রবিবার ২২ অক্টোবর ২০১৭


গোমতী পারপারে ৪৩ বছর


আমাদের কুমিল্লা .কম :
08.02.2017

মাহফুজ নান্টু ||

কুমিল্লার গোমতী নদী। শহরের উত্তরাংশের পাশ দিয়ে বয়ে যাওয়া নদীটির ওপারের মানুষ এপারে, আর এপারের মানুষকে ওপারে পার করে দিয়ে কাটিয়ে দিলেন ৪৩ বছর। মহান স্বাধীনতার সময় মুক্তিবাহিনীকে তথ্য ও খাবার সংগ্রহ করে স্বাধীনতা যুদ্ধে অবদান  রাখা তামাটে বর্ণের তেজদীপ্ত যুবকটি এখন বয়সের ভারে নুহ্য। ব্যক্তি জীবনে আর্থিক অবস্থার ন্যূনতম পরিবর্তন হয়নি। তবে এ নিয়ে কোন আক্ষেপও নেই। দারিদ্রের কষাঘাতে জর্জরিত হয়েও সহজ সরল জীবন যাপন করেছেন। ৪৩ বছর ধরে খেয়া পারাপার করে কাটিয়ে দেয়া লোকটি জেলার বুড়িচং উপজেলার ষোলনল ইউনিয়নের ষোলনল গ্রামের মরহুম জুনাব আলীর মেঝো সন্তান আবদুর রশিদ (৭৫)। মুক্তিযুদ্ধের সময়কার কোন ডকুমেন্ট রাখতে পারেননি বলে মিলেনি রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি। তাই বলে কোন আক্ষেপ নেই সহজ সরল এ মানুষটির। তার বড় ও ছোট দু’ভাই অনেক আগেই গত হয়ে গেছেন।
ষোলনল ইউনিয়নসহ আশেপাশের এলাকার সাধারণ মানুষজনের কাছে মাঝি রশিদ নামে পরিচিত লোকটি স্বাধীনতা যুদ্ধের সময় তাগড়া যুবক ছিলেন। বিয়ে করেন চাচাতো বোন আমিনা খাতুনকে। বড় মেয়েটি যখন পৃথিবীর মুখ দেখলো তার কিছু দিন পরেই স্বাধীনতা যুদ্ধের দামামা বেজে উঠল। ঘরে থাকলে বিপদ,তাই কোন চিন্তা না করে আড়ালে আবডালে পাকিস্থানীদের বিভিন্ন গোপন তথ্য পৌঁছে দিতেন মুক্তিবাহিনীর কাছে। আবার খাবার সংগ্রহ করে পৌঁছে দিতেন মুক্তিযোদ্ধাদের কাছে। স্বাধীনতা যুদ্ধের পরে সংসারী হওয়ার সময়ে কঠিন সমস্যায় পড়েছিলেন।
কারণ বাবা জুনাব আলী দরিদ্র কৃষক  ছিলেন। অন্যর জমি বর্গা চাষ করতেন। স্বাধীনতা যুদ্ধের পর আবদুর রশিদও জীবন ধারনের জন্য বাবার পথ বেছে নেন গোমতী চরে অন্যর জমি বর্গা চাষ শুরু করেন। একে একে রশিদ-আমেনা দম্পতির ঘরে ছয় মেয়ে এক ছেলে মিলে ৯ জন সদস্যর একটি বড় পরিবার হয়ে যায়। বর্গা চাষ করে সংসার চালানো সম্ভব নয় বলে পাশে থাকা গোমতী নদীর খেয়া ঘাটের মাঝি হয়ে গেলেন। স্বাধীনতা যুদ্ধের পর থেকে নদীর পাড়ের মানুষজনকে এপার ওপার পার করে দিয়ে সংসার চালানো শুরু হয়। দারিদ্রতা দূর না হলেও দৈন্যতায় ভরা জীবনের বরাদ্দ থেকে কেটে যায় জীবনের ৪৩ টি বছর। বড় দু’মেয়েও পরপারে চলে যায়। এখন নদীর পাড়ে বসে চতুর্থ শ্রেণীতে পড়–য়া নাতি সিয়ামের নৌকা পারাপার দেখেন নৌকায় করে নদী পার হওয়া  ভাড়া নেন। প্রতিজন ৫টাকা করে।
গত ৪৩ বছর ধরে খায়াঘাটের বাৎসরিক ইজারা গড়ে ১০-১৫ হাজার টাকা করে দেন। বর্তমানে দৈনিক আড়াইশ থেকে সাড়ে ৩শ টাকা ভাড়া পান। এ সামান্য আয় দিয়ে কায়ক্লেশে জীবন পার করছেন।
খেয়া ঘাটের মাঝি আবদুর রশিদের সাথে কথা হয়। জীবনের দৈন্যদশার কথা বলেন। জানান এ পর্যন্ত প্রায় ১০-১২ নৌকা কিনেছেন। এনজিও ও ব্যাংক থেকে ঋণ নিয়ে কেনেন। মুক্তিযুদ্ধের কথা বলেন। গোমতী নদীর পাড়ের পালপাড়ায় বাঙ্গালী নিরহ মানুষকে কিভাবে নৃসংশভাবে গুলি করে হত্যা করেছে পাকিস্থানীরা তাও দেখেছেন। আড়ালে চোখের পানি ছেড়ে সমবেদনা জানিয়েছেন মুক্তিকামী শহীদদের জন্য। নিজেও সহযোগিতা করেছেন মুক্তিযোদ্ধাদের।