সোমবার ৩০ নভেম্বর ২০২০
  • প্রচ্ছদ » sub lead 3 » আ.লীগের ক্ষমতার ৮ বছর মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচার সরকারের ঐতিহাসিক সাফল্য


আ.লীগের ক্ষমতার ৮ বছর মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচার সরকারের ঐতিহাসিক সাফল্য


আমাদের কুমিল্লা .কম :
16.01.2017

বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচার, আইনের শাসন প্রতিষ্ঠার লড়াইয়ে রাষ্ট্রের জন্য অন্যতম বড় চ্যালেঞ্জ। বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ডের বিচার সম্পন্ন করে টানা ৮ বছর ধরে ক্ষমতায় থাকা আওয়ামীলীগ ঐতিহাসিক দায়িত্ব পালনে সক্ষম হলেও মানবতাবিরোধী অপরাধীদের বিচার কাজ চলমান আছে। ইতোমধ্যেই টানা দ্বিতীয় মেয়াদে সরকার পরিচালনার তিন বছর শেষ করে ফেলেছে আওয়ামী লীগ।

বিশ্লেষকরা বলছেন, বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ডের বিচারের মত মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচার কাজ যদি আওয়ামী লীগ ঠিকঠাক মত চালিয়ে নিতে পারে তাহলে রাষ্ট্র হিসেবে বাংলাদেশ ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা অর্জনের রাষ্ট্রীয় চ্যালেঞ্জ উত্তরণে বিরাট সাফল্য অর্জন করবে।

মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে ব্যক্তিপর্যায়ে বিচার কাজ চলতে থাকলেও একই অপরাধে সংগঠন হিসেবে অভিযুক্ত জামাতে ইসলামকে নিষিদ্ধ করতে নানা মহল থেকে দাবির প্রেক্ষিতে ক্ষমতার নবম বছরে পা দিয়েও বর্তমান সরকার কোনো উল্লেখযোগ্য পদক্ষেপ নিতে সফল হয়নি। তবে সংবিধানের সঙ্গে গঠনতন্ত্র সাংঘর্ষিক হওয়ায় জামায়াতে ইসলামীর নিবন্ধন ২০১৩ সালের আগস্টে অবৈধ ও বাতিল ঘোষণা করেছে হাই কোর্ট। বিচারপতি এম মোয়াজ্জম হোসেন, বিচারপতি এম ইনায়েতুর রহিম, এবং বিচারপতি কাজী রেজাউল হকের বেঞ্চ এ রায় ঘোষণা করেন।

বাংলাদেশের গণপ্রতিনিধিত্ব আইন অনুযায়ী নির্বাচন কমিশনে নিবন্ধন না থাকলে কোন রাজনৈতিক দল নির্বাচনে অংশ নিতে পারে না। তাই এ রায় বহাল থাকলে আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচনে জামায়াতে ইসলামী অংশগ্রহণ করতে পারবে না। তবে জামায়াত রায়ের পরপর এর বিরুদ্ধে আপিল করায় বিষয়টি এখনো আইনি প্রক্রিয়াধীন।

২০০৯ সালের ৬ জানুয়ারি শেখ হাসিনার নেতৃত্বে শপথ গ্রহণ করে রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব নেয় আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে মহাজোট সরকার। নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে আওয়ামী লীগের নির্বাচনী ইশতেহারের অন্যতম প্রধান অঙ্গীকার ছিল ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধে মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচার কাজ সম্পন্ন করা।

ইশতেহারে করা অঙ্গীকার অনুযায়ী, ২০০৯ সালের ২৯শে জানুয়ারি জাতীয় সংসদে যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের প্রস্তাব পেশ করলে তা সর্বসম্মতিক্রমে গৃহীত হয়। ২০১০ সালের ২৫ শে মার্চ ট্রাইব্যুনাল, আইনজীবী প্যানেল এবং তদন্ত সংস্থা গঠন করা হয়। এ পর্যন্ত আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে ২৭টি মামলা নিষ্পত্তি হয়েছে। আপিল বিভাগে চূড়ান্তভাবে নিষ্পত্তি হয়ে ৬টি মামলার রায় কার্যকর করা হয়েছে। এখনো ২২টি মামলার বিচার কাজ চলছে।

সর্বশেষ আলবদর নেতা ও জামায়াতের অর্থের যোগানদাতা মীর কাসেম আলীর ফাঁসি কার্যকর করা হয়েছে। এর আগে জামায়াতের আমির মতিউর রহমান নিজামী, দলটির সেক্রেটারি জেনারেল আলী আহসান মোহাম্মদ মুজাহিদ, দুই সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল কাদের মোল্লা ও মুহাম্মদ কামারুজ্জামান এবং জামাতের ঘনিষ্ঠ রাজনৈতিক মিত্র বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরীর ফাঁসি কার্যকর হয়েছে।

আপিল বিভাগের আরেক রায়ে জামায়াতের নায়েবে আমির দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীর সাজা কমিয়ে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে। সেই রায়ের পূর্ণাঙ্গ অনুলিপি প্রকাশিত হওয়ার পর দুই পক্ষের করা রিভিউ আবেদন এখন নিষ্পত্তির অপেক্ষায়।

এছাড়া শুনানি চলার মধ্যেই মুক্তিযুদ্ধকালীন জামাতে ইসলামির আমির গোলাম আযম ও বিএনপির সাবেক মন্ত্রী আবদুল আলীমের মৃত্যু হওয়ায় তাদের আপিল নিষ্পত্তি হয়ে গেছে। এছাড়া ট্রাইব্যুনালে বিচারাধীন অবস্থায় মারা যান জামায়াতের নায়েবে আমীর ও মুক্তিযুদ্ধের সময় খুলনায় রাজাকার বাহিনীর প্রতিষ্ঠাতা একেএম ইউসুফ।

আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের প্রসিকিউটর রেজিয়া সুলতানা ঢাকাটাইমসকে জানিয়েছেন, ট্রাইব্যুনালে এ পর্যন্ত ২৭টি মামলার চূড়ান্ত রায় হয়েছে। এখনো ২২টি মামলার বিচার কাজ চলছে।

আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের দেওয়া দণ্ডের বিরুদ্ধে সর্বোচ্চ আদালতে আপিল করেছেন আওয়ামী লীগের বহিষ্কৃত নেতা ব্রহ্মণবাড়িয়ার মোবারক হোসেন, জামায়াত নেতা রংপুরের এটিএম আজহারুল ইসলাম, পাবনার আবদুস সুবহান, জাতীয় পার্টির সাবেক নেতা হবিগঞ্জের সৈয়দ মুহম্মদ কায়সার, সাবেক মুসলিম লীগ নেতা চাঁপাইনবাবগঞ্জের আফসার হোসেন চুটু ও মাহিদুর রহমান, পটুয়াখালীর ফোরকান মল্লিক, বাগেরহাটের সিরাজুল হক ওরফে কসাই সিরাজ, খান আকরাম হোসেন, নেত্রকোনার আতাউর রহমান ননী ও ওবায়দুল হক তাহের। তাদের আপিল শুনানির অপেক্ষায় রয়েছে। মামলার রায় অনুযায়ী পর্যায়ক্রমে এসব আপিলের শুনানি অনুষ্ঠিত হবে।

এ ছাড়া মানবতারোধী অপরাধের দায়ে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের বিচারে ১০ জনের ফাঁসিসহ বিভিন্ন মেয়াদে সাজার আদেশ হলেও তারা বিচারের আগ থেকেই পলাতক। তারা হলেন, জামায়াত নেতা আবুল কালাম আযাদ ওরফে বাচ্চু রাজাকার, আলবদর নেতা চৌধুরী মাইনুদ্দিন ও আশরাফুজ্জামান খান, নগরকান্দার বিএনপি নেতা জাহিদ হোসেন ওরফে খোকন রাজাকার, পিরোজপুরের সাবেক এমপি জাতীয় পার্টির ইঞ্জিনিয়ার আবদুল জব্বার, কিশোরগঞ্জের রাজাকার সৈয়দ মো. হাসান আলী, কিশোরগঞ্জ করিমগঞ্জের ক্যাপ্টেন (অব.) নাসিরউদ্দিন, গাজী আবদুল মান্নান, হাফিজউদ্দিন ও আজহারুল ইসলাম।

তবে মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচার প্রক্রিয়া এগিয়ে নেয়ার কাজটি কখনোই সহজ ছিলনা। আওয়ামীলীগ সরকার ক্ষমতায় আসার কয়েকদিনের মধ্যেই দেশের ইতিহাসে অন্যতম বড় বিপর্যয় হিসেবে বিবেচিত ‘বিডিআর বিদ্রোহ’ সংঘটিত হয় ২০০৯ সালের ২৫-২৬ ফেব্রুয়ারি।  সে ধাক্কা কাটিয়ে উঠে মানবতাবিরোধী অপরাধীদের বিচার শুরু করা ছিল সরকারের জন্য কঠিন এক কাজ।

অন্যদিকে ২০১৩ সালের ৫ই ফেব্রুয়ারি যুদ্বাপরাধী আব্দুল কাদের মোল্লাকে ৩টি মামলায় ১৫ বছরের কারাদণ্ড এবং ২টি মামলায় যাবজ্জীবন কারাদণ্ড প্রদান করে ট্রাইব্যুনাল। কিন্তু কাদের মোল্লাসহ সকল যুদ্ধাপরাধীর অভিযোগে অভিযুক্তদের ফাঁসির দাবীতে ওইদিনই ছাত্র, শিক্ষক সহ বিভিন্ন শ্রেণী-পেশার হাজার হাজার মানুষ রাজধানীর শাহবাগ চত্বরে এসে জড়ো হয়। শাহবাগের এই প্রতিবাদ অতিদ্রুত ছড়িয়ে পড়ে দেশের বিভিন্ন অংশে। শাহবাগসহ সারা বাংলাদেশেই ‘যুদ্ধাপরাধী’র ফাঁসির দাবীতে গঠিত হয় গনজাগরণ মঞ্চ। অন্যদিকে, শাহবাগে আন্দোলনকারীদের নেতৃত্বে রয়েছে “নাস্তিক ব্লগাররা” মর্মে অভিযোগ এনে চট্টগ্রামের হাটহাজারী মাদ্রাসার প্রধান শিক্ষক শাহ আহমদ শফীর নেতৃত্বে হেফাজতে ইসলাম নামক একটি সংগঠন সক্রিয় হয়ে উঠে।

হেফাজতে ইসলামের ব্যানারে ২০১৩ সালের ৫ই মে, হাজার হাজার মানুষ ঢাকা অবরোধ কর্মসূচি পালন করে এবং মতিঝিলে তাদের দ্বিতীয় সমাবেশের আয়োজন করে। ৫ ও ৬ই মে ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে নিরাপত্তা বাহিনীর সাথে এই সংগঠনের কর্মীদের ব্যাপক সংঘর্ষে হেফাজতে ইসলামের কর্মী, পুলিশ, বিজিবি সদস্যসহ বহু হতাহত হয়। পরে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী অত্যন্ত কৌশলের সাথে রাতের আঁধারে হেফাজতে ইসলামের নেতা-কর্মীদের মতিঝিল ত্যাগ করতে বাধ্য করে।

এদিকে সরকারের দ্বিতীয় মেয়াদের চতুর্থ বছরে এসে মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচার প্রক্রিয়া নতুন মাত্রালাভ করেছে। হাইকোর্ট বিভাগে বিচারকের সংখ্যা কমে যাওয়া, জায়গা সঙ্কটের কথা উল্লেখ করে পুরাতন হাইকোর্ট ভবন থেকে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল অন্য কোথাও সরানোর জন্য ইতিমধ্যে দুইবার আইনমন্ত্রণালয়কে চিঠি দিয়েছে সুপ্রিম কোর্ট প্রশাসন। দুইবার ট্রাইব্যুনাল না সরানোর জন্য পাল্টা চিঠি দিয়েছে আইনমন্ত্রণালয়। আইন মন্ত্রণালয় বলেছে, ট্রাইব্যুনাল স্থানান্তর করলে তা সর্বজনগ্রাহ্য হবে না বরং সুপ্রীমকোর্ট দেশবাসীর কাছে প্রশ্নবিদ্ধ হবে।

আইন মন্ত্রণালয়ের চিঠিতে বলা হয়, ‘পুরাতন হাইকোর্ট ভবনটি বাংলাদেশের ঐতিহ্যবাহী ও ঐতিহাসিক স্থাপনা। ভবনটি ব্রিটিশ আমলে পূর্ব বাংলা ও অসম প্রদেশের গবর্নরের সরকারী বাসভবন হিসেবে নির্মাণ করা হয়। পরবর্তীতে এ ভবনটিকে পূর্ব পাকিস্তানের হাইকোর্টে রূপান্তর করা হয়।’ চিঠিতে বলা হয়, ‘১৯৭১ সালে মহান স্বাধীনতাযুদ্ধের সময় সংঘটিত অপরাধের সঙ্গে জড়িতদের বিচারকার্য পরিচালনার জন্য বর্তমান সরকার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে। এরই ধারাবাহিকতায় অন্য কোথাও যৌক্তিক ও নিরাপদ স্থাপনা না পাওয়ায় সরকার পুরাতন হাইকোর্ট ভবনে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল স্থাপন করে।’

আইন মন্ত্রণালয়ের ওই চিঠিতে বলা হয়, ‘ট্রাইব্যুনালে বিচারকার্য শুরুর পর অনেক কুখ্যাত যুদ্ধাপরাধী ও মানবতাবিরোধী অপরাধীর বিচারকাজ সুসম্পন্ন হয়। এ কারণে এই ভবনটির ঐতিহ্য ও গুরুত্ব বহুগুণে বৃদ্ধি পেয়েছে।’ চিঠিতে আরও বলা হয়, ‘বাংলাদেশের জনগণ চায় ঐতিহাসিক ভবনটির মর্যাদা সমুন্নত রেখে অত্র ভবনেই যুদ্ধাপরাধীদের বিচারকাজ অব্যাহত থাকুক। আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল এ ভবন থেকে অন্যত্র সরানো হলে জনমনে ক্ষোভের সৃষ্টি হবে এবং সর্বজনগ্রাহ্য হবে না। বরং বাংলাদেশ সুপ্রীমকোর্ট দেশবাসীর কাছে প্রশ্নবিদ্ধ হবে।’ ‘সকল বিষয় বিবেচনা করে পুরাতন হাইকোর্ট ভবন থেকে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল স্থানান্তর করে ভবনটি বাংলাদেশ সুপ্রীমকোর্টের অনুকূলে দখল হস্তান্তর করা সমীচীন হবে না’ বলেও সুপ্রীমকোর্টকে জানায় আইন মন্ত্রণালয়।

ট্রাইব্যুনালের বিচার প্রক্রিয়ার সর্বশেষ অবস্থা সম্পর্কে জানতে ঢাকাটাইমস কথা বলেছিল ট্রাইব্যুনালের প্রসিকিউটর ব্যারিস্টার তুরিন আফরোজ’র সাথে। তুরিন আফরোজ বলেছেন,  যে প্রক্রিয়ায় মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচার কাজ চলছে, তাতে রাষ্ট্র হিসেবে বাংলাদেশ গর্ব করতে পারে।

তিনি বলেন, “আমরা অনেক প্রতিকুলতার মধ্যে অনেকগুলো মামলা নিষ্পত্তি করেছি। বিশ্বের ভেতরে একটা দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছি আমরা। অন্যান্য দেশে মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচার প্রক্রিয়া হিসেবে বাংলাদেশের এই ট্রাইব্যুনাল মডেল হিসেবে পরিগণিত হচ্ছে,”।

তিনি বলেন,  মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচার প্রক্রিয়া চলমান আছে। এই অতীব গুরুত্বপূর্ণ প্রক্রিয়াকে এগিয়ে নেতে হবে।