শনিবার ১৬ ডিসেম্বর ২০১৭


২০ জনকে সারিবদ্ধভাবে দাঁড় করে ব্রাশফায়ার


আমাদের কুমিল্লা .কম :
04.12.2017


শাহীন আলম দেবিদ্বার।। আজ ৪ ডিসেম্বর। কুমিল্লার দেবিদ্বার হানাদার মুক্ত দিবস। ১৯৭১ সালের রক্তঝরা এই দিনে মুক্তি ও মিত্র বাহিনীর যৌথ আক্রমণে পাক হানাদার বাহিনীকে পরাস্ত করে মুক্ত করা হয় দেবিদ্বারকে। স্বাধীনতা ঘোষণার মাত্র ৫ দিনের মধ্যে (অর্থাৎ ৩১ মার্চ) কুমিল্লা-সিলেট মহাসড়কে বি-বাড়িয়া থেকে কুমিল্লা সেনানিবাসে (তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের প্রধান সেনা ছাউনি) পায়ে হেঁটে গমনকারী আধুনিক অস্ত্রে সুসজ্জিত ১৫ জনের একটি হানাদার দল ভোরে দেবিদ্বার উপজেলার ভিংলাবাড়ি স্থানে জনতা কর্তৃক প্রথম অবরুদ্ধ হয়। এ যুদ্ধে ৩৩ জন বাঙালি শহীদ হন। ৬ সেপ্টেম্বর পাক হানাদারদের সঙ্গে সম্মুখ যুদ্ধে দেবিদ্বারের বারুর গ্রামের মুক্তিযোদ্ধা মো. জয়নাল আবেদীন, বাচ্চু মিয়া, শহিদুল ইসলাম, আলী মিয়া, আ.সালাম, সফিকুল ইসলাম, মো. হোসেনসহ ৭ জন শহীদ হন।
মুক্তিযুদ্ধে পাক হানাদারের বর্বরতার নির্মম স্বাক্ষর দেবিদ্বারের ‘গণকবর’। ১৭ সেপ্টেম্বর শক্র সেনারা মুরাদনগরের রামচন্দ্রপুরসহ বিভিন্ন এলাকা থেকে ২০ বাঙালিকে ধরে এনে দেবিদ্বার উপজেলা সদরের প্রাথমিক শিক্ষক সমিতির সামনে গর্ত খুঁড়ে সারিবদ্ধভাবে দাঁড় করিয়ে ব্রাশফায়ার করে নির্মমভাবে হত্যা করে। এঘটনায় ভাগ্যক্রমে একজন বেঁচে গেলেও বাকি ১৯ শহীদকে সেখানে মাটি চাপা দেয় পাকবাহিনী। দীর্ঘ দিন ধরে ওই স্থানটি অবহেলিত ও দখলে থাকলেও দেবিদ্বার প্রেসক্লাব ও উপজেলা প্রশাসনের উদ্যোগে এর আংশিক স্থানদখল মুক্ত করে ‘গণকবর’ স্মৃতি ফলক লাগানো হয়েছে।
একাত্তরের ৩ ডিসেম্বর মুক্তিবাহিনী ও মিত্রবাহিনী যৌথভাবে হানাদারদের বিরুদ্ধে আক্রমণ পরিচালনা করে। এইদিন মুক্তিবাহিনী কুমিল্লা-সিলেট মহাসড়কের কোম্পানীগঞ্জ ব্রিজটি মাইন বিষ্ফোরণে উড়িয়ে দেয়। মিত্র বাহিনীর ২৩ মাউন্টেড ডিভিশনের মেজর জেনারেল আরডি বিহারের নেতৃত্বে এ অভিযান পরিচালিত হয়। মিত্র বাহিনীর একটি ট্যাংক বহর বুড়িচং ও ব্রাক্ষণপাড়া হয়ে দেবিদ্বার আসে। পাক হানাদাররা এ রাতে পিছু হটে এবং দেবিদ্বার ছেড়ে কুমিল্লা সেনা ছাউনিতে পালিয়ে যায়।
ধীরে ধীরে মুক্তিবাহিনী সেনা ছাউনির দিকে অগ্রসর হতে থাকে। মিত্র বাহিনীর ট্যাংক বহরটি দেবিদ্বার থেকে চান্দিনা হয়ে ঢাকা অভিমুখে রওনা হলে মোহনপুর এলাকায় ভুল বুঝাবুঝির কারণে দুই মিত্র গ্রুপে গুলি বিনিময়কালে ৬ মিত্র সদস্য নিহত হন। এভাবেই ৪ ডিসেম্বর দেবিদ্বার শত্রুমুক্ত হয় এবং উল্লাসিত জনতা স্বাধীন বাংলার লাল সবুজের পতাকা নিয়ে বিজয়ের আনন্দে মেতে উঠেন। দিবসটি যথাযোগ্য মর্যাদায় পালনের জন্য স্থানীয় প্রশাসন ও মুক্তিযোদ্ধা সংসদসহ বিভিন্ন সংগঠনের পক্ষ থেকে কর্মসূচি গ্রহণ করা হয়েছে।
ঢাকাসহ বিভিন্ন এলাকার মুক্তিযোদ্ধা এবং রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দদের ভারত সীমান্ত পারাপারে একমাত্র সহজ ও নিরাপদ এলাকা ছিল দেবিদ্বার। মুক্তিযোদ্ধাদের যুদ্ধ প্রশিক্ষণ দিতে উপজেলার ফতেহাবাদ গ্রামের জমাদ্দার বাড়ি সংলগ্ন ‘নলআরা’(গভীর জঙ্গল) এবং প্রবাসী সরকারের উপদেষ্টাম-লীর একমাত্র জীবিত সদস্য ন্যাপ প্রধান অধ্যাপক মোজাফ্ফর আহমেদের নিজ বাড়ি এলাহাবাদ গ্রামে আরো ১টি অস্থায়ী মুক্তিযুদ্ধ প্রশিক্ষণ ক্যাম্প প্রতিষ্ঠা করা হয়। পাশাপাশি শুভপুর গ্রামেও আরো একটি স্যাটেলাইট মুক্তিযোদ্ধা প্রশিক্ষণ ক্যাম্প প্রতিষ্ঠা করা হয়।
এসব অস্থায়ী যুদ্ধ প্রশিক্ষণ ক্যাম্পে প্রাথমিক যুদ্ধ প্রশিক্ষণসহ যাচাই-বাছাই করে মুক্তিযোদ্ধাদের ভারতের বিভিন্ন প্রশিক্ষণ ক্যাম্পে পাঠানো হতো। মুক্তিযোদ্ধাও এ অঞ্চলে ছিল অনেক বেশি। বাংলাদেশে মুক্তিযোদ্ধাদের তালিকায় দ্বিতীয় বৃহত্তম এলাকা দেবিদ্বার। বিগত আ.লীগ সরকারের আমলে ‘নলআরা’(গভীর জঙ্গল) এর অস্থায়ী প্রশিক্ষণ ক্যাম্পে একটি স্মৃতিফলক এবং এলাহাবাদ গ্রামে প্রশিক্ষণ ক্যাম্পের স্মৃতি রক্ষার্থে ‘চেতনায় মুক্তিযুদ্ধ বাংলাদেশ’ নামে একটি মুক্তিযুদ্ধ যাদুঘর নির্মাণ এবং হায়ানাদের নির্মম হত্যাযজ্ঞের স্বাক্ষর উপজেলা সদরের ১৯ শহীদের গণকবরে স্মৃতিফলক নির্মাণ এবং পোনরা চৌরাস্তার মোড়ে পাক হায়ানাদের সম্মুখ সমরে শহীদ আবু বকরের কবর পাকাকরণ করা হয়।
স্বাধীনতা সংগ্রামে হানাদার বাহিনীর নৃশংস হত্যাযজ্ঞের তা-ব হয়নি এমন গ্রাম দেবিদ্বারে নেই। অন্যান্য অঞ্চলের চেয়ে এ অঞ্চলটি ছিল অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। তার পরেই ছিল ভারতের সীমান্তবর্তী এলাকা ব্রাক্ষণবাড়িয়ার কসবা অঞ্চল। তাছাড়া পাক সেনাদের সাথে সম্মুখসমরেও পিছিয়ে ছিল না এ অঞ্চল। বরকামতা যুদ্ধে ৫ পাক শত্রুসেনা নিহত, ভানী এলাকার যুদ্ধে ৭ পাক শত্রুসেনা নিহত, বারুর সম্মুখ যুদ্ধে ৬ মুক্তিযোদ্ধা শহীদ, মহেশপুর যুদ্ধে ১৪ নিরীহ বাঙালি শহীদ, ধামতী ও ভূষণা যুদ্ধে ১১ নিরীহ বাঙালি শহীদ হওয়ার ঘটনা উল্লেখযোগ্য।
এ ছাড়াও দেবিদ্বারে স্বাধীনতা সংগ্রামে অবদান ছিল অবিস্মরণীয়। মুক্তিযুদ্ধে অবদান রাখেন একমাত্র জীবিত সদস্য ন্যাপ প্রধান অধ্যাপক মোজাফ্ফর আহমেদ, ন্যাপ-সিপিবি-ছাত্র ইউনিয়ন কর্তৃক গঠিত বিশেষ গেরিলাবাহিনীর অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা সদস্য কমরেড আব্দুল হাফেজ, যুদ্ধকালীন সময়ে ভারতের পালাটোনাক্যাম্প প্রধান সাবেক সাংসদ যুদ্ধাহত বীর মুক্তিযোদ্ধা ক্যাপ্টেন সুজাত আলী, মুক্তিযুদ্ধের সংগঠক সাবেক এম,এন,এ আব্দুল আজিজ খান, আজগর হোসেন মাস্টারসহ অসংখ্য যোদ্ধা ।