শুক্রবার ১৪ অগাস্ট ২০২০


শহীদুল্লাহ হলের ‘মানুষ খেকো’ পুকুর


আমাদের কুমিল্লা .কম :
07.04.2017

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শহীদুল্লাহ হলের পুকুরে ডুবে শিক্ষার্থী মৃত্যু অমোঘ নিয়তি হয়ে দাঁড়িয়েছে। নিয়মিত বিরতিতে প্রাণ নিচ্ছে এই পুকুর। একের পর এক মৃত্যুর ঘটনায় এটি এখন সবার কাছে এক কিংবদন্তি। একে নিয়ে তৈরি হচ্ছে মিথ। আরোপ করা হচ্ছে ‘অতিপ্রাকৃত’ তকমা।

বছর বছর প্রাণ নিচ্ছে ‘রহস্যময়ী’ এই পুকুর। যেন বা মানুষ খেকো, ক্ষুধা পেলে টেনে নেয় সন্তরণরত কোনো শিক্ষার্থীকে। ছয় মাস কিংবা বছর ঘুরতে এর ক্ষুধা জাগে, আর সলিলসমাধি ঘটে কোনো মায়ের সন্তানের।

সর্বশেষ বুধবার (৫ এপ্রিল) সন্ধ্যায় এই পুকুরে ডুবে প্রাণ হারায় এক শিক্ষার্থী।  ফুটবল খেলে ক্লান্ত সহপাঠীদের সঙ্গে গোসল করতে নেমেছিল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ফলিত পরিসংখ্যান বিভাগের ছাত্র বায়েজিদ বোস্তামি। এরপর সবার অজান্তে ডুবে যায় অতল তলে।

এই পুকুরে ডুবে এখন পর্যন্ত কতজন শিক্ষার্থীর মৃত্যু হয়েছে, তার সুনির্দিষ্ট হিসাব নেই হল প্রশাসনের কাছে। তবে ২৫ থেকে ২৭ জনের মৃত্যুর প্রত্যক্ষদর্শী নন্দলাল দেব।

নন্দলাল তিন যুগের বেশি সময় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মৃত্তিকা, পানি ও পরিবেশ বিভাগের ল্যাব সহকারীর দায়িত্ব শেষে এখন অবসরে আছেন। থাকেন শহিদুল্লাহ হলের পেছনের কোয়ার্টারে। তিনি ঢাকাটাইমসকে বলেন, ব্রিটিশ আমল থেকে এই পুকুরে প্রায় প্রতি বছর শিক্ষার্থীর মৃত্যু ঘটছে বলে নানা জনের কাছে জেনেছেন তিনি। আর ১৯৭২ সালের পর এখন পর্যন্ত তিনি ২৫ থেকে ২৭ জনের মৃত্যু স্বচক্ষে দেখেছেন।

এত এত মৃত্যু দেখে তার কী মনে হয়। কেন এভাবে নিয়ম করে প্রাণ যাচ্ছে শিক্ষার্থীদের। নন্দলাল তার দীর্ঘদিনের পর্যবেক্ষণ থেকে যা জানালেন তা প্রচলিত কিংবদন্তিই। পুকুরের চারপাশে চারটি বড় গর্ত রয়েছে, যেগুলো হল প্রশাসন চেষ্টা করেও বন্ধ করতে পারেনি। বেশির ভাগ শিক্ষার্থীর মৃতদেহ ওই সব গর্তের আশপাশে পাওয়া গেছে।

আজ পর্যন্ত কোনো কর্মচারী পুকুরে ডোবেনি জানিয়ে নন্দলাল বলেন, শিক্ষার্থীরাই বারবার ডুবে মরে। হঠাৎ একটি ছেলে সাঁতার কাটতে কাটতে পুকুরের মাঝখানে চলে যায়, তারপর সে আর ফিরে আসতে পারে না। ডুবে মরা বেশির ভাগ শিক্ষার্থী পরিবারের একমাত্র সন্তান বলে জানান তিনি।

বছর দুয়েক আগে এক শিক্ষার্থীর ডুবতে ডুবতে বেঁচে যাওয়ার অভিজ্ঞতা বর্ণনা করে সাবেক এই কর্মচারী বলেন, ওই শিক্ষার্থী পুকুরের মাঝখানে গিয়ে ডুবে যাচ্ছিল। পরে আশপাশের মানুষের সহায়তা তাকে উদ্ধার করা হয়। ওই শিক্ষার্থীর ভাষ্য, তার শরীরে বিদ্যুতের তারের মতো কী যেন একটা স্পর্শ করেছিল। ঘটনার আকস্মিকতায় বাক রুদ্ধ হয়ে গিয়েছিল তার। শুধু হাত নাড়িয়েছিল সে।

নন্দলালের ধারণা, এই পুকুরে অদৃশ্য কিছু আছে, নইলে এত শিক্ষার্থী মরবে কেন। তবে পুকুরের পানিতে মৃত্যুর কারণ হতে পারে এমন কিছু আছে কি না তা নিশ্চিত হতে এর আগে বেশ কয়েকবার পানি পরীক্ষা করা হয়েছিল। কিন্তু তাতে কিছু পাওয়া যায়নি বলে জানান তিনি।

নন্দলাল তার পর্যবেক্ষণ থেকে আরো জানান, বেশির ভাগ সময় তিথিকে কেন্দ্র করে  শিক্ষার্থীর মৃত্যু হয় এই পুকুরে। সর্বশেষ মৃত্যুর ঘটনাটি বুধবার অষ্টম তিথিতে ঘটেছে।

তবে ওই পুকুরে অতিপ্রাকৃত কিছু খোঁজার কারণ নেই বলে মনে করেন মৃত্তিকা, পানি ও পরিবেশ বিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষক অধ্যাপক দিদারুল আলম। তিনি বলেন, এমনকি পুকুরের পানির কম্পোজিশন বা চাপেরও কোনো সমস্যা নেই। পানিতে কোনো ধরনের বিষাক্ত গ্যাস নেই যা কারো মৃত্যুর কারণ হতে পারে।

তাহলে নিয়মিতভাবে এ রকম মৃত্যুর কারণ কী? অধ্যাপক দিদারুল আলম ঢাকাটাইমসকে বলেন, এমনিতেই পুকুরের মাঝখানে পানি বেশি থাকে। অতিরিক্ত সাঁতার কাটার কারণে শিক্ষার্থীরা নিজের অজান্তেই ক্লান্ত হয়ে পড়ে, ফলে সেখানে ভারসাম্য হারায় সে। তীরে ফিরে আসার শক্তি হারিয়ে ডুবে যায়।