বৃহস্পতিবার ২১ নভেম্বর ২০১৯


এবার মিডল্যান্ড হাসপাতালে চিকিৎসা অবহেলায় নবজাতকের মৃত্যুর অভিযোগ


আমাদের কুমিল্লা .কম :
22.12.2017

তৈয়বুর রহমান সোহেল।।

#দোষীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়ার দাবি স্বজনদের
#ডাক্তারেরই উচিত ছিল আল্ট্রাসনো করে যাওয়া। এখানে হাসপাতাল প্রশাসনের অবহেলা নেই। ভবিষ্যতে আমরা ওই ডাক্তারকে হাসপাতালে ঢুকতে দেবো না – ডা.শহীদউল্লাহ
#হাসপাতালের দায়িত্বরতদের নির্দেশ দেই আল্ট্রাসনো করানোর জন্য, কিন্তু তারা তা করাতে পারেনি। এটা আমার ব্যর্থতা নয়- ডা. করুণা রাণী
#দায়িত্বে অবহেলার প্রমাণ পেলে তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া হবে- সিভিল সার্জন
হাসাপাতালে রাত নয়টার পর যদি আল্ট্রাসনোগ্রাফি করানোর মত লোক না থাকে, তবে কেন রোগীর ভর্তি নিবে?’- রোগীর স্বজন

কুমিল্লা নগরীর সেই মিডল্যান্ড হাসপাতালে চিকিৎসায় অবহেলায় আবারো নবজাতকের মৃত্যুর অভিযোগ উঠেছে। গত তিনমাস পূর্বে ভুল চিকিৎসায় এ হাসপাতালে শিশু প্রীতমের (৭) মৃত্যুর অভিযোগ উঠে। বৃহস্পতিবার বিষয়টি নবজাতকের স্বজনরা অভিযোগ করেন।

মায়ের আহাজারি

নিহতের স্বজনদের সূত্রে জানা যায়, লাকসামের কৃষ্ণপুর গ্রামের শামসুদ্দিন মজুমদারের প্রসূতি স্ত্রী লুৎফুন নাহার বুধবার রাত সাড়ে ৮টার সময় কুমিল্লা মিডল্যান্ড হাসপাতালে কুমিল্লা মেডিকেল কলেজের গাইনি বিভাগের বিভাগীয় প্রধান অধ্যাপক করুণা রাণী কর্মকারের তত্ত্বাবধানে ভর্তি হন। এর পূর্বে নিহত নবজাতকের মামা একটি কলেজের প্রভাষক মো. তারেকুল ইসলাম ওই গাইনি ডাক্তার করুণা রাণীর সাথে এ বিষয়ে যোগাযোগ করলে তিনি প্রসূতিকে মিডল্যান্ড হাসপাতালে ভর্তি করানোর পরামর্শ প্রদান করেন।
ডাক্তারের কথামত নবজাতকের মামা তার প্রসূতি বোনকে একদিনের মধ্যে মিডল্যান্ড হাসপাতালে ভর্তি করে দেন। বুধবার রাত ৯টার সময় ডা. করুণা রাণী নবজাতকের মাকে দেখে বলেন, ‘গর্ভের বাচ্চা সুস্থ আছে। রোগীর সিজার করানো লাগবে না।’ এরপর তিনি প্রসূতির আল্ট্রসনোগ্রাফি করানোর পরামর্শ প্রদান করে হাসপাতাল ত্যাগ করেন। রাত নয়টার পর ওই হাসপাতালে আল্ট্রাসনোগ্রাফি করানোর মত কোনো ডাক্তার বা নার্সকে খুঁজে না পেয়ে প্রসূতির স্বজনেরা বারবার ডাক্তার হাসপাতালে দায়িত্বরতদের সাথে যোগাযোগ করেন। এসময় তারা হাসপাতালের পরিচালকের মুঠোফোনে বারবার যোগাযোগ করলেও তিনি ফোন ধরেননি। একপর্যায়ে স্বজনরা কুমিল্লার বিভিন্ন আল্ট্রাসনোগ্রাফির প্রতিষ্ঠানে যোগাযোগ করলেও ওইসব প্রতিষ্ঠানে রাতে ডাক্তার না পাওয়ায় তারা আল্ট্রাসনোগ্রাফি করাতে ব্যর্থ হয়। এদিকে রাত আড়াইটার সময় প্রসূতির প্রসব বেদনা উঠে। সাড়ে তিনটার সময় বাচ্চা প্রসব হওয়ার দেখা যায় বাচ্চাটি মৃত।

মৃত নবজাতক

এ বিষয়ে যোগাযোগ করা হলে ড. করুণা রাণী কর্মকার জানান, প্রসূতির ব্লাডে পানিস্বল্পতা ছিল। আমি তিনদিন পূর্বে তাকে হাসপাতালে ভর্তি করাতে বলি। কিন্তু তাকে ভর্তি করানো হয়েছে বুধবার রাত সাড়ে ৮টায়। রাত ৯টার সময় স্টেটেসকোপ দিয়ে পরীক্ষা করে দেখি বাচ্চার হার্টসাউন্ড নেই। সম্ভবত গর্ভে থাকা অবস্থায় বাচ্চাটির মৃত্যু হয়েছে।
হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের বক্তব্য, যে রোগীকে যে ডাক্তারের অধীনে ভর্তি করানো হয়েছে সাধারণত তিনিই ওই রোগীর আল্ট্রাসনোগ্রাফি করান। কিন্তু ডা. করুণা রাণী তা করেননি- এমন প্রশ্নের জবাবে ডা. করুণা রাণী বলেন, রোগী কয়েকমাস ধরে আমার তত্ত্বাবধানে ছিল, তা ঠিক। গতকাল আমি বাসায় যাওয়ার সময় হাসপাতালের দায়িত্বরতদের নির্দেশ দেই আল্ট্রাসনো করানোর জন্য, কিন্তু তারা তা করাতে পারেনি। এটা আমার ব্যর্থতা নয়। আর পরিবার যথাসময়ে রোগী ভর্তি না করানোতেই নবজাতকের মৃত্যু হয়েছে বলে আমার ধারণা।
প্রসূতির ভাই চাঁদপুরের কচুয়া রহিমানগর বঙ্গবন্ধু ডিগ্রি কলেজের প্রভাষক তারেকুল ইসলাম বলেন, ‘ডা. করুণা রাণী আমার বোনকে বুধবার হাসপাতালে ভর্তি করানোর কথা বলেন। আমি বুধবারই বোনকে হাসপাতালে ভর্তি করাই।’
তিনি বলেন, ‘আমার দু:খ একটাই, হাসাপাতালে রাত নয়টার পর যদি আল্ট্রাসনোগ্রাফি করানোর মত লোক না থাকে, তবে কেন রোগীর ভর্তি নিবে?’
তিনি আরো বলেন, ‘রাত ৯টার পর আমরা আজাদ-শেফাসহ বেশ কয়েকটি আল্ট্রাসনোগ্রাফি সেন্টারে দৌড়াদৌড়ি করেছি, লাভ হয়নি। যদি অন্তত আল্ট্রা হতো তাহলে প্রসূতিকে সিজার করাতাম। এর আগেও শিশু প্রীতম এ হাসপাতালে ভুল চিকিৎসায় মারা গেছে বলে অভিযোগ করা হয়েছিল। ওই শিশুটি ছিল আমার দূর সম্পর্কের ভাতিজা। তারপরও ডাক্তারের ভরসায় আমি বোনকে এখানে ভর্তি করিয়েছি। আমি এর সুষ্ঠু বিচার চাই।’
বৃহস্পতিবার সকালে হাসপাতালের পরিচালক ডা. শহীদুল্লাহর কাছে প্রসূতির স্বজনরা মৌখিক অভিযোগ করলে তিনি বলেন, ‘আমার চোখের সামনে বারবার শিশু প্রীতমের ছবি ভেসে ওঠে। একই ঘটনার পুনরাবৃত্তি কেন মিডল্যান্ড হাসপাতালে হবে। কুমিল্লার মেডিসিন ক্লাব নিয়ে দুই গ্রুপের দ্বন্দ্বের কারণে খুব ঝামেলায় আছি। পরশু রাতে আমার ঘুম না হওয়াতে গতরাতে ঘুমের ওষুধ খেয়ে ঘুমিয়ে পড়ি। তাই হয়তো আমি আপনাদের ফোন রিসিভ করতে পারিনি। আমি এ ঘটনার সাথে সংশ্লিষ্ট ডাক্তার ও স্টাফদের পেনাল্টি (ব্যবস্থা গ্রহণ ) দেবো। আপনাদের যে ক্ষতি হয়েছে তা কখনো পূরণ হবার নয়। আপনারা যে ডাক্তারের অধীনে ভর্তি হয়েছেন, তারই উচিত ছিল আল্ট্রাসনোগ্রাম করে যাওয়া। এখানে হাসপাতাল প্রশাসনের অবহেলা নেই। ভবিষ্যতে আমরা ওই ডাক্তারকে হাসপাতালে ঢুকতে দেবো না। এ ঘটনায় আমরা ক্ষমা প্রার্থী।’
এ বিষয়ে যোগাযোগ করা হলে কুমিল্লার সিভিল সার্জন ডা. মুজিবুর রহমান বলেন, ‘এ বিষয়ে ডা. করুণা রাণী কর্মকার আমার সাথে যোগাযোগ করেছেন। আমি তার বক্তব্য শুনেছি। তিনি জানিয়েছেন স্টেটেসকোপ দিয়ে পরীক্ষার পর বাচ্চার ফিডল সাউন্ড শুনতে পাননি। অর্থাৎ বাচ্চাটি আগেই মৃত ছিল। ক্লিনিক্যালি ডেড ঘোষণার জন্য তিনি আল্ট্রা করানোর কথা বলেছিল। তারপরও কারো দায়িত্বে অবহেলার প্রমাণ পেলে তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া হবে।’