শনিবার ২১ অক্টোবর ২০১৭


বঙ্গবীরের একটি লেখার সুরতহাল : অধ্যক্ষ মীর হারুন-উর-রশিদ


আমাদের কুমিল্লা .কম :
12.10.2017

বঙ্গবীর কাদের সিদ্দিকীর গত ৮ আগষ্ট (২০১৭) বাংলাদেশ প্রতিদিনে প্রকাশিত উপ-সম্পাদকীয়টি ‘‘শেখ কামালের কি বদনাম নিয়ে মরার কথা ছিল’’ এ শিরোণামে লিখিত। প্রায় পৃষ্ঠা জুড়ে লেখা। অনেক বড় লেখা। শোকাবহ আগস্টকে কেন্দ্র করে তাঁর দুঃখ-বেদনা ও দুঃসহ স্মৃতি বিধৃত করতে গিয়ে সমসাময়িক বাস্তবতা তিনি এতে সহজভাবে তুলে ধরেছেন। বঙ্গবীরের বেদনাহত জীবন ও সীমাহীন আত্মত্যাগ নিয়ে আমার কোন দ্বিমত নেই। তবে তার লেখাটির শিরোনাম নিয়ে আমার মতের ভিন্নতা রয়েছে। কারো লেখা পড়ে পাঠকদের মনে যাতে কোন বিভ্রান্তি না ছড়ায় সম্মানিত লেখকদের সে ব্যাপারে সতর্ক ও মনোযোগ থাকা প্রয়োজন। আমার বিভ্রান্তি ও দ্বিমতের বিষয়টি শেখ কামালকে নিয়ে। শেখ কামাল কি মরেছেন? নাকি তাকে মারা হয়েছে? শেখ কামাল মরেননি। তাঁকে দু’বার মারা হয়েছে। তাঁকে প্রথম মারা হয় রাজনৈতিক ও সামাজিক ভাবে। আর এ জাতীয় অসংখ্য ‘‘মারার’’ মাধ্যমেই ১৫ আগস্টের বিয়োগান্ত ঘটনার ক্ষেত্র প্রস্তুত হয়েছে। অনেকের সাথে আমিও একমত মতিয়া-ইনুদের মতো তৎকালীন কিছু রাজনৈতিক নেতার উগ্রতা, হটকারী ভূমিকা ও কর্মকান্ডই ১৫ আগস্ট শোকাবহ ঘটনা সৃষ্টিতে বড় উম্মাদনা তৈরী করেছিল। কি দূর্ভাগ্য! যারা বঙ্গন্ধুকে উৎখাত করতে চেয়েছিল, ফেরাউন নমরুদের সাথে তুলনা করেছিল ’৭৫ পরবর্তী সময়ে বঙ্গবন্ধু ও তাঁর পরিবারের চরিত্র হনন করেছিল বঙ্গবন্ধুর চামড়া দিয়ে ঢোল আর হাড্ডি দিয়ে সে ঢোল বাজাতে চেয়েছিল সেসব নীতি-আদর্শহীন চাটুকার, আগন্তুক, তোষামোদকারীরাই বঙ্গবন্ধুর জিকির করতে করতে আজ আওয়ামী লীগ ও সরকারে ঠাঁই নিয়েছে।
আমি ঐ সময়কালে ভাসানী ন্যাপের একজন সমর্থক ছিলাম। মওলানা ভাসানীর বক্তৃতা শোনার জন্য কুমিল্লা থেকে ঢাকা-চট্টগ্রামে ভাসানীর জনসভায় যেতাম। মনে পড়ে ১৯৭৪ সনের জুনে ভাসানীর বক্তৃতা শোনার জন্য চট্টগ্রামের লালদিঘীর ময়দানে গিয়েছিলাম। ফেরার পথে মালবাহী ট্রাকে যাত্রী হয়ে মাঝপথে রাতে পত্রিকা বিছিয়ে ট্রাকের নীচে ঘুমিয়েছিলাম। সে সময়ের অন্যতম বিরোধী দল মওলানা ভাসানীর ন্যাপ বা ন্যাপের নেতৃবৃন্দ মতিয়া ইনুদের মত উচ্চারণের অযোগ্য ভাষায় বঙ্গবন্ধুর বিরুদ্ধে কোথাও অশ্লীল-অশ্রাব্য ভাষায় গাল-মন্দ করেছেন এমন দেখিনি, শুনিনি।

দেহরক্ষীর গুলিতে ভারতের সাবেক প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী নিহত হলে হিন্দু শাস্ত্রমতে বড় সন্তান রাজীব গান্ধী তার মায়ের মুখাগ্নী করেছিলেন। ভারতীয় এক সাংবাদিক তখনকার ভারতের সমসাময়িক রাজনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে এক নিবন্ধে লিখেছিলেন, রাজীব গান্ধী যখন তার মায়ের মুখাগ্নী করছিলেন তখন তার মানসপটে কি ভেসে উঠেছিল? শৈশবের স্নেহার্দ্র মাখা কোন স্মৃতি না সমস্যাক্লিষ্ট ভারতের মানচিত্র, কোনটা? ঐ সাংবাদিক এ প্রশ্নের উত্তর জেনেছিলেন কিনা আমার জানা নেই। এ বিষয়ে আমার কৌতুহল আজীবন সঙ্গী হয়েই থাকবে। তবে মতিয়া-ইনুরা আমাদের কৌতুহল নিবৃত্ত করতে পারেন। এখন মন্ত্রীত্বের সুবাদে বিভিন্ন জাতীয় দিবসে তারা যখন বঙ্গবন্ধুর সমাধীতে পুষ্পার্ঘ অর্পণ করে নিচের দিকে তাকিয়ে দাড়িয়ে থাকেন তখন তাঁদের মানসপটে কি ভেসে উঠে? অতীতের উগ্রতা, হটকারিতা ও অপরাজনীতির জন্য বঙ্গবন্ধুর কাছে ক্ষমা প্রার্থনা, নাকি স্বাভাবিক নিয়মে তাঁর আত্মার মাগফেরাত কামনা। কোনটা? তবে ভুল রাজনীতির জন্য বঙ্গবন্ধুর কাছে ক্ষমা চাইলেই হবে না। জাতির নিকটও তাদের ক্ষমা চাওয়া উচিত। গণ-মাধ্যমে এদের ছবি দেখলে হাসি আসে। এরাতো শুধু জীবিত বঙ্গবন্ধু নয় মৃত বঙ্গবন্ধুকেও কম গাল-মন্দ করেননি। যে দেশে স্বাধীনতার বিরোধীদের বিচার হচ্ছে সে দেশে মতিয়া-ইনুদের মত স্বাধীনতার স্থপতির কট্টর বিরোধীদের কেন বিচার হবে না। যারা তাদের অতীত রাজনৈতিক কর্মকান্ড নিয়ে আজ তিরস্কৃত হওয়ার কথা তারা কেন আজ পুরস্কৃত হবেন। নিবেদিত প্রাণ একজন শিক্ষক যেমন শিক্ষার্থীদের উজ্জীবিত করে, স্বপ্ন দেখায়, স্বপ্ন বাস্তবায়নের পথে টেনে নিয়ে যায় তদ্রুপ রাজনীতিবিদগণ দেশ, জাতি ও সমাজের শিক্ষক, অভিভাবক, ইমাম। তারা জাতিকে সার্বজনীন সত্য, সুন্দর ও সঠিক ভবিষ্যৎ নির্মাণে নেতৃত্ব দিবেন। জাতিকে তার কাঙ্খিত লক্ষে এগিয়ে নেবেন। এটাই রাজনীতির সার্বজনীন ও চিরায়ত ধারা। রাজনীতি শুধু ক্ষমতা দখল বা ক্ষমতায় টিকে থাকার লড়াই- কৌশল হতে পারে না। আমাদের দুর্ভাগ্য গত প্রায় তিন দশক ধরেই আমরা ক্ষমতা দখল ও ক্ষমতায় টিকে থাকার কলুষিত রাজনীতির যাতাকলে নিষ্পেষিত। স্বাধীনতার মূলমন্ত্র ও চেতনা ভুলে আমাদের অহর্নিশ এ কোন্ যাত্রা? আমরা চলেছি কোথায়? বর্তমান কদর্য ও দৈন্যদশার এ রাজনীতির অবসান অতীব জরুরী। প্রসঙ্গত একটি কথা বলতে হয়। শরৎ বাবুর শ্রীকান্ত গল্পে পড়েছিলাম, মরার কোন জাত-পাত নেই। কিন্তু বঙ্গবন্ধুর পরিবারের সঙ্গে লতায়-পাতায়, ছায়ায়-মায়ায় জড়িত বঙ্গবীর কেন হৃদয় খুঁড়ে বেদনা জাগাতে শেখ কামালের ‘বদনাম’ প্রসঙ্গটি শিরোনাম করলেন তা বোধগম্য হল না। নির্মম রাজনৈতিক হত্যাকান্ডের শিকার কামাল। মৃত মানুষ নিয়ে নেতিবাচক আলোচনা শোভনীয় নয়। এবং কোন ধর্মই এটা সমর্থন করে না।

আমি পেশায় শিক্ষক ছিলাম। এ দেশের শিক্ষা-ব্যবস্থার সাথে আমার কমবেশী চল্লিশ বৎসরের সম্পর্ক। এ দেশের শিক্ষার করুণ দশা আমাকে যন্ত্রনাক্লিষ্ট করে। আমাদের শিক্ষা-সমস্যা সমাধানে বা শিক্ষার মান-উন্নয়নে কোন ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি এমন নয় তবুও শিক্ষার মান নামতে নামতে খাদের কিনারায় ধপাস করে পড়ে যাওয়ার কিংবা পড়ে ধপাস করার অপেক্ষায় রয়েছে। প্রাথমিক, মাধ্যমিক থেকে শুরু করে মহাবিদ্যালয়, বিশ্ববিদ্যালয় সর্বত্রই একই চিত্র। সামগ্রিক শিক্ষা ব্যবস্থাই আজ কংকালে পরিণত হতে চলেছে। শিক্ষা হচ্ছে মানুষের জ্ঞান অর্জনের মাধ্যমে আত্মবিকাশের একটি ধারাবাহিক ও দীর্ঘমেয়াদী কর্মসূচী। শিক্ষা আধুনিক বিশ্বে উন্নয়নের প্রধান শক্তিশালী হাতিয়ার। শিক্ষা আগুনের পরশমনি, যার ছোঁয়ায় মানুষ পাল্টে যায়। শিক্ষার উদ্দেশ্য হলো মানুষের ভিতরে গভীর মমত্ববোধ, জীবনবোধ, মানবিক ও নৈতিক মূল্যবোধ সৃষ্টি করা। শিক্ষা মানুষের বিবেক, নৈতিকতা ও মূল্যবোধের জাগরণ সৃষ্টি করে। শিক্ষা দিপ্তীময় জীবনের স্বপ্ন পূরণের হাতিয়ার। একজন শিক্ষক আজীবন শিক্ষার্থী। জ্ঞান সীমাহীন ও নিয়ত প্রসারমান এবং পরিবর্তনশীল। যিনি শিক্ষকতার মহান পেশায় নিয়োজিত তাকে প্রসারমাণ ও পরিবর্তনশীল জ্ঞানের সঙ্গে তাল মিলিয়ে নিজেকে নিয়ত হাল নাগাদ করতে হয়। এমন একটি ভাবনা মাথায় রেখেই হয়ত কার্লমার্ক্স মন্তব্য করেছিলেন, ‘‘এন এডুকেটর মাস্ট বি এডুকেটেড’। শিক্ষক বলতে আলোকিত, জ্ঞানী, গুণী, বুদ্ধিদীপ্ত একজন আদর্শ, সৎ নিরপেক্ষ ব্যক্তিকে বুঝায় যিনি সমাজ বিবর্তনে অনুঘটকের দায়িত্ব পালন করেন। শিক্ষক অনুকরণ ও অনুসরণের মডেল। শিক্ষক সভ্যতার ধারক।

প্রিয় পাঠক, ভারতীয় চলচ্চিত্র তারকা আমীর খান অভিনীত ও প্রযোজিত ‘‘তেরে জমিন পর’’ ছবিটি দেখেছেন? ভিন্ন রকম মানসিক গড়নের কারণে পড়াশোনায় পিছিয়ে পড়া একজন শিক্ষার্থীকে শিক্ষক যথাযথ পরিচর্যা করে কিভাবে সাফল্যের পথ দেখিয়েছিলেন তারই মর্মস্পর্শী চিত্র ফুটে উঠেছে এতে। চলচ্চিত্রের সেই শিক্ষক ও শিক্ষার্থীর চরিত্র মনে দাগ কেটে আছে। একজন শিক্ষকের তার ছাত্রের প্রতি স্নেহ, মায়া-মমতা, দরদ- ভালবাসা না থাকলে এবং ছাত্রটির সঙ্গে বন্ধুর মতো আচরণ না করলে তাকে সুশিক্ষায় শিক্ষিত করা আদৌ সম্ভব নয়। একজন ছাত্রের প্রকৃত বন্ধু, কোমল, কঠোর, ন্যায়-পরায়ন সেই শিক্ষক আজ কোথায়? বাস্তবে কি সেই শিক্ষকের দেখা মেলে? হয়ত মেলে, সংখ্যায় কম হলেও নিশ্চয় তারা আছেন, শিক্ষার্থীদের হৃদয়ে তাঁরাই তো বেঁচে থাকেন চিরকাল। প্রতিটি শিক্ষকই শেষ বিচারে একজন হ্যামিলনের বংশীবাদক যিনি কথার ইন্দ্রজাল দিয়ে ছাত্রদের হৃদয়কে তাঁর পেছনে পেছনে নৃত্যগীত মুখরভাবে আনন্দে এক সৃজনী উৎসবে শরীক করতে পারেন।

আমাদের শিক্ষকদের সেই চিরায়ত সৌন্দর্য ও মর্যাদা আজ কোথায়? সর্বনাশা শিক্ষক রাজনীতির কড়ালগ্রাসে ধ্বংস হচ্ছে ‘শিক্ষা’ আর ধূলায় লুন্ঠিত হচ্ছে শিক্ষকের ‘মর্যাদা’। একজন শিক্ষকের সবচেয়ে বড়গুণ তিনি একজন নিরপেক্ষ ব্যক্তি। অতীতের আদর্শিক অবস্থান থেকে আজকের শিক্ষকসমাজ বিচ্যূত। তারা এখন নানা রঙের (সাদা, নীল, গোলাপী) রাজনীতি ও নানা মতাদর্শের পূজারী। শিক্ষক রাজনীতি এখন রমরমা। সকল স্তরের শিক্ষক এখন নিয়োগও পান রাজনৈতিক বিবেচনায় এবং যোগ্যদের চেয়ে অযোগ্যরাই বেশী নিয়োগ পাচ্ছেন, সমাদৃত হচ্ছেন। রাজনীতির কারণেই কুষ্টিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের অস্ত্রবাজ ছাত্রলীগ কর্মী আজ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক। রাজনীতির কারণেই মাননীয় উপাচার্য মহোদয়গণ বেপরোয়া, আইন না মানা, স্বজনপ্রীতি, স্বেচ্ছাচারমূলক আচরণ ও দূর্নীতিতে জড়িয়ে পড়ছেন। কিন্তু দিনশেষে এ সমস্ত দলবাজ শিক্ষকদের দিয়ে আর যাই হোক ‘শিক্ষা’ রক্ষা হবে না, শিক্ষার মান সমৃদ্ধ হবে না বরং হবে প্রশ্নবিদ্ধ। দলবাজ শিক্ষকরা রাজনীতি আর নানান সুযোগ-সুবিধার পেছনে ঘুরলে তারা কিভাবে ভাল শিক্ষক হবেন? কিভাবে ভাল গবেষক হবেন? কিভাবে উচ্চতর ডিগ্রি লাভ করবেন? কিভাবে নতুন জ্ঞান সৃষ্টি করবেন? শিক্ষার্থীদেরই বা কিভাবে জ্ঞান-বিজ্ঞান চর্চায় ও গবেষণায় আকৃষ্ট করবেন? দলীয় রাজনীতি শিক্ষককে মেরুদন্ডহীন করে তোলে। জাতি গঠনের নিয়ামক শক্তি শিক্ষক সমাজ মেরুদন্ডহীন হয়ে পড়লে জাতি মাথা উঁচু করে দাঁড়াবে কিভাবে?
রাজনীতির এ থাবা থেকে শিক্ষা ও শিক্ষককে মুক্ত করে আনতে হবে। কাউয়া ও দূর্নীতিবাজ পরিবেষ্টিত হয়ে আমাদের শিক্ষামন্ত্রী নূরুল ইসলাম নাহিদ যতই বাগাড়ম্বর করুক না কেন বাস্তবতা হল ভিন্ন ও বড়ই করুণ। এমসি কলেজের ছাত্রাবাস পোড়ার দৃশ্যে তাঁর বক্তব্যে যে অসহায়ত্ব ফুটে উঠেছে এ অসহায়ত্ব শুধু ছাত্রাবাস ধ্বংসের দৃশ্যপট থেকে নয় এ অসহায়ত্ব পুরো শিক্ষা ব্যবস্থা ধ্বংসের। এ অবস্থায় গণমাধ্যমে যখন দেখি শিক্ষায় গতিশীল নেতৃত্ব প্রদান এবং অবদান রাখার জন্য আমাদের শিক্ষামন্ত্রী আন্তর্জাতিক সম্মান বা পদক পাচ্ছেন তখন এ বৈপরীত্য বড়ই বেমানান ও বেদনাদায়ক। এককালের কমিউনিষ্ট। গণফোরাম শেষ করে এখন আওয়ামীলীগে। নীতি-আদর্শহীন এসব দলছুট আগন্তুক এতিমদের দিয়ে দেশ ও জাতিকে এগিয়ে নেওয়ার আধুনিক ও গুণগত মান-সম্পন্ন শিক্ষা-ব্যবস্থার সূচনা ও বিস্তার কল্পনামাত্র।
এ লেখার শেষ প্রতিপাদ্য বিষয় জনাব মেননকে নিয়ে। বর্তমান বিমানমন্ত্রী। বঙ্গবীরের সাথে সবিনয়ে দ্বিমত পোষণ করে বলছি মেননদের অনুপ্রেরণায় আমি জাতির শ্রেষ্ঠ সন্তানদের একজন হওয়ার গৌরব অর্জন করেছি। আমাদের মহান মুক্তিযুদ্ধে সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করেছি। পাকিস্তান আমলের গোড়ার দিকে তৎকালীন পূর্বপাকিস্তানে ৬/৭টি কমিউনিষ্ট গ্রুপ ছিল। এদের কেউ কেউ একই আদর্শে বিশ্বাসী হলেও এরা এলাকা ভিত্তিক ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র দলে বিভক্ত ছিল। যেমন হক-তোহা, মতিন-আলাউদ্দিন, বাসার-দেবেন শিকদার, সিরাজ শিকদার, জাফর-মেনন গ্রুপ এভাবে এরা বিভক্ত ছিল। তন্মধ্যে জাফর-মেননের নেতৃত্বাধীন গ্রুপ ‘‘কমিউনিষ্ট বিপ্লবীদের পূর্ব বাংলা সমন্বয় কমিটি’’ ১৯৬৯ সন থেকেই পূর্ব বাংলার স্বায়ত্ব-শাসন ও স্বাধীনতার দাবী উত্থাপন করে আসছিল। ১৯৭০ সনের ২২শে ফেব্রুয়ারী ঐতিহাসিক পল্টন ময়দানে এক ছাত্র জনসভায় অনুরূপ দাবী উত্থাপনের দায়ে জাফর-মেননের স্থাবর-অস্থাবর সমস্ত সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত ও সাত বৎসরের সশ্রম কারাদন্ডের আদেশ হয়েছিল। কমিউনিষ্টদের এ গ্রুপটি কখনোই পূর্ব পাকিস্তানের অস্তিত্বে বিশ্বাসী ছিল না। এ গ্রুপটি জন্মলগ্ন থেকেই পূর্ব পাকিস্তানের পরিবর্তে ‘‘পূর্ব বাংলা’’ শব্দটি ব্যবহার করে আসছিল। এককালের বিজিএমইএ নেতা ও শিল্পপতি মোস্তফা গোলাম কুদ্দুসের নেতৃত্বে তৎকালীন ঢাকা-চট্টগ্রাম ট্রাংক রোডে ১৯৬৯ ও ৭০ সন জুড়ে অসংখ্যবার চিকা মেরেছিলাম ‘‘কৃষক শ্রমিক অস্ত্র ধর, পূর্ব বাংলা স্বাধীন কর’’। ভারতের তৎকালীন নক্সালবাড়ী আন্দোলন আমাদের ব্যাপকভাবে প্রভাবিত ও সশস্ত্র লড়াইয়ে উদ্বুদ্ধ করেছিল। তখন বিশ্বজুড়ে সমাজতান্ত্রিক আন্দোলনের প্রবল ঝড়ো হাওয়া বইতে শুরু করে। আর সেই উত্তাল সময়েই আমরাও ধাবিত হই স্বাধীনতা ও সমাজতন্ত্র তথা মুক্তির মোহনায়। মেননের সবকিছুই চৈনিক ছিল না। গণচীন আমাদের মহান স্বাধীনতা যুদ্ধে সমর্থন না দেয়ায় এটাকে চীনের ভুল রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত আখ্যায়িত করে চীনপন্থী হিসেবে পরিচিত জাফর-মেননের ‘‘কমিউনিষ্ট বিপ্লবীদের পূর্ব-বাংলা সমন্বয় কমিটি’’ আমাদের মহান মুক্তিযুদ্ধে সাংগঠনিকভাবে অংশগ্রহণ করেছিল। ভারতের মাটিতে তখন এদেশের বামপন্থীদের অবস্থান নিরাপদ ছিল না। এমনকি বামপন্থী মুক্তিযোদ্ধারাও। ভারতের বামপন্থীদের (বিশেষ করে সিপিএম) সাহায্য-সহযোগিতা না পেলে এ দেশের বামপন্থীদের ভারতে গিয়ে অবস্থান, প্রশিক্ষণ গ্রহণ বা মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ সূখকর হত না। আমাদের স্বাধীনতা আন্দোলনের অন্যতম বীর-পুরুষ মজলুম জননেতা মওলানা ভাসানীকে মুক্তিযুদ্ধের দিনগুলোয় রহস্যজনক কারণে ভারতের মাটিতে গৃহবন্দী হয়েই থাকতে হয়েছিল। আমাদের মুক্তিযুদ্ধ ভারতের নিকট কৌশলগত দিক থেকে গুরুত্বপূর্ণ ছিল যার সবটাই মানবিক ছিল না।
ইতিহাসের দীর্ঘ পথ-পরিক্রমায় অনেক ঘাত-প্রতিঘাতের মধ্য দিয়ে এ দেশের মুক্তিকামী মানুষ স্বাধীনতার মূলমন্ত্র ও চেতনায় উজ্জীবিত হয়েছিল। অবশেষে ৭১’এ সে মহান বিজয়গাঁথা রচিত হয়ে উদিত হয়েছে লাল সবুজের পতাকা এবং বেলাশেষে হাজার বৎসরের শ্রেষ্ঠ বাঙালী, স্বাধীনতার প্রাণ-পুরুষ বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকেই ইতিহাস স্বাধীনতার মহানায়কের মর্যাদায় অধিষ্ঠিত করেছে। তিনিই স্বাধীনতার স্থপতি। তবে এদেশের স্বাধীনতা ও মুক্তিকামী মানুষের লড়াই সংগ্রামের অনেক কীর্তি-কাহিনী ইতিহাসের পাতায় ঝাপসা হয়ে এলেও সব সত্য একদিন মাথাচাড়া দিয়ে উঠবে। সে দিনের অপেক্ষায় রইলাম।

অধ্যক্ষ মীর হারুন-উর-রশিদ
বীর মুক্তিযোদ্ধা
সভাপতি
বাংলাদেশ কলেজ শিক্ষক সমিতি (বাকশিস) কুমিল্লা।
মোবাইলঃ ০১৮৪২০৮৫৪৯১।