মঙ্গল্বার ২১ নভেম্বর ২০১৭


ভালোবাসার রঙ নীল


আমাদের কুমিল্লা .কম :
07.11.2017

নীলার অলস সময় আর কাটেনা। সাজিদের আজ ফিরতে দেরী হবে। বিয়ের চার বছর পার হলেও তাদের কোল জুড়ে এখনও কোনো সন্তান আসেনি। বিশ্ববিদ্যালয়ের সহপাঠী সাজিদকে ভালোবেসে বিয়ে করেছিলো। অথচ এখন আর নীলার ভালোবাসা যেনো সাজিদকে ছুঁতে পারেনা। ধীরে… খুব ধীরে… তাদের ভালোবাসার স্বতঃস্ফূর্ততায় কে যেনো কালিমা লেপন করছে।
নীলা চাকুরী করতে চাইলে সাজিদের জবাব ছিলো এমনি —-” আমার বাবা- মা চাকুরীজীবী বউ পছন্দ করেনা। তুমি শুধু আমার লক্ষী বউ হয়ে থাকবে এবং সংসার সামাল দেবে। আমি, তুমি আর আমাদের সন্তান মিলে বাঁধবো ভালোবাসায় টইটুম্বুর ঘর। ”
আহ্! কি অপার্থিব সেই অনুভূতি!! ভালোবাসা আর ভালোবাসা!! তার মত সুখ জীবনে কজনা পেয়েছে। তার হ্যান্ডসাম সাজিদ! সাজিদকে ছাড়া তার জীবন অচল।
কিন্তু বিধিবাম!! বিয়ের এক বৎসরের মাথায় অনুভূতির আলোর স্ফুরনে অজানা এক কালোছায়া পড়ছিলো। হৃদয়ের আকুতি আর ভারমুক্ত হতে পারছেনা। সব অভিব্যক্তিগুলো কেবলি ম্লান হয়ে যাচ্ছিলো।
সাজিদের খালি ব্যস্ততা আর ব্যস্ততা। অনেক রাতে বাসায় ফেরা। তারপর ল্যাপটপ নিয়ে বসে থাকা।
এনজিও-তে চাকুরী কি এমন???
নীলা বিরক্ত। সাজিদের তার জন্য কোনো সহানুভূতি নেই। তার একাকীত্বের যন্ত্রণার প্রতি কোনো ভ্রুক্ষেপ নেই। সন্তান নেওয়ার ব্যাপারে ডাক্তার দেখানো— এ ব্যাপারেও কোনো তৎপরতা নেই। অথচ সাজিদ ফুরফুরে — কি করে সম্ভব?? নীলাকে এসব খুব ভাবায়। আগে দুপুরে একসাথে খেতে না পারলেও রাতের খাবার একসাথে খেতো। আজকাল রাতের খাবারও বাইরে খেয়ে আসে।
খালি অফিস! অফিস! আর অফিস!!
এ কেমন জীবন শুরু হলো নীলার?? রুচিশীল, সুন্দরী নীলা স্বভাবে শান্ত, ভদ্র।
উচ্চ- বাচ্য করা তার স্বভাব বিরুদ্ধ। অবশেষে সময় কাটানোর জন্য সাজিদের মতো অনলাইনে সক্রিয় হলো। কিন্তু এখানেও সে আনন্দ খুঁজে পেলোনা। প্রকৃতপক্ষে সাজিদই তার আনন্দ। সে সাজিদকে নিয়ে মাতোয়ারা থাকতে চায়।
নীলারা কখনোই নৈতিকতার দরজার ছিটকিনি খুলে নিজেকে বিলীন করে দিতে পারেনা!
মাঝে মাঝে নীলা নিজেকেই নিজে শান্ত¡না দেয়। সাজিদের যতখানি ব্যস্ততা
তার উপরে নীলা যদি চাকুরী করতো তাহলে সংসারের ভারসাম্য টিকিয়ে রাখা মুশকিল হতো। সন্তান হচ্ছেনা— সেটা হয়তো দূর্ভাগ্য। পৃথিবীতে বহু নিঃসন্তান দম্পতি আছে।
আসলে নীলা এখন চরমভাবে সাজিদের সঙ্গ চায়, ভালোবাসা চায়। দিনকে দিন তার ভেতরের হাহাকার বেড়েই চলছে। শূণ্যতা তাকে আষ্টে- পৃষ্ঠে জড়িয়ে ধরছে। সাজিদ তার রুমেই গভীর রাত পর্যন্ত ল্যাপটপে কাজ করে।
প্রতি ভোরে নীলা ঘুম ভাঙ্গলে তার ভালোবাসার মানুষটির নিঃসাড় ঘুমন্ত চেহারাটা দেখে। গভীর মমতা, প্রচন্ড ভালোবাসা ও আবেগ নিয়ে
সাজিদকে জড়িয়ে ধরতো। মাঝে মাঝে সাড়া মিলতো; তবে ইদানীংমনে হয় তার প্রিয়তমের সাড়াটা দায়সারাগোছের। অগত্যা একরাশ বিষন্নতা নিয়েই প্রতি ভোরে নীলাকে বিছানা ছাড়তে হয়।
আজ পুরো বিকেল জুড়েই ছিলো কালবৈশাখীর তান্ডব। সন্ধ্যা থেকে ঘ্যান
ঘ্যান বৃষ্টি। সাজিদরা দোতলায় থাকে। পাশের খালি জায়গায় এখনো বিল্ডিং উঠেনি। কচু, হেলেঞ্চা আর নানারকম ভেষজ গাছে ভরপুর। নীলার রুমের সাথেই লাগোয়া বারান্দা। দরজা খুলতেই হিমেল বাতাসের ছোঁয়া।
আহ্! কি ঠান্ডা আবেশ….!!
ব্যাঙ আর ঝিঁ ঝিঁ অবিরাম ডেকেই চলেছে। সেই সাথে গুঁড়ি গুঁড়ি বৃষ্টি!!
অদ্ভূত এক দুঃখ ভরা বিলাস এবং ভালোলাগায় আচ্ছন্ন হলো নীলার মন!
মনে পড়ে গেলো ছোট্ট নীলার মায়ের কাছের সেই প্রথম পাঠের বুলি…..
ক– কাক ডাকে বাঁশের বনে।
খ– খোকা পড়ে ঘরের কোনে।
সেই ঘর, সেই ঘরের কোন, সেই কাকের ডাক, সেই বাঁশঝাড়— শৈশবের সেই ভাবালুতা আজিকার এই মেঘঘন রাতে তাকে খুব বেশি নস্টালজিক করে তুলেছে।
হঠাৎ সে আনমনে আওড়ানো শুরু করলো অচিন্ত্যকুমার সেনগুপ্তের সেই কুটির কবিতা….
” ঝিকিমিকি দেখা যায় সোনালি নদীর,
ওই খানে আমাদের পাতার কুটির।
এলোমেলো হাওয়া বয়,
সারাবেলা কথা কয়,
কুটিরের কোল ঘেঁষে একটু উঠোন,
নেচে নেচে খেলা করি ছোট দুটি বোন। ”
এই “কুটির” তাকে এতোটাই আন্দোলিত করে যে, সে বারবার মনে মনে কুটিরের সেই দুবোনের সাথে তাদের উঠোনে হারিয়ে যায়।
হায় শৈশব!! আবার যদি ফিরে পাওয়া যেতো!!
বিশ্ববিদ্যালয়ে সাজিদকে নিয়ে কল্পনাটা
ছিলো অন্যরকম। জোৎস্না রাতে ছাদে বসে দুজন দুজনকে উপলব্ধি কিংবা প্রচন্ড বৃষ্টিতে দুজনে ভিজে একাকার। ভালোবাসায় সিক্ত দুটি মন ভিজে একাকার হয়ে যাওয়ার সেই কল্পনা কল্পনাই থেকে গেলো।
কল্পনার জীবন ভালোবাসার ঝড়ে যত উন্মাতাল হোক না কেনো বাস্তবতা নীলার জন্য তার সিকিভাগ ভালোলাগার অনুভূতিও বয়ে আনতে পারেনি।
এবার জোরে বৃষ্টি এলো! নীলা ভেতরে এলোনা! বৃষ্টিস্নাত নীলা আজ বৃষ্টির সাথেই মিতালী পাতাতে চায়! আকাশের ঐ কান্না যেনো তারই কান্না। এক সমুদ্র অভিমান আর চাপা কষ্ট নিয়ে কখন চোখগুলো সিক্ত হয়ে উঠেছে।
হায় জীবন! নাহ্!! সে বৃষ্টি থেকে চোখের জল লুকোবেনা।
কার জন্য লুকোবে??
তার কান্না দেখার যে কেউ নেই!!
বৃষ্টির জল আর চোখের জল ধুয়ে মুছে একাকার হয়ে যাক!!
কলিং বেল বেজে উঠলো। সাজিদ ফিরেছে। চিরকালের ভদ্র নীলা চোখ মুছে, নিজেকে ঠিকঠাক করে ধীর ভঙ্গীতে দরজা খুললো।
নিত্যদিনের মতই যথারীতি সাজিদ ল্যাপটপে এবং নীলা একাই বিছানায়।
ভোরে ঘুম ভাঙ্গলে নীলা অভ্যাসবশে সাজিদকে খুঁজে। অবাক ব্যাপার! আজ সাজিদ বিছানায় নেই।
কি ব্যাপার??
উঠে এগিয়ে গিয়ে দেখলো সাজিদ ফোনে কথা বলছে। নীলা বুঝলো পারিবারিক কোনো ঝামেলা নিয়েই কথা বলছে।
কেনো জানি নীলা আবার বিছানায় এসে শুয়ে পড়লো। চোখে এখনো ঘুম ঘুম ভাব।
হঠাৎ সাজিদ যে মোবাইলে ফেসবুক চালায় সেটি নীলার চোখে পড়লো। আলো জ্বলে উঠায় সে মোবাইলটি হাতে নিলো। মোবাইল ডাটা অন। বুঝলো সাজিদ ভুলবশতঃ মোবাইল ডাটা অফ করেনি।
ওমা…….!!!
এক অনিন্দ্য সুন্দরীর ছবির লোগো এবং মেসেজ!!
কি মনে করে ওপেন করলো মেসেজ!!
তারপর…?? তারপর….??? তারপর….??
তার আর পর নেই!!
নীলা একটি গভীর অন্ধকার কূপে তলিয়ে যেতে থাকলো।
না….!! না…!! না…!!
সে যা দেখেছে তা সত্যি নয়।
তার সাজিদ এমন করতে পারেনা।
শয়তান ছাড়া কেউ এমন করতে পারেনা।
ভদ্র নীলা আজ আর ভদ্র নয়। মোবাইল নিয়ে সাজিদকে এক ধাক্কায় সোফায় ফেলে দিলো।
দাঁত খিঁচিয়ে বললো — “এই নগ্ন ছবি কার?? ”
……”তুমি এই মেয়ের সাথে কতদিন
ধরে এসব করছো??”
……”তোমার এতো খারাপ ছবি তুমি কি করে পাঠালে?”
…..”তুমি কি জানোয়ার??”
……”তুমি কি পশু?? ”

বঞ্চিত নীলা আজ উন্মাদ। সাজিদ তাকে শান্ত করার চেষ্টা করেও আবার চুপ হয়ে গেলো। নির্বাক সাজিদ!! ভাষাহারা সে!!
তারপর নীলা কাঁদলো। অনেক কাঁদলো।
সাজিদ আজ বিকেলেই বাসায় চলে আসলো। দেখে দরজায় তালা ঝুলছে। তারপর ড্রইং রুমের কফি টেবিলে একটা চিরকুট পায়।
তাতে লেখা—-
“আমার ভালোবাসার সাজিদ মরে গেছে। তাইতো তার নীলা অনিশ্চিতের
পথে পা বাড়ালো। এই খেলুড়ে সাজিদ তার নয়!”
চিরকুটটি নিয়ে সাজিদ সোফায় বসে পড়লো। শুধু ঘরটাই খালি লাগছেনা;
যেনো পুরো পৃথিবীটাই আজ খালি।
একি!! তার ভেতরটা এরকম হু হু করছে
কেনো??
যেমন করেই হোক সে নীলাকে ফিরিয়ে আনবে!!
এক সমুদ্র অনুতাপ সাজিদকে গ্রাস করলো!!
সেই সাথে অনুধাবন করলো, জীবনে ভালো থাকার উপায় সঙ্গী বা সঙ্গিনীর প্রতি বিশ্বস্ততা!!

………..লেখিকাঃ মেহেরুন্নেছা
অধ্যাপিকা, উদ্ভিদবিদ্যা বিভাগ,
কুমিল্লা ভিক্টোরিয়া সরকারি কলেজ।