মঙ্গল্বার ২৪ অক্টোবর ২০১৭


আওয়ামী লীগের একক প্রার্থী তাজুল ইসলাম : আসন পুনরুদ্ধার করতে বিএনপির প্রয়োজন কর্নেল আজিমকে


আমাদের কুমিল্লা .কম :
31.07.2017

ভোটের আগাম হাওয়া :
কুমিল্লা ৯ (লাকসাম-মনোহরগঞ্জ)
শাহাজাদা এমরান।।
কুমিল্লার লাকসাম উপজেলার একটি পৌরসভা, ৭টি ইউনিয়ন এবং মনোহরগঞ্জ উপজেলার ১৫টি ইউনিয়ন নিয়ে গঠিত কুমিল্লা ৯ সংসদীয় আসন। জেলার অন্যান্য আসনগুলোর মতোই এখানে আওয়ামী লীগ এবং এনটি আওয়ামী লীগ প্রায় সমানে সমান। এই আসনের দুই উপজেলাতেই আওয়ামী লীগের কিছুটা গ্রুপিং থাকলেও আগামী নির্বাচনে এমপি মনোনয়নে বর্তমান এমপি তাজুল ইসলামের ন্যূনতম কোন সমস্যা হবে বলে মনে হয় না। কিন্তু বিএনপিতে এখানে বর্তমানে গ্রুপিং চরম আকার ধারণ করে আছে। আগামী নির্বাচনে সম্ভাব্য প্রার্থীর সংখ্যাও এখানে দিন দিন দীর্ঘ হচ্ছে। সমস্যা আরো প্রকট হয়েছে, কেন্দ্রীয় বিএনপির সাংগঠনিক সম্পাদক ও এই আসনের সাবেক এমপি কর্নেল (অব.) আনোয়ারুল আজিম দলের একটি সিদ্ধান্তকে কেন্দ্র করে অভিমানবশত: পদত্যাগ করার জন্য। যদিও দল থেকে এই পদত্যাগ গ্রহণ করা হয়নি এবং তিনিও ইতিমধ্যে তা প্রত্যাহার করে নিয়েছেন। বিগত নির্বাচনের ফলাফল এবং লাকসাম- মনোহরগঞ্জ উপজেলায় কর্নেল (অব.) এম আনোয়ারুল আজিমের অবস্থান বিবেচনা করে শুধু বিএনপি না, খোদ ক্ষমতাসীন দলের নেতাকর্মীদের বক্তব্য, বিএনপি এই আসন পুনরুদ্ধার করতে হলে কর্নেল (অব.) এম আনোয়ারুল আজিমের কোন বিকল্প নেই। এখানে আওয়ামী লীগের একক প্রার্থীর বিপরীতে বিএনপির একাধিক প্রার্থী থাকলেও আসন পুনরুদ্ধার করতে হলে সসম্মানে ফিরিয়ে আনতে হবে কেন্দ্রীয় বিএনপির সাংগঠনিক সম্পাদক ও এই আসনের সাবেক এমপি কর্নেল (অব.) আনোয়ারুল আজিমকে।
কুমিল্লার এই (লাকসাম-মনোহরগঞ্জ) ৯ সংসদীয় আসন থেকে ১৯৭৩ সালে প্রথম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে আওয়ামী লীগ থেকে এমপি নির্বাচিত হন আওয়ামী লীগের জালাল আহমেদ। ১৯৭৯ সালে দ্বিতীয় জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিএনপি থেকে এমপি নির্বাচিত নুরুর রহমান, ১৯৮৬ সালে তৃতীয় জাতীয় সংসদ নির্বাচনে জাতীয় পার্টি থেকে এমপি নির্বাচিত রফিকুল ইসলাম, ১৯৮৮ সালে চতুর্থ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে জাতীয় পার্টি থেকে এমপি নির্বাচিত হন সাইফুল ইসলাম হিরু (তিনি পরে বিএনপিতে যোগ দিয়ে উপজেলা বিএনপির সভাপতি হন এবং ২০১৪ সালের আন্দোলনে গুম হন। এখনো তার কোন হদিস পাওয়া যাচ্ছে না) । ১৯৯১ সালে পঞ্চম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিএনপি থেকে এমপি নির্বাচিত হন এটিএম আলমগীর হোসেন, ১৯৯৬ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারির প্রশ্নবিদ্ধ ৬ষ্ঠ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিএনপি থেকে এমপি নির্বাচিত হন এটিএম আলমগীর হোসেন। ১৯৯৬ সালের ১২ জুনের সপ্তম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে আওয়ামী লীগ থেকে এমপি নির্বাচিত হন তাজুল ইসলাম। ২০০১ সালের অষ্টম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিএনপি থেকে এমপি নির্বাচিত হন কর্নেল (অব.) এম আনোয়ারুল আজিম। ২০০৮ সালের নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিএনপির কর্নেল (অব.) এম আনোয়ারুল আজিমকে মাত্র ৪৫৮ ভোটের ব্যবধানে পরাজিত করে দ্বিতীয় বারের মত এমপি হন আওয়ামী লীগের বর্তমান এমপি তাজুল ইসলাম। ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারির বিতর্কিত এবং প্রশ্নবিদ্ধ দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে আবারো এমপি হন আওয়ামী লীগের বর্তমান এমপি তাজুল ইসলাম।
আওয়ামী লীগ :
কুমিল্লা ৯ সংসদীয় আসনের একটি পৌরসভা ও দুটি উপজেলার সকল পর্যায়ের কমিটি বর্তমান এমপি তাজুল ইসলামের নেতৃত্বে ঐক্যবদ্ধ এবং সংগঠিত। যদিও কমিটি করার সময় এ নিয়ে বিস্তর সমালোচনা হয়েছে। তার বিরোধী অংশের বক্তব্য হচ্ছে, তিনি প্রায় টেলিভিশনে টকশোর মাধ্যমে জাতিকে গণতন্ত্রের সবক দিলেও নিজের দুই উপজেলায় কমিটি করেছেন সম্মেলন ছাড়া রাতের আঁধারে । তাজুল ইসলামের এগুলো পকেট কমিটি, তৃণমূল আওয়ামী লীগ ও এর অঙ্গসংগঠনের ত্যাগী নেতাকর্মীরা কমিটিতে স্থান পাননি এবং তাদের মূল্যায়নও করা হয়নি এমন সকল অভিযোগ এনে তাজুল ইসলাম বিরোধী গ্রুপটি তখন পত্রপত্রিকায় বিবৃতিও দিয়েছে এবং এ নিয়ে একাধিক সংবাদও পরিবেশিত হয়েছে। দুই উপজেলাতেই বর্তমান এমপি তাজুল ইসলাম বিরোধী গ্রুপটি এখনো বহাল তবিয়তে রইলেও মাঠে তারা সক্রিয় না এবং মনোনয়ন পাওয়ার রাজনীতিতে তারা কোন ফ্যাক্টরও না। তাই স্থানীয়দের মতে, আগামী সংসদ নির্বাচনে কুমিল্লা ৯ সংসদীয় আসন থেকে আওয়ামী লীগ ও মহাজোটের একক প্রার্থী বলা যায় বর্তমান এমপি তাজুল ইসলামই।
বিএনপি :
২০০১ সালের নির্বাচনের পূর্বে তৎকালীন কুমিল্লা দক্ষিণ জেলা বিএনপির সভাপতি লে.কর্নেল (অব:) আকবর হোসেন বীর প্রতীকের হাত ধরে বিএনপির রাজনীতিতে আসেন কর্নেল (অব.) এম আনোয়ারুল আজিম। রাজনীতিতে এসেই মনোনয়ন এবং মনোনয়ন পেয়েই বিপুল ভোটে এমপি নির্বাচিত হন কর্নেল (অব.) এম আনোয়ারুল আজিম। এমপি নির্বাচিত হয়ে নিজের ক্লিন ইমেজ ও বিনয়ী ব্যবহার দিয়ে অল্পদিনের মধ্যেই কর্নেল আজিম শুধু বিএনপি বা চারদলীয় জোট নয় তার প্রধান প্রতিপক্ষ আওয়ামী লীগের কাছেও তিনি জনপ্রিয় হয়ে যান। যার ফলে ২০০৮ সালের অষ্টম সংসদ নির্বাচনে সারা দেশে যেখানে বিএনপির বিশাল ভরাডুবি হয়েছিল সেখানে বিএনপির একটি অংশের নৌকার পক্ষে সমর্থন দেওয়ার পরেও মাত্র ৫৫৮ ভোটের ব্যবধানে তিনি পরাজিত হন। স্থানীয় নেতাকর্মীদের মতে, সেই নির্বাচনে কর্নেল (অব.) আজিম হারেননি। তাকে হারানো হয়েছে। দলের নেতা ও তৎকালীন পৌরসভার মেয়র মজির আহমেদ ও বর্তমান কেন্দ্রীয় বিএনপির শিল্পবিষয়ক সম্পাদক , চৈতী গ্রুপের কর্ণধার আবুল কালাম প্রকাশ্যে ধানের শীষের বিরোধিতা করে কর্নেল (অব.) আজিমকে হারিয়ে দিয়েছিলেন। সংসদ নির্বাচনের অল্প কিছু দিন পর যে উপজেলা নির্বাচন হয়েছিল, সেই নির্বাচনে মেয়র মজির আহমেদ উপজেলা চেয়ারম্যান নির্বাচিত হন এবং পৌরসভার উপ নির্বাচনে তার ছোট ভাই মফিজুর রহমান মেয়র নির্বাচিত হন। বিএনপির স্থানীয় নেতাদের মতে, ধানের শীষের কর্নেল (অব.) আজিমকে হারাতে সহায়তা করার কারণেই তৎকালীন ও বর্তমান এমপি তাজুল ইসলাম এই দুটি চেয়ার ভাইয়া গ্রুপের কর্ণধার মজির আহমেদকে উপহার দিয়েছিলেন। ২০০৮ সালের অষ্টম সংসদ নির্বাচনের পরবর্তী পর্যায়ে বিএনপির রাজনীতিতে নিষ্ক্রিয় হয়ে যান মজির আহমেদ ও চৈতী গ্রুপের আবুল কালাম। লাকসাম-মনোহরগঞ্জের পুরো কর্তৃত্ব এককভাবে কর্নেল (অব.) আজিমের ছিল। আন্দোলন সংগ্রামে ছিল তার কর্মীদের বিশাল ভূমিকা। ২০১৪ সালের উপজেলা নির্বাচনে মনোহরগঞ্জে উপজেলা চেয়ারম্যান, ভাইস চেয়ারম্যান ও মহিলা ভাইস চেয়ারম্যানও নির্বাচিত হয় বিএনপি থেকে। আর লাকসামে মূল নির্বাচনে দুটি কেন্দ্র স্থগিত করিয়ে পরবর্তী নির্বাচনে এককভাবে দখল করে নেয় আওয়ামী লীগ। ২০১৩ সালের ২৭ নভেম্বর সরকার বিরোধী আন্দোলন চলাকালে বিএনপির কর্মীদের মতে, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর হাতে গুম হন লাকসাম উপজেলা বিএনপির সভাপতি সাইফুল ইসলাম হিরু এবং পৌরসভা বিএনপির সভাপতি হুমায়ুন কবীর পারভেজ। হিরু-হুমায়ুন গুম হওয়ার পর কর্নেল (অব.) আজিম চৈতী গ্রুপের আবুল কালামকে লাকসাম উপজেলা বিএনপির ভারপ্রাপ্ত সভাপতি করেন। লাকসাম বিএনপি ও আওয়ামী লীগ কর্মীদের মতে, আজিম সাহেবের সবচেয়ে রাজনৈতিক বড় ভুল ছিল আবুল কালামকে লাকসাম উপজেলা বিএনপির ভারপ্রাপ্ত সভাপতি করা। এই পদায়নের মধ্যে দিয়েই ঐক্যবদ্ধ লাকসাম বিএনপি ভাঙনের মধ্যে পড়ে, বর্তমানে যা চূড়ান্ত পর্যায়ে রয়েছে। সম্প্রতি লাকসাম-মনোহরগঞ্জের দায়িত্বপ্রাপ্ত নেতা, এই আসনের সাবেক এমপি ও কেন্দ্রীয় সাংগঠনিক সম্পাদক কর্নেল (অব.) আজিমকে না জানিয়ে কেন্দ্রীয় বিএনপি লাকসাম-মনোহরগঞ্জের ছাত্রদল ও যুবদলের কমিটি দেয় চৈতী গ্রুপের কর্ণধার ও কেন্দ্রীয় বিএনপির শিল্প বিষয়ক সম্পাদক আবুল কালামের অনুসারীদের। এতে দুই উপজেলার হাজার হাজার ত্যাগী নেতাকর্মী যারা আন্দোলন সংগ্রামে ছিল তারা ফুঁসে উঠে। বিষয়টি অগণতান্ত্রিক বিবেচনায় মেনে নিতে না পেরে গেল রমজান মাসে ঢাকায় এক ইফতার পার্টিতে দল থেকে পদত্যাগ করেন কর্নেল (অব.) আজিম। অবশ্য এরই মধ্যে তিনি পদত্যাগ পত্র প্রত্যাহার করে দলের কাছে আবেদনও করেছেন দলের জন্য কাজ করতে। যদিও দল তার পদত্যাগপত্র গ্রহণ করেনি।
লাকসাম-মনোহরগঞ্জের বিএনপি আওয়ামী লীগসহ বিভিন্ন পর্যায়ের একাধিক লোকের সাথে কথা বলে প্রায় অভিন্ন সুরে জানা গেছে, কুমিল্লা ৯ সংসদীয় আসন আওয়ামী লীগ থেকে উদ্ধার করতে হলে কেন্দ্রীয় বিএনপিকে ফিরিয়ে আনতে হবে কর্নেল (অব.) আজিমকে। এখন পর্যন্ত এই আসনে আওয়ামী লীগের তাজুল ইসলামকে হারানোর মতো নেতা বিএনপির মধ্যে নেই বলে তারা জানান। কারণ, যারা আছেন, তারা এখনো নির্বাচনের জন্য সেভাবে আগ থেকে প্রস্তুতিও নিয়ে রাখেননি। আর জামায়াতসহ ২০ দলীয় জোটের নেতাকর্মীরাও কর্নেল আজিমের নেতৃত্বে ঐক্যবদ্ধ। স্থানীয়রা জানান, কোন কারণে বিএনপির কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব যদি কর্নেল আজিম ছাড়া অন্যকে ধানের শীষের মনোনয়ন দেন, তাহলে প্রায় নিশ্চিত একটি আসন হারাতে হবে বিএনপিকে।
কর্নেল (অব.) আজিম ছাড়া এই আসন বিএনপি থেকে আরো যারা মনোনয়ন প্রত্যাশা করেন, তারা হলেন, মনোহরগঞ্জ উপজেলা চেয়ারম্যান ও উপজেলা বিএনপির সভাপতি আলহাজ্ব ইলিয়াছ পাটোয়ারি, লাকসাম উপজেলা বিএনপির ভারপ্রাপ্ত সভাপতি ও কেন্দ্রীয় শিল্প বিষয়ক সম্পাদক আবুল কালাম ও ঢাকসুর সাবেক সদস্য ও যুবদলের কেন্দ্রীয় কমিটির সাবেক শ্রম বিষয়ক সম্পাদক ড.রশীদ আহাম্মেদ হোসাইনী।
এ দিকে, আরেকটি বিষয় জানা যায়, মনোহরগঞ্জ উপজেলায় কর্নেল (অব.) আনোয়ারুল আজিমের পর বিএনপি ও ২০ দলীয় জোটে সবচেয়ে বেশী জনপ্রিয় উপজেলা চেয়ারম্যান ইলিয়াছ পাটোয়ারি। তার নেতৃত্বেই এখানে ঐক্যবদ্ধ রয়েছে দল এবং জোট।
জাতীয় পার্টি :
এখানে হুসেইন মোহাম্মদ এরশাদের নেতৃত্বাধীন জাতীয় পার্টির সাংগঠনিক কাঠামো তেমন একটা না থাকলেও নির্বাচন এলে এখানে জাপা থেকে প্রার্থী হন প্রফেসর ড. গোলাম মোস্তফা । তিনি আগামী নির্বাচনেও প্রার্থী হবেন বলে নিশ্চিত করে জানিয়েছেন।
এদিকে, একটি সূত্র জানায়, বিএনপি দলীয় সাবেক এমপি এটিএম আলমগীর স্বতন্ত্র কিংবা আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন মহাজোটের কোন একটি শরিক দল থেকে আগামী নির্বাচনে প্রার্থী হতে পারেন। এ ছাড়া ইসলামী শাসনতন্ত্র আন্দোলন বাংলাদেশ , জাকেরপার্টিসহ ছোটখাট আরো কয়েকটি ইসলামপন্থী দল কুমিল্লা-৯ সংসদীয় আসন থেকে প্রার্থী দিতে পারে বলে জানা গেছে।
তবে বিশ্বস্ত সূত্র জানায়, আগামী নির্বাচন যদি ৫০ ভাগও সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ হয় আর বিএনপি দলীয় প্রার্থী যদি কর্নেল (অব.) এম আনোয়ারুল আজিম হয়, তাহলেও আসনটি ধরে রাখতে কঠিন পরীক্ষার মুখোমুখি হতে হবে ক্ষমতাসীন দল আওয়ামী লীগকে।