শুক্রবার ২০ জুলাই ২০১৮


অপরিকল্পিত ইজিবাইকে নগরীতে যানজট-দুর্ঘটনা, টাকা যাচ্ছে যার তার পকেটে!


আমাদের কুমিল্লা .কম :
02.11.2017

মাহফুজ নান্টু:

কুমিল্লা মহানগরীর প্রধান ও সংযোগ সড়কগুলোতে প্রতিদিনই সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত লেগে থাকে যানজট। এসব যানজটে প্রতিনিয়ত সৃষ্টি করছে জনদুর্ভোগ, অপচয় হচ্ছে কর্মঘন্টা। তবে এ নিয়ে কুমিল্লা সিটি কর্পোরেশন জেলা ও পুলিশ প্রশাসন বিভিন্ন অস্থায়ী পদক্ষেপ গ্রহণ করলেও স্থায়ী কোন সমাধান হচ্ছে না। প্রতিনিয়ত এমন যানজটে নাকাল হচ্ছে নগরবাসী।

কুমিল্লা সিটি কর্পোরেশনের লাইসেন্স কর্মকর্তা কাজী আতিকুর রহমান জানান, সিটি কর্পোরেশন হওয়ার পূর্বে কুমিল্লা পৌরসভা থাকাকালীন প্রায় ৩শ’ ব্যাটারিচালিত অটোবাইকের লাইসেন্স দেয়া হয়। পরবর্তীতে বিদ্যুতের অপচয়রোধে সরকার কর্তৃক ইজিবাইক আমদানি নগরীতে চলাচলের বিষয়ে নিষেধজ্ঞা জারি হয়। ওই ৩শ অটোবাইকের রেজিষ্ট্রেশন বাতিল করা হয়। তারপর থেকে আর কোন ইজিবাইকের রেজিষ্ট্রেশন দেয়নি সিটি কর্পোরেশন কর্তৃপক্ষ।
তবে কুমিল্লা মহানগরীতে এক শ্রেণীর অসাধু লোকজন আড়ালে আবডালে শত সহ¯্র ইজিবাইক আমদানী করে এবং তা চালকদের কাছে ভাড়ায় চালনার সুযোগ দেয়। এছাড়াও স্থানীয় কিছু লোকজন দেশীয় পদ্ধতি ব্যবহারের মাধ্যমে শুরু করে ইজিবাইক তৈরি ও বাজারজাত করা। এতে করে প্রয়োজনের অধিক ইজিবাইক নগরীর প্রধান ও ফিডার সড়কগুলোতে চলাচলের কারণে প্রতিনিয়ত তৈরি হচ্ছে যানজট।
ইজিবাইকের ধরপাকড়ে পুলিশের বাণিজ্য সৃষ্টি:
কুমিল্লা মহানগরীতে গত বছর ইজিবাইক চলাচলে জেলা ও পুলিশ প্রশাসনের নিষেধাজ্ঞা জারি হলে জেলা ট্রাফিক পুলিশের ইজিবাইকের ধরপাকড় বাণিজ্য শুরু হয়। তবে ট্রাফিক পুলিশকে ম্যানেজ করে চলছে নগরীতে ইজিবাইক চলাচল। গত মার্চ মাসে আবদুল সোবহান নামে এক ব্যাক্তির ইজিবাইক কান্দিরপাড় থেকে আটক করে ট্রাফিক পুলিশের সদস্য। পরে তিনি ২২শ’ টাকায় পুলিশ লাইনস থেকে বাইকটি ছাড়িয়ে আনেন। তবে এসব অভিযোগ অস্বীকার করেন ট্রাফিক পুলিশ।
ইজিবাইক চুরি ও ইজিবাইকের দুর্ঘটনার হার বাড়ছে: কুমিল্লা মহানগরীতে অতিরিক্ত এবং অপরিকল্পিতভাবে ইজিবাইক চলাচলের কারণে গত তিন বছরে সবচেয়ে বেশী দুর্ঘটনা ঘটেছে। গত বছর স্টেশন রোড এলাকায় বেপরোয়া গতির কারণে যাত্রী সমেত উল্টে যায় একটি ইজিবাইক। এতে কানাইন লাল দত্ত ও আফসানা নামে দুজন শিক্ষার্থী মারাত্মক আহত হয়। এছাড়াও এসব ইজিবাইকের চালকগুলোর মধ্যে অপ্রাপ্ত বয়স্কদের হার বেশী। ফলে ট্রাফিক সিগনাল না বুঝে তাদের চলাচলেও বাড়ছে যানজট। এছাড়াও ইজিবাইক চুরি ঘটনাও বাড়ছে। গত পনের দিন আগে নগরীর রানীর বাজার,চকবাজার স্টেশন রোড এলাকায় অন্তত ১২টি ইজিবাইক চুরি করে নিয়ে যায় দুর্বৃত্তরা। রেজিষ্ট্রেশন না থাকার কারণে পুলিশ এসব ইজিবাইক উদ্ধার করতে পারছেনা। তবে যত যাই হোক নি¤œ আয়ের মানুষজন বিভিন্ন এনজিও থেকে ক্ষুদ্র ঋণ নিয়ে কেনা তাদের আয়ের একমাত্র উৎস হারিয়ে পথে বসার উপক্রম হচ্ছে। আর এসব ইজিবাইক রেজিষ্ট্রেশনবিহীন থাকার কারণে কারো কাছে অভিযোগও করতে পারছেনা।
পরিকল্পনার অভাবে রাজস্ব হারাচ্ছে সরকার: বেসরকারি জরিপের সূত্র অনুযায়ী কুমিল্লা মহানগরীতে প্রতিদিন গড়ে অন্তত সাড়ে ৬ হাজার ব্যাটারি চালিত অটোবাইক চলাচল করে। এসব অটোবাইক থেকে ১০ জন নেতা সরকার ও বিরোধী দলীয় নেতারা তাদের দলীয় পদ পরিচয় ব্যবহার করে প্রতিদিন এসব ইজিবাইক থেকে ৩০-৫০ টাকা হারে চাঁদা আদায় করেন বলে অভিযোগ রয়েছে। শুধুমাত্র রেজিষ্ট্রেশন না থাকার কারণে ইজিবাইকের চালকরা এসব চাঁদা দিতে বাধ্য হচ্ছে। যদি নগরীর ভেতর নির্দিষ্ট পরিমাণ অটোবাইক একটি পরিকল্পনার মাধ্যমে চলাচলের অনুমতি দেয়া হত তাতে সাধারণ নগরবাসী যানজট থেকে মুক্তি পেত সরকারও রাজস্ব পেত।
ইজিবাইক নিয়ে সিটি কর্পোরেশন জেলা-পুলিশ প্রশাসনের বক্তব্য: অপরিকল্পিত ইজিবাইক চলাচল ও যানজটের বিষয়ে কুমিল্লা সিটি কর্পোরেশনের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা অনুপম বড়–য়া জানান,আসলে ইজিবাইক সর্ম্পকিত সমস্যা সমাধানের বিষয়ে আদৌ কোন সিদ্ধান্ত নেয়ার কোন পদক্ষেপ নেই সিটি কর্পোরেশনের। কারণ বাহনটি সরকার কর্তৃক অবৈধ। এখন হঠাৎ করে এসব ইজিবাইক চলাচলে সিটি কর্পোরেশন কঠোর সিদ্ধান্তে উপনীত হলে তার আগে এসব ইজিবাইক চালকগুলোকে পুনর্বাসনের সুযোগি তৈরি করে দিতে হবে। তার আগেও আমাদের বুঝতে হবে সিটি কর্পোরেশন এককভাবে এসব যানবাহনের ব্যাপারে সিদ্ধান্ত নিতে পারেনা। এ জন্য সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের পরিপত্র জারি হওয়া জরুরি। এতকিছুর পরেও ইজিবাইক কেন নগরীর প্রধান সড়কগুলোতে দাপিয়ে বেড়ায় এতে করে রাজস্ব হরাচ্ছে সরকার। যদি ইজিবাইকগুলোকে একটা ফরমেটের আওতায় আনা যেত তাহলে সরকারের রাজস্ব বৃদ্ধি পেত। এখন আসলে সরকারি নির্দেশনার বাইরে কিছু করার সুযোগ নেই সিটি কর্পোরেশনের।
তবে কুমিল্লা পুলিশ সুপার মো:শাহ আবিদ হোসেন জানান ভিন্ন কথা। তিনি বলেন, সিটি কর্পোরেশনের ট্রান্সপোর্টেশনের কোন নিয়ম নীতি না থাকাসহ সড়কগুলো সংস্কারহীন থাকার কারণে যানজট ও দুর্ঘটনা বাড়ছে। এছাড়াও নগরীতে নেই কোন গণপরিবহন ব্যবস্থা। আর এসবের ফলে ইজিবাইক চলাচল ও জনদুর্ভোগ সৃষ্টি নিয়ে জেলা পুলিশের কিছু করার নেই। এ সমস্যা থেকে উত্তোরণের জন্য জেলা প্রশাসন সিটি কর্পোরেশনসহ সংশ্লিষ্ট সকলকে মিলে একটা সুন্দর উপায় খুঁজে বের করতে হবে।
তবে জেলা প্রশাসক মো:জাহাংগীর আলম বলেন, বাংলাদেশ রোড ট্রান্সপোর্ট অথরিটির মটর বেহিকেল অধ্যাদেশ অনুযায়ী ইজিবাইক কোন বাহনের আওতায় পড়ে না। যেহেতু ইজিবাইক কোন বাহনের আওতায় পড়েনা, সেহেতু এতে রাজস্ব বৃদ্ধির কোন উপায় নেই। আর তারচেয়ে বড় কথা হলো স্থানীয় রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দদেরকে এ বিষয়ে সবচেয়ে বেশী সচেতন হতে হবে। আর সিটি কর্পোরেশন চাইলে ইজিবাইক বন্ধে সিভিল প্রশাসন থেকে সহযোগিতা করা হবে। কিন্তু কোন সুনির্দিষ্ট সিদ্ধান্ত হঠাৎ করে ইজিবাইক বন্ধ করা হলে ইজিবাইক চালকরা কি করবে,তাদের পুনর্বাসন না করা হলে ইজিবাইক চালকদের পরিবারগুলো অসহায় অবস্থায় পড়বে। তখন তাদের জন্য কি করবে প্রশাসন এমন প্রশ্নের উত্তরে জেলা প্রশাসক মো:জাহাংগীর আলম বলেন,নগরীতে হঠাৎ করেই ইজিবাইক চলাচল শুরু হয়নি। আর যারা গ্রামে ইজিবাইক চালায় তাদের বিষয়ে প্রশাসনের কোন নজরদারী নেই। শুধুমাত্র নগরীতে যেন ইজিবাইক চলাচল না করে সে বিষয়টাকে প্রতিষ্ঠিত করতে হবে। যারা এখন নগরীতে ইজিবাইক চালায় তারা গ্রামে পুনর্বাসিত হবে। কারণ আইনের উর্ধ্বে আমরা কেউ না এ বিষয়টা মনে রাখতে হবে। তবে এ সমস্যা সমাধানে সিটি কর্পোরেশন সিভিল প্রশাসন ও পুলিশ প্রশাসনের সমন্বয়টা খুব জরুরি।