শনিবার ২২ জুলাই ২০১৭


বিএনপির একক প্রার্থীর বিরুদ্ধে আওয়ামী লীগকে লড়তে হবে নিজেদের একাধিক প্রার্থীর সাথে


আমাদের কুমিল্লা .কম :
16.07.2017

শাহাজাদা এমরান ।।
রাজনৈতিক ভাবে কুমিল্লা জেলাকে উত্তর এবং দক্ষিণ নাম দিয়ে বিভক্ত করা হয়েছে। কুমিল্লা উত্তরের দাউদকান্দি-মেঘনা নিয়ে কুমিল্লা -১, হোমনা তিতাস নিয়ে কুমিল্লা ২ এবং মুরাদনগর উপজেলা নিয়ে কুমিল্লা ৩ সংসদীয় আসন গঠিত। এর মধ্যে ২০০৮ সালের ২৯ ডিসেম্বর নবম সংসদ নির্বাচনে কুমিল্লা ২ ও ৩ আসনে জয়লাভ করে বিএনপি এবং কুমিল্লা ১ আসনে জয়লাভ করে আওয়ামীলীগ। এর আগে ১৯৭৩ সালের প্রথম জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর থেকে ২০০১ সালের ১ অক্টোবর অস্টম জাতীয় সংসদ নির্বাচন পর্যন্ত এই তিনটি আসনে আওয়ামীলীগ কখনো জয়লাভ করতে পারে নি। ২০০৮ সালের নির্বাচনে একটি আসন হাত ছাড়া হওয়ায় বিএনপি চাচ্ছে এটি পূনরুদ্ধার করে বাকী ২টি ধরে রাখতে আর আওয়ামীলীগ চচ্ছে কুমিল্লা -১ ধরে রেখে বাকী ২টি পূনরুদ্ধার করতে। অবশ্য ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারির প্রশ্নবিদ্ধ নির্বাচনে এ তিনটি আসনের মধ্যে বিনা প্রতিদ্ধন্ধিতায় কুমিল্লা -১ (দাউদকান্দি-মেঘনা) আসনে আওয়ামলীগের মেজর জেনারেল (অব:) সুবিদ আলী ভুইয়া এবং কুমিল্লা-২(হোমনা -তিতাস) আসনে জাতীয় পার্টির ( এরশাদ) মো. আমীর হোসেন নির্বাচিত হন। অপর দিকে, কুমিল্লা -৩ ( মুরাদনগর) আসনে তখন মহাজোটের প্রার্থী ছিল জাতীয় পার্টির আক্তার হোসেন। কিন্তু এর বিরুদ্ধে বিদ্রোহী প্রার্থী হন আওয়ামীলীগের কেন্ত্রীয় সাবেক অর্থ সম্পাদক ইউছুফ আবদুল্লাহ হারুন ও কুমিল্লা উত্তর জেলা আওয়ামীলীগের সাধারণ সম্পাদক ড. কিশোর আলম সরকার। তখন মহাজোট প্রার্থী ও আওয়ামীলীগীর অপর বিদ্রোহী প্রার্থীকে পরাজিত করে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে নির্বাচিত হন আওয়ামীলীগের ইউছুফ আবদুল্লাহ হারুন।
কুমিল্লা-১(দাউদকান্দি-হোমনা) :
দাউদকান্দি ও মেঘনা উপজেলা নিয়ে গঠিত কুমিল্লা-১ সংসদীয় আসন। কুমিল্লার ১১টি আসনের মধ্যে এটি হেভিয়েট আসন হিসেবে পরিচিত। এক দিকে বিএনপির স্থায়ী কমিটির প্রভাবশালী সদস্য ও সাবেক মন্ত্রী ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন অপর দিকে বর্তমান ক্ষমতাসীন দলের এমপি ও জ্বালানী সংক্রান্ত মন্ত্রনালয়ের স্থায়ী কমিটির সভাপতি মেজর জেনারেল (অবঃ) সুবিদ আলী ভুইয়া।
এখানে মোট ভোটার ২ লক্ষ ৭৭ হাজার ৯৩৪ জন। এর মধ্যে পুরুষ ভোটার ১ লক্ষ ৩৪ হাজার ৬১৪ আর মহিলা ভোটার ১লক্ষ ৪৩ হাজার ৩২০ জন। ২০০৮সালের ২৯ ডিসেম্বর নির্বাচনে সুবিদ আলী ভুইয়া ১২ হাজারের কিছু বেশী ভোট পেয়ে বিএনপির ড. মোশাররফকে পরাজিত করে এমপি হন। পরে ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারির বিতর্কিত নির্বাচনে মেজর জেনারেল (অবঃ) সুবিদ আলী ভুইয়া বিনা প্রতিদ্বন্ধিতায় নির্বাচিত হন।
বিএনপি :
ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেনের একক নেতৃত্বে এখানে সবাই ঐক্যবদ্ধ এবং দল হিসেবেও সুসংহত। এখানে তিনি দল ও জোটের একক প্রার্থী। ১৯৯১ সালের ৫ম সংসদ নির্বাচন থেকে শুরু করে ২০০১ সালের অষ্টম জাতীয় সংসদ নির্বাচন পর্যন্ত প্রতিটি নির্বাচনেই ড. মোশাররফ বিপুল ভোটে বিজয়ী হন। সার্বিক বিবেচনায় এবারও তিনি সুবিধা জনক অবস্থায় রয়েছে বলে মনে করেন স্থানীয় জনগন। ।

আওয়ামী লীগ :
বর্তমান এমপি লে.কর্নেল (অবঃ) সুবিদ আলী ভুইয়া ছাড়াও ক্ষমতাসীন আওয়ামীলীগ থেকে এবার যারা নমিনেশন চাইতে পারেন বলে শোনা যাচ্ছে তাদের মধ্যে রয়েছেন ২০০১ সালে নির্বাচন করা হাসান জামিল সাত্তার, মেঘনা উপজেলার প্রতিষ্ঠার অন্যতম রূপকার, সাবেক উপজেলা চেয়ারম্যান ও মেঘনা উপজেলা আওয়ামীলীগ সভাপতি মো. সফিকুল আলম, সাবেক জাতীয় ফুটবলার বাদল রায় এবং ইউরোপিয়ন ইউনিভার্ষিটির ভিসি ড. আবদুল মান্নানসহ আরো কয়েকজন তরুন।
জাতীয় পার্টি ঃ
জাতীয় পার্টি থেকে নির্বাচন করার জন্য মাঠ নামছেন জাপা নেতা সুলতান আহমেদ জিসান ,আবদুল কাদের জুয়েল ও জাতীয় ছাত্রসমাজ কেন্দ্রীয় কমিটির সাবেক প্রেসিডেন্ট আবু জায়েদ আল মাহমুদ মাখন সরকার ।
কুমিল্ল¬া – ২ ( হোমনা – তিতাস )
১৯৭৩ সালের প্রথম জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারির বিতর্কিত নির্বাচনের আগ পর্যন্ত আর কোন নির্বাচনেই আওয়ামীলীগ এখানে জয় লাভ করতে পারে নি। এ জন্য আওয়ামীলীগ এ আসনে প্রতিবারই প্রার্থী বদল করতে হয়েছে। কিন্ত জয়ের বন্দরে পৌঁছতে পারে নি। ১৯৯১ সালের ৫ম সংসদ নির্বাচন থেকে ২০০৮ সালের ৯বম সংসদ নির্বাচন পর্যন্ত প্রত্যেক বারই এখান থেকে নির্বাচিত হয়েছেণ বিএনপির এম কে আনোয়ার । এমনকি ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারির বিতর্কিত নির্বাচনেও এখানে আওয়ামলীগ দলীয় প্রার্থী মনোনয়ন পায়নি। পেয়েছে জাতীয় পার্টির অখ্যাত প্রার্থী মো. আমীর হোসেন । পরে তিনি বিনা প্রতিদ্বন্ধিতায় নির্বাচিত হন। বরাবরের মত এবারও আসনটি পূনরুদ্ধার করতে মরিয়া আওয়ামীলীগ। এজন্য এবারো তারা নতুন পার্থী খুঁজছে বলে জানা গেছে।
আওয়ামী লীগ :
হোমনা ও তিতাস উপজেলা নিয়ে গঠিত কুমিল¬া ২ আসন। ৪৪ বছর ধরে হাত ছাড়া হওয়া এই আসনটি এক বারের জন্য হলেও ফিরে পেতে এবার আওয়ামীলীগের হাই কমান্ড মরিয়া হয়ে উঠছে।
গত নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে আওয়ামীলীগের নবাগত প্রার্থী ও পপি লাইব্রেরীর প্রতিষ্ঠাতা অধ্যক্ষ আদুল মজিদ ১৮ হাজারের বেশী ভোটে বিএনপির এম কে আনোয়ারের কাছে পরাজিত হন। গতবারের পরাজিত প্রার্থী অধ্যাপক আবদুল মজিদের সাথে এবার মনোনয়ন দৌঁড়ে যোগ দিয়েছেন তিতাস উপজেলা সাবেক চেয়ারম্যান ও উপজেলা আওয়ামীলীগ আহবায়ক পারভেজ হোসেন সরকার। অধ্যাপক আবদুল মজিদের বাড়ি হোমনা আর বিএনপির প্রার্থী এম কে আনোয়ারের বাড়িও হোমনা। আর পারভেজ হোসেন সরকারের বাড়ি তিতাসে। এ হিসেবে এবার আওয়ামীলীগ দলীয় হাই কমান্ড তিতাস থেকে এবার প্রার্থী দেয়ার চিন্তা করছে বলে জানা গেছে। এ খবরে গনসংযোগ বাড়িয়ে দিয়েছেন তিতাস উপজেলা সাবেক চেয়ারম্যান পারভেজ হোসেন সরকার। মনোনয়ন দৌড়ে এগিয়ে থাকা এই তরুণ নেতা এলাকায় নীট এন্ড ক্লীন হিসেবে পরিচিত বলে ভোটাররা জানান।
বিএনপি :
হোমনা ও তিতাস বিএনপিতে নেই কোন অভ্যন্তরীন কোন্দল। এখানে বর্তমান এমপি এম কে আনোয়ার দল এবং জোটের একক প্রার্থী। তার বিকল্প এখানে কোন প্রার্থীও নেই নেতাও নেই। দুই উপজেলায় তিনি সমান জনপ্রিয়। এবারো তিনি এ আসনে বেশ সুবিধা জনক অবস্থানে আছেন বলে ভোটাররা জানান। এখানে জাতীয় পার্টি থেকে তিতাস উপজেলা জাপা সভাপতি মো. আমির হোসেন ভুইয়া , সাধারণ সম্পাদক জহিরুল ইসলাম জোহর , ও আলহাজ্ব মোশাররফ হোসেন এর নাম শোনা যাচ্ছে।

কুমিল¬া – ৩ (মুরাদনগর )
২২টি ইউনিয়ন ও ২টি থানা নিয়ে গঠিত মুরাদনগর উপজেলা। এই একটি উপজেলা নিয়েই কুমিল¬া ৩ সংসদীয় আসন । এখান মোট ভোটার ২ লক্ষ ৯৮ হাজার ৬০৪ ভোট। এর মধ্যে পুরুষ ১ লক্ষ ৪০ হাজার ৩৮০ ভোট আর মহিলা ১ লক্ষ ৫৮ হাজার ২২৪ ভোট। এখানে ১৯৭৩ সালের পর আর কোন জাতীয় সংসদ নির্বাচনে আওয়ামীলীগ বিজয়ী হতে পারে নি(২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারির বিতর্কিত নির্বাচন ব্যতিত)। এই আসন থেকে ৫ বারই এমপি নির্বাচিত হয়েছেন বিএনপির কেন্দ্রীয় কমিটির ভাইস চেয়ারম্যান আলহাজ্ব শাহ মোফাজ্জ্বল হোসাইন কায়কোবাদ। শুধু মাত্র প্রার্থী বাছাইয়ে সিদ্ধান্তহীনতার কারনেই গত ৪১ বছরেও এই আসন থেকে আওয়ামীলীগ জয়লাভ করতে পারে নি বলে জানা গেছে। এবারো বিএনপির দল এবং জোটের একক প্রার্থী আলহাজ্ব শাহ মোফাজ্জ্বল হোসাইন কায়কোবাদ। বিপরীত দিকে আওয়ামীলীগে দলীয় প্রার্থী কে হবে তা নিয়ে বরাবরের ন্যায় এখনই শুরু হয়েছে তীব্র অভ্যন্তরীণ কোন্দল। জাহাঙ্গীর আলম সরকার আর ৫ জানুয়ারির নির্বাচনের এমপি ইউছুফ আবদুল্লাহ হারুন এই দুই নেতার মধ্যে চলছে মনোনয়ন পাবার যুদ্ধ।

বিএনপি :
কুমিল্লা -৩ মুরাদনগরে বিএনপি বা এর কোন অঙ্গসংগঠনে কোন গ্রুপিং বা কোন্দল নেই। এখানে দল এবং জোটের একক প্রার্থী আলহাজ শাহ মোফাজ্জল হোসাইন কায়কোবাদ। তিনি কেন্দ্রীয় বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যানও। দীর্ঘদিন ধরে তিনি অসুস্থ্য হয়ে সৌদী আরবে চিকিৎসা নিচ্ছেন। প্রবাস জীবন যাপন করলেও বিদেশ থেকেই মুরাদনগরের পুরো রাজনৈতিক কার্যক্রম তিনি মনিটরিং করছেন প্রতিনিয়ত। নিয়মিত কর্মী সভা গুলোতে মোবাইলের মাধ্যমে বক্তব্য রাখছেন । কর্মীদের উজ্জীবিত করছেন। কর্মীরাও তার নেতৃত্বে আস্থ্ ারেখে তার অনুপস্থিতিতে দলকে আন্দোলন সংগ্রামে সম্পৃক্ত করে সংহত রেখেছেন। কর্মীদের বক্তব্য ৫ বারের এমপি কায়কোবাদকে আওয়ামীলীগ ২০০৮ সালের জোয়ারের সময় যখন হারাতে পারে নি আশা করি বাকী জীবনেও তারা তা করতে পারবে না।
আওয়ামী লীগ :
কুমিল্লা ৩ মুরাদনগর উপজেলা আওয়ামীলীগে রয়েছে ২ গ্রুপ। বর্তমান এমপি ইউছুফ আবদুল¬াহ হারুন গ্রুপ এবং কুমিল¬া উত্তর জেলা আওয়ামীলীগের সাধারন সম্পাদক জাহাঙ্গীর আলম সরকার গ্রুপে বিভক্ত কুমিল্লা ৩ সংসদীয় আসন। জানা যায়, সাবেক এফবিসিআইসির সভাপতি ইউছুফ আবদুল্লাহ হারুন বিএনপির মোফাজ্জল হোসাইন কায়কোবাদের সাথে দুইবার নির্বাচন করে পরাজিত হলেও ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারির বিএনপি বিহীন নির্বাচনে জয়লাভ করে এমপি হোন । অপর দিকে, জাহাঙ্গীর আলম সরকার দীর্ঘ দিন জেলার সাধারণ সম্পাদক থাকায় উপজেলায় দলের মধ্যে তার একটি শক্তিশালী অবস্থান রয়েছে। ইউছুফ আবদুল্লাহ হারুন স্বতন্ত্র থেকে ৫ জানুয়ারির নির্বাচনে এমপি হলেও সম্প্রতি দেশের অন্য এমপিদের সাথে তিনিও আওয়ামীলীগে যোগদান করেছেন। ফলে এখানে আগামী নির্বাচনে মনোনয়ন নিয়ে মূল প্রতিদ্বন্ধিতা হবে বর্তমান এমপি ইউছুফ আবদুল্লাহ হারুনের সাথে জাহাঙ্গীর আলম সরকারের। এখানে জাতীয় পার্টি (এরশাদ) থেকে মনোনয়ন পেতে পারেন ৫ জানুয়ারির নির্বাচনে মহাজোটের প্রার্থী আক্তার হোসেন।



Notice: WP_Query was called with an argument that is deprecated since version 3.1.0! caller_get_posts is deprecated. Use ignore_sticky_posts instead. in /home/dailyama/public_html/beta/wp-includes/functions.php on line 4023