বুধবার ২১ ফেব্রুয়ারী ২০১৮


দেবিদ্বারে গ্রুপিংয়ে আ.লীগ-নিষ্ক্রিয় বিএনপি


আমাদের কুমিল্লা .কম :
11.02.2018


শাহীন আলম, দেবিদ্বার।। দলীয় কয়েকটি গ্রুপে বিভক্ত দেবিদ্বার উপজেলা আওয়ামীলীগ ও বিএনপি। গ্রুপিং তুঙ্গে থাকলেও রাজনীতির মাঠে রয়েছে আওয়ামী লীগ। অপর দিকে, এক দিকে সরকারী দলের হামলা-মামলার শিকার অপর দিকে রয়েছে দলের অভ্যন্তরীণ কোন্দল। ফলে এক প্রকার মাঠের বাহিরে রয়েছে প্রধান রাজনৈতিক দল বিএনপি। জামায়াতের রাজনীতিও এখানে কোণঠাসা হয়ে পড়েছে। দু’একটি সভা ও উঠান বৈঠক করে রাজনীতির মাঠে সক্রিয় হতে চেষ্টা করছে জাতীয় পার্টি। কমিউনিষ্ট, ন্যাপ, ইসলামী আন্দোলনসহ সমমনা কয়েকটি দল চলছে খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে। এছাড়া জাপার ভাড়াটে কার্যালয় ছ্ড়াা নিজস্ব কার্যালয়ের অস্তিত্ব নেই আওয়ামীলীগ ও বিএনপিসহ কোন দলেরই দেবিদ্বারে।
আওয়ামী লীগ : স্থানীয় এমপি রাজী মোহাম্মদ ফখরুল ইসলাম মুন্সি, কুমিল্লা উত্তর জেলা আওয়ামীলীগের সহ সভাপতি ও সাবেক মন্ত্রী এবিএম গোলাম মোস্তাফা, যুগ্ম সম্পাদক অধ্যক্ষ এম হুমায়ুন মাহমুদ ও যুগ্ম সম্পাদক রওশন আলী মাস্টার- দেবিদ্বার উপজেলা আওয়ামীলীগ এখন এই চারটি গ্রুপে বিভক্ত। যার কারণে তিন বছরের উপজেলা কমিটি চলছে এখন ২২ বছর ধরে। নেই কোন সম্মেলন, পরিবর্তন নেই কমিটির। নেতৃত্বে আসতে পারছে না অনেক সম্ভাবনাময়ী তরুণ। ক্ষমতাসীন দল হওয়া সত্ত্বেও এখানে নেই কোন দলীয় কার্যালয়।
এই উপজেলায় সর্বশেষ সম্মেলন হয়েছিল ১৯৯৬ সালের ২ আগস্ট। সেই সম্মেলনে মো. জয়নুল আবেদীনকে সভাপতি ও একেএম মনিরুজ্জামানকে সাধারণ সম্পাদক করে একটি কমিটি করা হয়। বর্তমানে এই কমিটি নামে থাকলেও কার্যত কোন কাজে নেই। উপজেলা আ.লীগের সভাপতি জয়নুল আবেদীন মাঝে মাঝে সরকারী দু-চারটি সভায় যোগদান করলেও একেবারেই নিস্কৃয় দলের সেক্রেটারী একেএম মনিরুজ্জামান। এ নিয়ে খোদ ক্ষমতাসীন দলেই ক্ষোভ বিক্ষোভের অন্ত নেই।
এ ব্যাপারে কুমিল্লা-৪(দেবিদ্বার) আসনের সাংসদ রাজী মোহাম্মদ ফখরুল ইসলাম মুন্সি বলেন, দীর্ঘদিন কমিটি না হওয়ায় উপজেলা আ.লীগ সাংগঠনিক ভাবে কিছুটা দূর্বল। তবে সরকারী অনুষ্ঠানসহ নিয়মিত সভা-সমাবেশ পালন হচ্ছে। আর গ্রুপিং সব দলেই আছে, থাকবে। কার্যালয় সর্ম্পকে তিনি বলেন, স্কোয়ার হসপিটালে সামনে আওয়ামী লীগের একটি অস্থায়ী কার্যালয় রয়েছে।
কুমিল্লা উত্তর জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি আবদুল আউয়াল সরকার বলেন, দেবিদ্বার উপজেলা আ.লীগ কমিটির কোন কার্যকারিতা নেই। কমিটির কার্যকারিতা না থাকলে সংগঠন টিকে না, নেতা তৈরী হয়না। এমন অনেক যোগ্য নেতা রয়েছেন যারা নতুন কমিটি না হওয়ায় নেতৃত্বে আসতে পারছে না। এবার ভেবেছিলাম, সম্মেলন করে কমিটি করব, কিন্তু একেক নেতা একেক দিকে। তাঁরা চার নেতা চারদিকে থাকলে আমাদের এমন কি ঠেকা পড়েছে তাদের ডিঙ্গিয়ে কমিটি করব? দলীয় কার্যালয় সম্পর্কে জানতে চাইলে দলের এ নেতা আরও বলেন, কেন্দ্রীয়ভাবে নির্দেশনা রয়েছে নিজস্ব দলীয় কার্যালয় থাকতে হবে। কিন্তু কে কার কাজ করে। সবাই নিজের চিন্তাই ব্যস্ত।
আওয়ামী রাজনীতিতে গ্রুপিং থাকলেও তা প্রকট নয় দাবি করে উপজেলা আ.লীগের সাধারণ সম্পাদক একেএম মনিরুজ্জামান বলেন, আওয়ামীলীগ বড় দল গ্রুপিং থাকবেই। সবাই দলের মনোনয়ন চায়। দলীয় সভা-সমাবেশে অনুপস্থিত থাকার কথা অস্বীকার করে তিনি বলেন, এটি সঠিক নয়, যারা এসব বলছে তারা কি পদে আছে? সেটা আগে দেখতে হবে।
একাধিক আ.লীগ নেতা অভিযোগ করে বলেন, তৃণমূল নেতাকর্মীর বিশাল একটি অংশের সাথে বর্তমান সাংসদ রাজী ফখরুলের রয়েছে বিস্তর দুরত্ব। এদিকে, গত বছরের ১১ নভেম্বর একটি কর্মীসভায় উপজেলা আ.লীগের সাবেক সাংসদ এবিএম গোলাম মোস্তফার নেতৃত্বে দলের পাঁচ নেতার মধ্যে ঐক্য হলেও ভিতরের চিত্র সম্পন্ন উলটো। বিশ্বস্থ সূত্রে জানা যায়, ঐক্য হওয়া নেতারা ভিতরে ভিতরে দলীয় মনোনয়ন নিয়ে সাংসদ হওয়ার স্বপ্ন দেখছেন।যার কারণে এবিএম গোলাম মোস্তাফার ঐক্য হালে পানি পাচ্ছে না।
বিএনপি :
দেবিদ্বার উপজেলা বিএনপি এখন বহুধা বিভক্ত হলেও কোন গ্রুপই এখানে খুব একটা সক্রিয় নয়। কেন্দ্রীয় কর্মসূচী গুলোও পালন হয় দায়সারা গোছের। হামলা,মামলা,নির্যাতন ও হয়রানির স্বীকার ত্যাগী কর্মীরা এখন উপযুক্ত নেতা খুঁজে পাচেছ না।
বিএনপি যখন ক্ষমতায় ছিল তখন এই আসন থেকে চার বারের নির্বাচিত এমপি ইঞ্জি: মুঞ্জুরুল আহসান মুন্সীর দাপট ছিল ঈর্ষণীয়। ক্ষমতায় থাকার সময় তার কিছু বিতর্কিত ভূমিকা জনমনে নেতিবাচক ধারণা সৃষ্টি হয়। যার কারণে ১/১১’র সময় তার বিরুদ্ধে একাধিক মামলা হয়। তিনি গ্রেফতার হন একই সাথে আদালত কর্তৃক শাস্তি হওয়ায় ২০০৮ সালের নির্বাচনে তিনি প্রার্থী হতে পারেননি। ফলে ঐ নির্বাচনে তার স্ত্রীকে বিএনপির দলীয় প্রার্থী করা হয়।
বর্তমানে দেবিদ্বার উপজেলা বিএনপিতে চরম সংকটকাল চলছে। বিশেষ করে নেতৃত্বের শূন্যতা প্রকট আকার ধারণ করছে। ১/১১’র সাবেক এমপি ইঞ্জি: মুঞ্জুরুল আহসান মুন্সী দেবিদ্বারের মাঠ ছেড়ে দেয়ার সুযোগে মাঠ সরগরম করতে তৎপর হয়ে উঠে কয়েকজন নেতা। ফাঁকা মাঠে গোল করার অভিপ্রায়ে কয়েকদিন পরপর এসব নেতাদের বিভিন্ন সামাজিক অনুষ্ঠানে দেখা মিললেও সাংগঠনিক কোন কাজে তৎপরতা দেখা যাচ্ছে না এসব নেতাদের।

দেবিদ্বার উপজেলা বিএনপির একাধিক নেতার সাথে কথা বলে জানা গেছে, ২০০৫ সালের পর দেবিদ্বার উপজেলা বিএনপির প্রকাশ্যে দেবিদ্বারে কোন সম্মেলন হয়নি। এর মধ্যে যে ২/১ বার উপজেলা কমিটি হয়েছে তা ইঞ্জি: মুঞ্জুরুল আহসান মুন্সি ঢাকায় বসে পকেটে কমিটি করে দিয়েছে। যার কারণে দেবিদ্বারে নতুন নেতৃত্ব গড়ে উঠছে না। সর্বশেষ ২০১৬ সালে সাবেক এমপি ও কেন্দ্রীয় বিএনপির নির্বাহী সদস্য ইঞ্জি: মুঞ্জুরুল আহসান মুন্সি এড. ফরিদকে সভাপতি ও গিয়াস উদ্দিনকে সাধারণ সম্পাদক করে ঢাকা থেকে দেবিদ্বার উপজেলা বিএনপির কমিটি ঘোষনা করেন। যা মেনে নিতে পারেনি স্থানীয় নেতারা।
এ প্রসঙ্গে বিএনপি নেতা ও দেবিদ্বার উপজেলা চেয়ারম্যান রুহুল আমীন বলেন, এবারের উপজেলা নির্বাচনে সারা দেশের তিন ভাগের পোনে তিন ভাগ উপজেলায় যেখানে বিএনপির প্রার্থীরা দাঁড়াতে পারেনি সেখানে দলীয় নেতাকর্মী ও সাধারণ জনগনকে সাথে নিয়ে ক্ষমতাসীন দলের সাথে সংগ্রাম করে উপজেলা চেয়ারম্যান হয়েছি। কিন্তু মুঞ্জু মুন্সি আমাকে কোন দলের পদে রাখে নি। তিনি দু:খ করে বলেন, দেবিদ্বার উপজেলা বিএনপির সম্মেলন কবে কখন এবং কোথায় হয়েছে কেউ বলতে পারবে না। মুঞ্জুরুল আহসান মুন্সি নিজের ইচ্ছে মত পকেট কমিটি করে দলের ত্যাগী নেতাকর্মীদের দূরে ঠেলে দিয়েছে। বর্তমান বিএনপির পকেট কমিটির সাথে দেবিদ্বার বিএনপি ও এর অংগ সংগঠনের নেতাকর্মীদের কোন সম্পর্ক নেই। কেন্দ্র ঘোষিত কোন কর্মসূচীই তারা পালন করে না। আমি আমার অনুসারীদের নিয়ে যতটুকু সম্ভব করার চেষ্টা করি।
অপর দিকে, কেন্দ্রীয় সহ সাংগঠনিক সম্পাদক আবদুল আউয়াল খান, হংকং বিএনপির সভাপতি ও বর্তমান আওয়ামীলীগ দলীয় এমপির চাচা এএফএম তারেক মুন্সীরও রয়েছে কিছু কিছু অনুসারী। কিন্তু তারা দৃশ্যমান মাঠে ময়দানে কোন দলীয় কর্মকান্ড করে না বলে জানা গেছে।
এ প্রসঙ্গে বিএনপির নির্বাহী কমিটির সদস্য ও সাবেক এমপি মঞ্জুরুল আহসান মুন্সির সেল ফোনে একাধিকবার যোগাযোগ করার চেষ্টা করেও তিনি ফোন রিসিভ না করাতে তার বক্তব্য নেয়া যায়নি।
সাবেক এমপি মঞ্জুরুল আহসান মুন্সির অনুসারী ও দেবিদ্বার উপজেলা বিএনপির সভাপতি এড. ফরিদ ও সাধারণ সম্পাদক গিয়াস উদ্দিনের সেল ফোনে বার বার চেষ্টা করেও তাদের বক্তব্য নেওয়া সম্ভব হয়নি। তবে মঞ্জুরুল আহসান মুন্সির অনুসারী ও উপজেলা যুবদলের সভাপতি মো. রেজাউল করিম ভিপি শাহীন বলেন, যারা বলে সাবেক এমপি মঞ্জুরুল আহসান মুন্সি এবং তার দলের লোকেরা কোন কাজ করে না তাদের বলতে চাই আপনারা দলীয় কোন কর্মসূচী পালন করেছেন। আপনাদের বিরুদ্ধে কয়টি মামলা আছে। মঞ্জুরুল আহসান মুন্সি সাহেব কখনো পকেট কমিটি করেননি। যারা যোগ্য তাদেরই তিনি কমিটিতে স্থান দিয়েছেন বলে জানান তিনি।
জামায়াত :
এদিকে, জামায়াত গত উপজেলা পরিষদ নির্বাচনে ভাইস চেয়ারম্যান পদে বিপুল ভোটে নির্বাচিত হলেও বর্তমানে অনেকটা মুখ থুবড়ে পড়েছে দলের সাংগঠনিক কার্যক্রম। এই দলেরও নেই কোন কার্যালয়। তারা দলের সাংগঠনিক কার্যক্রম বিভিন্ন গ্রাম-গঞ্জে বা ইউনিয়ন পর্যায়ের দায়িত্বশীলদের বাড়ি অথবা অন্য কোন সুবিধাজনক স্থানে করছে বলে সূত্র থেকে জানা যায়।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক জামায়াত নেতা দলীয় কার্যক্রম স্থবিরের কথা স্বীকার করে বলেন, দলীয় কর্মসূচীও এখন আর আগের মত আসে না, মাসিক বৈঠকগুলো নিজেদের সুবিধাজনক স্থানে করি, অনেক নেতা মামলা-হামলার ভয়ে দেশ ছেড়ে বিদেশে অবস্থান করছে, দেশের প্রেক্ষাপট পরিবর্তন হলে হয়তো এসব নেতা-কর্মীরা দেশে ফিরবেন। মূলত জামায়াত মাঠে কোণঠাসায় রয়েছে। তবে ভিতরে ভিতরে দলের সাংগঠনিক শক্তিশালী মজবুত করার চেষ্টা করছে বলে জানান এ নেতা।
জামায়াতের উপজেলা সেক্রেটারী সাইফুল ইসলাম শহীদের কাছে দলের অবস্থান সর্ম্পকে জানতে চাইলে তিনি এ ব্যাপারে মুখ খুলতে নারাজ।
জাতীয় পার্টি :
এখানে জাতীয় পার্টির কেন্দ্রীয় ভাইস চেয়ারম্যান থাকলেও দলগত ভাবে জাপা এখানে খুবই দূর্বল। ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারি নির্বাচনে এই আসনে মহাজোট থেকে মনোনয়ন পায় জাপার বর্তমান ভাইস চেয়ারম্যান ইকবাল হোসেন রাজু। কিন্তু স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে ইকবাল হোসেন রাজুকে পরাজিত করে এমপি নির্বাচিত হন আওয়ামীলীগ নেতা রাজী মোহাম্মদ ফখরুল ইসলাম মুন্সি।
মাঠে জাপার সাংগঠনিক কার্যক্রমের অগ্রগতি সম্পর্কে জানতে চাইলে দলের কেন্দ্রীয় ভাইস চেয়ারম্যান ইকবাল হোসেন রাজু জানান, মাঠে আছি এবং থাকবো। দলের সাংগঠনিক শক্তি আগের চেয়ে ভালো। প্রধানমন্ত্রী এ আসনটি জাতীয়পার্টির জন্য রাখবেন বলেও তিনি জানান।
এ ছাড়া এই উপজেলায় কমিনিষ্ট পার্টির তেল গ্যাস রক্ষা আন্দোলনসহ সময়ে সময়ে কিছু কর্মসূচী থাকলেও অন্য কোন দলের দৃশ্যমান আর কোন কার্যক্রম নেই বললেই চলে।