শনিবার ১৬ ডিসেম্বর ২০১৭
  • প্রচ্ছদ » sub lead 2 » বঙ্গবন্ধুর ভাষণের প্রাপ্য সম্মান ইউনেস্কো দিয়েছে- আহমদ আলী


বঙ্গবন্ধুর ভাষণের প্রাপ্য সম্মান ইউনেস্কো দিয়েছে- আহমদ আলী


আমাদের কুমিল্লা .কম :
25.11.2017


তৈয়বুর রহমান সোহেল।। বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের ভাষণ সম্প্রতি ইউনেস্কো কর্তৃক স্বীকৃতি পেয়েছে। বঙ্গবন্ধুর ভাষণ স্বীকৃতি পাওয়ায় কুমিল্লাসহ সারাদেশে আনন্দ র‌্যালি ও নানা কর্মসূচি পালিত হচ্ছে। এ উপলক্ষে শনিবার কুমিল্লা জেলা ও পুলিশ প্রশাসনের পক্ষ থেকে বর্ণাঢ্য আয়োজন করা হয়েছে। জাতির জনকের ৭ মার্চের ভাষণের ইতিবৃত্ত, পূর্ব ও পরের বিভিন্ন বিষয় নিয়ে স্মৃতিচারণ করেছেন বঙ্গবন্ধুর ঘনিষ্ঠ সহচর, ভাষাসৈনিক ও বীরমুক্তিযোদ্ধা-জীবন্ত কিংবদন্তি অ্যাডভোকেট আহমদ আলী।
শুক্রবার সকালে কুমিল্লা নগরীর বাগিচাগাঁও স্মৃতি কুটিরে কথা হয় তাঁর সাথে। এসময় ৭১-এর স্মৃতি হাতড়াতে হাতড়াতে তিনি বলেন, ১৯৭১ সালের ৬ মার্চ বঙ্গবন্ধুর বাসার ছাদে ৭ মার্চের ভাষণ কী হবে তা নিয়ে কার্যকরী কমিটির সদস্যদের নিয়ে একটি বৈঠক বসে। তখন আমি কেন্দ্রীয় আওয়ামী লীগের সদস্য। রাত বারোটা পর্যন্ত চলে ওই বৈঠক, কিন্তু ৭ মার্চের ভাষণ কী হবে তার কোনো সুরাহা হয়নি। বৈঠকে নেতাকর্মীরা বিভিন্ন বক্তব্য রাখেন, আমিও বক্তব্য রাখি। একপর্যায়ে কার্যকরী কমিটি দুইটি দলে বিভক্ত হয়ে পড়ে। এক পক্ষের জোরালো মত ছিল বঙ্গবন্ধু ৭ মার্চ স্বাধীনতার ঘোষণা দেবেন, অন্যপক্ষের মত ছিল স্বাধীনতা ঘোষণা দেওয়া যাবে না। তাদের দাবি ছিল স্বাধীনতা ঘোষণা দিলে তারা বিচ্ছিন্নতাবাদী হয়ে পড়বেন। বঙ্গবন্ধু ওইদিন সভায় সভাপতিত্ব করলেও তিনি শুধু শুনেছেন, কিন্তু কোনো কথা বলেননি। আমরা যে যার মত প্রকাশ করেছি। পরেরদিন আমার কাছে বহু মানুষ জানতে চায় বঙ্গবন্ধু স্বাধীনতার ঘোষণা দেবেন কিনা-আমি বলেছি তাঁর সিদ্ধান্ত তিনিই নেবেন।
আহমদ আলী বলেন, ৭ মার্চের ভাষণে কুমিল্লার দেবিদ্বারের একজনের অবদান আছে। তিনি হলেন আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলার দুই নং আসামি সিএসপি অফিসার আহমেদ ফজলুর রহমান। পরে প্রমাণস্বরূপ তিনি বলেন, ৭ মার্চ সকালে আমি ও ইঞ্জিনিয়ার আব্দুর রশীদ আহমেদ ফজলুর রহমানের বাসায় যাই। এসময় তাঁর মেয়ে আমাদের ঘরের ভেতরে ডেকে পাঠান। ভেতরে গিয়ে হঠাৎ দেখতে পাই বঙ্গবন্ধুকে! এসময় তাঁর ও আহেমদ ফজলুর রহমানের হাতে একগুচ্ছ কাগজ দেখতে পাই। যেহেতু তিনি আগেরদিন ৭ মার্চের ভাষণ সম্পর্কে কিছু বলেননি সেহেতু খুব সহজেই অনুমান করা যায় তিনি আহমেদ ফজলুর রহমানের সাথে আলোচনা করে বা কিছুটা পরামর্শ করেই ভাষণের বিষয়ে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছেন।
৭ মার্চের ভাষণের দিন তিনি বঙ্গবন্ধুর পাশেই মঞ্চে দাঁড়ানো ছিলেন। ভাষণ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, এটা নেহায়েত কোনো রাজনৈতিক বক্তব্য ছিল না, এটা ছিল কবিতা। বাঙালি জাতিকে উজ্জীবিত করার কবিতা। ৭ মার্চের ভাষণই বাঙালি জাতির স্বাধীনতা। আমরা ৬ মার্চ রাতে বৈঠকে যে আলাপ-আলোচনা করেছি, তার বিন্দুমাত্র প্রতিফলন ঘটেনি এ ভাষণে। তিনি সম্পূর্ণ নিজস্ব ভঙ্গিতে ও রাজনৈতিক দূরদর্শিতায় তাঁর বক্তব্য উপস্থাপন করেছেন। ওইদিন পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর যে কড়া অবস্থান ও আকাশপথে টহল ছিল, পরোক্ষভাবে স্বাধীনতার ঘোষণা না দিয়ে সরাসরি স্বাধীনতার ঘোষণা দিয়ে দিলে হয়তো রেসকোর্স ময়দানে সমবেত কেউই জীবিত ঘরে ফিরতে পারতো না। পাকিস্তানি বাহিনীর কড়া টহলের বিষয়ে তিনি বলেন, একটি গুজব ছিল যে ৭ মার্চ স্বাধীনতার ঘোষণা দেয়া হবে। তাই পাকিস্তানি বাহিনীও সুদৃঢ় অবস্থান নেয়।
তিনি বলেন, বঙ্গবন্ধুর ভাষণ বিশ্ব স্বীকৃতি পাওয়ার যোগ্য এবং সে সম্মানটুকুই ইউনেস্কো দিয়েছে। আপসোস, এ মহান নেতাকে মীরজাফরের বংশধর খুনি মোশতাকরা বাঁচতে দেয়নি।
সশস্ত্র বাহিনী দিবস সম্পর্কে তিনি বলেন, পত্রিকার মাধ্যমে আজ দেখি সশস্ত্র বাহিনী দিবসের সঠিক ইতিহাস সম্পর্কে কোনো আলোচনাই নেই। অথচ বাংলাদেশই একমাত্র রাষ্ট্র যেখানে সশস্ত্র বাহিনী দিবস পালন করা হয়। সেদিন তাজউদ্দিন আহমেদের অনস্বীকার্য ভূমিকার কথা সবাই ভুলে গেছে।
বয়সের ভারে ন্যূব্জ এ রাজনীতিবিদ অত্যন্ত আক্ষেপ করে বলেন, আমি আজ আপাংতেয়-অজিজ্ঞাসু। বঙ্গবন্ধু কুমিল্লা হয়ে যেকোনো স্থানে যাত্রাপথে আমার বাড়িতে থাকতেন, কখনো বেশি রাত হয়ে গেলেও তিনি আমার বাসায় চলে আসতেন। তাই আমার বাসার নাম রেখেছি স্মৃতি কুটির। ৭ মার্চ পর্যন্ত কুমিল্লার একমাত্র প্রতিনিধি আমিই ছিলাম যে বঙ্গবন্ধুর সাথে একান্তে সময় কাটিয়েছি। পরবর্তীতে কাজী জহিরুল কাইয়ুম আমার সাথে যুক্ত হয়। অথচ আজ কেউ আমার খবর রাখে না। কুমিল্লায় কোনে প্রোগ্রাম হলে আমি কোনো খবর পাই না। আমি শয্যাশায়ী, বার্ধক্যের কারণে কোথাও যাওয়ার শক্তি হারিয়ে ফেলেছি। কেউ আমাকে কোথাও ডাকলো কি ডাকলো না, তাতেও আমার কিছু যায় আসে না। তাই বলে কুমিল্লায় আমাকে প্রাপ্য সম্মানটুকুও কেউ দেবে না! তাই মৃত্যুর পূর্বে আমি বাড়ির নামের সাথে বি-প্রত্যয় যোগ করে ‘বিস্মৃতি কুটির’ নামকরণ করে যাবো।

 

মাসুদ আলম/আমাদের কুমিল্লা