রবিবার ২৪ †m‡Þ¤^i ২০১৭
পরবর্তী


অতঃপর তনুকে ভুলে গেলাম আমরা!


আমাদের কুমিল্লা .কম :
24.08.2017

রাশেদা রওনক খান

একটা আশা জাগানিয়া আন্দোলনকে কিভাবে যেন স্তিমিত করে দেয়া হলো! আর আমরাও হয়ে পড়লাম হতোদ্যম! সেদিন যদি তনু হত্যার বিচার চাইতে গিয়ে রাজপথে দমিত না হতাম, সেদিন যদি আমরা ধীরে ধীরে রাজপথ থেকে সরে না আসতাম, তাহলে আজ হয়তো এভাবে প্রতিদিন খবরের কাগজে হাজারো মেয়ের ধর্ষণের খবর পড়তে হতোনা। আমরা অভিভাবকেরা উদ্বিগ্ন হয়ে মেয়েদের স্কুল-কলেজে পাঠাতে হতোনা। তনু হত্যাকা-ের বিচারটি জনসম্মুখে হয় খুব বেশি দরকার ছিল, হয়নি বলেই আজ চারিদিকে এতো ধর্ষণের ঘটনা ঘটে চলেছে। আমার জন্ম এই কুমিল্লাতে। কুমিল্লার ধুলো মাখা রাস্তায় হেটেই আমার স্কুল-কলেজে যাওয়া। ছোটবেলা হতেই কুমিল্লার যে বৈশিষ্ট্যটি শুনে এসেছি, তা হলো শান্ত কুমিল্লা শান্তির শহর। সেই কুমিল্লাই সেদিন তনু হত্যার বিচার চেয়ে হয়ে উঠেছিল অশান্ত, বিক্ষোভে ফেটে পড়েছিল কুমিল্লার প্রতিটি মানুষ, প্রতিটি রাস্তা, প্রতিটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, প্রতিটি ঘর-বাড়ি। কুমিল্লায় বিএনপি- আওয়ামীলীগসহ দল-মত নির্বিশেষে সকলে এক হয়ে হাজির হয়েছিল পূবালী চত্বরে। শান্ত শহরের আকাশে ভেসে বেড়াচ্ছিল অশান্তির বাষ্প। তনু কেবল একটি নাম নয়, একজন মেয়ে নয়, একটি প্রতীক হয়ে উঠেছিল কুমিল্লাবাসীর কাছে! আগুনের মতো দাউ দাউ করে জ্বলছে শহরের প্রতিটি নাগরিক, বিচার পাবার তীব্র আকাঙ্খায় একত্রে হয়েছিল শহরের মানুষ গুলো, তনুকে এভাবে হারানোর বেদনায় শোককে শক্তিতে রপান্তরিত করেছে তনুর সহপাঠীরা। এই শহরের মেঘের ভেলায় ভাসছিলো তারুণ্যের অগ্নিশিখা! কুমিল্লার এই তরুণেরা ‘ফেইসবুক নির্ভর ডিজুস প্রজন্ম’ নয়,তাই আরেকবার প্রমাণ করে দিল তাদের লড়াই দিয়ে। প্রয়োজনে তারা লড়তে জানে, প্রতিবাদের ভাষা তাদের রক্তে, অন্যায়কে রুখে দিতে তারা সদা প্রস্তুত। হবেই না কেন? যে কুমিল্লায় বিদ্রোহের কবি, দ্রোহের কবি নজরুল এর অহরহ পদচারণা ছিল, সেই কুমিল্লাতে তো এভাবে দামামা বাজিয়ে তরুণেরা এগিয়ে আসবেই ন্যায় বিচারের অধিকার আদায়ে, সেটাই তো স্বাভাবিক।
তরুণরা আন্দোলন করেছিল সারা দেশেই, যার বীজ বপন করেছে তনুর কুমিল্লা, সোশ্যাল মিডিয়া তনুর বন্ধুদের আন্দোলন কে তরঙ্গের মতো ছড়িয়ে দিয়েছে মুহূর্তের মাঝে সারা দেশে। গণ জাগরণ মঞ্চ এগিযয়ে এসেছিলো তাদের সকল শক্তি আর দৃঢ় প্রত্যয় নিয়ে। তনু হত্যার প্রতিবাদে চারদফা দাবি ও দু’দফা কর্মসূচি ঘোষণা করেছিল গণজাগরণ মঞ্চ। কেননা তারুণ্য জানে, আমরা ‘ভীতু’ জাতি নই, আমাদের যখন এত জনবল ছিলনা, তখনি বঙ্গবন্ধু বলেছিলেন, “আমাদের কেউ দাবায়া রাখতে পারবেনা”, সেই ৭ কোটি মানুষের বদলে আজ আমরা ১৬ কোটি। তাই ৭ কোটির যে গর্জন-বর্ষণ ছিল, তা আজ ১৬ কোটিতে রপান্তরিত হয়ে বিশাল আকার ধারণ করেছে,তাও আমাদের মনে রাখতে হবে। ৭ কোটির গর্জন-বর্ষণে যদি বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে আমরা স্বাধীনতা আনতে পারি, তবে কি ১৬ কোটির গর্জনে তারই কন্যার নেতৃত্বে আমরা স্বাধীন দেশে নারীর পথ চলা, নারীর জীবনকে স্বাধীন করতে পারবনা?
শুধু তরুণেরাই নয়, তারুণ্যের পাশে এসে দাঁড়িয়েছিল বাংলার আপামর জনসাধারণ, সকল শিক্ষা প্রতিষ্ঠান। কেউই যেন মানতে পারছিলোনা জীবন সংগ্রামের লড়াকু সৈনিক তনুর এভাবে চলে যাওয়াকে । আমাদের লড়াই করেই সত্যকে প্রতিষ্ঠিত করতে হবে। এই লড়াই এ হেরে যাওয়া মানে ‘মিথ্যে’, ‘অন্ধকার’, ‘ববর্রতা’ কে প্রশ্রয় দেয়া। এটা হতে দেয়া যায় না। যেভাবেই হউক, আমাদের আন্দোলন চালিয়ে যেতে হবে, যতদিন আমাদের হাতে এই বিচার এর ফলাফল না আসে। এই আন্দোলন কোনভাবেই কোনো প্রতিষ্ঠান বা গোত্রের বিরুদ্ধে নয়। এই আন্দোলন ছিল তনু হত্যার বিচারের দাবিতে। এই আন্দোলন ছিল সত্যের জন্য, ন্যায় বিচার প্রতিষ্ঠার জন্য, এই আন্দোলন আমাদের অস্তিত্বের লড়াই! এই বিচার আমাদের সত্য ও ন্যায় এর পথ কে শক্ত করতো, যা আজ আর হলো না! কেন হলোনা? তারুণ্য থমকে গেলো কেন? কুমিল্লার গণমাধ্যমগুলো নীরব হয়ে গেলো কেন? কেন আমরা সবাই একেবারে নীরব হয়ে পড়লাম তনুর বিচার চাইবার বদলে?
আজ বড্ড বেশি উত্তর জানা প্রয়োজন। আজ সময় কুমিল্লাসহ সারাদেশের মানুষের নিজেকে প্রশ্ন গুলোর উত্তর এর সন্ধান করা। নয়তো এই চুপ থাকার ফলাফল যে কত জঘন্য হতে পারে, তা নিশ্চয়ই এখন আমাদের টের পেতে আর সমস্যা হচ্ছেনা : সাড়ে তিন বছরের তানহা ৫১ বছর বয়সী লোক দ্বারা ধর্ষিত ও খুন হয়, বাদ পড়েনা ৮ মাসের শিশু ও! এখন বনানী হতে শুরু করে বস্তি পর্যন্ত সর্বত্র চলছে ধর্ষণের মহাউৎসব! হা, পিছিয়ে পড়ছে মানবিকতা, বিপন্ন এই জীবনে আমরা আর কত পরাজয় দেখবো? আমরা কি টের পাচ্ছি, মানবতা হেরে যাচ্ছে? আমরা হেরে যাচ্ছি? আমরা প্রতিনিয়ত পিছিয়ে যাচ্ছি? মানব জাতি হতে আমরা পশুতে নয়, পশুর চেয়েও নিম্নমানের জাতিতে পরিণত হচ্ছি। ধর্ষকদের আমরা সদানন্দে পশু বলে গালি দেয়, কিন্তু নিজেরা যে ধর্ষকদের বিরুদ্ধে সোচ্চার হচ্ছিনা, রাজপথে যাচ্ছিনা, কথা বলছিনা, তাতে কি আমরা তাদের সমপর্যায়ের বলেই গণ্য হচ্ছিনা? কবি তো বলেই গিয়েছেন, অন্যায় যে করে, অন্যায় যে সহে/তবে ঘৃণা তারে যেন তৃণ সম দহে। তাই আজ যে তনু হত্যাকা-ের বিচার হলোনা,এর দায় আমাদের সবার নিতে হবে, কারণ আমরাই কেউ কেউ এইসব নরপশুদের বিচার হতে দেইনা, আমাদের মতো রক্ত মাংসের মানুষই ধর্ষক-খুনি কে বাঁচিয়ে দিতে তৎপর হয়ে উঠি। আর তনুর জন্য করা রাজপথের আন্দোলনকে ঝুলিয়ে দেই দর্জির দোকানে তনুরই সেই নতুন জামার মতো….।

লেখক:শিক্ষক, নৃবিজ্ঞান বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।

 



Notice: WP_Query was called with an argument that is deprecated since version 3.1.0! caller_get_posts is deprecated. Use ignore_sticky_posts instead. in /home/dailyama/public_html/beta/wp-includes/functions.php on line 4023