বৃহস্পতিবার ১৭ অক্টোবর ২০১৯


অধ্যক্ষের দুর্নীতিতে ডুবছে কলেজ


আমাদের কুমিল্লা .কম :
23.08.2017

আবদুর রহমান ।।

১৯৭২ সালে বীর মুক্তিযোদ্ধারা ‘মনোহরগঞ্জ স্কুল’ নামে একটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান প্রতিষ্ঠা করেন। প্রতিষ্ঠা লাভের পর প্রাক্তন প্রধান শিক্ষক মরহুম আবুল খায়ের মিয়ার নেতৃত্বে স্কুলটি দক্ষিণ লাকসামের একটি শ্রেষ্ঠ বিদ্যাপীঠ হিসেবে খ্যাতি অর্জন করে। কালের আবর্তনে ২০০০ সালে প্রতিষ্ঠানটি স্কুল এন্ড কলেজে রূপান্তরিত হয়। প্রতিষ্ঠার পর থেকে প্রতিষ্ঠানটি ভালোই ছড়িয়ে যাচ্ছিল শিক্ষার আলো। তবে উপজেলা সদরের প্রাণকেন্দ্রে অবস্থিত বীর মুক্তিযোদ্ধাদের হাতে গড়া এই প্রতিষ্ঠানটি এখন ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে পৌঁছেছে। অধ্যক্ষ আবদুল মতিনের দুর্নীতিতে প্রতিষ্ঠানটি ডুবতে বসেছে।
যেভাবে অধ্যক্ষ হলেন আবদুল মতিন : ২০০৩ সালে এক বিতর্কিত নিয়োগ প্রক্রিয়ার মাধ্যমে অধ্যক্ষ আবদুল মতিন স্কুল শাখার সহকারী শিক্ষক পদে নিয়োগ লাভ করে। নিয়োগ লাভের এক বছর পর তিনি প্রতিষ্ঠানে যোগদান করেন। পরে ওই সময় থেকেই বিভিন্ন অনিয়মের মাধ্যমে অধ্যক্ষের পদটি দখল করেন তিনি। অধ্যক্ষের চেয়ারে বসেই নিজের ব্যক্তিস্বার্থে প্রতিষ্ঠানকে ব্যবহার শুরু করে অধ্যক্ষ মতিন। প্রাক্তন প্রধান শিক্ষক মরহুম আবুল খায়ের মিয়ার সততায় মনোহরগঞ্জ স্কুলের নামে প্রায় তিন একর সম্পত্তি ক্রয় এবং স্কুলের বিভিন্ন ভবন নির্মাণ করা সম্ভব হয়। অধ্যক্ষ আবদুল মতিনের বাড়ি কলেজের পাশেই হওয়ায় এলাকার মানুষের ধারণা ছিল তিনি প্রতিষ্ঠানটিকে একটি শ্রেষ্ঠ ও আদর্শ প্রতিষ্ঠানে পরিণত করবেন। কিন্তু বাস্তব সত্য হলো, আবদুল মতিনের নিয়োগ লাভের পর থেকে অদ্যাবধি পর্যন্ত এই দীর্ঘ সময়ে মুক্তিযুদ্ধের বীর সেনাদের গড়া প্রতিষ্ঠানটি বর্তমানে ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে পৌঁছেছে। আগে বিএনপির রাজনীতিতে জড়িত থাকলেও মৌসুমি পাখির মতো অধ্যক্ষ আবদুল মতিন এখন আওয়ামী লীগ নেতা।
অধ্যক্ষের বিরুদ্ধে অভিযোগ : দীর্ঘ ১৪ বছর পর অবশেষে অধ্যক্ষ আবদুল মতিনের বিরুদ্ধে দুর্নীতি, অনিয়ম, স্বেচ্ছাচারিতা, চাটুকারিতা ও দলবাজির অভিযোগ এনে গত প্রায় ১৫ দিন ধরে বিভিন্ন দপ্তরে কাগজপত্রের প্রমাণাদিসহ ৫ পৃষ্ঠার একটি লিখিত অভিযোগ দেওয়া হয়েছে। মনোহরগঞ্জ স্কুল এন্ড কলেজ পরিচালনা কমিটির ৩ জন বর্তমান সদস্য এবং একজন সাবেক সদস্য সর্বমোট ২৬টি অনিয়ম ও দুর্নীতির কথা উল্লেখ করে শিক্ষামন্ত্রী, শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের সচিব, মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের মহা-পরিচালক, কুমিল্লা শিক্ষা বোর্ডের চেয়ারম্যান, মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক শিক্ষা অঞ্চল-কুমিল্লার পরিচালক ও জেলা মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তার কাছে এ অভিযোগ দিয়েছেন। অভিযোগকারীরা হলেন; প্রতিষ্ঠানের পরিচালনা কমিটির বিদ্যোৎসাহী সদস্য ও সাবেক সভাপতি মো.আবুল হাসেম ভূঁইয়া, অভিভাবক সদস্য মো.বাবুল মিয়া, মো.বাহার উদ্দিন ও সাবেক সদস্য হারুনুর রশিদ। অভিযোগের কাগজপত্র ঘেঁটে এবং অনুসন্ধানে অধ্যক্ষ আবদুল মতিনের এসব অনিয়ম ও দুর্নীতির প্রমাণও পাওয়া গেছে। এতে দেখা যায় অনিয়ম ও দুর্নীতির মাধ্যমে প্রায় এক কোটি টাকা আত্মসাৎ করেছেন তিনি।
অধ্যক্ষ মতিনের যত অনিয়ম ও দুর্নীতি : অভিভাবক সদস্যদের দেওয়া অভিযোগ ঘেঁটে দেখা গেছে, ২০১৪ সালে প্রতিষ্ঠানের পরিচালনা কমিটি কর্তৃক গঠিত অভ্যন্তরীণ নিরিক্ষা কমিটি শুধুমাত্র স্কুল শাখায় ২০১৩ সালের ১ বছরের হিসেব নিরীক্ষা করে ১১ লক্ষ ৮৩ হাজার ৬৮০ টাকার হিসাবের গরমিল পাওয়া যায়। তবে ওই সময়ের কমিটিকে ম্যানেজ করে অধ্যক্ষ পার পেয়ে যান। বরং উল্টো যারা অডিট করিয়েছেন, তাদেরকেই হয়রানি শুরু করেন তিনি। এ টাকাগুলো অধ্যক্ষ নিজেই আত্মসাৎ করেছেন বলে অভিযোগ রয়েছে। কলেজের দুই জন শিক্ষক চাকরি থেকে পদত্যাগ করেন। পদত্যাগ করার পূর্বে এ দু’জন শিক্ষক ৭ মাস কলেজে অনুপস্থিত ছিলেন। অধ্যক্ষ পদত্যাগ করা দুই শিক্ষকের সঙ্গে আঁতাত করে ওই ৭ মাসের বেতন ভাতার সরকারি ১ লক্ষ ১২ হাজার ৩২৭ টাকা আত্মসাৎ করেন। ২০১৬ সালের ৩ জুলাই কলেজের অফিসের আলমারি থেকে ৬৫ হাজার টাকা চুরি হয়। ওই তারিখে কলেজের গেট ও অফিসের চাবি অধ্যক্ষের বাসায় ছিল। কলেজ বন্ধ থাকার কারণে শিক্ষক কর্মচারীগণ কিছু বুঝে উঠার আগেই তিনি বিষয়টি পুলিশকে না জানিয়ে ধামাচাপা দেওয়ার চেষ্টা করেন। প্রতিষ্ঠানের চুরি হওয়া টাকা উদ্ধারে রহস্যজনক কারণে কোন ব্যবস্থা নেননি তিনি। কলেজ ভবনের তৃতীয় তলার টিনের চাল এঙ্গেলসহ ঝড়ে পুকুরে পড়ে গেলে সেখান থেকে সেগুলো তুলে কলেজের দ্বিতীয় তলার ছাদে রাখা হয়। একইভাবে মাঠের মাঝখানে অবস্থিত স্কুল শাখার বড় টিনের ঘরটি ভেঙে মালামাল স্টোর রুমে না রেখে বন্যা আশ্রয় কেন্দ্রের নিচে ফেলে রাখেন। পরে এগুলো বাড়িতে নিয়ে এসব মালামাল আত্মসাৎ করেন তিনি। ২০০৬ সালে তৎকালীন উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার কার্যালয়ের অফিস সহকারী মো.মোতালেবের কাছ থেকে ৬০ হাজার টাকা ‘ঘুষ’ গ্রহণ করেন তার এক আত্মীয়কে চাকরি দেওয়ার নামে। কিন্তু চাকরি না দিতে পারলে মোতালেব যখন টাকার জন্য চাপ দেয় তখন অধ্যক্ষ টাকা না দিয়ে সরকারিভাবে প্রাপ্ত প্রতিষ্ঠানের কম্পিউটার মোতালেবকে দিয়ে দেন। ২০১৫ ও ২০১৬সালে শিক্ষার্থীদের অনলাইন ভর্তির আবেদন বাবদ শিক্ষাবোর্ড প্রদত্ত ৫২ হাজার টাকাও তিনি আত্মসাৎ করেন। স্কুল এন্ড কলেজ একই প্রতিষ্ঠান হওয়া সত্ত্বেও অধ্যক্ষ মতিন সম্পূর্ণ আইন ও নিয়ম বহির্ভূতভাবে ২০১৬ সাল পর্যন্ত স্কুল ও কলেজ উভয় শাখা থেকে বেসরকারি সকল ভাতাদি গ্রহণ করেছেন। যার পরিমান প্রায় ৪ লক্ষ ৬০ হাজার টাকা। বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচির আওতায় প্রতিষ্ঠানের নামে বরাদ্ধকৃত টাকা রাতের অন্ধকারে মাঠে কয়েক ট্রাক বালি ফেলে প্রায় ৪০ হাজার টাকা আত্মসাৎ করেছেন তিনি। ২০১৭ সালের এইচএসসি পরীক্ষার্থীদের মধ্যে থেকে ৪/৫ বিষয়ে অকৃতকার্যসহ সকল বিষয়ে ফেল করা এবং টেস্ট পরীক্ষায় অংশগ্রহণ না করা এমন প্রায় তিন শ’ শিক্ষার্থীকে অধ্যক্ষ তাঁর নিজ ক্ষমতাবলে ফরমফিলাপ কমিটিকে না জানিয়ে মোটা অঙ্কের টাকার বিনিময়ে ফরম ফিলাপ করান। যার ফলে চলতি বছরে এইচএসসি পরীক্ষার ফলাফলে চরম বিপর্যয় ঘটে। এ বছর পাশের হার ছিলো মাত্র ১৭ দশমিক ৮ শতাংশ। এ ফরম ফিলাপ করা বাবদ অধ্যক্ষ প্রায় ৩ লক্ষ টাকা আত্মসাৎ করেছেন বলে অভিযোগ রয়েছে। কলেজের পিছনের দুটি ডোবা তিনি বিগত ১৩ বছর যাবৎ অধ্যক্ষ ভোগ দখল করে চলেছেন। ডোবা দু’টির বাৎসরিক গড় ইজারা মূল্য ৮ হাজার টাকা হিসেবে প্রায় ১ লক্ষ ১২ হাজার টাকা আত্মসাৎ করেছেন তিনি। অভিযোগ রয়েছে প্রতি বছর পহেলা বৈশাখ উদযাপনের নামে প্রতিষ্ঠানের হাজার হাজার টাকা আত্মসাৎ করেন অধ্যক্ষ মতিন। এদিকে, ২০১৬-২০১৭ অর্থ বছরে কলেজ শাখায় কম্পিউটার ল্যাব স্থাপিত হয়। তথ্য ও যোগাযোগ প্রযক্তি অধিদপ্তরের তথ্য মতে, দেশের প্রতিটি ল্যাবের জন্য ১০টি ডেস্কটপ কম্পিউটার, ১টি ল্যাবটপ, ১টি ট্যাবলেট, ১টি মাল্টিমিডিয়া প্রজেক্টর (স্কিনসহ), ১টি লেজার প্রিন্টার, ১টি রাউটার ও অন্যান্য কম্পিউটার সংশ্লিষ্ট যন্ত্রপাতি দেওয়া হয়েছে। কিন্তু কলেজের কম্পিউটার ল্যাবটি এখনও শূন্য হয়ে পড়ে আছে। এছাড়া কম্পিউটার ল্যাব রক্ষণাবেক্ষণ ও সাইনবোর্ড বাবদ প্রদান করা নগদ ৩০ হাজার টাকাও আত্মসাৎ করেছেন তিনি। এভাবে অনিয়ম ও দুর্নীতির মাধ্যমে মনোহরগঞ্জ স্কুল এন্ড কলেজের এক কোটি টাকার বেশি আত্মসাৎ করেছেন অধ্যক্ষ আবদুল মতিন।
কলেজ শিক্ষকদের অভিযোগ : নাম প্রকাশ না শর্তে মনোহরগঞ্জ কলেজের অন্তত ৫জন সিনিয়র শিক্ষক জানান, অধ্যক্ষ আবদুল মতিন তার কৃতকর্মের জন্য একজন অযোগ্য, দুর্নীতিবাজ ও চাটুকার ব্যক্তি হিসেবে পুরো এলাকায় কুখ্যাতি লাভ করেছেন। নিয়োগ লাভের পর ১৪ বছর অতিবাহিত হলেও প্রতিষ্ঠানের টাকা দিয়ে এক শতক জমি ক্রয়তো দূরের কথা প্রতিষ্ঠানে একটি ইটও বসাতে পারেননি তিনি। অথচ এই দীর্ঘ সময়ে প্রতিষ্ঠানের লক্ষ লক্ষ টাকা আত্মসাৎ করে তিনি কলেজের সামনে তিনতলা বিশিষ্ট অট্টালিকার মালিক হয়েছেন। তিনি প্রতিষ্ঠানের কয়েক কোটি টাকা অপচয় ও আত্মসাৎ করেছেন। শিক্ষকরা আরও বলেন, প্রতিষ্ঠান পরিচালনায় চরম দায়িত্বহীনতার পরিচয়, কলেজ শাখাকে ডিগ্রি কলেজে রূপান্তর করতে ব্যর্থ হওয়ায়, মনোহরগঞ্জ উপজেলা সদর সরকারি কলেজ থেকে বঞ্চিত হয়েছে। চাটুকার, তৈলবাজ, দলবাজিতে হ্যাট্রিক হওয়া, অযোগ্য, অদক্ষ, ব্যর্থ অধ্যক্ষ আবদুল মতিনের বিরুদ্ধে ইতিমধ্যে কলেজের শিক্ষকরা অনাস্থা দিয়েছেন বলেও জানান তাঁরা।
অভিযোগকারীদের ভাষ্য : অভিযোগ কারীদের মধ্যে প্রতিষ্ঠানের পরিচালনা কমিটির বিদ্যোৎসাহী সদস্য ও সাবেক সভাপতি মো.আবুল হাসেম ভূইঁয়া, সাবেক অভিভাবক সদস্য হারুনুর রশিদ জানান, অধ্যক্ষ মতিনের সকল দুর্নীতির তথ্য প্রমাণসহ আমরা অভিযোগ করেছি। তিনি (অধ্যক্ষ) মুক্তিযোদ্ধাদের হাতে গড়া এই শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের বারোটা বাজিয়েছেন। তাই সঠিক তদন্তের মাধ্যমে তার (অধ্যক্ষের) বিচারের দাবি করছি।
অভিযুক্ত অধ্যক্ষ আবদুল মতিনের ভাষ্য: এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে এসব অভিযোগ অস্বীকার করে মনোহরগঞ্জ স্কুল এন্ড কলেজের অধ্যক্ষ আবদুল মতিন মুঠোফোনে বলেন, আমাকে উপজেলা আওয়ামী লীগের তথ্য ও গবেষণা সম্পাদক এবং শিক্ষক সমিতির সভাপতি বানানো হয়েছে। যারা রাষ্ট্রের বিরোধী দল তারাই এসব ভুয়া কথা ছড়াচ্ছে। ফলাফল বিপর্যয়ের কারণে আমাদের শিক্ষকদের ১০ টা থেকে ৪টা পর্যন্ত কলেজে উপস্থিত থাকার কথা বলা হয়েছে। এতে অনেক শিক্ষকের স্বার্থে আঘাত লেগেছে, তারাই এগুলোতে সহযোগিতা করছে। এছাড়া এই প্রতিবেদককে কলেজে গিয়ে এসব অভিযোগের উত্তর নেওয়ার জন্য বলেন অধ্যক্ষ আবদুল মতিন।
কর্তৃপক্ষের বক্তব্য : এসব প্রসঙ্গে জানতে কুমিল্লা শিক্ষা বোর্ডের চেয়ারম্যান প্রফেসর মো.আবদুল খালেকের মুঠোফোনে বেশ কয়েকবার ফোন করা হলেও তিনি রিসিভ করেননি। তবে জেলা শিক্ষা কর্মকর্তা মো.আবদুল মজিদ বলেন, মনোহরগঞ্জ কলেজের অধ্যক্ষ আবদুল মতিনের বিরুদ্ধে অভিযোগ পেয়েছি। এই অভিযোগের তদন্ত প্রক্রিয়াধীন রয়েছে। তিনি বলেন, তদন্তে এসব ঘটনার সতত্যা পাওয়া গেলে তাঁর (অধ্যক্ষের) বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।