রবিবার ২৪ †m‡Þ¤^i ২০১৭


আমি যখন ‘জাতিসংঘ’ !


আমাদের কুমিল্লা .কম :
11.07.2017

এম. এস. দোহা
নব্বই’র দশকের কথা। রাজধানীর ফকিরাপুলে দেশের সর্বাধিক প্রচারিত জাতীয় সাপ্তাহিক আজকের সূর্যোদয় পত্রিকার অফিসে সহকর্মী শাবান মাহমুদ (বর্তমান ঢাকা সাংবাদিক ইউনিয়নের সভাপতি) ও অনুজ সোহেল হায়দার চৌধুরীর (ডিইউজের সাধারণ সম্পাদক) সাথে কথা বলছিলাম। সালাম দিয়ে সামনে এসে দাঁড়ালেন উঠতি বয়সের এক যুবক। পরিচয় দিয়ে বললেন আমার বাড়ি লাকসাম। আপনার গ্রামের পাশে সিংজোড়ে। লাকসাম উপজেলা ছাত্র-ছাত্রী কল্যাণ পরিষদ নামক একটি সংগঠনের উদ্যোক্তা এবং প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি। পাসপোর্ট সাইজের নিজের একটি ছবি ও কমিটির তালিকা দিয়ে তা প্রকাশের অনুরোধ করলেন। সূর্যোদয় গ্রুপের ৩টি পত্রিকায় গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে আমি। তাই ছবি সম্বলিত প্রেস রিলিজটি যথারীতি ছাপা হলো। সপ্তাহখানেক পরে আবার আগমন। এভাবেই শামছুল করিম দুলালের সাথে আমার পরিচয়। কিছুদিন পর একটি খাম হাতে তুলে দিয়ে বললেন- ভাই আপনাকে আমাদের সংগঠনের উপদেষ্টা মনোনীত করেছি। আশা করি আপনি সম্মত হবেন এবং খুশি হবেন।
‘লাকসাম উপজেলা ছাত্র ছাত্রী কল্যাণ পরিষদ’ গরীব মেধাবী শিক্ষার্থীদের বিনামূল্যে বই বিতরণ ও বৃত্তি দিতো। এ ধরনের কয়েকটি অনুষ্ঠানে ৯৬ সালে সংসদ সদস্য তাজুল ইসলামের সাথে অতিথি হিসেবে আমিও উপস্থিত থাকতাম। শামছুল করিম দুলালের এই সেবামূলক সাংগঠনিক কর্মকান্ডে আমাকে অভিভূতও অনুপ্রাণিত করে। যা আন্তরিকতা ও যোগাযোগের ক্ষ্ত্রে আরো প্রসারিত হয় ।
একদিন সংসদ অধিবেশন সংবাদ কাভারেজের জন্য অফিস থেকে বের হওয়ার মুহূর্তে আজকের সূর্যোদয় অফিসে দুলালের উপস্থিতি। বললাম জরুরি কথা থাকলে সংক্ষেপে বলতে হবে। নচেৎ সময় থাকলে চলো সংসদ অধিবেশনে দেখে আসি। আমার প্রস্তাব সাথে সাথে লুফে নিলো দুলাল। অনেকটা আলাউদ্দিন চেরাগ হাতে পাওয়ার মতো। সংসদের ভিতরে গিয়ে তৎকালীন সময়ের বহুল আলোচিত এমপি শামীম ওসমানসহ বেশ কয়েকজন ক্লোজ এমপি মন্ত্রীর সাথে আমার সখ্যতা ও ঘনিষ্টতা দেখে দুলাল হতচকিত হয়ে পড়ে। বললাম এমপি ৩৩০ জন, কিন্তু বড় জোর ৭০/৮০ জন সাংবাদিক আমরা প্রতিদিন সংসদ রিপোর্ট কাভার করি। আনুপাতিক হারে এমপিদের তুলনায় কম হওয়ায় তাই সাংবাদিকদের কদর একটু বেশীই বলা চলে। মূলত: তখনই লেখালেখি ও সাংবাদিকতার জড়ানোর প্রস্তাব দেয় দুলাল। বললাম ইচ্ছে থাকলে অবশ্যই সম্ভব। আমার সহযোহিতা অবশ্যই পাবে।
কয়েক বছর পরে হঠাৎ একদিন ফোন করলেন আমার পরম শ্রদ্ধেয় লাকসাম প্রেসক্লাবের তৎকালীন সাধারণ সম্পাদক আবদুল কুদ্দুস ভাই। বললেন দুলাল একটি পত্রিকা বের করতে চায়। সব কিছু ম্যানেজ হয়েছে, কিন্তু সাংবাদিকতার পাঁচ বছরের অভিজ্ঞতার সনদের অভাবে এগুতে পারছেন না। অবশ্য তখন এ ধরনের প্রত্যয়ন পত্র জোগাড় করাটা খুব সহজও ছিল না। দুলালকে যারা পছন্দ করে না এমন দু’ চারজনে বিষয়টি টের পেয়ে আমাকে নিষেধও করেছে। কিন্তু কুদ্দুস ভাইয়ের অনুরোধ উপেক্ষা করতে পারিনি। অতপর মিললো ‘আলোর দিশারী’র ডিক্লারেশন। পত্রিকার লোগো বা মানোগ্রামটি আমাকেই করে দিতে হয়। সেই সাথে পত্রিকায় উদ্বোধনী সংখ্যার প্রথম পৃষ্ঠায় আমার একটি বাণী প্রকাশের মাধ্যমে শামছুল করিম দুলাল আমাকে কৃতজ্ঞতার জালে আটকে ফেলে। দেখতে দেখতে পেরিয়ে যাচ্ছে সতেরটি বছর। অনেক চড়াই উৎরাই পেরিয়ে আলোর দিশারী ও শামছুল করিম দুলাল ‘টক অব দ্যা লাকসাম’।
লেখালেখির কারণে সবাই তাকে ভালো বলতেন এটা আশা করাটা যেমন বোকামী, পাশাপাশি তার লেখনিতে অনেক ইতিবাচক সুফলও ভোগ করেছে লাকসামবাসী। বিড়ালের গলায় ঘন্টা বাঁধার কঠিন কাজটি করার লোক এ সমাজে বড্ড অভাব। এক্ষেত্রে দুলালকে থামানো যেতো না। কিছুু কিছু ব্যাপারে আমার সাথেও তার দ্বিমত হতো। ঢাকায় কর্মরত লাকসামের সাংবাদিকদের অধিকাংশের যাতায়ত আমার অফিসে। নিজেদের মধ্যে অনেক ভুল বুঝাবুঝি নিরসনের দায়িত্ব মাঝে মাঝে চাপতো আমার ঘাড়ে। এজন্য দুলাল আমাকে‘জাতিসংঘ’ বলে সম্বোধন করতো।
প্রায় বছর খানেক যাবৎ দুলালের সাথে সরাসরি দেখা সাক্ষাৎ হয় না। মাঝে মাঝে ফোনে কুশলাদি বিনিময় হতো। টেলিফোনে দুলাল প্রায় প্রস্তাব দিতো ঢাকায় লাকসাম কেন্দ্রীক বিভিন্ন সংগঠন গঠনের প্রক্রিয়ার সাথে সম্পৃক্ত হতে। তার ডাকে সাড়া না দেওয়ার মাঝে মাঝে অভিমান করতো বলতো- বেশী ভালো মানুষ বা নিরপেক্ষ হয়ে লাভ নেই। বিপদে পড়লে দেখবেন ভালো মানুষের পক্ষে কথা বলার লোক খুঁজে পাবেন না।
এবার রমজানের শেষ প্রান্তে দুলালের ফোন। ভাই ঢাকায় অফিস নিলাম অনেক দিন। একদিনের জন্যও পদধুলি দিলেন না। কালকে অবশ্যই আমার অফিসে ইফতারে আসতে হবে। ইফতারের আগে ফোনের পর ফোন। না গিয়ে উপায় নেই। কিন্তু দুলালের সাথে এটাই যে আমার শেষ দেখা এটা স্বপ্নেও ভাবতে পারিনি।



Notice: WP_Query was called with an argument that is deprecated since version 3.1.0! caller_get_posts is deprecated. Use ignore_sticky_posts instead. in /home/dailyama/public_html/beta/wp-includes/functions.php on line 4023