সোমবার ২২ জুলাই ২০১৯
  • প্রচ্ছদ »sub lead 2 » ৪৬ বছরেও রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি মেলেনি বেলতলী বধ্যভূমির


৪৬ বছরেও রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি মেলেনি বেলতলী বধ্যভূমির


আমাদের কুমিল্লা .কম :
13.12.2017


নাসির উদ্দিন চৌধুরী, লাকসাম।। লাকসাম রেলওয়ে জংশন বেলতলী বধ্যভূমি। স্বাধীনতার ৪৬ বছরেও রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি মেলেনি এ বেলতলী বধ্যভূমি-র। ১৯৭১ সালে যুদ্ধ চলাকালীন সময়ে পাক সেনারা বিভিন্ন বয়সের বাঙ্গালী হাজার হাজার নারী পুরুষকে নির্মমভাবে নির্যাতন চালিয়ে হত্যা করে এখানে মাটি চাপা দেয়া হয়েছিল। দীর্ঘ দিন অযতেœ অবহেলায় পড়ে থাকার পর রেল কর্তৃপক্ষ ২০১৫সালে এ বধ্যভুমিটিতে একটি স্মৃতি সৌধ নির্মান করে দেন। প্রয়োজনীয় রক্ষণাবেক্ষন আর অবহেলায় এটি দিনের বেলায় গোচারন ভূমি আর রাতের বেলায় অপরাধীদের আখড়ায় পরিনত হয়।
স্বাধীনতা যুদ্ধ কালীন সময়ে লাকসাম রেলজংশনের ঝাড়–দার উপেন্দ্র মালির সহযোগী এ বর্বরতম ঘটনার স্বাক্ষী ও প্রত্যক্ষদর্শী শ্রীধাম চন্দ্র দাস জানায়, ৭১ এর ১৫ এপ্রিল পাক সেনারা লাকসাম আক্রমন করার পরদিন লাকসাম জংশন প্লাটফরমে বেশ কিছু বাঙ্গালীর লাশ ছড়িয়ে ছিটিয়ে পড়েছিল। তৎকালীন রেলওয়ে স্যানেটারী ইন্সপেক্টর পাক বাহিনীর নির্দেশের কথা জানিয়ে লাশগুলো রেলওয়ে জংশনের দক্ষিনে নিয়ে বেলতলীতে মাটি চাপা দিতে বলে।
শ্রীধাম আরও জানান, স্বাধীনতা যুদ্ধের সময় লাকসাম রেলওয়ে জংশনের পাশে চাঁদপুর ট্যোবাকো কোম্পানীর কারখানায় স্ব-চোখে দেখেছেন পাক সেনাদের চরম নিষ্ঠুরতা, অত্যাচার ও হত্যাযজ্ঞ। লাকসাম দখলের দুদিন পর পাক সেনারা হত্যা করলো রেলওয়ে জংশনের পাশে অবস্থিত মিস্ত্রি গ্রামের মুক্তি যোদ্ধা আবদুল খালেকসহ একদল বাঙ্গালীকে। ওই সময় আমি মুক্তিযোদ্ধা আবদুল খালেকের লাশ মাটি চাপা দেয়ার স্থানটিকে চিহ্নিত করে রাখি। দেশ স্বাধীন হওয়ার পর সে স্থান থেকে লাশ তুলে তাদের পারিবারিক কবরস্থানে নেয়ার ব্যবস্থা করি।
মুক্তিযোদ্ধারা জানায়, পাক বাহিনী দেশের অন্যান্য এলাকার মত কুমিল্লা সেনানিবাস থেকে এসে ১৯৭১ সালের ১৫ এপ্রিল দেশের গুরুত্বপূর্ন রেলওয়ে জংশন ও লাকসাম অঞ্চল দখল করে রেলওয়ে জংশনের পশ্চিম দক্ষিন পাশে অবস্থিত থ্রী এ সিগারেট ফ্যাক্টরীতে ক্যাম্প স্থাপন করে। যুদ্ধকালীন সময়ে পাকবাহিনীরা এ সিগারেট ফ্যাক্টরীকে মিনি ক্যান্টনমেন্ট হিসেবে ব্যবহার করতো। এ ক্যান্টনমেন্টের অধীনে ছিল লাকসামসহ কুমিল্লা জেলার দক্ষিন এলাকা, চাঁদপুর, ফেনী ও নোয়াখালী অঞ্চল। এসব অঞ্চল থেকে পাক বাহিনী শ’ শ’ যুবক-যুবতীসহ বিভিন্ন বয়সের নারী-পুরুষকে ট্রাকে করে তুলে নিয়ে আসত। এদের মধ্যে যুবতীদের উপর যৌন নিপীড়ন শেষে তাদেরকে নির্মমভাবে হত্যা করা হতো। এখানে সব বয়সের ও ধর্মের লোকদের ধরে এনে হত্যার পর তাদেরকে ওই বধ্যভূমিতে গর্ত খুড়ে মাটি চাপা দিত। বিশেষ করে ফেনী, নোয়াখালী, চাঁদপুর এবং বরিশাল অঞ্চলের ট্রেনে আসা যাত্রীদেরকেও পাক সেনারা রেলওয়ে জংশন থেকে ধরে নিয়ে যেত ওই থ্রী এ সিগারেট ফ্যাক্টরীতে। সেখানে তাদের উপর নির্যাতন চালিয়ে হত্যার পর বেলতলী বধ্য ভূমিতে মাটি চাপা দেয়া হতো।
অনুসন্ধানে জানা যায়, এ বধ্যভূমিতে লাকসাম রেলওয়ে জংশনের পাশ্ববর্তী পাইকপাড়া গ্রামের তৎকালীন ছাত্রলীগ নেতা আবদুস সোবহান ও বাইনচাটিয়া গ্রামের দরবেশ নূর ইসলাম, নাঙ্গলকোটের আদ্রা ইউপি চেয়ারম্যান আলী আশ্রাফ খানসহ জানা অজানা অনেক বাঙ্গালী নরনারীকে থ্রীএ সেগারেট ফ্যাক্টরিতে নির্যাতনের পর হত্যা করে এখানে মাটি চাপা দেয়া হয়।
লাকসাম রাজঘাট এলাকার খোরশেদ আলম জানান, আমার বাবা সৈয়দ আনু মিয়া, মা বেলজান বিবি, আমার ছোট ভাই মনু এবং দুঃসম্পর্কের দাদা আবদুল জলিলকে পাক বাহিনীরা থ্রী এ সিগারেট ফ্যাক্টরীতে ধরে নিয়ে যায়। সেখানে নিয়ে তাদেরকে গুলি করে নির্মম ভাবে হত্যা করে। তাদেরকেও সম্ভবত বেলতলী বধ্যভূমিতে মাটি চাপা দেয়া হয়েছিল।
প্রত্যক্ষদর্শী রেলওয়ের তৎকালীন কর্মকর্তা কর্মচারীরা জানায়, ওই সময় শুধু বধ্যভুমিতে লাশ মাটি চাপা দেয়া ছাড়াও ট্রেনে আসা শত শত যাত্রীদের পাখির মত গুলি করে হত্যা শেষে তাদেরকে মালবাহী ট্রেনের বগি ভর্তি করে তা চাঁদপুর নিয়ে ডাকাতিয়া নদীতে ফেলে দিত।
স্থানীয় মুক্তিযোদ্ধারা জানান, ’৯৯ সালে ঢাকার একদল সাংবাদিক অনুরোধে শ্রীধাম দাস বেলতলী বধ্যভুমি খুড়ে বের করে আনেন বেশ কয়েকটি মাটি চাপা দেয়া মানুষের হাড় গোড়-কঙ্কাল-করোটি। এ সময় উদ্ধার করা বেশ ক’টি মাথার খুঁলি ও কিছু হাঁড় বর্তমান ঢাকায় মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরে সংরক্ষিত আছে।
মুক্তিযোদ্ধারা আরও জানান,’৯৯ সালে বাংলাদেশ মুক্তিযোদ্ধা সংসদ লাকসাম থানা কমান্ডের একটি আবেদনের প্রেক্ষিতে (সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রনালয়ের ১৮-১-৯৯ইং তারিখের সাবিম/শ-উঃ১/৯৯-১নং স্মারক মোতাবেক কুমিল্লা জেলা প্রশাসন ২৫-২-৯৯ তারিখে) লাকসাম উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাকে বধ্যভূমির জায়গাটি অধিগ্রহনের নির্দেশ দিলে ও তা আজও কার্যকর হয়নি।
লাকসাম মুক্তিযোদ্ধা সংসদের কমান্ডার আবদুল বারী মজুমদার জানান, দেশের বিভিন্ন এলাকা থেকে পাক বাহিনী সাধারন মানুষসহ ট্রেনের যাত্রীদের নির্বিচারে গুলি করে হত্যা শেষে প্রতিদিন এখানে যে ভাবে মাটি চাপা দিত, সে হিসাবে দেখা যায়, এখানে প্রায় ১০ হাজার বিভিন্ন বয়সের নারী পুরুষের লাশ মাটি চাপা দেয়া হয়েছিল।