মঙ্গল্বার ২৩ অক্টোবর ২০১৮
  • প্রচ্ছদ » sub lead 2 » কুমেকে অস্থিতিশীলতার নেপথ্যে হাসপাতালের দুই চিকিৎসক!


কুমেকে অস্থিতিশীলতার নেপথ্যে হাসপাতালের দুই চিকিৎসক!


আমাদের কুমিল্লা .কম :
13.01.2018

মাসুদ আলম।। রাজনীতি নিষিদ্ধ থাকলেও কুমিল্লা মেডিক্যাল কলেজে (কুমেক) সক্রিয় রয়েছে ছাত্রলীগ। দুই গ্রুপে বিভক্ত এ সংগঠনের কর্মীদের মধ্যে প্রায়ই দেখা দিচ্ছে সংঘাত। অভিযোগ উঠেছে, স্বাচিপের কার্যনির্বাহী পরিষদের দুই সদস্য কুমেকের সাবেক শিক্ষার্থী ডা. হান্নান ও ডা. পলাশ এই দুই গ্রুপের নেতৃত্ব দিলেও তাদের দ্বন্দ্ব-সংঘাতে মদদ দিচ্ছেন কুমিল্লা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের ওই দুই চিকিৎসক।

কুমেকের শিক্ষক ও শিক্ষার্থী সূত্রে জানা গেছে, ২০১৫ সালের ১৩ নভেম্বর অধ্যাপক ডা. ইকবাল আর্সনালকে সভাপতি ও অধ্যাপক ডা. এএম আজিজকে সাধারণ সম্পাদক করে স্বাধীনতা চিকিৎসক পরিষদের (স্বাচিপ) কেন্দ্রীয় কমিটি হয়। এরপর ২০১৬ সালে স্বাচিপের ১৫১ সদস্যের পূর্ণাঙ্গ কমিটি ঘোষণার পর থেকে স্বাচিপের কুমিল্লা শাখা ও কুমিল্লা মেডিক্যাল কলেজের ছাত্র রাজনীতিতে দ্বন্দ্ব দেখা দেয়।

কুমেক ছাত্রলীগের দুটি গ্রুপকে নেতৃত্ব দিয়ে আসছেন কুমিল্লা মেডিক্যাল কলেজের সাবেক ছাত্র বর্তমানে স্বাচিপ কেন্দ্রীয় কমিটি ও কুমিল্লা শাখার কার্যনির্বাহী পরিষদের সদস্য ডা. আব্দুল হান্নান ও ডা. হাবিবুর রহমান পলাশ। তারা দু’জনই ঢাকায় বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ে চিকিৎসক হিসেবে নিয়োজিত। ডা. হান্নান অ্যানেসথেশিয়া বিভাগ এবং ডা. পলাশ ইএনটি বিভাগের রয়েছেন।

সূত্র জানায়, কুমিল্লা মেডিক্যাল কলেজে ছাত্র রাজনীতি নিষিদ্ধ থাকায় মেডিসিন ক্লাবের আড়ালে ছাত্রলীগের কার্যক্রম পরিচালনা করতেন হান্নান ও পলাশ। ২০০৪ সালে পলাশ মেডিসিন ক্লাবের সভাপতি হন। এর আগেই হান্নান কুমেক থেকে লেখাপড়া শেষ করে বের হন। তবে তাদের মধ্যে কোনও দ্বন্দ্ব বা কোন্দল ছিল না। ২০১৬ সালে স্বাচিপের পূর্ণাঙ্গ কমিটি ঘোষণার পর তাদের মধ্যে নেতৃত্বের দ্বন্দ্ব শুরু হয়। এর জের ধরে হান্নান ও পলাশ পৃথকভাবে কুমেকে ছাত্রলীগের কমিটি করেন। তবে এসব কমিটির কেন্দ্রীয় ছাত্রলীগ এবং জেলা ও মহানগর ছাত্রলীগের স্বীকৃতি নেই।

বর্তমানে কুমেকে ডা. হান্নান গ্রুপের নেতৃত্বে রয়েছেন ৩১তম ব্যাচের ছাত্র নওশাদ, সাদমান ও চয়ন। ডা. পলাশ গ্রুপের নেতৃত্বে রয়েছেন ২১তম ব্যাচের ছাত্র অনিম, আসিফ, শ্যামল ও সবুজ।

তবে কুমিল্লা জেলা ছাত্রলীগের সাবেক সভাপতি আ ফ ম আহসান উদ্দিন টুটুল বলেন, ‘কুমেক ছাত্রলীগের কোনও কমিটি বা স্বীকৃতি নেই। আমি জেলা ছাত্রলীগের নেতৃত্বে থাকাকালে কুমেক ছাত্রলীগের খোঁজখবর নিতাম। এখন কে বা কারা দেখাশোনা করছে, বলতে পারবো না।’

প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর অনুষ্ঠান নিয়ে কুমেকের শেখ রাসেল ছাত্রাবাসে গত বৃহস্পতিবার (৪ জানুয়ারি) রাতে ছাত্রলীগের দুই গ্রুপের মধ্যে সংঘর্ষে ঘটনা ঘটে। এতে অন্তত ১০ জন আহত হন। সংঘর্ষে জড়ানো নেতাকর্মীরা ডা. হান্নান ও ডা. পলাশের অনুসারী বলে জানা গেছে।

এর আগে গত বছরের ১ নভেম্বর রাতে ছাত্রলীগের দুই গ্রুপের মধ্যে ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়ার ঘটনা ঘটে। এতে পাঁচ জন আহত হন। ঘটনাস্থল থেকে পুলিশ তিন জনকে আটক করে। প্রাতিষ্ঠানিকভাবে ব্যবস্থা নেওয়ার আশ্বাসে কলেজ কর্তৃপক্ষ মুচলেকা দিয়ে তাদের কলেজে নিয়ে আসে। ওই ঘটনায় পরদিন কুমিল্লা মেডিক্যাল কলেজের অধ্যক্ষ অধ্যাপক ডা. মহসিন উজ জামান চৌধুরীর সভাপতিত্বে একাডেমিক কাউন্সিল সভায় ৮ ছাত্রকে বিভিন্ন মেয়াদে কলেজ ও হোস্টেল থেকে বহিষ্কার করা হয়। পাঁচ জন ইন্টার্ন চিকিৎসককে সতর্ক করা হয়। মেডিসিন ক্লাবসহ সব ধরনের সংগঠনও নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হয় ওই একাডেমিক কাউন্সিল সভায়।

নাম না প্রকাশ করার শর্তে কুমেকের এক শিক্ষক জানান, কুমেকে সব সংগঠন ও রাজনীতি নিষিদ্ধ ঘোষণার পরও হান্নান এবং পলাশের নেতৃত্বাধীন ছাত্রলীগের দ্বন্দ্ব অব্যাহত রয়েছে। এছাড়াও হাসপাতালে কর্তব্যরত আবাসিক চিকিৎসক ডা. আব্দুল আউয়াল সোহেল এবং অ্যানেসথেশিয়ার চিকিৎসক ডা. মোহাম্মদ আলী টিপুর নেতৃত্বে আরও একটি গ্রুপ তৈরি হয়েছে বলে সূত্রটি জানিয়েছে। তাদের মদদের কারণেই হান্নান ও পলাশ গ্রুপের মধ্যে বারবার সংঘাতের সৃষ্টি হয়। সূত্রমতে, ডা. সোহেল এবং টিপুর মূল লক্ষ্য গ্রুপ সৃষ্টি করে কুমেকে অবস্থান তৈরি করে নেতৃত্বে আসা।

কুমেকে ডা. সোহেল-টিপু গ্রুপের অনুসারীরা হলেন ২১তম ব্যাচের ছাত্র পলাশ সরকার, রাহাত মিসবাহ্ ও ২২তম ব্যাচের ছাত্র নিলয়।

এ বিষয়ে হান্নান গ্রুপের প্রধান ডা. আব্দুল হান্নান বলেন, ‘আমি কুমেকের সাবেক ছাত্র। দীর্ঘদিন সেখানে পড়ালেখা করেছি এবং ক্যাম্পাসে ছাত্রলীগের রাজনীতির সঙ্গে জড়িত ছিলাম। এখন আমি একটি মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ে কর্মরত রয়েছি। আমার বাড়ি কুমিল্লায়, সেই হিসেবে কুমেকের ক্যাম্পাসে যাওয়া-আসা হয়। ক্যাম্পাসে রাজনীতি ও সংগঠন করায় সেখানে আমার অনুসারী থাকতে পারে বা আমাকে পছন্দ করতেই পারে। এসব গ্রুপ বা দলমত নিয়ে আমি রাজনীতি করি না। ক্যাম্পাসে থাকাকালেও করিনি।’ তিনি আরও বলেন, ‘যারা আমার অনুসারীদের ব্যবহার করে কুমেকে দ্বন্দ্ব সৃষ্টি করেছে, তারা কুমেক হাসপাতালে কর্মরত।’

পলাশ গ্রুপের প্রধান ডা. হাবিবুর রহমান পলাশ বলেন, ‘হান্নান ভাই আর আমি দুজনই কুমেকে পড়ালেখা করেছি। ২০০৩ এবং ২০০৪ সালে আমি মেডিসিন ক্লাবের সভাপতি ছিলাম। ২০০৫ সালে কুমেক থেকে পড়ালেখা শেষ করেছি। কখনও হান্নান ভাই ও আমার কোনও প্রকার দ্বন্দ্ব হয়নি। ২০১৬ সালে স্বাচিপের কুমিল্লা জেলা কমিটি ঘোষণার পর থেকে কুমেকে দ্বন্দ্ব ও সংঘাতের ঘটনা ঘটতে থাকে। কুমেক হাসপাতালের দুই চিকিৎসক স্বাচিপের কুমিল্লা জেলা শাখার সাংগঠনিক সম্পাদক আব্দুল আউয়াল সোহেল এবং জয়েন সেক্রেটারি ডা. মোহাম্মদ আলী টিপু তার অনুসারীদের নেতৃত্বে আনার জন্য এবং সংখ্যা বৃদ্ধির লক্ষ্যে হান্নান ভাইয়ের অনুসারীদের সঙ্গে সম্পৃক্ত হয়ে কুমেকে বিভিন্ন সময় দ্বন্দ্ব ও সংঘাতের সৃষ্টি করছেন।’

কুমেকের সাবেক কয়েকজন ছাত্রনেতাও কলেজে দ্বন্দ্ব-সংঘাতের পেছনে ওই দুই চিকিৎসকের কথা তুলে ধরেন। তারা জানান, ২০১৬ সালের ২০ অক্টোবর কুমেকে দ্বন্দ্ব ও সংঘাতের কারণে ১৬ জন শিক্ষার্থীকে কলেজ কর্তৃপক্ষ বহিষ্কার করে। কিন্তু ডা. সোহেল ও ডা. টিপু কুমেক অ্যাকাডেমিক কাউন্সিল থেকে তাদের বহিষ্কারাদেশ প্রত্যাহার করিয়ে নেন। ওই ১৬ শিক্ষার্থীর মধ্যে হান্নান গ্রুপের আট জন এবং পলাশ গ্রুপের আট জন ছিলেন। কিন্তু ডা. পলাশ ও ডা. হান্নান তাদের বহিষ্কারাদেশ প্রত্যাহার চাননি। ওই নেতাদের দাবি, ডা. সোহেল ও ডা. টিপুর মূল লক্ষ্য বহিষ্কার হওয়া ছাত্রদের তাদের অনুসারী করে নেওয়া।

এসব অভিযোগ সম্পর্কে কুমিল্লা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের আবাসিক চিকিৎসক, স্বাচিপের কুমিল্লা জেলা শাখার সাংগঠনিক সম্পাদক ও বিএমএ কুমিল্লা জেলার যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক আব্দুল আউয়াল সোহেল বলেন, ‘আমি হাসপাতালে সরকারি চাকরি করি। ছাত্র রাজনীতির সঙ্গে সম্পৃক্ত হওয়ার প্রশ্নই আসে না। বরং আমি ছাত্রদের সংঘর্ষের খবর পেয়ে দ্রুত হাসপাতালে ছুটে গেছি। কিন্তু যারা গ্রুপিং করে তারা সেখানে আসেনি। আমি গ্রুপিং করলে হয়তো আমিও যেতাম না।’

অভিযোগের বিষয়ে জানতে অ্যানেসথেশিয়ার চিকিৎসক ডা. মোহাম্মদ আলী টিপুর মোবাইল ফোনে একাধিকবার চেষ্টা করেও তাকে পাওয়া যায়নি।

কুমিল্লা মেডিক্যাল কলেজের উপাধ্যক্ষ অধ্যাপক ডা. জাহাংগীর হোসেন ভূইয়া জানান, গত কয়েক বছর ধরে নতুন শিক্ষার্থীদের বরণ করাকে কেন্দ্র করে আধিপত্য বিস্তারের ব্যাপারটি চলে আসছে। এরই ধারাবাহিকতায় ৪ জানুয়ারি ছাত্রলীগের ৭০তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উদযাপন নিয়ে রাতে দুই পক্ষের সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে।

কুমেক অধ্যক্ষ অধ্যাপক ডা. মহসিন উজ জামান চৌধুরী বলেন, ‘কলেজ ক্যাম্পাসে রাজনীতি নিষিদ্ধ। কোনও ছাত্র সংগঠন বা অন্য কোনও নামে এখানে রাজনীতি করা যাবে না; যা আগেই বলে দেওয়া হয়েছে। সূত্র-বাংলাট্রিবিউন।।