শুক্রবার ১৪ অগাস্ট ২০২০


গোমতী পাড়ের স্বপ্নবাজ কিশোর


আমাদের কুমিল্লা .কম :
10.04.2017

মাসুদ আলম।।  একবার ভেবে দেখুন তো আপনি যেখানে বসে আছেন তার পাশ দিয়ে বয়ে চলছে কলকল রবে খর¯্রােতা নদী। তার ওপর সেতু দিয়ে ঝমঝম আওয়াজে দ্রুতগতিতে ছুটে চলছে ট্রেন। সে নদীর ¯্রােতের শব্দ আপনার কানে বাজছে। ঠিক সে সময় খড়ের চালার নিচে বসে ফুঁ দিয়ে দিয়ে মাটির পাত্রে রাখা কফি খাচ্ছেন। আর সন্ধ্যা ঘনিয়ে আসার পর নানান রঙ বেরঙের আলোর ঝলকানি চোখে ভাসছে, তখন কেমন লাগবে?
কুমিল্লার দুঃখ বলে পরিচিত গোমতি নদীর তীরে এমন স্বপ্ন দেখছেন এক কিশোর। পাভেল নামের এই কিশোর স্বপ্ন দেখেন নিজেদের জমিতে গড়ে তুলবেন বিনোদনের সব আয়োজন। সব বয়সী মানুষ ঘুরতে আসবেন আর আনন্দ নিয়ে বাসায় ফিরবেন। ইতিমধ্যে অবশ্য স্বপ্নের জাল বুনতে শুরু করেছেন পাভেল। পাশে পেয়েছেন তার বাবা হান্নান সরকারকে। যাকে সবাই মেম্বার বলে চেনে।
গোমতী নদীকে বলা হয় কুমিল্লার দুঃখ। এই নদী শহর থেকে উঁচু তাই কুমিল্লা শহরের বন্যার পানি নামতে না পারায় শহরজুড়ে জলাবদ্ধতা কমে না। ফলে নগরবাসীকে দুর্ভোগ পোহাতে হয়।
যদিও বর্তমানে নদীর উভয় তীরে বাঁধ থাকার ফলে তা কৃষি ও সেচ কাজে সুফল বয়ে এনেছে। তবে নগরীর সাধারণ মানুষের দাবি, গোমতি নদীকে কেন্দ্র করে পর্যটনের গুরুত্বপূর্ণ স্থান হিসেবে গড়ে তোলা সম্ভব।
নগরবাসীর এমন চিন্তাকে মাথায় নিয়ে কিশোর পাভেলের গোমতি কফি হাউজ অ্যান্ড রিসোর্ট করার পরিকল্পনা। যেই চিন্তা সেই কাজ। বাবাকে সাথে নিয়ে কুমিল্লা শহরের উত্তর দিকে পালপাড়া ব্রিজের পাশে গড়ে তোলেন কফি হাউজ। এখনো সবকিছু প্রাথমিক পর্যায়ে থাকলেও পড়ন্ত বিকালে সময় পেলেই ছুটে আসেন গোমতির পাড়ে। কারণ জায়গাটি যে যানজট ও কোলাহলমুক্ত প্রকৃতির সৌন্দর্য ঘেরা। বিশেষ করে বিভিন্ন উৎসব ও ছুটির দিনগুলোতে গোমতির এই এলাকাতে মানুষের উপচেপড়া ভিড় লক্ষ্য করা যায়।

যেভাবে পাভেলের শুরু
গোমতি কফি হাউজ অ্যান্ড রিসোর্টের কর্ণধার পাভেল বয়সে কিশোর হলেও চিন্তায় বেশ প-িত প-িত ভাব। দর্শনীয় এলাকায় ঘুরতে বেশ পছন্দ তার। ছোট্ট সময় থেকে একটু বাউন্ডুলে টাইপের ছিল পাভেল। পড়াশোনায় তেমন মনযোগী ছিল না। পরিবারের আদরের সন্তান হওয়ায় তেমন জোরজবস্তিও করেননি বাবা হান্নান। হঠাৎ একদিন অসুস্থ হয়ে পড়লে চিকিৎসক তার ইচ্ছার বিরুদ্ধে কিছু না করার পরামর্শ দেন। যে কারণে ছেলেকে পড়াশোনার চাপ না দিয়ে ইচ্ছা অনুযায়ী ইলেক্ট্রিকের কাজ শেখার জন্য একটি প্রশিক্ষণ কেন্দ্রে ভর্তি করে দেন।
কিছুদিন পর সে কাজ ভালো লাগে না বললেও এসি ও ফ্রিজ মেরামতের কাজ শেখার কাজে লাগিয়ে দেন পাভেলকে। প্রশিক্ষণ নিয়ে একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে কিছুদিন কাজও করেন। কিন্তু মনে টেকেনি বেশিদিন।
বাবার কাছে নতুন আবদার রাখেন পাভেল। বলেন, গোমতির পাড়ে বানাশুয়া রেল ব্রিজের কাছে আমাদের জমিতে কফি হাউজ করবো। পুকুর কেটে নৌকা ছাড়বো। মানুষ ঘুরতে আসবে। কমিউনিটি সেন্টার করবো।
ছেলের এমন চিন্তা শুনে টেনশনে পড়ে যান হান্নান সরকারের। কী করবেন ভেবে পাচ্ছিলেন না। নানা চিন্তাভাবনার পর ছেলের স্বপ্নপূরণ করতে মাঠে নামেন। নিজের একবিঘা জমিতে শুরুতে পুকুর খনন করে মাটি দিয়ে রাস্তার পাশের নিচু জায়গা ভরাটের পর তৈরি করেন ছোট্ট তিনটি খড়ের ঘর। একটিতে কফি ও অন্যান্য খাবার তৈরির কাজে ব্যবহার করা হয়। আগত দর্শনার্থীদের কফি খেতে দেয়া হয় মাটির মগ।
অন্য দুটি ছাউনির চারপাশ খোলা রেখে করা হয়েছে বসার ব্যবস্থা। এছাড়াও পুকুর পাড়ে দুটি গাছের গোড়ায় ইট দিয়ে বসার জায়গা বানানো।
সরেজমিনে ঘুরে দেখা গেছে, কয়েকজন বন্ধুকে নিয়ে কফি বানাতে ব্যস্ত পাভেল। দুই বন্ধু ব্যস্ত ফুচকার প্লেট তৈরিতে। সামনের ছাউনিগুলোতে বসে আছেন কয়েকজন তরুণ। কাছে গিয়ে পরিচয় দিতেই ধন্যবাদ দিয়ে বললেন পাভেল বলেন, সামনে চলুন বাবার সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেই।
পাশে দাঁড়ানো বাবা নিজেই এগিয়ে এসে বলেন, আমি পাভেলের বাবা। কুশল বিনিময় শেষে ছেলের স্বপ্ন নিয়ে বিস্তারিত কথা বলেন।
তিনি বলেন, প্রথমে কিছুটা দ্বিধাদ্বন্দ্বে ছিলাম। কিন্তু এখন আমি খুশি। কারণ যারা এখানে আসে সবাই ছেলের জন্য আসে। তার ইচ্ছা পূরণের জন্য যা যা করতে হয় আমি করবো। পিছবা হবো না। ইতিমধ্যে সাত লাখ টাকা খরচ হয়ে গেছে। তাতেও কোনো সমস্যা নেই।
বাবার কথা টেনে নিয়ে পাভেল বলেন, আমি ঢাকা থেকে কফি খাওয়ার মাটির মগ নিয়ে আসছি। সামনে যে পুকুর দেখছেন এখানে ছোট্ট বাচ্চাদের জন্য নৌকা দেব। এখানে কমিউনিটি সেন্টার করবো। মানুষ ঘুরতে আসবে। আনন্দ পাবে, এটাই আমার স্বপ্ন।
আশপাশের এলাকার মানুষ এই উদ্যোগকে সাধুবাদ জানালেও সম্প্রতি নগরীর শাসনগাছার কিছু বখাটের হাতে আগত দর্শনার্থীদের ইভটিজিংয়ের শিকার হতে হয়েছে বলে অভিযোগ করলেন পাভেলের বাবা। যে কারণে নারীরা আসতে ভয় পাচ্ছেন বলেও জানান। বলেন, স্থানীয় ছত্রখিল পুলিশ ফাঁড়ির ইনচার্জ শাহীন স্যারকে সমস্যার কথা জানিয়েছি। তিনি ব্যবস্থা নেয়ার আশ্বাস দিয়েছেন।
পাভেলের কফি হাউজে ঘুরতে আসা কুমিল্লার ভিক্টোরিয়া কলেজের শিক্ষার্থী নজরুল ইসলাম বলেন, এমন একটি উদ্যোগে আমরা খুশি। সময় গেলে পরিচিতি বাড়ার পাশাপাশি দর্শনার্থীও বাড়বে। কিন্তু পরিবেশ সুন্দর ও নিরাপদ রাখতে  আমরাও প্রশাসনের সহযোগিতা কামনা করি।