সোমবার ১৮ জুন ২০১৮


লাকসামে ঐক্যবদ্ধ আওয়ামী লীগের বিপক্ষে গ্রুপিংয়ে বিপর্যস্ত বিএনপি


আমাদের কুমিল্লা .কম :
20.02.2018


নাসির উদ্দিন চৌধুরী, লাকসাম।। লাকসামে আওয়ামী লীগের সুসংগঠিত নেতৃত্বের বিপরীতে অভ্যন্তরীণ কোন্দলে সাংগঠনিকভাবে চরম সংকটে বিএনপি। সাংগঠনিকভাবে আওয়ামী লীগ সুদৃঢ় অবস্থানে থাকলেও নেতৃত্বের লড়াইয়ে বিএনপি নিজেরাই নিজেদের প্রতিপক্ষ হয়ে দাঁড়িয়েছে। এতে আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীদের মাঝে চাঙ্গা ভাব থাকলেও বিএনপি নেতাকর্মীরা হতাশায় ভুগছেন। নেতৃত্বের লড়াইয়ে কারণে বিএনপির তৃণমূলের নেতাকর্মীদের মাঝেও প্রভাব পড়েছে। এখানে জামায়াতে ইসলামীর কৌশলী ভূমিকায় এবং জাতীয় পার্টিও সাংগঠনিক কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে।
বিএনপি :
লাকসামে বিএনপি বর্তমানে দুটি গ্রুপে বিভক্ত। এক গ্রুপের নেতৃত্বে রয়েছেন সাবেক সংসদ সদস্য ও বিএনপির কেন্দ্রীয় কমিটির সাংগঠনিক সম্পাদক কর্নেল (অবঃ) এম আনোয়ারুল আজিম। অপর গ্রুপের নেতৃত্বে রয়েছেন বিএনপির কেন্দ্রীয় কমিটির শিল্প বিষয়ক সম্পাদক ও উপজেলা বিএনপির সভাপতি আবুল কালাম। দলীয় কোন্দলে জর্জরিত বিএনপিতে ২০০১ সালে জাতীয়পাটির সাবেক এমপি সাইফুল ইসলাম হিরু দলে যোগদান করে উপজেলা বিএনপির সভাপতি হন। ওই বছরই অনুষ্ঠিত জাতীয় সংসদ নির্বাচনে দলীয় মনোনয়ন পান কর্নেল (অবঃ) এম আনোয়ারুল আজিম। ওই সময় বিএনপির সাবেক এমপি এটিএম আলমগীর ও শিল্পপতি আবুল কালাম ঐক্যবদ্ধ হয়ে তার বিরুদ্ধে সভা সমাবেশ করে। পরবর্তীতে কর্নেল এম আনোয়ারুল আজিম এমপি নির্বাচিত হলে তারা অনেকটা দুর্বল হয়ে পড়ে। শিল্পপতি আবুল কালাম বিএনপি নেতা আবদুর রহমান বাদলকে নিয়ে গ্রুপিং অব্যাহত রাখে। এদিকে তাদের মধ্যে ক্ষমতা এবং নেতৃত্বের ভাগাভাগি নিয়ে মামলা হামলা ও সংঘর্ষের ঘটনাও ঘটেছে। এক পর্যায়ে তারা কোণঠাসা হয়ে আজিম গ্রুপের সাথে মিলে গেলেও ভিতরে ভিতরে দ্বন্দ্ব রয়েই যায়।
এক সময় আজিম গ্রুপের পক্ষে থাকা সাবেক পৌর মেয়র ও উপজেলা চেয়ারম্যান এবং ভাইয়া গ্রুপের পরিচালক মজির আহমেদ কালাম গ্রুপের সাথে যুক্ত হয়ে প্রকাশ্যে গ্রুপিং করা শুরু করেন। সেই সময় তাদের বক্তব্য ছিল নিখোঁজ বিএনপি নেতা সাইফুল ইসলাম হিরুন বিরুদ্ধে। আজিম বিরোধী বলয়ের অভিযোগ ছিল, কর্নেল (অবঃ) এম আনোয়ারুল আজিম খুব ভাল মানুষ। কিন্তু তিনি সব সময় হিরুর কথা শুনেন। হিরু ছাড়া চলতে পারেন না। কর্নেল (অবঃ) এম আনোয়ারুল আজিম সাইফুল ইসলাম হিরুকে ত্যাগ করলে আর কোন সমস্যা থাকবে না।
এক সময় লাকসামে এই দুই গ্রুপের মধ্যে ব্যাপক দ্বন্দ্ব সংঘাত দেখা দেয়। সর্বশেষ ২০১৩ সালে আজিম গ্রপের লোকজন প্রতিপক্ষ মজির আহমেদের মৎস্য খামার ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে হামলা চালিয়ে ব্যাপক ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগ করে। এতে উভয় গ্রুপের অনেক নেতাকর্মী আহত হয়। ওই সময় এর প্রতিবাদে আবুল কালামের অনুসারীরা মজির আহমেদের পক্ষ নিয়ে লাকসামে ব্যাপক শোডাউন করে। এক পর্যায়ে মজির আহমেদ রাজনীতি থেকে কৌশলে অনেকটা নিষ্ক্রিয় হয়ে পড়েন। তবে তার অনুসারীরা বর্তমানে আবুল কালামের পক্ষে কাজ করছেন।
এদিকে ২০১৩ সালে ২৭ নভেম্বর আজিম গ্রুপের অনুসারী ও উপজেলা বিএনপির দুই শীর্ষ নেতা সাবেক এমপি সাইফুল ইসলাম হিরু ও হুমায়ুন কবির পারভেজ নিঁখোজ হলে আবারো রাজনীতিতে কালাম গ্রুপ মাথাচাড়া দিয়ে উঠে। এরপর থেকেই লাকসাম বিএনপি নেতৃত্ব শূন্য হয়ে পড়ে। সাইফুল ইসলাম হিরু যেভাবে প্রভাবের সাথে একক নেতৃত্ব বহাল রেখেছিল তার অনুপস্থিতিতে আজিম গ্রুপের পক্ষে সেটা আর রাখা সম্ভব হয়নি। দীর্ঘ ৪’বছরেও নিখোঁজ ওই দুই নেতা ফিরে না আসায় এক পর্যায়ে কর্নেল আজিম আবুল কালামকে উপজেলা বিএনপির ভারপ্রাপ্ত সভাপতির দায়িত্ব দেয়। সে সময়ই এ দায়িত্ব যাতে আবুল কালামকে না দেয়া হয় তার কিছু অনুসারী তাকে নিষেধ করেছিল। কিন্তু সূত্র জানায়, কর্নেল আজিম উদারপন্থী রাজনীতিবিদ হওয়ায় এবং লাকসামের রাজনীতিতে বিএনপিকে ঐক্যবদ্ধ রাখার জন্যই আবুল কালামকে ভারপ্রাপ্ত সভাপতি করেছিল।
সূত্রমতে, এদিকে আবুল কালাম দলের একক নেতৃত্ব দখলে নিতে নানা কৌশল অবলম্বন করতে থাকেন। এরই ধারাবাহিকতায় হঠাৎ করে আজিম সাহেবকে না জানিয়ে উপজেলা প্রথমে যুবদল ও পড়ে ছাত্রদলের আংশিক কমিটি আবুল কালাম কেন্দ্রে প্রভাব খাটিয়ে নিয়ে আসলে প্রকাশ্যে চলে আসে আজিম গ্রুপ আর কালাম গ্রুপ। এ নিয়ে রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষও হয় লাকসামে। গত বছরের মাঝামাঝি সময়ে কোন সম্মেলন ছাড়াই এমনকি প্রচলিত কমিটি না ভেঙে দিয়ে এককভাবে কালাম সমর্থিতদের দিয়ে লাকসাম-মনোহরগঞ্জ উপজেলা বিএনপির আংশিক কমিটি গঠন করলে বিক্ষুব্ধ হয়ে উঠে আজিম গ্রুপ। তখন থেকেই আজিম সমর্থিতরা এ কমিটি এবং কালাম গ্রুপকে প্রতিরোধের ঘোষণা দিয়ে বেশ কয়েকবার সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়ে। যা বর্তমানে অব্যাহত আছে।
কর্নেল আজিমের অনুসারীদের বক্তব্য, আবুল কালাম ও মজির আহমেদ মিলে ২০০৮ সালে প্রকাশ্যে নৌকার পক্ষে কাজ করে শহীদ জিয়ার প্রতীক ধানের শীষকে মাত্র ২৫৮ ভোটে হারিয়ে দেয়। আর এ অভিযোগ বরাবরই অস্কীকার করে আসছে বর্তমান লাকসাম উপজেলা বিএনপির সভাপতি আবুল কালাম। বর্তমানে লাকসাম ও মনোহরগঞ্জে বিএনপি, যুবদল ও ছাত্রদলের কোন পূর্ণাঙ্গ কমিটি নেই। আংশিক কমিটি দিয়ে চলছে।
কর্নেল (অবঃ) আনোয়ারুল আজিম সমর্থিত লাকসাম পৌরসভা বিএনপির সভাপতি তাজুল ইসলাম খোকন বলেন, মামলা ও গ্রেপ্তারের কারণে আমরা স্বাভাবিকভাবে দলীয় কর্মকা- চালাতে পারছি না। যারা বিগত নির্বাচন সমূহে দলীয় প্রার্থীর বিপক্ষে কাজ করেছে এবং দলের নিশ্চিত বিজয় নস্যাৎ করেছে তারা কোন ভাবেই দলের পরিচয় বহন করতে পারেনা। আমরা সব সময় দলের নেতাকর্মীদের নিয়ে আন্দোলন সংগ্রামে আছি থাকবো। তিনি বলেন, লাকসামে বিএনপি নামধারী একটি গ্রুপ আছে, তারা নির্বাচন এলেই সক্রিয় হয়ে উঠে পরিবেশে ঘোলাটে করে। এতে কোন লাভ হবেনা। নেতা কর্মীরা কর্নেল (অবঃ) আনোয়ারুল আজিমের নেতৃত্বে ঐক্যবদ্ধ আছে ,থাকবে। যিনি এখন বিএনপি বলে দাবি করে সেই কালাম গেল নির্বাচনে নৌকার পক্ষে এজেন্টের মত কাজ করছে। লাকসামের জনগন তা জানে। সুতরাং আগামী নির্বাচনে এখানে আজিম ভাইই ধানের শীষ প্রতীক নিয়ে নির্বাচন করে দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়াকে এই সিটটি উপহার দিবে ইনশাল্লাহ।
এ ব্যাপারে লাকসাম উপজেলা বিএনপির সভাপতি আবুল কালাম বলেন, এটা আমার কমিটি নয়, এটা বিএনপি ও ধানের শীষের কমিটি। বিএনপি ও ধানের শীষের শক্ত ঘাঁটি এবং অবস্থান লাকসামে বিদ্যমান। শুধু তৃণমূলে নয় লাকসামের সকল জায়গায় বিএনপির শক্ত অবস্থান রয়েছে। বর্তমান কমিটির নেতৃত্বেই সকলেই ঐক্যবদ্ধ। তিনি বলেন, এখানে আর কোন কমিটি বা গ্রুপিং নেই। যিনি (কর্ণেল অবঃ আনোয়ারুল আজিম) বিএনপি দাবি করছেন, তিনিতো দলের পদত্যাগী নেতা। বিএনপিতে তার কোন অধিকারও নেই। তিনি বলেন, আমার নেতৃত্বে লাকসামে বিএনপি ও অঙ্গ সংগঠনের নেতা কর্মীরা ঐক্যবদ্ধ আছে এবং থাকবে।
আওয়ামী লীগ :
ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের বর্তমান জাতীয় সংসদ সদস্য ও লাকসাম উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি মোঃ তাজুল ইসলামের নেতৃত্বে লাকসাম উপজেলায় তৃণমূল পর্যায় থেকে শান্তিপূর্ণভাবে উপজেলা ও পৌর কমিটি সম্মেলনের মাধ্যমে গঠন করেছেন। এতে কমিটিতে দলের প্রবীন ও ত্যাগী নেতাকর্মীরা স্থান পাওয়ায় দলীয় কর্মকা-ে চাঙ্গা ভাব এসেছে। এছাড়াও উন্নয়ন কর্মকা- এবং ভবিষ্যৎ পরিকল্পনাকে সামনে রেখে বর্তমান সংসদ সদস্য মোঃ তাজুল ইসলাম বিভিন্ন সাংগঠনিক, সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও ধর্মীয় অনুষ্ঠানে অংশ নিয়ে দলের সকল পর্যায়ের নেতাকর্মীদের ঐক্যবদ্ধ রাখতে সচেষ্ট রয়েছেন। লাকসাম উপজেলা , পৌরসভা এবং প্রায় সকল ইউনিয়ন পরিষদের সকল সদস্যই ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ থেকে নির্বাচিত। আওয়ামী লীগসহ দল এবং অঙ্গসংগঠনের সকল পর্যায়ের কমিটিই সুসংগঠিত। ফলে কেন্দ্রীয় এবং স্থানীয় যে কোন কর্মসূিচই পালিত হয় স্বত্ব:স্ফূর্তভাবে।
স্থানীয় সংসদ সদস্য ও লাকসাম উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি মোঃ তাজুল ইসলাম বলেন, লাকসামে আওয়ামী লীগ ও অঙ্গ সংগঠনের সকল পর্যায়ের নেতাকর্মীরা আজ ঐক্যবদ্ধ। যার ফলে এখানে দলে কোন বিরোধ নেই। কারণ দলের নবীন প্রবীণ নেতাকর্মীরা যোগ্যতা অনুযায়ী স্ব স্ব অবস্থানে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। আওয়ামী লীগের নেতৃত্বেই লাকসামের মানুষ শান্তি আছে এবং শান্তিতে থাকবে।
জামায়াত ইসলামী : জামায়াতে ইসলামী নিবন্ধন নিয়ে অনিশ্চয়তা থাকায় অবস্থান করছেন কৌশলী ভূমিকায়। শীর্ষ নেতাদের দ-ের পর ভেতরে ভেতরে নিয়মিত চালিয়ে যাচ্ছেন সাংগঠনিক তৎপরতা। তবে ইদানিং কালে তাদের প্রকাশ্যে কোন মিছিল মিটিং দেখা যায় না।
জাতীয় পার্টি : জাতীয়পাটি নেতাকর্মীর সংখ্যা কম হলেও তারাও বিভিন্ন গ্রুপে বিভক্ত। উপজেলা জাতীয়পার্টির সভাপতি প্রফেসর গোলাম মোস্তফার দাবি লাকসামে জাতীয় পাটির কোন গ্রুপিং নেই, সকল পর্যায়ের নেতাকর্মীদের নিয়ে তাদের কমিটি রয়েছে।