শুক্রবার ২৩ অগাস্ট ২০১৯


এবার ট্রাম্প-পূজারি ভারতীয়রাই ‘ট্রাম্পড’ হচ্ছেন


আমাদের কুমিল্লা .কম :
14.03.2017

আমেরিকান প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প আবার মাজা-কোমড় বেঁধে নেমেছেন। তিনি আবার ‘মুসলিম ব্যান’-এর মতো এক নির্বাহী আদেশ জারি করেছেন গত ৬ মার্চ। তবে অনেক ধরনের আঁটঘাট বেঁধে এবার তিনি আসছেন। যেমন প্রথমত তার এবারের কর্মকে ঠিক সরাসরি ‘মুসলিম ব্যান’ যেন না বলা যায় এর ব্যবস্থা তিনি করছেন। তাই এর ডাক নাম এবার ‘রিভাইজড ট্রাভেল ব্যান’ বা সংশোধিত ট্রাভেল ব্যান। এছাড়া আগের সাত মুসলিম রাষ্ট্রের জায়গায় এবার কেবল ইরাককে বাদ দেওয়া হয়েছে। কিন্তু বাকি সুনির্দিষ্ট সেই আগের ছয় রাষ্ট্রেরই নাম উল্লেখ করা হয়েছে। তবে ওরা মুসলমান বলে এই ট্রাভেল ব্যান কিনা সে ‘ডাক’ এবার তিনি উহ্য রেখেছেন। কিন্তু ‘টেররিস্ট শব্দের’ ওপর জোর দিয়েছেন।

ট্রাম্পের প্রথমবার জারি করা ‘মুসলিম ব্যান’ আদেশ দেওয়া হয়েছে গত ২৭ জানুয়ারি ২০১৭। তার শপথ গ্রহণের এক সপ্তাহের মধ্যে। কিন্তু আমেরিকার বিভিন্ন এয়ারপোর্টে  ট্রাম্প-বিরোধী অ্যাক্টিভিস্টরা আগে থেকেই তৎপরতায় জমায়েত হয়ে বিক্ষোভ শুরু করেছিল। ওদিকে বেশির ভাগ ট্রাভেলারই আমেরিকায় নামার পরই টের পেয়েছিল ওই নির্বাহী নিষেধাজ্ঞার কথা। ফলে অ্যাক্টিভিস্টদের তৎপরতায় কেবল মুসলমান হওয়ার কারণে এয়ারপোর্টে নাস্তানাবুদ হওয়ার ঘটনা দেশে-বিদেশে বিশাল সহানুভূতি যোগাড় করতে পেরেছিল। এবার যাতে তেমন সুযোগ না পায় সে ব্যবস্থা নিতে এবার ৬ মার্চ নির্দেশ জারি করা হলেও বলা হয়েছে, এই নির্দেশ কার্যকর হবে ১০ দিন পর আগামী ১৬ মার্চ থেকে। এছাড়া আগের আদেশের বিরুদ্ধে কয়েকটা ফেডারেল আদালত পাল্টা আদেশ দেওয়ায় শেষ পর্যন্ত ট্রাম্পের নির্বাহী আদেশটাই বাতিল বা নাল ভয়েড হয়ে গিয়েছিল। এবার তাই ধর্মীয় সংখ্যালঘুর নাম সরাসরি উল্লেখ করা হয়নি, যেটা আগের বার করা হয়েছিল। এতে ট্রাম্পবিরোধীরা এর আগে জনসমক্ষে এবং আদালতে অভিযোগ ও ব্যাখ্যা করার সহজ সুবিধা পেয়েছিল যে, প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প মুসলমান ব্যতীত  অন্য ধর্মগুলোকে বৈষম্যমূলক বা বাড়তি সুবিধা দিয়েছেন। আর এতেই আদালতেরও বাতিল আদেশ দিতে সুবিধা হয়েছিল। সেকথা মনে রেখে এবার শিরোনামে কথাটা বলা হয়েছে ‘ট্রাভেলারস ব্যান’। ঠিক ‘মুসলিম ব্যান’ নয়। এছাড়া মূল সংজ্ঞায়ন করা হয়েছে এভাবে যে, যারা সম্ভাব্য টেররিস্ট তাদের হাত থেকে আমেরিকান নাগরিকদের সুরক্ষা দিতে ওই টেররিস্টদের আমেরিকায় প্রবেশাধিকার ঠেকাতেই এই সাময়িক নিষেধাজ্ঞার আদেশ দিচ্ছেন। কিন্তু আবার সাময়িক কেন? কারণ প্রেসিডেণ্ট ট্রাম্প আসলে ওই ছয় দেশ থেকে ট্রাভেলার আসতে ভিসা দেওয়া অথবা শরণার্থী আসার অনুমতি দেওয়ার যে আইনকানুনগুলো আছে তা নতুন করে বিবেচনা- মানে মূল্যায়ন ও সূক্ষ্মভাবে পরীক্ষা করে দেখার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। সেই কাজের লক্ষ্যে তিনি অন্তর্বর্তী সময়কাল ৯০ দিনের জন্য এই নিষেধাজ্ঞা জারি করছেন। স্পষ্ট করে লিখেছেন, ‘সম্প্রতি শরণার্থীবেশে টেররিস্টরা আমেরিকায় প্রবেশের ছুতা খুঁজছে’। ১. কংগ্রেস ইতোমধ্যেই সিরিয়া ও ইরাকের ওপর নিষেধাজ্ঞা জারির কথা বলেছেন। ২. যেসব দেশকে আমেরিকান সেক্রেটারি অব স্টেট (বিদেশমন্ত্রী) ‘টেররিজমের পৃষ্ঠপোষকতা’ করে বলে তালিকাবদ্ধ করেছেন – যেমন ইরান, সিরিয়া ও সুদান- এসব রাষ্ট্র এবং এছাড়াও ৩. হোমল্যান্ড সিকিউরিটি যেসব রাষ্ট্রের ব্যাপারে উদ্বিগ্নতা প্রকাশ করেছে ইত্যাদি এই তিন ক্যাটাগরিকে বিবেচনায় নিয়ে আপাতত ছয়টা রাষ্ট্রকে এই নিষেধাজ্ঞা তালিকায় নেওয়া হয়েছে। তবে এবার ইরাকের নাম বাদ রাখা হয়েছে ‘ডিফেন্স সেক্রেটারি জিম ম্যাটিসের অনুরোধে যিনি আশঙ্কা করেন যে, ইরাকের নাম বাদ না রাখা হলে এতে আইএস বা ইসলামি স্টেটকে পরাজিত করার কাজের সমন্বয় বজায় রাখা ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে’।

এছাড়াও ওদিকে, যারা আমেরিকার স্থায়ী বসবাসের অনুমতিপ্রাপ্ত অথবা ইতোমধ্যে ভিসাধারী হয়ে আছেন তাদের (জন্ম ওই ছয় রাষ্ট্রের অরিজিন হলেও) ওপর ‘সংশোধিত ট্রাভেল ব্যান’ প্রযোজ্য হবে না। আবার আগের বার, সিরিয়ান রিফিউজির বেলায় ট্রাভেল ব্যান অনির্দিষ্টকালের জন্য বলবৎ করা ছিল, তা বদল করে এবার ১২০ দিন করা হয়েছে। মোটামুটি এই হলো নতুন সংশোধিত ট্রাভেল ব্যানের পুরা ভাষ্য, যা দেখে সেখান থেকে মূল কিছু পয়েন্ট টুকে আনা হয়েছে।

এটা পরিষ্কার বোঝা যাচ্ছে যে, ট্রাম্পবিরোধী অ্যাক্টিভিস্টরা যাতে এবার মাঠগরম করতে কম সুবিধা পায় সে লক্ষ্যে নির্বাহী আদেশ যতদূর সম্ভব সংশোধন করে নেওয়া হয়েছে। তাই এরপরও সেটা কত দূর, কোথায় গিয়ে দাঁড়াবে তা বোঝা যাবে আগামী ১৬ মার্চ থেকে এই আদেশ কার্যকর হতে শুরু করার পর।

তবে ইতোমধ্যে আগের নির্বাহী আদেশ স্থগিত করে দিয়েছিল যে ফেডারেল আদালত, সেখানে আবার গিয়ে আবেদন জানানো হয়েছিল যে পুরানো স্থগিত আদেশটাই নতুন নির্বাহী আদেশের ওপরও প্রযোজ্য বলে যেন তিনি ঘোষণা করেন। কিন্তু এই আবেদনে ফেডারেল আদালত সাড়া দিতে রাজি হয়নি। কিন্তু অ্যাক্টিভিস্টদের জন্য এক ইতিবাচক খবর আছে। খবরটা হলো, এরপরেও ‘সংশোধিত ট্রাভেল ব্যান’ ইতোমধ্যেই নিজের বিরুদ্ধে প্রথম ধাক্কা খেয়েছে। সংক্ষেপে সে ঘটনাটা হলো, সিরিয়ান এক নাগরিক অনেক আগে রিফিউজি স্ট্যাটাসে আমেরিকায় বসবাসের অনুমতি পেয়েছিল। এরপর সিরিয়ার যুদ্ধবিধ্বস্ত আলেপ্পোতে অবস্থানরত এবং কোনোমতে টিকে থাকা তার স্ত্রী ও একমাত্র জীবিত কন্যাকে নিজের কাছে আনতে আদালতের অনুমতিও পেয়েছিল। কিন্তু তাদের আমেরিকায় আনতে যাওয়ার মুহূর্তে ট্রাম্প প্রশাসনের প্রথম নিষেধাজ্ঞায় সবকিছু অনিশ্চিতভাবে স্থগিত হয়ে গেছিল। উইসকনসিন স্টেটের এক আদালত ট্রাম্প প্রশাসনের আদেশের বিরুদ্ধে গিয়ে ওই লোকের স্ত্রী ও তিন বছরের মেয়েকে আবার আমেরিকায় এসে একসঙ্গে থাকার অনুমতি দিয়েছে।

এই ঘটনার তাৎপর্য হলো, লন্ডন গার্ডিয়ান পত্রিকা বার্তা সংস্থা এপির সুত্র ধরে বলছে, ‘ওই সিরিয়ান নাগরিক আসলে আদালতে গিয়েছিল ট্রাম্পের ‘সংশোধিত ট্রাভেল ব্যান’ আদেশ ঘোষণার পরে এবং সরাসরি নতুন আদেশের বিরুদ্ধেই অভিযোগ নিয়ে যে, ‘ট্রাম্পের সংশোধিত ট্রাভেল ব্যান’ এখনও মুসলিমবিরোধী হয়ে আছে। এটা তার ধর্মীয় স্বাধীনতা এবং ন্যায়বিচার পাওয়ার অধিকার থেকে তাকে বঞ্চিত করে রেখেছে। তাই তিনি বিচারক মাইকেল কনলির কাছে আবেদন রাখেন ট্রাম্পের, ‘সংশোধিত ট্রাভেল ব্যান’ যেন তার পরিবারের ওপর অকার্যকর থাকবে বলে তিনি আদেশ দেন’। সুতরাং এমন মনে করার সম্ভাবনা ও কারণ আছে যে, ট্রাম্পের ‘সংশোধিত ট্রাভেল ব্যান’ও আবার আদালতে চ্যালেঞ্জ করা হতে পারে।

এটা খুব স্বাভাবিক যে প্রথম নিষেধাজ্ঞার পর থেকে ট্রাম্প চরমভাবে মুসলিমবিদ্বেষী বলে চিহ্নিত ও পরিচিতি পেয়ে গেছেন। কিন্তু ট্রাম্পের আসল উদ্দেশ্য কী মুসলমান বা ইসলাম বিদ্বেষ? এ নিয়ে সন্দেহ করার অবকাশ আছে। খুব সম্ভবত ট্রাম্পের মূল টার্গেট বিদেশি বা ইমিগ্রান্টদের আমেরিকা ছাড়া করা। কেন?  ঠিক যে কারণে ‘ভারত বা চীন আমেরিকানদের চাকরি খেয়ে ফেলতেছে’, ফলে ট্রাম্প সেসব চাকরি ফিরিয়ে আনার লক্ষ্যে ভোটারদের পক্ষে কাজ করবেন- এই প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন এবং  ক্ষমতায় এসেছেন। এখন সেই প্রতিশ্রুতি রক্ষার পক্ষে কাজ করতে চান। আসলে যখন আমেরিকান অর্থনীতিতে ভাটা চলে, কাজের অভাব প্রকট দৃশ্যমান হয় তখন রিপাবলিকানদের দিক থেকে খুব সস্তা ও কমন এক স্লোগান হলো- বিদেশি বা ইমিগ্রান্ট খেদাও। একথা বলে চটকদারি পপুলার জনসর্থন যোগাড় করা। এছাড়া এখন পশ্চিমে যেহেতু ইসলামবিরোধী সেন্টিমেন্ট ভালো কাজ করছে তাই এর আড়ালে ট্রাম্প আসলে তার ‘বিদেশি বা ইমিগ্রান্ট খেদাও’ স্লোগানটা মাখিয়ে হাজির করেছেন। এক ঢিলে দুই পাখি। এজন্য তার মূল আক্রমণের লক্ষ্য শরণার্থী বা ইমিগ্রান্ট আশ্রয়প্রার্থী। অবশ্য মনে রাখতে হবে, এর মানে এই না যে, ইমিগ্রান্টদের বের করে দিলেই আমেরিকানদের চাকরির বাজারে সুদিন ফিরে আসা নিশ্চিত। কোনো গবেষণা প্রমাণ এখানে নেই। কেবল চটকদারি পপুলার জনসর্থন যোগাড় করাই এর লক্ষ্য। আসলে বাইরের বা বিদেশি বলে কাউকে এনিমি হিসেবে হাজির করে দেখাতে পারলে জনসমর্থন তুঙ্গে রাখার এটা এক পপুলার উপায়।

ব্যাপারটা আর একদিক থেকে দেখা যাক। অনেকেই লক্ষ করেছেন যে, ট্রাম্পের প্রথম ‘মুসলিম ব্যান’ আদেশে ভারতের সরকার এবং ইসলামবিদ্বেষী জনগণ খুশি হয়েছিলেন। বাংলাদেশ কেন বাংলাদেশের পাশপোর্টে ইসরায়েলে ভ্রমণ নিষেধাজ্ঞা দিয়ে রেখেছে? অতএব ট্রাম্পের ‘মুসলিম ব্যান’ জায়েজ এমন আজগুবি তুলনা দিয়েও কিছু ভারতীয়কে সোশ্যাল মিডিয়ায় সাফাই স্ট্যাটাস দিতে দেখা গিয়েছিল। এছাড়া বিজেপি- আরএসএসের হাত ধরে ভারতের ইসলামবিদ্বেষী অংশের মানুষজন প্রকাশ্যে নির্দ্বিধায় ট্রাম্পের ছবি টাঙিয়ে ধূপধুনা দিয়ে তাকে পূজা করতেও আমরা দেখেছি। সারকথা, ট্রাম্প ভারতের সরকার ও হিন্দু জনগণের স্বার্থরক্ষার লোক (মানে মুসলমানের বিরুদ্ধ লোক) হিসেবে তারা বুঝতে চেয়েছিলেন। কিন্তু এখন বাস্তবতা হলো পুরা উল্টা। গত কয়মাসে পর পর তিন ভারতীয় চোরাগোপ্তা হামলার শিকার হয়েছেন। গুলি করে তাদের ওপর হামলা হওয়ার পর হামলাকারীরা তাদের বলেছে, ‘ভারতে ফিরে যেতে’। তাতে এবার ভারতীয়দের টনক নড়েছে। আনন্দবাজার পত্রিকা এবার সম্পাদকীয় লিখে স্বীকার করছে, ‘ভুল হয়ে গেছে’। সম্পাদকীয়ের শিরোনাম হচ্ছে, ‘পড়শীরা যখন আক্রান্ত হচ্ছিলেন তখন পাশ ফিরে শোওয়াটা উচিত হয়নি’ । ঘটনা এখানেই শেষ নয়। সর্বশেষ ঘটনাটা হলো, আগের ‘মুসলিম ব্যান’-এ খুশি হওয়া ভারতীয়রা এবার অবাক বিস্ময়ে আবিষ্কার করেছে যে, এই গত সপ্তাহে এক ভারতীয় শিখ অরিজিন কানাডীয় নাগরিক (মনপ্রিত কুনার)কে আমেরিকায় প্রবেশ করতে দেওয়া হয়নি, এয়ারপোর্ট থেকে ফিরিয়ে দেওয়া হয়েছে। এ নিয়ে গত ১০ মার্চ আনন্দবাজার পত্রিকা বিরাট আপসোস করে এক রিপোর্ট ছেপেছে। লিখেছে, ‘…আমেরিকায় প্রবেশ আটকে দিয়ে মার্কিন সীমান্ত অফিসার বলেন,‘আপনার নিশ্চয় মনে হচ্ছে, আপনি ট্রাম্প-ড!’। এখানে কে যে আসলে ট্রাম্পড? ট্রাম্প পূজারি ভারতীয়রা নাকি ওই সাত বা ছয় দেশের মুসলমানেরা! না কি সবাই? বোঝাবুঝির সময় এসেছে!

গৌতম দাস : রাজনৈতিক বিশ্লেষক

[email protected]