শনিবার ১৯ অক্টোবর ২০১৯
  • প্রচ্ছদ » সম্পাদকীয় » জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান এর ৯৮ তম জন্মদিনে শ্রদ্ধাঞ্জলি


জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান এর ৯৮ তম জন্মদিনে শ্রদ্ধাঞ্জলি


আমাদের কুমিল্লা .কম :
15.03.2017

॥ শাহ্জাহান চৌধুরী ॥

“যতকাল রবে পদ্মা, যমুনা
গৌরী মেঘনা বহমান
ততকাল রবে কীর্তি তোমার
শেখ মুজিবুর রহমান”

১০ অক্ষরের একটি নাম, শেখ মুজিবুর রহমান। তিনি এদেশের মাটি ও মানুষের সাথে অঙ্গীকারাবদ্ধ ছিলেন এদেশের সাধারণ মানুষের দুঃখ দুর্দশার কি করে অবসান হবে তাই ছিল সার্বক্ষণিক  চিন্তা। ৮ম শ্রেণিতে পড়াকালীন সময় থেকেই তার রাজনৈতিক জীবনের শুরু। তিনি রাজনীতিকেই লক্ষ্যে পৌঁছবার উপায় হিসাবে বেছে নিয়েছিলেন। একজন সাধারণ কর্মী হিসাবে শুরু করে তিনি হয়েছেন বঙ্গবন্ধু।

১৯২০ থেকে ১৯৭৫ মাত্র ৫৫ বৎসরে। স্বল্পায়ু জীবন। এর মধ্যে জেলে কাটিয়েছেন জীবনের অধিকাংশ সময়। ১৮ বছর বয়সে প্রথম কারাবরণ করেন। বন্দী জীবনের কথা লিখতে গিয়ে তিনি তার আত্মজীবনীতে অকপটে লিখে গেছেন ঘটনা প্রবাহ তারই একটি ‘‘একদিন সকালে আমি ও রেণু (বঙ্গমাতা বেগম ফজিলাতুননেছা মুজিব) বিছানায় বসে গল্প  করছিলাম। হাচু (বঙ্গবন্ধুর বড় মেয়ে বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা) ও কামাল (তাঁর বড় ছেলে শেখ কামাল) নিচে খেলছিল। হাচু, খেলা ফেলে  মাঝে মাঝে আমার কাছে আসে আর ‘আব্বা’ বলে ডাকে। কামাল চেয়ে থাকে। এক সময় কামাল হাসিনাকে বলছে। হাচু আপা, হাচু আপা, তোমার আব্বাকে আমি একটু আব্বা বলি।

বন্দিত্ব তাকে বিচ্যুত করতে পারেনি তাঁর সংগ্রামী পথ থেকে।

কোন দলীয় দৃষ্টিভঙ্গী থেকে এ প্রকাশনা নয়। একজন বাঙালি হিসাবে, একজন সংস্কৃতি কর্মী হিসাবে ঋণ শোধের দায়বদ্ধতায় আমাদের উত্তর  প্রজন্মের জন্য ইতিহাসের পাতা থেকে দু’টি কথা রাখা হলো। তাঁর সংগ্রাম, আত্মত্যাগ, সাহসী ভূমিকা ও আপোসহীন বলিষ্ঠ নেতৃত্বের ফলে আমরা আজ স্বাধীন জাতি হিসাবে পৃথিবীর বুকে মাথা তুলে দাঁড়িয়েছি।

সবুজ-শ্যামল, সুজলা-সুফলা, পাখিডাকা, নদী-নালায় ভরপুর আমাদের প্রিয় জন্মভূমি বাংলাদেশের স্থপতি জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। বাংলাদেশের রাজধানী ঢাকা থেকে বুড়িগঙ্গা, ধলেশ্বরী, পদ্মা, আড়িয়াল খাঁ পার হলে একটি নদীর নাম মধুমতি। এই মধুমতির তীর ঘেঁষে স্নিগ্ধ গ্রাম টুঙ্গিপাড়ায় ১৯২০ সালের ১৭ মার্চ জন্মগ্রহণ করেন আমাদের জাতির পিতা সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ বাঙালি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। তাঁর বাবার নাম শেখ লুৎফর রহমান, মায়ের নাম সায়েরা খাতুন। ছোট বেলায় বাবা, মা তাঁকে ডাকতেন ‘খোকা’ নামে।

বঙ্গবন্ধু জাতির পিতা শেখ মুজিবুর রহমানের বংশের ইতিহাস আমরা অনেকে জানি আবার অনেকে জানিনা। বঙ্গবন্ধুর পরিবার ছিল এক খানদানি পরিবার। টুঙ্গিপাড়া তৎকালীন ফরিদপুর জেলার গোপালগঞ্জ মহকুমা যা বর্তমানে গোপালগঞ্জ জেলার একটি গ্রাম। শেখ বোরহান উদ্দিন নামে এক ধার্মিক পুরুষ এই বংশের গোড়া পত্তন করেন। এই বংশের উত্তর পুরুষ হলেন আমাদের জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। এই বংশের যে একদিন সুদিন ছিল তার কিছু কিছু প্রমাণ এখনও আছে। আমি যখন ২০১১ সালে বঙ্গবন্ধুর মৃত্যু দিবস ১৫ আগষ্ট টুঙ্গিপাড়া যাই তখন দেখেছি বাড়ির বাউন্ডারি চকমিলান দেওয়ালের কিছু কিছু অংশ এখনো আছে। আস্তে আস্তে বংশ বাড়ে, সেই দালান-কোঠা ভেঙ্গে চার ভিটায় চারটি টিনের ঘর হয়। সেই টিনের ঘরের একটিতেই ১৭ মার্চ ১৯২০ খ্রিস্টাব্দে বঙ্গবন্ধুর জন্ম হয়।

ছোট খোকা আস্তে আস্তে বড় হয়। তাকে ভর্তি করে দেওয়া হয় তার ছোট দাদা শেখ আবদুর রশিদ প্রতিষ্ঠিত স্কুলে। সেখান থেকে তিনি তৃতীয় শ্রেণি পর্যন্ত পড়ালেখা করে চতুর্থ শ্রেণিতে গিয়ে ভর্তি হন গোপালগঞ্জ পাবলিক স্কুলে। বঙ্গবন্ধুর বাবা শেখ লুৎফর রহমান গোপালগঞ্জে চাকরি করতেন। মা থাকতেন বাড়িতে। ছোট কালে খোকা খেলাধূলা, গান বাজনায় ছিলেন পারদর্শী, ঘণ্টার পর ঘণ্টা নদীতে সাঁতার কাটতেন। ১৯৩৪ সালে সপ্তম শ্রেণিতে পড়াকালীন শেখ মুজিব হঠাৎ বেরিবেরি রোগে আক্রান্ত হন। ১৯৩৬ সালে গ্লুকোমা নামে রোগে আক্রান্ত হয়ে চিকিৎসা শেষে তিনি সেই যে চশমা নিলেন, মৃত্যুর দিনও সেই চশমা তাঁর হাতে ছিল। বঙ্গবন্ধুর বক্তৃতার বিভিন্ন ছবিতে সেই চশমাটি দেখা যায়।

১৯৩৭ সাল থেকেই সপ্তম শ্রেণিতে পড়াকালীন বঙ্গবন্ধুর রাজনৈতিক সচেতনতা প্রকাশ পায়। তিনি বৃটিশ খেদাও আন্দোলনে যোগ দেন। মুসলিম সেবা সমিতির জন্য বাড়ি বাড়ি গিয়ে চাল সংগ্রহ করে তা বিক্রি করে গরীব ছেলেদের বই ও পরীক্ষার অন্যান্য খরচ চালাতেন। ১৯৩৮ সালে তিনি যখন অষ্টম শ্রেণির ছাত্র, তাঁদের স্কুলে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেরে বাংলা ও শ্রমমন্ত্রী হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী আসেন এবং তিনি সাহস করে স্কুলের ভাঙ্গা ঘর মেরামত ও ছাত্রদের কিছু দাবী দাওয়া নেতাদের সামনে তুলে ধরেন। হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী নোট বুক বের করে তাঁর নাম ঠিকানা লিখে নিলেন। পরবর্তীতে তিনি যখন কলকাতায় পড়তে যান শহীদ সাহেবের কাছেই তার রাজনৈতিক শিক্ষা হয়। মাত্র আঠার বছর বয়সে আমাদের বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান প্রথম কারাবরণ করেন। তিনি ছিলেন ন্যায়ের পক্ষে তাই সাতদিন পর তাঁকে ছেড়ে দেওয়া হয়। ১৯৩৯ সালে কলকাতা গিয়ে শহীদ সোহরাওয়ার্দীর সাথে দেখা করেন এবং গোপালগঞ্জে মুসলিম ছাত্র লীগ গঠন করার অনুমতি নিয়ে আসেন। এই মুসলিম ছাত্রলীগই এক সময় ছাত্র লীগ হয়। ১৯৪১ সালে বঙ্গবন্ধু দ্বিতীয় বিভাগে ম্যাট্রিক পাশ করে কলকাতায় ইসলামিয়া কলেজে ভর্তি হন এবং সেখানে ১৯০৮ সালে প্রতিষ্ঠিত বেকার হোস্টেলে আবাসিক ছাত্র হিসাবে সিট পান। (যে হোস্টেলের একটি রুম এখন বঙ্গবন্ধুর স্মৃতি গৃহ হিসাবে কর্তৃপক্ষ সংরক্ষণ করছে। ২০১২ সালে কলকাতায় গেলে আমি সে কক্ষ দেখে আসি)। এসময় দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শুরু হয়। যুদ্ধের ভয়াবহতার মধ্যে শেখ মুজিব সাংগঠনিক দক্ষতায় ইসলামিয়া কলেজে জনপ্রিয় একজন ছাত্র নেতা হিসাবে আবির্ভূত হন। ১৯৪৩ সালে ভারতবর্ষে ভয়াবহ দুর্ভিক্ষ শুরু হয়। শেখ মুজিব সেই দুর্ভিক্ষে নিরলস ভাবে ত্রাণ তৎপরতা চালান। এতে হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী সহ অন্যান্য নেতারা শেখ মুজিবের ছাত্র নেতৃত্বের উপর আস্থা ভাজন হন।

পারিবারিক কারণে খুব ছোট থাকতেই নিকটআত্মীয় ফজিলাতুন্নেছা ওরফে রেণুর সাথে শেখ মুজিবের বিবাহ হয়। নজরুলের কবিতায় আছে, “এই পৃথিবীতে যা কিছু চির কল্যাণকর অর্ধেক তার করিয়াছেন নারী অর্ধেক তার নর”। খোকার জীবনেও তার প্রতিফলন দেখা যায়। ফজিলাতুন্নেছা মুজিব যদি না থাকতেন তাহলে হয়তো শেখ মুজিবের পক্ষে বঙ্গবন্ধু হয়ে ওঠা হতো কিনা সন্দেহ।

১৯৪৭ সালের ১৪ আগস্ট দেশ ভাগের কিছুদিন পর সেপ্টেম্বর মাসে বঙ্গবন্ধু কলকাতা ছেড়ে ঢাকা চলে আসেন এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ল’ ক্লাশে ভর্তি হন। শুরু হয় তার আরেক জীবন। নতুন দেশ নতুন করে গড়ে তোলার আন্দোলন সংগ্রামে ঝাঁপিয়ে পড়েন, গড়ে তোলেন গণতান্ত্রিক যুব লীগ। ১৯৪৮ সালের ১১ মার্চ “বাংলা ভাষা দাবি দিবস” ঘোষণা করা হলো। শেখ মুজিব এই দাবী দিবসের পক্ষে জনমত গঠন করার জন্য জেলায় জেলায় বেরিয়ে পড়লেন। ১১ মার্চ ১৯৪৮ সালে ‘বাংলা ভাষা দাবী দিবসের’ মিছিল করতে গিয়ে ঢাকায় প্রথম তিনি গ্রেফতার হন এবং তাকে ঢাকা জেলের ৪নং ওয়ার্ডে অন্যান্য বন্দীদের সাথে রাখা হয়। এ বছর ১৫ মার্চ শেখ মুজিবসহ অন্যান্যদের মুক্তি দেওয়া হয়। ১৬ মার্চ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ঐতিহাসিক আমতলায় বাংলা ভাষা সংগ্রাম পরিষদের সকলের প্রস্তাবে শেখ মুজিবুর রহমান সভায় সভাপতিত্ব করেন। বিখ্যাত আমতলায় রাষ্ট্রভাষা আন্দোলনের এই প্রথম সভার তারিখটি ছিল ১৬ মার্চ ’৪৮। তাঁর জন্মদিনের একদিন আগে। ১৯৪৮ এবং ১৯৪৯ সালের পাকিস্তান সরকারের কারসাজিতে দেশে খাদ্য সংকট দেখা দেয়। বিশেষ করে ফরিদপুর, কুমিল্লা, ঢাকা জেলায় এ সংকট প্রবল আকার ধারণ করে। শেখ মুজিব জনগণের পক্ষে এ সংগ্রামে ঝাঁপিয়ে পড়েন। এরপর শেখ মুজিব পূর্ব পাকিস্তান ছাত্রলীগ সংগঠনকে শক্তিশালী করে গড়ে তুলতে কাজে লেগে যান। এর মধ্যে তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের নিম্ন বেতনভোগী কর্মচারীদের আন্দোলনে ঝাঁপিয়ে পড়েন। তাদের দাবি আদায় করতে গিয়ে বিশ্ববিদ্যালয় হতে তার ছাত্রত্ব কেড়ে নেওয়া হয়। তিনি গ্রেফতার হন। ১৯৪৭ সালে দেশ ভাগের পর থেকে ১৯৪৯ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত তিনি তিনবার জেল খাটেন। জেলে তিনি অনশন ধর্মঘটও পালন করেন। ২১ শে ফেব্রুয়ারি ১৯৫২ সালে জেলে বসেই শোনেন ঢাকার বুকে ছাত্রদের উপর গুলি চালানো হয়েছে। এই জেল জুলুমে শেখ মুজিবের সাথে পরিবারের যে যোগাযোগ কতটুকু বিচ্ছিন্ন হয়েছিল তা আমরা তার স্বহস্তে লিখিত জীবনীতে পাই। জেল থেকে ফিরে বাড়ি গিয়েছেন “বড় মেয়ে হাসিনা (বর্তমান মাননীয় প্রধানমন্ত্রী) বিছানায় বসে বসে বঙ্গবন্ধুর সাথে খেলা করছে আর আব্বু আব্বু বলছে। পাশে ছোট শেখ কামাল জন্মের পর থেকে বাবাকে খুব কম দেখেছে। তিনি বললেন, হাচু আপা, হাচু আপা তোমার  আব্বাকে আমি একটু আব্বা বলি।”  দেশ বিভাগের পরপরই বাঙালিরা বুঝে গেল তারা দেশ পেয়েছে কিন্তু স্বাধীনতা পায়নি। ২০০ বৎসর বৃটিশের গোলামি করে এখন আবার জল্লাদের হাতে পড়েছে। এরা বাঙালিদের মুখের ভাষা,  বাঙালিদের মুখের আহার কেড়ে নিয়ে পশ্চিম পাকিস্তানকে সমৃদ্ধ করতে চায়। তখন একটি স্লোগান (যদিও উর্দুতে) প্রচলিত হয়, “ইয়ে আজাদী ঝুটা হায়, লাখো ইনসান ভুখা হায়”।

এত অত্যাচারের পরও শেখ মুজিব থেমে থাকেননি। বাঙালিদের সাথে নিয়ে আন্দোলন সংগ্রাম চালিয়ে গেছেন। বাঙালি বুঝতে শিখেছে যারা শাসন ক্ষমতায় তারা বাঙালিদের আপন নয় শুধুমাত্র ধর্মের দোহাই দিয়ে তারা তাদের জাঁতাকলে পিষ্ট করছে মাত্র। এদিকে বাঙালিদের মধ্যেও অনেকে পশ্চিমাদের সাথে হাত মিলিয়েছে। ইতোমধ্যে তিনি হাল ধরেন আওয়ামী লীগের। সাধারণ সম্পাদক হয়ে জেলায় জেলায় সংগঠন গড়ার কাজে লেগে পড়লেন। ফলও হলো অপ্রত্যাশিত। পূর্ব পাকিস্তান মুসলিম লীগের টলমল অবস্থা। পশ্চিম পাকিস্তানে আওয়ামীলীগের শাখা বিস্তার লাভ করলো। মুসলিম লীগের নেতারা পশ্চিম পাকিস্তানীদের ভুল বুঝিয়েছিলেন যে, বাঙালিরা রাষ্ট্রভাষা বাংলা করতে চায়। শেখ মুজিব লাহোর গিয়ে এক প্রেস কনফারেন্স এর মাধ্যমে এ ভুল ভাঙ্গিয়ে দেন। তিনি বলেন, আমরা উর্দু ও বাংলা দু’টোকেই রাষ্ট্রভাষা হিসাবে চাই। তখন পশ্চিম পাকিস্তানীদের অনেকের ভুল ভাঙ্গে। সামনেই নির্বাচন। শেখ মুজিব আওয়ামী লীগ নিয়ে নির্বাচন করতে ইচ্ছুক কিন্তু দলের অন্যান্যরা যুক্তফ্রন্ট করে নির্বাচন করতে চান। এ নিয়ে তাকে বোঝানো হয় আর কতকাল বিরোধী দল করা যায়। ক্ষমতায় না গেলে জনসাধারণের আস্থা থাকবে না। যে ভাবেই হোক ক্ষমতায় যেতে হবে। শেখ মুজিব এ কথার উত্তরে বলেছিলেন, “এভাবে ক্ষমতায় যাওয়া যেতে পারে কিন্তু জনসাধারণের জন্য কিছু করা সম্ভব হবে না। আর এ ক্ষমতা বেশিদিন থাকবেও না”। তার কথাই ঠিক হয়েছিল। যুক্তফ্রন্ট করে নির্বাচনে যুক্তফ্রন্ট সংখ্যাগরিষ্ঠ হয়েছিল। তাকে মন্ত্রিত্ব দিয়েছিল কিন্তু মাত্র কয়েকমাস পরেই কেন্দ্র থেকে সব কিছু ভেঙ্গে দেওয়া হল। শেখ মুজিব তার এলাকা গোপালগঞ্জ থেকে প্রথম এম এল এ নির্বাচিত হন। শহীদ সোহরাওয়ার্দী তাকে ডেকে বলেছিলেন, ‘তুমি মন্ত্রিত্ব নেবা কিনা?’ তিনি বলেছিলেন ‘আমি মন্ত্রিত্ব চাই না, পার্টির কাজ করতে আগ্রহী’। তবু তাকে মন্ত্রি করা হয়। ১৯৫৪ সালে মে মাসে যেদিন মন্ত্রি সভা শপথ গ্রহণ করেছে, সে দিনই পূর্ব বাংলার সবচেয়ে বড় পাটকল নারায়নগঞ্জ আদমজী জুট মিলে পরিকল্পিত ভাবে বাঙালি-অবাঙালি দাঙ্গা বাঁধিয়ে দেওয়া হয়। তারপর ৯২ (ক) ধারা জারি করে মন্ত্রিসভা ভেঙ্গে দেওয়া হয় এবং বিশেষ করে আওয়ামী লীগের নেতাদের ধর পাকড়ও শুরু হয়। মেজর জেনারেল ইস্কান্দার মির্জাকে পূর্ব বাংলার গভর্নর নিযুক্ত করা হয়। শেখ মুজিবকে গ্রেফতার করে কারাগারে পাঠানো হয়।

১৯৫৫ সালের ৫ জুন বঙ্গবন্ধু গণপরিষদ সদস্য নির্বাচিত হন। ২৫ আগস্ট করাচিতে পাকিস্তান গণপরিষদে বঙ্গবন্ধু প্রথম পূর্ব পাকিস্তানকে ‘পূর্ব বাংলা’ নামে ডাকার দাবি তোলেন এবং স্বায়ত্ত শাসনের আওয়াজ তোলেন। ১৯৫৬ সালে ১৬ সেপ্টেম্বর বঙ্গবন্ধু কোয়ালিশন সরকারের শিল্প, বাণিজ্য, শ্রম. দুর্নীতি দমন ও ভিলেজ এইড দপ্তরের দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৫৭ সালের ৩০ মে দলীয় সিদ্ধান্তে তিনি মন্ত্রিসভা থেকে পদত্যাগ করেন। ১৯৫৮ সালে সামরিক বাহিনীর প্রধান জেনারেল আইয়ুব খান সামরিক শাসন জারী করেন। রাজনৈতিক কর্মকান্ড নিষিদ্ধ ঘোষণা করেন এবং ১১ অক্টোবর বঙ্গবন্ধুকে গ্রেফতার করা হয়। ১৯৬০ সালে ৭ ডিসেম্বর তিনি হাইকোর্টে রিট আবেদন করে মুক্তি পান। এই সময়ই শেখ মুজিব বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামের লক্ষ্যে ছাত্র নেতৃবৃন্দকে নিয়ে ‘স্বাধীন বাংলা বিপ্লবী পরিষদ’ নামে একটি গোপন সংগঠন প্রতিষ্ঠা করেন।

১৯৬২ সালের ৬ ফেব্রুয়ারি বঙ্গবন্ধু জন নিরাপত্তা আইনে গ্রেফতার হন। ৪ বছরের সামরিক শাসনের অবসান হলে ১৮ জুন বঙ্গবন্ধু মুক্তি লাভ করেন। ১৯৬৪ সালের ১১ মার্চ দেশে সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার বিরুদ্ধে বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে দাঙ্গা প্রতিরোধ কমিটি গঠিত হয়। এর কিছুদিনের মধ্যে তাকে আবার গ্রেফতার করা হয়। ১৯৬৫ সালে শেখ মুজিবের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রদ্রোহের মামলায় তাঁকে ১ বছরের কারাদন্ড দেওয়া হয়। হাইকোর্টের নির্দেশে তিনি মুক্তিলাভ করেন।

১৯৬৬ সালে লাহোরে বিরোধী দল সমূহের জাতীয় সম্মেলনে বঙ্গবন্ধু তাঁর ঐতিহাসিক ৬ দফা দাবী পেশ করেন। সে বছরই বঙ্গবন্ধু (১ মার্চ) আওয়ামী লীগের সভাপতি নির্বাচিত হন।

১৯৬৮ সালে বঙ্গবন্ধুকে ১ নম্বর আসামি করে ৩৫ জন বাঙালি সেনা ও সিএসপি অফিসারের বিরুদ্ধে আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা দায়ের করা হয়। ১৯ জুন ঢাকা সেনানিবাসে আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলার বিচার কার্যক্রম শুরু হয়।

১৯৬৯ সালে বঙ্গবন্ধুর ৬ দফা ও ছাত্রদের ১১ দফা আদায়ের লক্ষ্যে ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ গঠিত হলে বঙ্গবন্ধুর মুক্তির দাবীতে দেশব্যাপী ছাত্র আন্দোলন শুরু হয়। আন্দোলন গণঅভ্যুত্থানে রূপ নিলে সরকার তাকে প্যারোলে মুক্তি নিয়ে গোল টেবিল বৈঠকে অংশ নিতে বললে তিনি তা প্রত্যাখান করেন। বাধ্য হয়ে সরকার ২২ ফেব্রুয়ারি আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা প্রত্যাহার করে শেখ মুজিব ও অন্যান্যদের মুক্তি দেয়। ২৪ ফেব্রুয়ারি রেসকোর্সে তাঁর সংবর্ধনা সভায় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংগ্রম পরিষদের পক্ষ থেকে তাকে আনুষ্ঠানিক ভাবে ‘বঙ্গবন্ধু’ উপাধিতে ভূষিত করা হয়। ১০ মার্চ মুক্ত বঙ্গবন্ধু লাহোরে গোল টেবিল বৈঠকে যোগদেন।
৫ ডিসেম্বর বঙ্গবন্ধু সোহরাওয়ার্দীর মৃত্যু বার্ষিকীর আলোচনা সভায় পূর্ব বাংলার নামকরণ করেন ‘বাংলাদেশ’।

১৯৭০ সালে ৭ ডিসেম্বর অনুষ্ঠিত সাধারণ নির্বাচনে বঙ্গবন্ধু ও তার দল আওয়ামী লীগ ৬ দফার ভিত্তিতে নৌকা প্রতীক নিয়ে নির্বাচনে অংশ গ্রহণ করেন এবং আওয়ামী লীগ তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানে জাতীয় পরিষদে ১৬৯ আসনের মধ্যে ১৬৭টি এবং প্রাদেশিক পরিষদে ৩০০ আসনের মধ্যে ২৮৮ আসন লাভ করে।

আসে বাঙালির বিজয়ের বছর। ৩ জানুয়ারি ১৯৭১ তিনি রেসকোর্স ময়দানে তার দলের নির্বাচিত প্রতিনিধিদের ৬ দফার ভিত্তিতে শাসনতন্ত্র রচনা  করার অঙ্গীকার নিয়ে শপথ গ্রহণ করেন। পশ্চিম পাকিস্তানের সংখ্যাগরিষ্ঠ দলের নেতা জুলফিকার আলী ভুট্টোও আওয়ামী লীগের সাথে কোয়ালিশন সরকার গঠনের সম্মতি জানান। ১৩ ফেব্রুয়ারি’৭১ প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খান ৩ মার্চ ঢাকায় জাতীয় পরিষদের বৈঠক আহবান করেন। কিন্তু ১ মার্চ হঠাৎ করেই ইয়াহিয়া খান অনির্দিষ্ট কালের জন্য বৈঠক স্থগিত করেন। এ খবরে বাঙালি রাস্তায় নেমে পড়ে। বাঙালি বুঝে নেয় ১৭৫৭ সালের পলাশীর মতো বাঙালির আকাশেও দুর্যোগের ঘনঘটা। বঙ্গবন্ধু ৭ মার্চ ’৭১ রেসকোর্স ময়দানে সর্বকালের সর্ববৃহৎ জন সমুদ্রে দাঁড়িয়ে ঘোষণা করেন “এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম- এবারের সংগ্রাম আমাদের স্বাধীনতার সংগ্রাম” জয় বাংলা। এ ভাষণ নিয়ে কবি রচনা করেছেন কবিতা, লেখক লিখেছেন কথামালা, গায়ক গেয়েছেন গান, তেমনি একটি কবিতা- নির্মলেন্দু  গুণের- স্বাধীনতা। এই শব্দটি কিভাবে আমাদের হলো।

“একটি কবিতা লেখা হবে তার জন্য অপেক্ষার উত্তেজনা নিয়ে লক্ষ লক্ষ উম্মত্ত অধীর ব্যাকুল বিদ্রোহী শ্রোতা বসে আছে ভোর থেকে জনসমুদ্রের উদ্যান সৈকতে: ‘কখন আসবেন কবি’?

শত বছরের শত সংগ্রাম শেষে,
রবীন্দ্রনাথের মতো দৃপ্ত পায়ে হেঁটে
অত:পর কবি এসে জনতার মঞ্চে দাঁড়ালেন।
তখন পলকে দারুণ ঝলকে তরীতে উঠিল জল,
হৃদয়ে লাগিল দোলা, জনসমুদ্রে জাগিল জোয়ার
সকল দুয়ার খোলা। কে রোধে তাঁহার বজ্রকন্ঠ বাণী?
গণসূর্যের মঞ্চ কাঁপিয়ে কবি শোনালেন তাঁর অমর-কবিতাখানি;
এবারের সংগ্রম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম
এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম।”
সেই থেকে স্বাধীনতা শব্দটি আমাদের।
৭ মার্চ  ’৭১ থেকে ২৫ মার্চ ’৭১ পর্যন্ত বাংলাদেশ স্বাধীন দেশ হিসাবে বঙ্গবন্ধুই রাষ্ট্র পরিচালনা করেছেন। ২৫ মার্চ রাতের আঁধারে ইয়াহিয়া ঢাকা ত্যাগ করেন আর পাকিস্তান সেনাবাহিনী ঝাঁপিয়ে পড়ে নিরস্ত্র বাঙালীর উপর। বঙ্গবন্ধু ২৫ মার্চ রাত ১২:২০ মিনিটে বাংলাদেশের স্বাধীনতা ঘোষণা করেন। এই ঘোষণা  ওয়ারলেস, টেলিফোন, টেলিগ্রামের মাধ্যমে সারা দেশে পাঠিয়ে দেওয়া হয়। বিভিন্ন সেনানিবাসে বাঙালি সৈনিক অফিসাররা যুদ্ধের জন্য প্রস্তুতি নিতে থাকেন। এদিকে রাত ১.৩০ মিনিটে পাকিস্তান সেনাবাহিনী বঙ্গবন্ধুকে তার ধানমন্ডী ৩২নং বাড়ি হতে গ্রেফতার করে পাকিস্তান নিয়ে যায়। ২৬ মার্চ ’৭১ আওয়ামী লীগকে নিষিদ্ধ ঘোষণা এবং বঙ্গবন্ধুকে দেশদ্রোহী আখ্যায়িত করা হয়। ১৭ এপ্রিল ’৭১ মেহেরপুরের বৈদ্যনাথ তলার আম্রকাননে গঠিত হয় বাংলাদেশ সরকার। বঙ্গবন্ধু রাষ্ট্রপতি তার অবর্তমানে সৈয়দ নজরুল ইসলাম অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি, তাজউদ্দিন আহমেদ প্রধানমন্ত্রী। ৩০ লক্ষ শহীদ আর দু’ লক্ষ মা-বোনের সম্ভ্রম এর বিনিময়ে ১৬ ডিসেম্বর ’৭১ বিজয় ছিনিয়ে আনে বাঙালি। আন্তর্জাতিক মহলের চাপে ৮ জানুয়ারি ১৯৭২ সালে বাঙালির জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে নি:শর্ত মুক্তি দিতে বাধ্য হয় পাকিস্তান সরকার। ১০ জানুয়ারি ১৯৭২ সালে দেশে ফিরে এসে প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব নেন বঙ্গবন্ধু। ১৪ ডিসেম্বর ’৭২ বাংলাদেশের প্রথম সংবিধানে স্বাক্ষর করেন বঙ্গবন্ধু। ১৯৭৩ এর নির্বাচনে সংখ্যাগরিষ্ঠতার ভিত্তিতে আওয়ামী লীগ আবার ক্ষমতায় আসে। ১৯৭৪ এর ২২ ফেব্রুয়ারি পাকিস্তান বাংলাদেশকে স্বীকৃতি দেয়। ২৫ সেপ্টেম্বর ’৭৪ জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদে প্রথমবারের মত বাংলায় ভাষণ দেন বঙ্গবন্ধু।

বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে চড়াই উতরাই পেরিয়ে যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশ যখন উন্নতির দিকে এগিয়ে যাচ্ছে ঠিক তখন ১৫ আগস্ট ১৯৭৫ সালে সেনাবাহিনীর বিপথগামী কিছু সদস্য হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ বাঙালি, বাংলাদেশের স্থপতি জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে তার ধানমন্ডির ৩২ নং বাস ভবনে স্ব-পরিবারের হত্যা করে।

১৫ আগস্ট ’৭৫ জাতির জীবনে এক কলঙ্কময় দিন। এই দিবসটি বাঙালি জাতি জাতীয় শোক দিবস হিসাবে পালন করে। বঙ্গবন্ধুর মৃত্যুর পর যখন চারদিকে ভীত-সন্ত্রস্থ সময়, তখনও কিন্তু কবি, গল্পকার, শিল্পীরা থেমে থাকেনি। তারা তাদের প্রিয়
নেতার জন্য উৎসর্গ করে রচনা করেছেন গান, কবিতা, গল্প। বঙ্গবন্ধুর মৃত্যুর কিছুদিন পরেই কবি কামাল চৌধুরী রচনা করেন কবিতা-
টুঙ্গী পাড়া গ্রাম থেকে

কবরের নির্জন প্রবাসে
তোমার আত্মার মাগফেরাতের জন্য
যে সব বৃদ্ধেরা কাঁদে
আমাদের যে সব বোনেরা
পিতা, ভাই, সন্তানের মতো
তোমার পবিত্র নাম
ভালোবেসে হৃদয়ে রেখেছে
যে সব সাহসী লোক
বঙ্গোপসাগরের সব দূরন্ত মাঝির মতো
শোষিতের বৈঠা ধরে আছে
হে আমার স্বাধীনতার মহান স্থপতি
মহান প্রভুর নামে আমার শপথ
সেইসব বৃদ্ধদের প্রতি আমার শপথ
সেই সব ভাই-বোন লক্ষ লক্ষ মানুষের প্রতি আমার শপথ
আমি প্রতিশোধ নেবো
আমার রক্ত ও শ্রম দিয়ে
এই বিশ্বের মাটি ও মানুষের দেখা
সবচেয়ে মর্মস্পশী জঘন্য হত্যার আমি প্রতিশোধ নেবো।

তাঁর সম্পর্কে বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর ড. আতিউর রহমান যথার্থই বলেছেন- “১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট মানব ইতিহাসের নৃশংসতম হত্যাকান্ডে সপরিবারে প্রাণ হারান সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ বাঙালি, বাংলাদেশের স্বাধীনতার রূপকার, জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান যার বিশাল অস্তিত্ব পড়ে আছে বাংলাদেশের ৫৬ হাজার বর্গমাইল জুড়ে, যার জন্ম না হলে স্বাধীন সার্বভৌম   ভূ-খন্ড হিসেবে বাংলাদেশের জন্ম হতো না। এ কারণেই এ কথা বললে ভুল হবে না যে, বাংলাদেশের আরেক নাম বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। আরও জোর দিয়ে বলা চলে তিনিই বাংলাদেশ।

তথ্যসূত্র ঃ
১. শেখ মুজিবুর রহমান। অসমাপ্ত আত্মজীবনী, ইউ.পি.এল
২. মহাকালের মহামানব, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান, সম্পাদনায় শফিকুর রাহী, মিজান পাবলিশার্স।
৩. শেখ মুজিব একটি লাল গোলাপ, সম্পাদনায়- মোনায়েম সরকার, মিনার মনসুর, কুমার প্রীতীশ বল, আগামী প্রকাশনী।