শনিবার ১৯ অগাস্ট ২০১৭


বকুল ……মেহেরুন্নেছা


আমাদের কুমিল্লা .কম :
07.08.2017

সোনাতলা গ্রামের বকুল। ছোট্ট পরীর মত একটি মেয়ে। বাবার নাম রমিজ মিঞা। গ্রামে টুকটাক কাঠ মিস্ত্রীর যুগালী হিসেবে কাজ করে। কখনো বদলা দেয়।গরীব রমিজ মিঞার জমি বলতে শুধু ঘর ভিটি। পোয়াতি খোদেজা বকুলের মা। বকুল কেবল স্কুলে আসা-যাওয়া শুরু করেছে। প্রতিদিন খোদেজা বকুলকে গোসল করিয়ে গরম ভাত খাওয়ায়ে স্কুলে পাঠায়। বকুল তার মায়ের বেড়ে ওঠা পেট ধরে আর জিজ্ঞেস করে মায়ের পেট এতো বড় কেনো।খোদেজা পরম মমতায় বলে বকুলের আরেকটা ভাই বা বোন আসবে। খুশীতে বকুল আটখানা।সে মাকে ঝাপটে ধরে আর বলে তার বোন হলেই সে খুশি। দু’বোন মিলে খেলবে। খোদেজাও খুশি।তার বকুল এতো সুন্দর! সে মেয়েকে বুকে টেনে নেয়।মাতৃত্বের সুখ আস্বাদন করে। রমিজ মিঞা এবং খোদেজা দুজনেই শান্ত- শিষ্ট। রমিজের বৃদ্ধা মাকে নিয়ে কোনোমতে তাদের দিন চলে যায়। বকুল তার দাদীর সাথে ঘুমায়। সেদিনও দাদী- নাতিন ঘুমিয়ে পড়েছিলো। মাঝরাতে রমিজ মাকে ডেকে তুলে। খোদেজার প্রসব বেদনা উঠেছে। রমিজ অন্য ঘরের মুরুব্বীদের জাগিয়ে পূর্ব বাড়ির রিজিয়ার মাকে ডাকতে গেলো।রিজিয়ার মা হলো ধাত্রী। গরীবের উপকারে লাগলেও তার সফলতা কম নয়।এতো রাতে আল্লাহর উপর ভরসা রেখে রমিজ রিজিয়ার মাকে ডেকে আনলো। কিন্তু কোনোভাবেই বাচ্চা খালাস হলোনা। শেষ রাতে বকুলের ঘুম ভেঙ্গে গেলো। ঘরে বাড়ির মহিলারা আল্লা আল্লা করছে। উঠোনে বাড়ির পুরুষেরা।কেনো জানি বকুল হঠাৎ জোরে কান্না করে দিলো। তার কচি মন বুঝে গিয়েছিলো ঘরে খুব খারাপ কিছু ঘটেছে বিশেষ করে তার মায়ের। দাদী এসে তাকে ঘুমোতে বললো। শক্ত করে সে দাদীর হাতটা চেপে ধরলো। মায়ের কাছে যেতে চাইলে তাকে যেতে দেয়া হলোনা। সকালে ভ্যান গাড়িতে করে খোদেজাকে সেই তিন মাইল দূরে উপজেলা হাসপাতালে নিয়ে চললো। পথেই খোদেজা মারা যায়।লাশ হয়ে ফিরে আসলো বকুলের মা খোদেজা। ছোট্ট বকুলের পৃথিবীটা নিমেষেই শূণ্য হয়ে গেলো। দিন যায়, রাত পোহায়। সব শোকই একসময় ম্লান হয়ে যায়। রমিজ মিঞা আবার বিয়ে করে।এই ঘরে তার তিন তিনটি ছেলে।রমিজ ও রমিজের বর্তমান বউ শাহানা ছেলে সন্তান নিয়ে খুবই গর্বিত।সৎ মা শাহানা বকুল ও তার দাদীর জীবনকে অতিষ্ঠ করে তুলেছিলো। রমিজের পক্ষে মা আর বকুলকে নিজের সাথে একই ঘরে রাখা আর সম্ভব হয়নি। সৎ মা আসার পর বকুলের লেখাপড়া বন্ধ হয়ে যায়। তখন সে দ্বিতীয় শ্রেণীতে পড়তো।দাদীসহ বকুলের বসবাস এখন রসুই ঘরের পাশে দোচালা একটি ছোট ছনের ঘরে। ছোটকাল থেকেই বকুল পাশের বাড়ির খালেক কাকুদের ঘরে কাজ করে। এই ঘরে কাজ করেই দাদী- নাতিনের পেট চলে। কাকু আর চাচী দুজনেই ভালো মানুষ।তাদের দুই মেয়ে— হীরা আর মীরা।হীরা আর মীরা বকুলের চেয়ে বয়সে বড়।কিন্তু তারা তিন তিনটি বোনের মত।বকুল তাদের আমের ভর্তা বানিয়ে দেয়।কখনো বরই, মুচি, কলার থোঁড়, তেঁতুল, খেজুরের গুড় দিয়ে ভর্তা বানায়। মোটকথা বকুল ছাড়া খালেক কাকুর ঘর অচল। দেখতে দেখতে বকুল বালেগ হয়ে গেলো। বিয়ের বয়স বলে কথা! অমনি রমিজ মেয়েকে বিয়ে দেয়ার জন্য উঠে পড়ে লাগে। যত সুন্দরী হোক গরীবের মেয়ের সৌন্দর্য হয়ে যায় তার জন্য কাল।শেষে কিনা ঘটকের মাধ্যমে বিয়ে ঠিক হলো দূর গ্রামের অবস্থাসম্পন্ন পরিবারের এক বাপের এক ছেলের সাথে।কিন্তু ছেলেটি বোবা। বকুলের দাদী আর খালেক কাকুদের নিষেধ সত্ত্বেও সৎ মায়ের প্ররোচনায় রমিজ মেয়েকে সেই বোবা ছেলের সাথেই বিয়ে দেয়।কারণ, রমিজকে এখানে এক পয়সাও খরচ করতে হয়নি। তাছাড়া বকুলও সুখে থাকবে। ছেলেটি বোবা হলেও দেখতে শুনতে ভালো।বকুলের শ্বশুরও ভালো। অসহায় বকুলও তার নিয়তিকে মেনে নিলো। বিয়ের দু’বছর হয়ে গেলো।এখনো বকুলের ঘরে কোনো সন্তান আসেনি।ক্রমে শ্বশুর সহ আত্মীয়-স্বজনরা কানাকানি শুরু করলো। সন্তান না হওয়ার জন্য বকুলকেই দোষারোপ আরম্ভ করলো।বকুল ভিতরে ভিতরে আরেকটা যন্ত্রণায় দগ্ধ হচ্ছিলো। তার চাচাতো দেবর বিয়ের পর থেকেই তার দিকে অন্য দৃষ্টিতে তাকায়। এ দৃষ্টির মর্মকথা শুধু মেয়েরাই বুঝতে পারে। একদিন সে বকুলকে কু-প্রস্তাব দিয়েই বসে।বকুল জোরালো ভাবে বলে, ” আপনি আমাকে এ সর্বনাশের দিকে টানবেন না”।কে শোনে কার কথা। সেই রাতে বকুলের বোবা স্বামী খালার বাড়ি বেড়াতে যায়।শ্বশুর- শ্বাশুড়ি আর বকুল ঘরে। রাতে বকুল প্রকৃতির ডাকে বাইরে গেলে হঠাৎ কেউ তাকে ঝাপটে ধরে মুখ বেঁধে ফেলে।ঘোঙরাতে থাকে বকুল।চাচাতো দেবরের সাথে আরো তিনজন মিলে পর্যায়ক্রমে সারারাত তাকে জবর- দস্তি ও হিংস্রভাবে নির্যাতন করে। ছুরি দিয়ে ভয় দেখায়। চিৎকার করলে তাকে শেষ করে ফেলবে। শেষরাতে আতঙ্কিত, বিপর্যস্ত, রক্তাক্ত বকুল কোনো মতে ঘরে ঢুকে।শ্বাশুড়িকে একবার ডাকতে পারলেও সে ঠাস্ করে অচেতন হয়ে পড়ে যায়।শ্বশুর- শ্বাশুড়ি দুজনেই উঠে আসে। মুখে পানির ছিটকা দেয়।দেখে বকুলের কাপড় রক্তে ভিজে গেছে।অনেক পরে বকুলের জ্ঞান ফিরে আসে।সে শ্বাশুড়িকে জড়িয়ে ধরে কান্না শুরু করে। শ্বাশুড়ি বুঝে উঠতে পারছেনা তার ছেলের বউ- এর একি হলো! তিনি ভাবলেন, বকুলের বোধহয় গর্ভপাত হয়ে গেছে। তাই বকুল মানসিক ভাবে ভেঙ্গে পড়েছে। ধীরে ধীরে সে সুস্থ হয়। আবার সেই দেবর তাকে কু- প্রস্তাব দিতে থাকে। কি করবে সে ভেবে পায়না। বকুল বুঝে যায় তার পেটে একজন আছে। কিন্তু তার সন্তানের বাপ সেই চারজনের কোন জন তা সে জানেনা। অবশেষে সে সিদ্ধান্ত নেয় যা থাকে কপালে সে তার শ্বাশুড়িকে সে রাতের ঘটনা জানাবে এবং তার পেটের সন্তানের কথাও বলবে। অসহায় সরল বকুল ভেবেছিলো শ্বশুর- শ্বাশুড়ি এবং বোবা স্বামী তার প্রতি সহানুভূতি দেখাবে। এই সরলা, ধর্ষিতা নারী বুঝতে পারেনি সমাজ এবং সমাজের মানুষগুলো এ ব্যাপারে কতটা কপট। পরীর মত সুন্দরী বকুলকে তার চাচী শ্বাশুড়ির জোরালো ভূমিকায় শ্বশুর বাড়ির লোকজন পেটের সন্তানসহ বাপের বাড়ি পাঠিয়ে দিলো। ধর্ষকদের কোনো দোষ নেই। বকুল সুন্দরী যুবতী–এটাই তার জীবনে কাল হয়ে দাঁড়িয়েছে। চাচী শ্বাশুড়ির বক্তব্য —- তার ছেলে এমন করতেই পারেনা। বকুল অসৎ। তাইতো তার আজ এ পরিনতি। বাপের বাড়িতে আসার পর সৎ মায়ের অত্যাচার আর খোঁটা আরো বেড়ে গেলো। বকুল তার অসহায় দাদীর হাত আজো শক্ত করে চেপে ধরলো। পেটের বাচ্চাটার কি হবে?? দাদী কোনো কূল- কিনারা না পেয়ে সেই রিজিয়ার মায়ের পরামর্শ মোতাবেক বনাজী ওষুধ খাওয়ায়।এই ওষুধ খাওয়ার পর বকুলের রক্তপাত শুরু হয়।পরে উপায়- আন্তর না দেখে দাদী হীরা আর মীরার মাকে জানায়। উনাদের সহায়তায় উপজেলা হাসপাতালে নিলে পর বকুল এ যাত্রা বেঁচে যায়। রমিজ মিঞা চেষ্টা করে বকুলকে শ্বশুর বাড়ি পাঠাতে। কিন্তু সে বাড়ির লোকজন কঠোর মনোভাব ব্যক্ত করে।এমন পাপিষ্ঠা বউ- এর মুখ তারা আর দেখতে চায়না।সাফ জানিয়ে দেয় তালাক নামা পাঠিয়ে দেবে।একদিন পাঠিয়ে দিলোও বটে। আবার বকুল আর দাদীর ছোট্ট দো- চালা ঘরে জীবন শুরু হলো। বকুল আগের মতই খালেক কাকুদের ঘরে কাজ করে। দাদী- নাতিনের জীবন চলছে। একদিন বকুল ঘাটে থালা- বাসন মাজছিলো। এমন সময় পানিতে একটি ঢিল এসে পড়লো। তাকিয়ে দেখে ও পাড়ে বাঁশ- ঝাড়ের আড়ালে একজন বসে আছে। পরনে লুঙ্গি, গায়ে গেঞ্জি, গলায় গামছা পেঁচানো। আবারো ঢিল মারলো। দেখে লোকটি তার দিকে তাকিয়ে হাসছে। সে চিনতে পারলো।পূর্ব পাড়ার জাফর ভাই। বছর খানিক আগে তার বউ মারা গেছে। একটি ছেলেও আছে। বকুল কোনো প্রতিক্রিয়া না দেখিয়ে ঘরে চলে আসে। বহূ দিন মনকে শক্ত রেখেও শেষঅব্দি বকুল আর নিজেকে ধরে রাখতে পারেনি। জাফরের কাছে শরীর মন দুটোই সঁপে দেয়। জাফর কথা দেয় বকুলকে বিয়ে করবে। মধ্য রাতে জাফর আসতো। দাদী হয়তো বেঁহুশের মতো ঘুমিয়ে থাকতো। দো-চালা ঘরের এক কক্ষে দাদী ঘুমায়, নামাজ পড়ে।তারই এক কোনে আবার হাঁড়ি- পাতিল। সেখানেই খাওয়া সারে। আরেক কক্ষে বকুলের বাস যেথায় বেড়ায় টাঙানো একটি ছোট আয়না। আয়নার পাশে রেক।একটা পাউডার দানি, গোলাপী চিরুনী,লিপস্টিক, মাথার ব্যান্ড, সুগন্ধী তৈল, সাবান রাখা আছে রেকে। আরেক পাশে ঝুলানো মাচা। মাচায় ভাঁজ করে রাখা ছেড়া কাঁথা।মাটিতে পাতা মোস্তাগের তৈরি পাটি। এই পাটির বিছানায় জাফর আর বকুলের অভিসার চলে। যেদিন জাফর আসবে সেদিন বকুল যেনো সত্যিকারের বকুল হয়ে ফুটে ওঠে।তখন তার শরীরের পরতে পরতে রোমাঞ্চ। হাঁটায় ছন্দ, কর্মে ছন্দ। আহ্! জাফর ভাই! এই লোকটি তার পেছনের সব কালো অধ্যায় মুছে দিয়েছে। তবুও মাঝে মাঝে বকুলকে বিষাদে পেয়ে বসে।কারন জাফরদের আর্থিক অবস্থা অনেক ভালো।তার মতো গরীবের মেয়েকে কি জাফরদের পরিবার মেনে নেবে? এতদসত্ত্বেও জাফর যেদিন আসে সেদিন বকুল সব ভুলে যায়।সেদিন যৌবনের খোলা দরজা দিয়ে তপ্ত বাতাস ঢোকে। মাথায় সুগন্ধী তেল মাখে। মুখে পাউডার লাগায়। নিজেকে অপরূপা করে তোলায় কোনো ঘাটতি রাখেনা। অতঃপর মিলনের গুপ্ত সুড়ঙ্গে দুজনে নিমজ্জিত হয়। সুড়ঙ্গটি অন্ধকার; কিন্তু বিজলীর চমকের মতো আনন্দের দ্যূতি ছড়ায় ক্ষণে ক্ষণে। মিলন শেষে অবলা বকুল জাফরের মুখ থেকে একবার আদায় করে যে জাফর খুব সহসা তাকে বিয়ে করবে। জাফরও সাঁয় দেয়। বকুলের এই অনিবার্য অভিযাত্রা তাকে দিনমান ঝলমলে রাখলেও সময় সময় বিদগ্ধ করে তোলে। তারপরেও দাদীকে ফাঁকি দিয়ে তাদের রতিখেলা চলে। কয়েকদিন ধরেই দাদীর শরীরটা ভালো যাচ্ছিলো না। দাদী- নাতিন বিষন্ন বদনে কেবলি একে অপরের হাত চেপে ধরে।ক্ষুদিপানার মতো বকুল সারাজীবন তার কচুরীপানার মতো দাদীর হাত ধরেই ছিলো। অবশেষে বকুলকে ছেড়ে দাদী চলে গেলো না ফেরার দেশে। সৎ মা আর সৎ ভাইদের রক্তচক্ষু সত্ত্বেও রমিজ তার মেয়েকে দো- চালা ঘর থেকে নিজের ঘরে নিয়ে আসে। যথারীতি জাফর আর বকুলের অভিসারে ছেদ পড়ে। শোকাতুর বকুল দাদীকে হারিয়ে বিপর্যস্ত। দাদীর শোকের চেয়ে তার শারীরিক পরিবর্তন নিয়ে সে বেশি মুষড়ে পড়লো। মনে হচ্ছে পেটে আবারো আরেকজন আছে। নাহ্ ; জাফরকে জোরেসোরে বিয়ের কথা বলবে।বহু চেষ্টায় অতি সংগোপনে জাফরকে রাতে আসতে বলার সুযোগ পায়! সৎ মায়ের চোখেও বকুলের শরীর, চলন- বলনের পরিবর্তন ধরা পড়ে।স্বভাববশতঃ বকুলকে সন্দেহের চোখে দেখতে লাগলো ; সেই সাথে পাহারাও চলতে লাগলো। রাতে জাফর আসলে বকুল সন্তর্পনে দুরু-দুরু বুকে বাইরে যায়। বকুল যতই বিয়ের কথা বলে জাফরের সেদিকে কোনো মনোযোগ নেই।সে বকুলের শরীর হাতড়াতে লাগলো। জাফর আর জাফর নেই। স্থান- কাল-পাত্র ভুলে সে আজ জানোয়ার। পশুর মতো হামলে পড়লো বকুলের উপর। অমনি কালো এক নারী- মূর্তি ফিসফিস করে বকুলকে ‘ বেশ্যা’, ‘মাগী’ বলতে বলতে দৌড়ে এলো। এমতাবস্থায় জাফর এক ঝটকায় বকুলকে ছেড়ে দিয়ে ভোঁ- দৌড়। আলু- থালু বকুল উঠে দেখে কালো-মূর্তি আর কেউ নয় — তার সৎ মা শাহানা। হায়রে! এ কি হলো!! বকুলের ভেতরে কালবৈশাখীর ঝড় বয়ে যাচ্ছে। তার বুক ধড়- ফড় করছে। ঠোঁটের কাঁপন, হাত- পায়ের কাঁপন কোনো মতেই থামাতে পারছেনা। হত- বিহবল, অসহায় বকুল জানেনা এই পৃথিবী আর তাকে চায় কিনা। সৎ মা আর সৎ ভাইয়েরা মিলে বকুলকে ভীষণ মারধোর করলো।মেয়ের এহেন কর্মকান্ডে রমিজ মিঞাও অসহায়ের মতো চুপ মেরে গেলো।সে ভেবে পায়না তার বকুলের জন্য সে কি করতে পারে। সারাদিন বকুল বিছানায়। বেহুঁশ বকুলের আজ আর কেউ নেই। বিকেলে খালেক চাচী এসে দেখেন বকুলের বিছানায় রক্ত।গায়ে প্রচন্ড জ্বর। সৎ মা অবিরত বকুলকে শাপ- শাপান্ত করছেন। গাল-মন্দ সহকারে চাচীর কাছে পুরো ঘটনার আদ্যোপান্ত বলে চলেছেন। চাচী অনেক কষ্টে বকুলকে তাদের বাড়ি নিয়ে গেলেন। উপজেলায় ডাক্তার দেখালেন। গর্ভের ঝামেলা সারালেন বটে; কিন্তু বকুলের মস্তিষ্কের ঝামেলাটা সারাতে পারলেন না। বকুল আর কাউকে চিনতে পারছেনা। শত চেষ্টায় নির্বাক বকুলের মুখ থেকে কোনো আওয়াজ সরছেনা।আরো ভয়ঙ্কর যেটা সেটা হলো সুন্দরী বকুল গায়ে কাপড় রাখছেনা। খালেক চাচার পরিবার ভেবে পায়না বকুলের কি হবে। তার পাগলামি বেড়েই চলছে। চাচী একদিন ভোরে ফজরের নামাজ পড়তে উঠে দেখে উঠোনে উলঙ্গ বকুল। কোনো মতে তাকে ঘরে এনে কাপড় পরান। তারা সিদ্ধান্ত নেয় উপজেলায় বকুলকে আবার ডাক্তার দেখাবে। কিন্তু বিধিবাম! পরদিন সকালে বকুলকে কোথাও খুঁজে পাওয়া যায়নি। ক্লান্তিহীন দুঃখ-যন্ত্রণা তাকে মানবিক সম্পর্ক থেকে অনেক দূরে নিয়ে গেলো! প্রায় দশ বছর পরের কথা….!! খালেক চাচার মেয়ে হীরা ঢাকা শহরে থাকে।আজ সে তার মেয়েকে স্কুল থেকে নিতে এসেছে। স্কুলের সামনে প্রতিক্ষীয়মান অভিভাবকরা কোনো এক ব্যাপারে হায়- আফসোস করছে। হীরাও মেয়ের ছুটির অপেক্ষায় দাঁড়িয়ে। হঠাৎ হীরার নজর পড়লো ফুটপাত ধরে ত্রিশ-পঁয়ত্রিশ বছর বয়সী এক উলঙ্গ মহিলার দিকে। সে এদিকেই আসছে। পুরুষেরা চোখ ফিরিয়ে নিচ্ছে ; নতুবা না দেখার ভান করছে।মহিলারা কেবল দুঃখ করছে। একি! হীরা ভুল দেখছে না….তো! এ যে তাদের সোনাতলা গ্রামের বকুল! চুলগুলো ছোট, ময়লা, তেল চিটচিটে। গায়ে কালশিটে দাগ। শরীরটা হলদেটে। হ্যাঁ! এই সেই বকুল! হীরা তার কাছে যেতে চাইলে অন্য মহিলারা নিষেধ করে। বকুল নাকি ধরতে গেলেই মারমুখী হয়ে যায়। তারপরেও হীরা তার কাছে যায়। হায় খোদা! বকুল একটা ইট কুড়িয়ে হাতে নিয়ে হীরাকে মারতে উদ্যত হয় কিন্তু মারেনা। চিৎকার করে সে দৌড়ে ভিড়ে হারিয়ে যায়। আজ রাতে হীরার ঘুম আসছেনা। বকুলের জন্য উথলে উঠা কান্না কোনোমতেই থামাতে পারছেনা।অঝোর ধারায় বৃষ্টি হচ্ছে! এই তুমুল বৃষ্টিতে বকুল কোথায়?? সে কিভাবে আছে?? অবশ্য ভয়হীন বকুল আজ অনন্তের পথে! আর কোনোদিনই বকুল জোছনার ডানায় চড়বেনা! বকুল আর কোনদিনই বকুল হয়ে ফুটবেনা! সোনাতলা গ্রামের বকুলের হাত আর কোনোদিনই কেউ সোনা দিয়ে বান্ধাবেনা! ধান-কাউনের এদেশে কত বকুল অকালে ঝরে পড়ে দড়ি হয়ে যায়! এই বকুলদের কোথাও কেউ নেই…..!!!   মেহেরুন্নেছা সহকারি অধ্যাপক, উদ্ভিদবিজ্ঞান। কুমিল্লা ভিক্টোরিয়া সরকারি কলেজ। কুমিল্লা।



Notice: WP_Query was called with an argument that is deprecated since version 3.1.0! caller_get_posts is deprecated. Use ignore_sticky_posts instead. in /home/dailyama/public_html/beta/wp-includes/functions.php on line 4023