শনিবার ১৯ অক্টোবর ২০১৯
  • প্রচ্ছদ » sub lead 3 » কুমিল্লা ভিক্টোরিয়া সরকারি কলেজের সাবেক অধ্যক্ষ প্রফেসর আমীর আলৗ চৌধুরী’র আজ ৮০তম জন্মদিন


কুমিল্লা ভিক্টোরিয়া সরকারি কলেজের সাবেক অধ্যক্ষ প্রফেসর আমীর আলৗ চৌধুরী’র আজ ৮০তম জন্মদিন


আমাদের কুমিল্লা .কম :
15.03.2017

স্টাফ রিপোর্টার।।
আলহাজ্ব প্রফেসর আমীর আলী চৌধুরী’র
৮০তম জন্মদিন উপলক্ষে তাঁর লিখিত
বিবৃতিটি প্রকাশ করা হল ঃ

আজ আমি আমার অগণিত ছাত্র-ছাত্রী, শুভানুধ্যায়ী এবং আত্মীয় স্বজনদের কাছে একটি তথ্য জ্ঞাপনের তাগিদ বোধ করছি। নইলে নিজের বিবেকের কাছে আমাকে দায়বদ্ধ থাকতে হবে। বিষয়টি আমার জন্ম তারিখ সংক্রান্ত। ইতিপূর্বে গের দুই বছর ২ সেপ্টেম্বর তারিখে কেউ কেউ আমাকে ফেইসবুক বা অন্য মাধ্যমে জন্ম দিনের শুভেচ্ছা জানিয়েছে। জবাবে আমার কোন প্রতিক্রিয়া ছিল না, আমি বরং বিব্রত বোধ করেছি। কারণ এই কাগুজে জন্ম তারিখটা সঠিক নয়।

আমাদের আমলে ম্যাট্রিকুলেশন (বর্তমানে এস.এস.সি) পরীক্ষার ফরম পূরণকালে জন্ম তারিখ নির্ধারণের ক্ষেত্রে অনেক সময় আমাদের শ্রেণি-শিক্ষকরা মুখা ভূমিকা পালন করতেন। আমার বেলায় এমনটিই ঘটেছিল।

আমার প্রকৃত জন্ম তারিখ আড়াল হবার নেপথ্যে আছে এক বেদনাবিধুর অধ্যায়। সেটি আমার মাতা সায়েকা খানম চৌধুরানীর অস্বাভাবিক অকাল করুণ মৃত্যু। সনটা ১৯৪৯। সবে মাত্র সপ্তম শ্রেনিতে উঠেছি। বেশ মনে আছে, মার্চের পয়লা সপ্তাহ শেষে, মঙ্গলবার বিকেলে, স্কুল থেকে বাড়ি ফিরে দেখি, আম্মার কামড়া জুড়ে বড় রকমের জটলা। স্বভাবে বিন¤্র, সদা অনুচ্চকণ্ঠ আম্মার তীব্র কণ্ঠস্বর ভেসে আসছে ভেতর থেকে।

আম্মা বৃহত্তর সিলেট জেলা অধুনা সুনামগঞ্জের প্রখ্যাত ভাটীপাড়া জমিদার বাড়ির কন্যা। তাঁর কথনে খানিকটা সিলেট রেশ থাকলেও সময়ের ব্যবধানে কুমিল্লার ভাষা ভালই রপ্ত করেছিলেন। কিন্তু একি তাজ্জব কান্ড! আম্মার কথাগুলো অসংলগ্ন বটে, তবে যা কিছু বলছেন একেবারে বিশুদ্ধ বাংলায়। আম্মার বই পড়ার অভ্যেস ছিল। কিন্তু তাই বলে এমন অনর্গল কলকাতার ভাষাভঙ্গিতে? উপস্থিত সবাই হতম্ভব।

আমি ভিড় ঠেলে আম্মার কাছে যেতেই চিৎকার করে জিজ্ঞেস করলেন, ‘‘তোর পিতা কোথায়? আজ বাড়ি ফিরতে এত দেরি করছে কেন?’’ ততোক্ষণে খবর পেয়ে আব্বা কর্মস্থল থেকে ছুটে এসেছেন। আব্বাকে দেখামাত্র আম্মার লম্ফঝম্প আর চেঁচামেচির মাত্রা বেড়ে গেল। আব্বা তাঁকে ধরে শান্ত করতে গেলে তিনি আরও খেপে গেলেন। ধস্তাধস্তিতে তাঁর পরনের বসন ঠিক রাখা দায় হল। সে যুগে এতদঞ্চলে বিবাহিতা মহিলাদের সেলোয়ার-কামিজ পরার চল ছিল না। অগত্যা আব্বা অন্যের সাহায্যে তাঁর নিজের শার্ট আর পায়জামা আম্মাকে জোর করে পরিয়ে দিলেন।

দিন তিনেক পর আম্মার বকাঝকা খানিকটা স্তিমিত হয়ে এল। চতুর্থ দিনে একেবারেই শান্ত হয়ে গেলেন। কোরান শরীফ বুকে নিয়ে নামাজের চৌকিতে ঠাঁই নিলেন। জোর করে তাঁকে সেখান থেকে ওঠানো গেল না। এই কয়দিন তাঁকে কিছুই খাওয়ানো যায়নি। তাঁর অতিরিক্ত দূর্বল হয়ে পড়লে তাঁকে বিছানায় স্থানান্তর করা হল।

এদিকে এলোপ্যাথি, হোমিওপ্যাথি, আয়ুর্বেদ, কবিরাজ, ঝাড়ফুক, তাবিজতুমার, কোরান খতম, ছদকা দান, এমনকি জ্বিন চালান – কোন আয়োজনেরই কমতি ছিল না। সপ্তম দিনে অবস্থা আরও সঙ্কাটপন্ন হয়ে পড়ল। ক্রমাগত রাত জাগার ফলে আমি হয়ত ঢুলছিলাম। তাই আব্বা আমাকে ঘুমোতে যেতে তাগাদা দিলেন। পাশের কামড়ায় বিছানায় আশ্রয় নেবার খানিক পরেই সমস্বরে উচ্চ ক্রন্দনরোল ভেসে এল। বিছানা থেকে লাফ দিয়ে উঠে আম্মার কামড়ায় ছুটে গেলাম। সাদা চাদরে আম্মার আপাদমস্তক ঢাকা। বুঝতে আর বাকি থাকল না। কিন্তু আমার কান্না ছাপিয়ে আব্বার বিলাপ ধ্বনিত হতে লাগল, ‘‘সায়েকা, সায়েকা, একি করলা তুমি সায়েকা? তুমিতো এইভাবে যাইতে পার না। আইজ না তোমার আমীরের বার বছর পূর্তির দিন? আইজ না তুমি সাধ করছিলা কত কি রান্দবা? তোমার মতো আর কি কেউ রান্দতে পারব? (এখানে বলতে হয় যে, রান্নায় আম্মার হতযশ ছিল) আর তোমার নাসিম? (আমার বোন, যে আমার সাত বছরের ছোট ছিল) ঐ অবুজ বাইচ্চা নাসিমরে কে সামলাইব, কে তার দেখভাল করব? কথা কও সায়েকা, কথা কও।’’

কিন্তু আম্মা তো চিরতরে স্তব্ধ হয়ে গেছেন। এক মঙ্গলবারে রোগাক্রান্ত হয়ে আরেক মঙ্গলবারে, ১৫ মার্চে সকলকে শোক-সাগরে ভাসিয়ে চলে গেলেন। এ কেমন মৃত্যু? এক নামহীন, বর্ণহীন, গন্ধহীন মৃত্যু, যে মৃত্যু-রহস্যের কুলকিনারা আজও হয়নি, হবেও না কোন দিন।

একদিকে আদরের প্রথম সন্তানের প্রথম যুগপূর্তির আনন্দানুভূতি, অপর দিকে সেদিনই বিনা মেঘে বজ্রপাতের মতো প্রিয়তমা পতœীর মর্মান্তিক মৃত্যুর দহনজ্বালা। আব্বা একেবারে হতবিহ্বল, দিশেহারা হয়ে পড়েছিলেন, যার জের জীবনভর তিনি টেনে গেছেন। তাইতো তিনি কখনও না করেছেন আম্মার মৃত্যুদিবস পালন, না করেছেন আমার জন্ম তিথিকে আবাহন। আর আমিও এতোটাকাল এ বিষয়ে নির্বাক থেকেছি। কাউকে কিছু মুখ ফুটে বলতে পারিনি। এমনকি আমার স্ত্রীকে ও না, সন্তানদেরকেও না।

তবে আজ বোধ করি সেই বিষাদমাখা রুদ্ধ কপাট খোলার দিন সমাগত। কেননা, আজকের প্রেক্ষাপটে ভিন্ন। আমাদের পরিবারের শেষ সাত পুরুষের প্রথম জন আমার প্রপ্রপিতামহ খানবাহাদুর আশরাফ আলী থেকে শুরু করে চতুর্থ প্রজন্মের আমার পিতা সুলতান আলম চৌধুরী পর্যন্ত কেউই বাহাত্তর বয়সের সীমা অতিক্রম করেন নি। কিন্তু পঞ্চম প্রজন্মে এসে আমার বেলাতেই ঘটল ব্যত্যয়। শুভ হোক আর অশুভই হোক, আজ আমার আশিটা বছর পূর্ণ হল। কিন্তু এই দিবসের সাথে যে আমার আম্মার মৃত্যু এক সূতোয় গাঁথা – তা আমি ভুলি কি করে?

তবে সে যা-ই হোক, আমার ¯েœহাস্পদদের অফুরন্ত ভালোবাসা এবং শ্রদ্ধায় আমি যে সিক্ত হতে পেরেছি, আমার জীবনের সেইতো পরম প্রাপ্তি। ১৫ মার্চ মানে চৈত্রের শুরু। আর চৈত্র মানে জীর্ণ পাতাদের ঝরার পালা। কিন্তু আমার আম্মাতো জীর্ণ ছিলেন না। সেই সজীব মানুষটি বড়ই অসময়ে ঝরে গেলেন। তবে আমার বর্তমান অবস্থানকে অসময় বলা যাবে না। এখন যে-কোন দিনই আমার ঝরে পড়ার লগ্ন হতে পারে। আমি তার প্রতীক্ষারত।