শনিবার ২৫ নভেম্বর ২০১৭


বাংলাদেশে ঢুকেছে ২ লাখ ৭০ হাজার রোহিঙ্গা


আমাদের কুমিল্লা .কম :
09.09.2017

# পাহাড়ের চূড়ায় প্রথম সন্তানের মা হলেন রোহিঙ্গা নূর বিবি
#মাকে কাঁধে নিয়ে ৬৫ কি.মি. হেঁটে উখিয়ায় রোহিঙ্গা তরুণ


# মিয়ানমার দূতাবাস ঘেরাও ১৩ সেপ্টেম্বর

স্টাফ রিপোর্টার।।

মিয়ানমারের রাখাইনে কমপক্ষে এক হাজার রোহিঙ্গাকে হত্যা করেছে দেশটির সেনাবাহিনী। জাতিগত নিধনযজ্ঞের মুখে প্রায় দুই লাখ ৭০ হাজার রোহিঙ্গা আশ্রয় নিয়েছে বাংলাদেশে। জাতিসংঘের শরণার্থী বিষয়ক হাইকমিশনারের (ইউএনএইচসিআর) মুখপাত্র ভিভিয়ান তানের বরাতে আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমগুলো এ তথ্য জানিয়েছে। জাতিসংঘ শরণার্থী বিষয়ক এই সংস্থা জেনেভাতে এক সংবাদ সম্মেলনে জানায়, গত দুই সপ্তাহে ২ লাখ ৭০ হাজার রোহিঙ্গা প্রাণ বাঁচাতে মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্য থেকে পালিয়েছে।

বাংলাদেশে দুটি শরণার্থী শিবির এরই মধ্যে রোহিঙ্গা ‘শরণার্থীতে ভরপুর’। তাদের ন্যূনতম সুযোগ-সুবিধা দিতে হিমশিম খাচ্ছে দাতা সংস্থাগুলো।
হাজার হাজার শরণার্থী বর্তমানে উখিয়া ও টেকনাফের রাস্তার পাশে অস্থায়ী তাবু টাঙ্গিয়ে আশ্রয় নিয়েছে। তবে বড় অংশটাই খোলা আকাশের নিচে অবস্থান নিয়েছে।

সংস্থার পক্ষ থেকে আরও বলা হয়, ‘অধিকাংশ আশ্রয় প্রার্থীই নারী। তাদের সঙ্গে আছে সদ্য জন্ম নেওয়া শিশু, পরিবারের সদস্য ও কম বয়সী শিশু। তারা খুবই হতদরিদ্র অবস্থায় এখানে এসে পৌঁছেছে। বর্তমানে ক্লান্ত, ক্ষুধার্ত এবং মরিয়া হয়ে আশ্রয় খুঁজছে।’
মিয়ানমার বাহিনীর অবরোধের মুখে গত ২৪ আগস্ট মধ্যরাতের পর রোহিঙ্গা যোদ্ধারা অন্তত ২৫টি পুলিশ স্টেশনে হামলা ও একটি সেনাক্যাম্পে প্রবেশের চেষ্টা চালায়। এতে মিয়ানমারের নিরাপত্তা বাহিনীর সঙ্গে তাদের সংঘর্ষ শুরু হয়।
এরপর রোহিঙ্গা অধ্যুষিত এলাকাগুলোতে অভিযান শুরু করে মিয়ানমারের সেনাবাহিনী। একের পর এক রোহিঙ্গা গ্রাম জ্বালিয়ে দেয়া হয়। অভিযানে হেলিকপ্টার গানশিপেরও ব্যাপক ব্যবহার করে মিয়ানমার সেনাবাহিনী। সীমান্তে পুঁতে রাখায় হয় স্থলমাইন।
মিয়ানমার সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে নির্বিচারে গুলি করে হত্যা, কুপিয়ে হত্যা, নারীদের গণর্ষণের অভিযোগ উঠে। তাদের হত্যাযজ্ঞ থেকে রেহাই পায়নি বয়োবৃদ্ধ নারী এবং শিশুরাও। প্রাণ বাঁচাতে স্রোতের বেগে তার বাংলাদেশে আসতে শুরু করে।

পাহাড়ের চূড়ায় প্রথম সন্তানের মা হলেন রোহিঙ্গা নূর বিবি :

কক্সবাজারের বালুখালী পাহাড়ের চূড়ায় সদ্য জন্ম নেওয়া মেয়েকে নিয়ে রোহিঙ্গা কিশোরী নূর বিবি

নূর বিবি। চোখ মুখ থেকে এখনও কৈশোরের ছাপ মোছেনি। ১৫ বছর বয়সেই বিয়ে হয় তার। দু’বছরের মাথাতেই হন অন্তঃসত্ত্বা। সংসার ভালোই চলছিল। কিন্তু হঠাৎ একদিন রাতে জ্বলে ওঠে গ্রাম। স্বামীর পরিবারের সঙ্গে অজানা গন্তব্যে পা বাড়ান নয় মাসের অন্তঃসত্ত্বা নূর বিবি। অবশেষে পাহাড় জঙ্গল ডিঙ্গিয়ে যখন সীমান্ত পার হয়ে বাংলাদেশের উখিয়ার বালুখালী পাহাড়ে আশ্রয় নিয়েছেন, ততদিনে পার হয়ে গেছে আরও ১৩ দিন। আশ্রয় নেওয়া সেই পাহাড়ের চূড়ায় হঠাৎ শুরু হয় প্রসব বেদনা। তারপর নূর বিবির অন্ধকার চোখ আলো করে ভূমিষ্ঠ হলো এক ফুটফুটে কন্যা।

এটি এক রোহিঙ্গা কিশোরীর প্রথম মা হওয়ার কষ্টগাঁথা। সোমবার (৪ সেপ্টেম্বর) রাতের ঘটনা এটি, সেদিনই মিয়ানমার থেকে বাংলাদেশে ঢুকে নিরাপদ আশ্রয় খুঁজে পেয়েছিলেন এ রোহিঙ্গা দম্পতি। বৃহস্পতিবার (৮ সেপ্টেম্বর) দুপুরে বালুখালী পাহাড়ের চূড়ায় সদ্য জন্ম নেওয়া মেয়েকে বুকে জড়িয়ে বসে থাকতে দেখা যায় প্রথমবারের মতো মা হওয়া নূর বিবিকে। ফুটফুটে সন্তানের কপালে দেখা যায় শুভ কামনার তিলক লাগানো চন্দন গুড়ার ফোঁটা। তবে প্রথম মা হওয়ার আনন্দ স্পর্শ করতে পারছে না নূর বিবিকে। কারণ তার মা-বাবাকে খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। একই সময় সবাই বাড়ি থেকে বের হলেও তারা কোথায় আছেন তা জানেন না তিনি। বারবার নিজের মা-বাবার কথা বলছিলেন সদ্য মা হওয়া রোহিঙ্গা কিশোরী নূর বিবি। এমনটাই জানা যায় তার সঙ্গে কথা বলে।পাহাড়ের ওপর সন্তান জন্ম দিয়েছেন নূর বিবি, কিন্তু পথে হারিয়েছেন মা-বাবাকে

বালুখালী পাহাড়ের চূড়ায় বাশের চাং তৈরি করে, তার ওপর কালো পলিথিন লাগিয়ে নিজেদের জন্য আপাত থাকার জায়গা তৈরি করেছেন নূর বিবির পরিবার। দশ-বাই-পাঁচ হাতের কুটিরে তার সঙ্গে আছেন স্বামী ইয়াসিন আরাফাত। শ্বশুর-শাশুড়ি, তাদের তিন মেয়ে ও চার ছেলে। তাদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, পরিবারের বড় ছেলে ইয়াসিন। বয়স ২২। রাখাইন রাজ্যে ছেলে ও মেয়েদের কম বয়সেই বিয়ে হয়। ইয়াসিনেরও তাই হয়েছে। মংডুর নাগপুরা এলাকায় ইয়াসিন পানের দোকান আছে। তার বাবা খাইরুল বাশার একজন মৌলভী। মাদ্রসায় আরবি পড়ান।

নূর বিবির শ্বশুর খাইরুল বাশার বলেন,‘আমাদের বাড়ি ছিল মংডুর নাগপুরে। মিলিটারিরা আগুন দিয়ে বাড়ি পুড়িয়ে দেয়। সবকিছু রেখে পালিয়ে এসেছি। বাংলাদেশে আসার আগে ১৩ দিন কেবল পাহাড় আর জঙ্গলে হেঁটেছি। এরপর বাংলাদেশে এসেছি ৪ সেপ্টেম্বর। তারপর এই পাহাড়ে আশ্রয় নিয়েছি।’

এ সময় নূর বিবির পাশেই বসে ছিলেন তার শাশুড়ি। নূর বিবি কখন মা হয়েছেন জানতে চাইলে তিনি কাঁদতে কাঁদতে বলেন, ‘আমাদের ঘর বাড়ি সবই আছে। কিন্তু তারপরও আমার প্রথম নাতনির জন্ম হলো পাহাড়ে। গত সোমবার রাতে নূর বিবির প্রসব বেদনা শুরু হয়। এসময় আমরা খোলা আকাশের নিচেই।’

সে সময়কার পরিস্থিতি সম্পর্কে তিনি আরও বলেন, ‘ আশেপাশের মানুষরা মাইয়াটার কষ্ট দেখে সহ্য করতে পারছিল না। এখানকার নারীরা সবাই কষ্টে আছেন। কাকে কী বলব! তারপরও অনেকে সাহায্য করেছেন, এগিয়ে এসেছেন। এর কিছুক্ষণ পর মা হয়েছেন নূর বিবি। তারপর গাড়িতে করে হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয় তাকে। সেখান থেকে তিনদিনের ওষুধ দেওয়া হয়েছে।’ তাদের কাছে কোনও টাকা পয়সা নেই বলেও জানান তিনি।
পাহাড়-জঙ্গলে লতাপাতা খেয়ে বেঁচে ছিলেন তাঁরা :
দিল বাহারের বয়স ৬০। মিয়ানমারের রাখাইনে সেনা অভিযানে প্রাণ গেছে তাঁর ছেলে মাহবুবের। ঘরবাড়ি ছারখার হয়েছে। নাতি আর স্বামীকে নিয়ে পালিয়ে ১২ দিন কাটিয়েছেন পাহাড়-জঙ্গলে। সঙ্গে থাকা চাল শেষ হয়ে গেছে আট দিনেই। বাকি দিনগুলো কাটিয়েছেন বৃষ্টির পানি আর লতাপাতা খেয়ে।
এরপর মাছ ধরার কাঠের নৌকায় চেপে এসে নেমেছেন বাংলাদেশ সীমান্তের উপকূলে। সেখানে তাঁর সঙ্গে দেখা হয় বিবিসির সাংবাদিক সঞ্জয় মজুমদারের সঙ্গে।
সঞ্জয়ের প্রতিবেদনে বলা হয়, দিল বাহার একটানা কাঁদছিলেন। তাঁর স্বামী জাকির মামুন পেছনে দাঁড়িয়েছিলেন। মুখে দাঁড়ি। দুর্বল শরীর। সঙ্গে রয়েছে নাতি মাহবুব। কিশোর মাহবুবের হাত ব্যান্ডেজের মতো করে বেঁধে রাখা হয়েছে। ব্যথায় কুঁকড়ে যাচ্ছে তার মুখ। দিল বাহার জানালেন, মাহবুবের হাতে গুলি লেগেছে।

জাকির মামুন জানালেন, বাংলাদেশ সীমান্ত থেকে মাত্র ৫০ কিলোমিটার দূরে মিয়ানমারের বুথিডং এলাকায় তাঁদের বাড়ি। হঠাৎই হামলা চলে তাঁদের গ্রামে। জাকির বলেন, ‘সেনাবাহিনী আমাদের বাড়িসহ অনেক বাড়িতে বোমা ছোড়ে। আগুন ধরিয়ে দেয়। গ্রামবাসী পালানোর চেষ্টা করলে নির্বিচারে গুলি চালায়। সারা রাত ধরে গুলি চলেছে। পরদিন সকালে দেখি গ্রামটি ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছে। গ্রামের বাড়িগুলো থেকে ধোঁয়া উড়ছে। সবকিছু হারিয়েছি আমরা। হামলায় মারা গেছেন আমার ছেলে—মাহবুবের বাবা। পরে আমরা প্রাণ নিয়ে কোনো রকমে পালিয়ে পাহাড়ি এলাকায় ঢুকে পড়ি।’

জাকির-দিল বাহারের সঙ্গে কথা বলে জানা গেল, প্রাণভয়ে বিধ্বস্ত বাড়ি থেকে কয়েকটি বাসনপত্র ও চাল নিয়ে বের হন তাঁরা। ১২ দিন ধরে তাঁরা দুটি পাহাড় ও বনজঙ্গলে ঘুরেছেন। তাঁদের কাছে যেটুকু চাল ছিল, তা আট দিনেই শেষ হয়ে যায়। নিরুপায় হয়ে লতাপাতা ও বৃষ্টির পানি খেয়ে প্রাণ বাঁচান তাঁরা। বাংলাদেশ সীমান্তের উপকূলে নামার পর আন্তর্জাতিক অভিবাসন সংস্থা (আইওএম) পরিচালিত একটি হাসপাতালে চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে মাহবুবকে।

 

 

ছোট ছোট নৌকায় চেপে বাংলাদেশ উপকূলে ভিড়ছে রোহিঙ্গারা। কাছাকাছি গেলে দেখা যাবে গাদাগাদি করে আছে রোহিঙ্গারা। নৌকার পাটাতনে রয়েছেন নারীরা। শক্ত করে ধরে রেখেছেন শিশুদের। পুরুষেরা নৌকার একদিকে বসে রয়েছেন। সীমান্তের শ্যামলাপুরের কাছেই আরেকটি নৌকা ভিড়ল। তীরে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখা গেল কালো পোশাক পরা মধ্যবয়সী এক নারীকে। নাম রহিমা খাতুন। উদ্বিগ্ন চোখে তাকাচ্ছিলেন এদিক-সেদিক।

রহিমা খাতুন তাঁর ভাইয়ের জন্য অপেক্ষা করছিলেন। জানালেন, ১০ দিন আগে মিয়ানমারের মংগদুতে তাঁদের এলাকায় হামলা হয়। পালানোর সময় তাড়াহুড়োতে অনেকেই আলাদা হয়ে যায় একে অন্যের থেকে। তখন থেকেই প্রতিদিন তীরে এসে ভাই নবি হাসানকে খোঁজেন রহিমা। ৪ নম্বর নৌকাটি তীরে ভেড়ার সঙ্গে সঙ্গে সামনের দিকে ছুটে গেলেন রহিমা। তাঁর দিকে খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে হেঁটে আসতে দেখা গেল এক যুবককে। পরস্পরকে জড়িয়ে ধরে কাঁদতে শুরু করলেন তাঁরা। বোঝা গেল তিনিই রহিমার সেই হারিয়ে যাওয়া ভাই।

রহিমা ও নাবি ভাবেননি আবার দেখা হবে। নাবি বললেন, ‘পরিবারের ১০ সদস্যের মধ্যে বেঁচে আছি মাত্র দুজন। গ্রামে হামলা চালিয়েছে সেনাবাহিনী।’

মিয়ানমারের সেনাবাহিনী এ ধরনের হামলার কথা অস্বীকার করেছে। তাদের ভাষ্য, তারা কেবল রোহিঙ্গা জঙ্গিদের লক্ষ্য করেই হামলা চালাচ্ছে। রাখাইনে পুলিশ চৌকিতে হামলাকারীদের লক্ষ্য করেই তাঁদের অভিযান।
কক্সবাজারে বালুখালীর একটি শরণার্থীশিবিরে আছেন অনেক রোহিঙ্গা। অনিশ্চিত জীবনের দুশ্চিন্তায় থাকা রোহিঙ্গাদের জন্য এটি একটি অস্থায়ী আবাস। সাধারণ প্লাস্টিক ও বাঁশ দিয়ে এই শিবির তৈরি করা হয়েছে। সেখানে তাদের ত্রাণ দেওয়া হচ্ছে।
জাকির মামুন বলেন, ‘বাংলাদেশে পৌঁছে তিনি একটু স্বস্তি পাচ্ছেন। এটি মুসলিমপ্রধান দেশ। এখানে তাঁরা নিরাপদে থাকবেন।’
মিয়ানমার দূতাবাস ঘেরাও ১৩ সেপ্টেম্বর
মিয়ানমারে রোহিঙ্গাদের ওপর নির্যাতন ও গণহত্যার প্রতিবাদে ১৩ সেপ্টেম্বর মিয়ানমার দূতাবাস ঘেরাওয়ের ঘোষণা দিয়েছে ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ। শুক্রবার জুমার নামাজ শেষে বায়তুল মোকাররম মসজিদের বাইরে রোহিঙ্গা নির্যাতন বন্ধে আয়োজিত এক বিক্ষোভ সমাবেশ থেকে এ ঘোষণা দেন সংগঠনের নেতারা।

বায়তুল মোকাররম মসজিদের উত্তর গেটে মুসল্লিরা পুরানা পল্টনের সড়কে অবস্থান নেন। সেখানে বিক্ষোভ সমাবেশ করেন তারা। ইসলামি আন্দোলন বাংলাদেশের নায়েবে আমির মুফতি ফয়জুল করিম ঘোষণা দিয়ে বলেন, ১১ সেপ্টেম্বর প্রতি জেলায় তারা বিক্ষোভ সমাবেশ করবেন। ১২ সেপ্টেম্বর রোহিঙ্গাদের মধ্যে ত্রাণ বিতরণ করবেন। বুধবার সকাল ১০টায় বায়তুল মোকাররমের দক্ষিণ প্লাজা থেকে মিয়ানমার দূতাবাস ঘেরাও করা হবে। মিয়ানমারের বিরুদ্ধে কেউ দাঁড়াতে না পারুক, আমরা মুসলিমরা এক হয়ে এর প্রতিবাদ করব।

তিনি বলেন, মিয়ানমারের এই পরিস্থিতিতে জাতিসংঘ কোথায়? মানবাধিকার সংগঠনগুলো কোথায়? কেন তারা কথা বলছে না। কেউ বলুক না বলুক, আমরা চুপ থাকব না।

ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ ঢাকা মহানগর দক্ষিণের সভাপতি ইমতিয়াজ আলম বলেন, মিয়ানমারে নারীদের ধর্ষণ করা হচ্ছে, অথচ সু চি বলছেন কিছু হচ্ছে না। তিনি নারী নাকি অন্য কিছু?

ইসলামি আন্দোলন বাংলাদেশের ঢাকা মহানগর উত্তরের সভাপতি ফজলুল বারী বলেন, মিয়ানমারে রোহিঙ্গাদের ওপর নির্যাতন জাহেলি যুগকেও হার মানিয়েছে। এই যুগেও এমন হতে পারে তা আমাদের ধারণা নেই। প্রধানমন্ত্রীকে অনুরোধ এই সমস্যা সমাধানে উদ্যোগ নিতে বাংলাদেশের মিয়ানমারের রাষ্ট্রদূতকে আল্টিমেটাম দিন।

মাকে কাঁধে নিয়ে ৬৫ কি.মি. হেঁটে উখিয়ায় রোহিঙ্গা তরুণ

জাফর আলম। ৩০ বছর বয়সী রোহিঙ্গা মুসলিম এই যুবক যেন এ যুগের বায়জিত বোস্তামী। মৃত্যুর হাত থেকে বাঁচতে ৮০ বছরের বৃদ্ধা মাকে কাঁধে নিয়ে ৬৫ কিলোমিটার হেঁটে রাখাইন রাজ্য থেকে বাংলাদেশে আসেন এই জাফর আলম। পাহাড় আর জঙ্গলের উঁচুনীচু এই পথ পাড়ি দিতে সময় লেগেছে প্রায় ৫দিন। রোহিঙ্গা মুসলিম এই তরুণের মার্তৃভক্তির সচিত্র প্রতিবেদন পড়ে চোখের পানি ফেলেছেন অনেককেই।
জ্বালিয়ে দেয়া গ্রাম থেকে জীবন বাঁচাতে বৃদ্ধা মাকে নিয়ে পালানো জাফর আলম ঘটনার বর্ণনা দেন এভাবে; চারপাশে শুধুই গোলাগুলি আর ভারী অস্ত্রের ঝনঝনানি। যত দূর চোখ যায় তত দূর কেবল আগুন আর আগুন। আগুনের লেলিহান শিখা আর আকাশ অন্ধকার করা কালো ধোঁয়া। মিয়ারমারের সরকারি বাহিনীর হত্যাযজ্ঞ আর নির্যাতন থেকে প্রাণ বাঁচাতে যেদিকে পারছে আবালবৃদ্ধবনিতা প্রাণ হাতে নিয়ে পালিয়ে যাচ্ছে। কিন্তু রাখাইন রাজ্যের বলিবাজার গ্রাম আমার বাড়ি। ঘরে অসুস্থ বৃদ্ধা মা। কী করবো কোথায় যাব, সেটাই ভেবে পাচ্ছিলাম না। কোনও উপায় না দেখে সব সহায় সম্পদ ফেলে মা আছিয়া খাতুনকে কাঁধে তুলে নিয়ে বাড়ি ছাড়ি। প্রাণের ভয়ে কয়েকদিন রাখাইন রাজ্যের এদিকে ওদিক ছুটে এক পর্যায়ে অন্যান্যদের সঙ্গে বাংলাদেশে প্রবেশের সুযোগ পাই। এরপর মাকে কাঁধে নিয়ে ৬৫ কিলোমিটার বন্ধুর পথ হেঁটে বাংলাদেশে আসি। নিজের মাকে বহন করে জন্মভূমি মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্য ছেড়ে আসার দুর্বিষহ অভিজ্ঞতার কথা ৬ সেপ্টেম্বর এ ভাবে তুলে ধরেন জাফর আলম।
জাফর আলমের বয়স ত্রিশের কাছাকাছি। গত বুধবার বিকালে উখিয়ার কুতুপালং রোহিঙ্গা ক্যাম্পের সামনে সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা হয় তার। জাফর আলম জানান, তার মায়ের নাম আছিয়া খাতুন। বয়স ৮০ পেরিয়ে গেছে। অসুস্থতার কারণে কথা বলতে পারেন না খুব একটা। বৃদ্ধার দুই ছেলে ও পাঁচ মেয়ের মধ্যে জাফরই সবার ছোট। মাকে কাঁধে নিয়ে মিয়ানমার থেকে ৫ সেপ্টেম্বর সে বাংলাদেশে পৌঁছে।
মিয়ানমার থেকে বাংলাদেশে আসার ব্যাপারে জাফর বলেন, বাংলাদেশ-মিয়ানমার সীমান্তের নো-ম্যানস ল্যান্ড থেকে রাখাইন রাজ্যে অবস্থিত তার গ্রামের বাড়ি বলিবাজারের সঠিক দূরত্ব আমার জানা নেই। তবে লোকে মুখে শুনেছি সীমান্ত থেকে বলিবাজারের দূরত্ব ৬০ থেকে ৬৫ কিলোমিটার হবে। পায়ে হেঁটে গেলে দু’দিন লাগে। আঁকা-বাঁকা পথ, বেশির ভাগ এলাকায় যানবাহন নেই। যতটুকু রাস্তায় যানবাহন চলাচল করতো, তাও এখন বন্ধ করে দিয়েছে মিয়ানমার সেনাবাহিনী। এছাড়াও রোহিঙ্গা তরুণ-যুবকদের ধরতে পথে পথে চেকপোস্ট বসানো হয়েছে। এ কারণে বিকল্প পথ হিসেবে পাহাড়-জঙ্গল পাড়ি দিয়ে আসতে হয়েছে আমাদের। এজন্য সময় লেগেছে পাঁচ দিন। এতো দিনের এই দৌড়ঝাঁপের কারণে আমার মা আরও অসুস্থ হয়ে পড়েন। অনাহারে অর্ধাহারে সঙ্গে থাকা অন্যান্যদের সহযোগিতায় কোনও মতে নো-ম্যানস ল্যান্ডে পৌঁছেছি। সেখানে একদিন অবস্থান নেওয়ার পর ৫ সেপ্টেম্বর কুতুপালং অনিবন্ধিত ক্যাম্পের বস্তিতে উঠি। তবে মায়ের অবস্থা খারাপ হওয়ায় তাকে আবারও কাঁধে নিয়ে কুতুপালং ক্যাম্পের ‘এমএসএফ’ হাসপাতালে আসি। এতো মানুষের ভিড়ে কবে ডাক্তারের দেখা পাবো জানি না।
উল্লেখ্য গত ২৪ আগস্ট মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে পুলিশ পোস্টে হামলায় ১২ পুলিশ সদস্যসহ অনেক রোহিঙ্গা হতাহত হয়। এ ঘটনায় মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে দেশটির সেনাবাহিনী ও আইন শৃঙ্খলা বাহিনী অভিযানের নামে সাধারণ মানুষ ওপর হত্যা, ধর্ষণ, বাড়িঘরে আগুনসহ নানা ধরণের নির্যাতন অব্যাহত রেখেছে। তাদের নির্যাতন থেকে প্রাণ বাঁচাতে প্রতিদিন পালিয়ে বাংলাদেশে এসে আশ্রয় নিচ্ছেন হাজার হাজার রোহিঙ্গা মুসলিম নারীপুরুষ।
জাতিসংঘের তথ্যমতে এ পর্যন্ত এক লাখ ২০ হাজার মানুষের বাংলাদেশে অনুপ্রবেশ করার কথা বলা হলেও স্থানীয়দের দাবি এই সংখ্যা দুই লাখের ওপরে। এছাড়াও নাফ নদীর পানির সীমানা থেকে শুরু করে স্থল সীমানা পার হয়ে নো-ম্যানস ল্যান্ডে অবস্থান নিয়েছে আরও হাজার হাজার নির্যাতিত রোহিঙ্গা। এর আগে ২০১৬ সালের ৯ অক্টোবরের পর মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে একই ধরণের বর্বরোচিত রোহিঙ্গা হত্যাযজ্ঞের ঘটনা ঘটে। সেসময় প্রাণ ভয়ে পালিয়ে আসে প্রায় ৮৭ হাজার রোহিঙ্গা শরণার্থী। এরপর আন্তর্জাতিক মহল নানাভাবে চাপ সৃষ্টি করে মিয়ানমার সরকারের ওপর। কিন্তু তার কোনও তোয়াক্কা না করে রাখাইন রাজ্যে ফের সেনা অভিযানের নামে রোহিঙ্গা হত্যাযজ্ঞ চালানো হচ্ছে।