বৃহস্পতিবার ২১ নভেম্বর ২০১৯


কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয় এক দশক পেরিয়ে


আমাদের কুমিল্লা .কম :
25.12.2016

প্রতিদিন প্রায় সাড়ে ছয় হাজার শিক্ষার্থী পা রাখেন কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাম্পাসে। আসেন শিক্ষক, বিশ্ববিদ্যালয়ের কর্মী। আর আসেন পর্যটক। চারদিকে সবুজের সমারোহ, নানা জাতের গাছ, আঁকাবাঁকা পাহাড়ি পথ, উঁচু উঁচু ঢিবি, তার ওপর ইট-কংক্রিটের দালান—সব মিলিয়ে পর্যটকদের জন্য কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয় একটা আকর্ষণীয় জায়গাই বটে।
শালবন বৌদ্ধবিহারের অদূরে ছবির মতো সাজানো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানটি কুমিল্লা অঞ্চলের একমাত্র উচ্চশিক্ষার বাতিঘর। এ অঞ্চলে শিক্ষার একটা ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটও রয়েছে। খ্রিষ্টীয় সপ্তম শতাব্দীতে চন্দ্র বংশীয় রাজা ভবদেব শালবন (আনন্দ) বিহার প্রতিষ্ঠা করেন। তখন এটি এশিয়ার জ্ঞানচর্চার অন্যতম উল্লেখযোগ্য বিদ্যাপীঠ ছিল। সে সময়ের পণ্ডিতেরা বিহারকে বিশ্ববিদ্যালয়ের মর্যাদা দিতেন। বহু দেশ থেকে মানুষ এ শহরে আসত জ্ঞান অন্বেষণের জন্য।
ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট মাথায় রেখেই এ অঞ্চলের মানুষ কুমিল্লায় একটি বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার দাবি জানিয়ে আসছিলেন। এ নিয়ে রাজপথে আন্দোলন-সংগ্রামও হয়েছে। অবশেষে ২০০৬ সালের ৭ ফেব্রুয়ারি বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করা হয়। ২০০৭ সালের ২৮ মে সাতটি বিভাগে ৩০০ শিক্ষার্থী ও ১৫ জন শিক্ষক নিয়ে যাত্রা শুরু করে কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়। বর্তমানে এ বিশ্ববিদ্যালয়ের চারটি অনুষদে ১৯টি বিভাগে ৬ হাজার ৫৩৫ জন শিক্ষার্থী ও ১৬৫ জন শিক্ষক রয়েছেন। রয়েছে সান্ধ্যকালীন এমবিএ, কম্পিউটার বিজ্ঞান ও প্রকৌশল (সিএসই) এবং ইংরেজিতে স্নাতকোত্তর (মাস্টার্স) প্রোগ্রাম। ছেলেদের জন্য তিনটি ও মেয়েদের জন্য একটি হল রয়েছে।

শিক্ষা ও সহশিক্ষা
‘আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়ে অনেক তরুণ শিক্ষক রয়েছেন। তাঁদের সঙ্গে আমাদের বোঝাপড়াটা ভালো বলেই এখানে পড়ালেখার মান ভালো’, বলছিলেন খাদিজা খাতুন। এ বিশ্ববিদ্যালয়েরই গণিত বিভাগে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর করেছেন তিনি। স্নাতকে তাঁর সিজিপিএ ছিল ৩.৮০, স্নাতকোত্তরে ৪.০। এখন একটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকতা করছেন।
এ বছর সারা দেশের প্রায় ৫৫ হাজার শিক্ষার্থী ভর্তির জন্য আবেদন করেছিলেন কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ে। সম্প্রতি ১ হাজার ৯৭ জনের ভর্তিপ্রক্রিয়া শুরু হয়েছে।
পড়ালেখার পাশাপাশি সহশিক্ষা কার্যক্রমেও সারা বছর সরব থাকে কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়। বিভিন্ন উৎসবে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের আয়োজন তো আছেই, শিক্ষার্থীদের সংগঠনগুলোও নিজেদের কার্যক্রমের মধ্য দিয়ে ক্যাম্পাস মাতিয়ে রাখে। এখানে গড়ে উঠেছে নাট্যসংগঠন থিয়েটার কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়, সাংস্কৃতিক সংগঠন প্রতিবর্তন, আবৃত্তি সংগঠন অনুপ্রাস কণ্ঠচর্চা, ব্যান্ডদল প্ল্যাটফর্ম, কুমিল্লা ইউনিভার্সিটি ডিবেটিং সোসাইটি, কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয় ফটোগ্রাফি সোসাইটি, স্বেচ্ছাসেবী রক্তদাতা সংগঠন বন্ধু, উদীচী, প্রথম আলো বন্ধুসভা ও কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয় সাংবাদিক সমিতি। বিভাগগুলোও নিজেদের মতো করে নিয়মিত বিভিন্ন অনুষ্ঠানের আয়োজন করে।
বিশ্ববিদ্যালয়ের সাংস্কৃতিক প্রতিনিধিদলের শিক্ষক ও নৃবিজ্ঞান বিভাগের সহকারী অধ্যাপক এন এম রবিউল আউয়াল চৌধুরী বলেন, ‘এ বিশ্ববিদ্যালয়ের চারজন শিক্ষার্থী ভারতে গিয়ে সাউথ এশিয়ান ইয়ুথ ফেস্টিভ্যালে বিতর্ক ও সংগীতে ভালো করেছে। খেলাধুলায়ও শিক্ষার্থীরা এগিয়ে আছে। গত বছর আন্তবিশ্ববিদ্যালয় ক্যারাম প্রতিযোগিতায় কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয় চ্যাম্পিয়ন হয়েছে। তবে অডিটরিয়াম না থাকার কারণে এখানে নিয়মিত সাংস্কৃতিক চর্চায় বেগ পেতে হচ্ছে।’ শিক্ষকের কথার সঙ্গে সায় জানালেন বিশ্ববিদ্যালয়ের বিতার্কিক ইসরাত জাহান। তিনি বলেন, ‘উপযুক্ত পৃষ্ঠপোষকতা আর অডিটরিয়াম থাকলে আমরা হয়তো আরও ভালো করতে পারতাম।’

পর্যটকদের কাছেও আকর্ষণীয় কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়‘রাজনৈতিক উত্তাপ চাই না’
প্রাতিষ্ঠানিকভাবে কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাম্পাস ‘ছাত্ররাজনীতিমুক্ত’ হিসেবেই পরিচিত। ভর্তির আগে শিক্ষার্থীদের এ-সংক্রান্ত অঙ্গীকারনামায় সই করতে হয়। কিন্তু বাস্তবচিত্রটা ভিন্ন। গত দশ বছরে রাজনৈতিক উত্তাপের কারণে বেশ কয়েকবার বিশ্ববিদ্যালয় বন্ধ হয়েছে। সর্বশেষ গত ৩১ জুলাই মধ্যরাতে ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক দলের দুপক্ষের সংঘর্ষে প্রাণ ঝরেছে মার্কেটিং চতুর্থ বর্ষের ছাত্র মো. খালিদ সাইফুল্লাহর। তখন বিশ্ববিদ্যালয় বন্ধ ছিল টানা দুই মাস।
১৫ ডিসেম্বর রাতে এ প্রসঙ্গে কথা হলো বেশ কয়েকজন শিক্ষার্থীর সঙ্গে। তাঁদের দাবি, শুধু কাগজে-কলমে নয়, সত্যিকার অর্থেই তাঁরা রাজনীতিমুক্ত ক্যাম্পাস চান। কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক সমিতির সভাপতি ও বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর মোহাম্মদ আইনুল হক অবশ্য জানালেন, ক্যাম্পাস রাজনীতিমুক্ত রাখতে তাঁরা যথাসাধ্য চেষ্টা করছেন।
গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের বিভাগীয় প্রধান মাহবুবুল হক ভূঁইয়া বলেন, শ্রেণিকক্ষ-সংকটের কারণে ক্লাস নিতে বেগ পেতে হচ্ছে। অনেকগুলো বিভাগেই এ সংকট রয়েছে। এ ছাড়াও পর্যাপ্ত আবাসন ও খেলাধুলার ব্যবস্থা নেই বলে অভিযোগ করলেন বেশ কয়েকজন শিক্ষার্থী। বিশ্ববিদ্যালয়ের অভ্যন্তরীণ সড়কগুলোরও নাজেহাল অবস্থা। আইন বিভাগের প্রথম বর্ষের শিক্ষার্থী রায়া ভট্টাচার্য বলছিলেন, ‘হলে আসন না থাকার কারণে মেসে থাকতে হচ্ছে। এতে করে নিরাপত্তা যেমন বিঘ্নিত হচ্ছে, আর্থিকভাবেও ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছি।’

মো. আলী আশরাফ, উপাচার্য, কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়আরও সময় দিতে হবে
হাঁটিহাঁটি পা পা করে এগিয়ে যাচ্ছে কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়। গত তিন বছরে আমার মেয়াদকালে কিছু কাজ করার চেষ্টা করেছি। ইতিমধ্যে আইন, গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগ চালু করেছি। বন ও পরিবেশবিজ্ঞান এবং হিউম্যান রিসার্চ ডেভেলপমেন্ট বিভাগের অনুমোদন আছে, অবকাঠামোর কারণে চালু করা যাচ্ছে না। ভবিষ্যতে বায়োকেমিস্ট্রি, জেনেটিকস ও মাইক্রোবায়োলজি বিভাগসহ যুগোপযোগী আরও বিভাগ খোলার চেষ্টা করব। ছাত্র-শিক্ষক, কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বিভিন্ন দাবি পূরণ করা হয়েছে। আরও হবে। বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্য ৫০ একর জায়গা অধিগ্রহণ, ছেলে ও মেয়েদের জন্য ১০ তলার দুটি হল এবং ১০ তলার একটি একাডেমিক ভবন এবং টিএসসি করার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের বয়স মাত্রই তো ১০ বছর, আমাদের আরও সময় দিতে হবে। অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতি এড়ানোর জন্য সব সময়ই আমরা চেষ্টা করছি।