শুক্রবার ১৩ ডিসেম্বর ২০১৯


আজ তনু হত্যার ১৩মাস পূর্ণ তিমিরে ঘুরপাক খাচ্ছে তনু হত্যা মামলার ভবিষ্যত


আমাদের কুমিল্লা .কম :
20.04.2017

তদন্ত কর্মকর্তা বললেন-গুরুত্বপূর্ণ জিজ্ঞাসাবাদ চলছে
মামলা নিয়ে সিআইডির  কোনো তৎপরতা দেহি না- তনুর মা
আজিজুর রহমান রনি, মুরাদনগর।।
কুমিল্লা ভিক্টোরিয়া কলেজের ইতিহাস বিভাগের ছাত্রী ও নাট্যকর্মী সোহাগী জাহান তনু হত্যাকা-ের আজ বৃহস্পতিবার ১৩ মাস পূর্ণ হয়েছে। নিহত হওয়ার ১৩ মাস পরেও এখনো গ্রেফতার হয়নি কোন ঘাতক। রয়েছে তারা সকল ধরাছোঁয়ার বাইরে।  এখনো তনু হত্যার মামলার তদন্তে কোন অগ্রগতি না দেখে রাগে ক্ষোভে ও অভিমানে কোন কথাই বলতে রাজি নয় মা আনোয়ারা বেগম। তিনি দু:খ করে বলেন, সিআইডি আমারে কয়, আপনি বেশি কথা বলেন। মেয়ে মারা গেছে আমার, কথা তো আমারেই কইতে অইব। মামলা নিয়ে সিআইডির মার্চ  মাসের ৩ তারিখের পর আর কোনো তৎপরতা দেহি না। অপর দিকে, মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা ও সিআইডি-কুমিল্লার সিনিয়র সহকারী পুলিশ সুপার জালাল উদ্দীন আহমেদ বুধবার বিকেলে বলেন, আমি এখানো হেড অফিসে তনুর মামলা নিয়ে মিটিং করছি। এরই মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ জিজ্ঞাসাবাদ হচ্ছে এবং চলছে।
ঘটনার পর থেকে তদন্তকারী সংস্থা একাধিকবার পরিবর্তন হলেও দীর্ঘ এসময়ে হত্যা রহস্যের মোটিভ ন্যূনতম উদঘাটন করা হয়নি। একই তিমিরে ঘুরপাক খাচ্ছে তনু হত্যা মামলার ভবিষ্যত।   ঘাতকদের শনাক্ত করা কিংবা মামলার তদন্তে দৃশ্যমান কোনো অগ্রগতিও নেই। মামলার অগ্রগতি নিয়েও তদন্ত সংস্থা সিআইডির সিনিয়র সহকারী পুলিশ সুপার  জানায়, আমরাা আমাদের তদন্ত কার্যক্রম অব্যাহত রেখেছি। আশাবাদী  মামলার একটা ফায়সালা হবে। কবে তিনি দৃশ্যমান অগ্রগতি দেখাতে পারবেন এ নিয়ে জানতে চাইলে জানান, তদন্ত চলছে।
নিহত তনুর মা যা বললেন :
নিহত সোহাগী জাহান তনুর মা আনোয়ারা বেগম গতকাল বুধবার মোবাইল ফোনে এই প্রতিবেদকের সাথে অত্যন্ত রাগে-দু:খে-ক্ষোভে বলেন, বাজান, আমরা কিয়ের ভালা আছি। তের মাস যাইতেছে, তনু নাই। তার ওপর ওর দাদা অসুস্থ। দম যায় আর আসে। কিছু খায় না। তনুর লগে আমার শ্বশুরের ভালা খাতির ছিল। কুমিল্লা থেকে মুরাদনগরের বাড়িতে গেলে দাদার গলা জড়িয়ে থাকত ও। মেয়েটা মারা যাওয়ার পর থেকে ওর দাদাও ভাইঙ্গা পড়েন। আমাদের আর ভালা থাকা। যেখানে আমরা থাকি (কুমিল্লার ময়নামতি সেনানিবাসের ভেতরের আবাসিক কোয়ার্টার), সেখানেও আমাদের চোখে চোখে রাখা হয়। কই যাই, কার কাছে যাই, এখনো খোঁজ নেওয়া হয়। চাকরির কারণে এখানে আছি, কোনো রকমে থাকা আর কি? এ মামলার কোনো অগ্রগতি দেখছি না। এখন পর্যন্ত একজন আসামি গ্রেপ্তার হয়নি। আসামি শনাক্তও হয়নি। মামলার চার্জশিটও (অভিযোগপত্র) দেওয়া হয়নি। মামলার তদন্তকারী সংস্থা সিআইডি ২০১৬ সালের ৩ ডিসেম্বর আমাদের ঢাকায় ডেকে নেয়। সেখানে নানা বিষয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করে। মামলা নিয়ে সিআইডি কয়, ধৈর্য ধরতাম, আশা রাখতাম। আমারে কয়, আপনি বেশি কথা বলেন। মেয়ে মারা গেছে আমার, কথা তো আমারেই কইতে অইব। মামলা নিয়ে সিআইডির ৩ মার্চেও পর  আর কোনো তৎপরতা দেহি না। সিআইডি কয়, আমরা খাড়াত আছি। ধৈর্য ধরেন। যাদের সঙ্গে ডিএনএ মেলানো দরকার, তাদের সঙ্গে মেলায় না কেরে। আমি এ মামলার কোনো কিনারা দেখছি না। হতাশ আমরা।  কষ্টে দিন যাচ্ছে। মনে কোনো শান্তি নাই। আল্লাহর কাছে মেয়ে হত্যার বিচার দিচ্ছি। ফেরাউনের মতো কোনো কিছু ঘটলে মনটা শান্তি পাইত। ২৩ ডিসেম্বর রাতে মেয়ের জন্য গ্রামের বাড়ি মুরাদনগর উপজেলার মির্জাপুরে দোয়া পড়াইছি।
নিহত তনুর বিচার প্রসঙ্গে তার মা আরো বলেন, কইছি তো, কেউ বিচার না করলে আল্লাহ একদিন না একদিন করব। আমি মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে মেয়ে হত্যার বিচার চেয়ে দেখা করতে চাই। তদন্ত সংস্থা খালি জিজ্ঞাসাবাদ আর আসা-যাওয়ার মধ্যেই আছে।
প্রতিদিনই মেয়ের কথা মনে পড়ে। মেয়েটা যে আমার কী আছিল, বলে বোঝানো যাবে না। পরিবারের তিন সন্তানের মধ্যে তনু সবার ছোট ছিল। ছোট মেয়ে হিসেবে ওরে সবাই আদর করত। কলিজার টুকরা ছিল, মেয়ে আমার। সেই মেয়ে নাই, এটা মনে এলে মাথা ঘোরে। গত এক বছরে চোখের জলে মেয়েকে স্মরণ করি। রাইতে কান্দি, দিনে কান্দি। আমার গেছে আমিই জানি। মেয়েটি আমার সবকিছু ছিল। এখন কারে নিয়ে বাঁচব? তারপরও আছি।
তদন্তকারী কর্মকর্তা যা বললেন : মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা ও সিআইডি-কুমিল্লার সিনিয়র সহকারী পুলিশ সুপার জালাল উদ্দীন আহমেদ বুধবার বিকেলে বলেন, তনুর হত্যা মামলা নিয়ে আমি এখন (১৯ এপ্রিল) ঢাকায় হেড অফিসে মিটিং করতেছি। ইতিমধ্যে গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি জিজ্ঞাসাবাদ করেছি, আরো জিজ্ঞাসাবাদ করব। আমরা আমাদের তদন্ত কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছি।  আশা করি আমরা এর ফায়সালা করতে পারব।
এদিকে দীর্ঘ এক বছরেও  তনু হত্যাকা-ের সঙ্গে জড়িতদের শনাক্ত বা গ্রেফতার করতে না পারা, সামরিক-বেসামরিক অর্ধশতাধিক ব্যক্তিকে জিজ্ঞাসাবাদ করা, দুই দফা ময়নাতদন্তের প্রতিবেদনে মৃত্যুর সুস্পষ্ট কারণ উল্লেখ করতে না পারা, এমনকি ডিএনএ পরীক্ষায় ৩ ধর্ষণকারীর শুক্রানু পেলেও এ পর্যন্ত ডিএনএ ম্যাচ করে ঘাতকদের সনাক্ত করতে না পারায় এ মামলার ভবিষ্যৎ কিংবা বিচার পাওয়া নিয়ে তনুর পরিবার, মানবাধিকার সংগঠনসহ বিভিন্ন মহলে সংশয় দেখা দিয়েছে।
জানা গেছে, গত বছরের অর্থাৎ ২০১৬ সালের ২০ মার্চ রাতে কুমিল্লা সেনানিবাসের ভেতরের একটি জঙ্গল থেকে কলেজছাত্রী সোহাগী জাহান তনুর লাশ উদ্ধার করা হয়। পরদিন তার বাবা কুমিল্লা ক্যান্টনমেন্ট বোর্ডের অফিস সহায়ক ইয়ার হোসেন বাদী হয়ে অজ্ঞাতনামা আসামিদের বিরুদ্ধে কোতয়ালী মডেল থানায় হত্যা মামলা দায়ের করেন। থানা পুলিশ ও ডিবি’র পর গত বছরের ১ এপ্রিল থেকে মামলাটির তদন্তের দায়িত্ব পায় কুমিল্লা সিআইডি। গত বছরের মে মাসে সিআইডি তনুর জামা-কাপড় থেকে নেওয়া নমুনার ডিএনএ পরীক্ষা করে ৩ জনের শুক্রানু পাওয়ার কথা গণমাধ্যমকে জানিয়েছিল এবং হত্যার আগে তনুকে ধর্ষণ করা হয়েছিল বলে তারা নিশ্চিত হয়েছিল।