সোমবার ২২ অক্টোবর ২০১৮


বিভক্ত আ’লীগ-গতি নেই বিএনপিতেও


আমাদের কুমিল্লা .কম :
25.02.2018

ইসমাইল নয়ন, ব্রাহ্মণপাড়া ॥
কুমিল্লা জেলা সদরের অতি নিকটবর্তী উপজেলা বুড়িচং। তাই জেলা সদরের রাজনীতির প্রভাব একটু বেশিই পড়ে এই উপজেলার ওপর। সকল বিষয়ে জেলা সদরের নেতারা প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে হস্তক্ষেপ করতে চায় এই উপজেলার রাজনীতিতে। তৃণমূল কর্মীদের মতামত বরাবরের মতই উপেক্ষা হয়ে আসছে। যার ফলে আ’লীগ ও বিএনপির তৃণমূল নেতা-কর্মীদের মাঝে বেড়ে উঠছে ক্ষোভ। সম্প্রতি সময়ে কমিটি দ্বন্দে বিভক্ত হয়ে পড়েছে উপজেলা আ’লীগ। প্রতিটি সংসদ নির্বাচনে প্রার্থী পরিবর্তন ও নেতৃত্বের পরিবর্তনে এক প্রকার বিপযর্স্ত হয়ে পড়েছে বিএনপি।

৯ টি ইউনিয়ন নিয়ে গড়ে ওঠা বুড়িচং উপজেলা । এই উপজেলাকে দু’ভাগে বিভক্ত করেছে গোমতী নদী। নদীর পূর্ব পাড়ে ৫ টি ও পশ্চিম পাড়ে ৪ টি ইউনিয়ন হলেও ভোটের দিকে দু’দিক প্রায় সমানে সমান। বুড়িচং-ব্রাহ্মণপাড়া উপজেলা নিয়ে একটি সংসদীয় আসন কুমিল্লা-৫।

আওয়ামী লীগ:
বুড়িচং উপজেলায় আওয়ামী লীগ ও বিএনপির জনপ্রিয়তা প্রায় একই রকম। দীর্ঘদিন ক্ষমতায় থাকার পরও অঙ্গ-সংগঠনগুলি গোছাতে পারেনি আওয়ামী লীগ। নেতাদের গ্রুপিংয়ের ফলে উপজেলা আ’লীগ, যুবলীগ, স্বেচ্ছাসেবলীগ, ছাত্রলীগসহ কোন সংগঠনের কমিটি পুনঃগঠন হয়নি। শুরু থেকে গ্রুপিং চলে আসলেও মূলত গত উপজেলা পরিষদ নির্বাচনে আ’লীগের প্রার্থী নিয়ে দুটি গ্রুপে বিভক্ত হয়ে যায় উপজেলা আ’লীগ। একটি গ্রুপের নেতৃত্ব দেন উপজেলা আ’লীগের সেক্রেটারি ও সাবেক উপজেলা চেয়ারম্যান মোঃ সাজ্জাদ হোসেন স্বপন ও অপর গ্রুপের নেতৃত্ব দেন উপজেলা আ’লীগের সহ-সভাপতি মোঃ আখলাক হায়দার। উপজেলা নির্বাচনে সংসদ সদস্য বাংলাদেশ আ’লীগের প্রেসিডিয়াম সদস্য এড. আবদুল মতিন খসরু একাধিক সমঝোতা বৈঠক ও কাউন্সিল করেও একক প্রার্থী নির্ধারণ করতে পারেনি। প্রার্থী নির্ধারনী সভায় একাধিকবার সংঘর্ষের ঘটনাও ঘঠে। ফলে উভয় গ্রুপ থেকে আ’লী দুই প্রার্থী নির্বাচনে অংশগ্রহণ করায় উভয়েরই ভরাডুবি হয়। উপজেলা নির্বাচনে সাজ্জাদ হোসেন ও আখলাক হায়দারের পরাজয় থেকে গ্রুপিং চরম আকার ধারণ করে। ফলে উপজেলা যুবলীগ, ছাত্রলীগসহ অন্যান্য সংগঠনগুলিও দু’টি ভাগে বিভক্ত হয়ে পরে। দীর্ঘ এক যুগ পর উপজেলা ছাত্রলীগের কমিটি গঠন করার পর সংঘর্ষে জড়িয়ে পরে বুড়িচং উপজেলা ছাত্রলীগ। ফলে কমিটি গঠনের এক সপ্তাহর পর তা আবার স্থগিত করা হয়। ফলে গত এক বছর ধরে কমিটি ছাড়াই চলছে বুড়িচং উপজেলা ছাত্রলীগ। গত ৬ ফেব্রুয়ারি কুমিল্লা দ. জেলা আ’লীগের সভাপতি পরিকল্পনা মন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল ও সাধারণ সম্পাদক রেলপথ মন্ত্রী মজিবুল হক স্বাক্ষরিত বুড়িচং উপজেলা আ’লীগের কমিটি পুনর্গঠন করা হয়। এ কমিটিতে এড. আবুল হাসেম খাঁন’কে সভাপতি ও সাজ্জাদ হোসেকে সেক্রেটারি বলবৎ রাখা হয়। এতে সক্রিয় হয়ে উঠে আখলাক হায়দার গ্রুপ। এরপর গত ১৮ ফেব্রুয়ারী আবদুল মতিন খসরু এমপি স্বাক্ষরিত বুড়িচং উপজেলা আ’লীগের নতুন আরেকটি কমিটি আসে। এ কমিটিতে আখলাক হায়দার সভাপতি ও এড. রেজাউল করিম সেক্রেটারী হিসেবে দেয়া হয়। এর পর থেকেই উপজেলা আ’লীগের নেতা কর্মীদের মাঝে দ্বিধা দ্বন্ধের সৃষ্ঠি হয়। দু’ ভাগে বিভক্ত হয়ে যায় উপজেলা আ’লীগ। গত ২১ ফেব্রুয়ারী আর্ন্তজাতিক মাতৃভাষা দিবসের অনুষ্ঠানে সংসদ সদস্য আবদুল মতিন খসরু উপস্থিত থাকলেও দেখা যায়নি এড. আবুল হাসেম খাঁন ও সাজ্জাদ হোসেন’কে। তাছাড়া তাদের গ্রুপের নেতা কর্মীদের উপস্থিতিও লক্ষ্য করা যায়নি। প্রবীন আ’লীগ নেতাদের দাবী আসন্ন সংসদ নির্বাচনে বুড়িচং উপজেলা আ’লীগের কমিটি দ্বন্ধ মিটিয়ে দু’টি গ্রুপকে একত্রিত না করলে কঠির পরীক্ষার মুখে পড়তে পারে কেন্দ্রীয় আওয়ামীলীগের নীতি নির্ধারক আবদুল মতিন খসরু এমপিকে।
এই ব্যাপারে বুড়িচং উপজেলার সাবেক চেয়ারম্যান ও আওয়ামীলীগের সাধারণ সম্পাদক সাজ্জাদ হোসেন স্বপন জানান, বুড়িচং আওয়ামীলীগের মধ্যে কোন গ্রুপিং নেই ,তৃনমুল পর্যায়ে সকল নেতাকর্মীরা ঐক্যবদ্ধ হয়ে দলীয় কার্যকর্ম চালিয়ে যাচ্ছে। যদি কোন গ্রুপিং বা দ্বন্ধ থাকে তা ।জেলা কমিটির নেতৃত্বে বসে অচিরে সমাধান করা হবে । দলীয় সংবিধান অনুসারে কুমিল্লা দক্ষিন জেলা কমিটির সভাপতি ও পরিকল্পনা মন্ত্রী লোটাস কামাল ও সাধারণ সম্পাদক রেলমন্ত্রী মজিবুল হক মুজিব স্বাক্ষরিত এ্যাড.হাসেম খান কে সভাপতি ও আমাকে সাধারণ সম্পাদক করে একটি কমিটি অনুমোদন দেয়। এ ছাড়া অন্য কোন কমিটির কোন বৈধ্যতা নেই।
অপর দিকে, স্থানীয় এমপি আবদুল মতিন খসরু সমর্থিত গ্রুপের উপজেলা আওয়ামীলীগের সাধারন সম্পাদক এ্যাড.রেজাউল করিম জানান, বুড়িচং উপজেলা আওয়ামীলীগ সাবেক আইনমন্ত্রী ও দলের কেন্দ্রীয় প্রেসিডিয়াম সদস্য এড.আব্দুল মতিন খসরু এমপির নেতৃত্বে ঐক্যবদ্ধ।আজ যারা নিজেদের বুড়িচং উপজেলা আওয়ামীলীগের সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক দাবী করে তারা গত ১৫ বছর ধরে একই পদে ছিল কিন্ত কোন সম্মেলন করেনি। শুধু তাই নয়, তাদের সাথে বুড়িচং উপজেলা আওয়ামীলীগ ও এর কোন পর্যায়ের নেতাকর্মীদের সম্পর্ক নেই। তারা সম্পর্কহীন নেতা।
বুড়িচং উপজেলার সাবেক এই ভাইস চেয়ারম্যান আরো বলেন, গত ১৮ ফেব্রুয়ারি আব্দুল মতিন খসরু এমপি’র সুপারিশ ক্রমে মো আখলাক হায়দার কে সভাপতি ও আমাকে সাধারন সম্পাদক করে একটি কমিটি অনুমোদন দেওয়া হয়।

বিএনপিঃ
প্রতিটি সংসদ নির্বাচনে প্রার্থী বদল ও সঠিক নেতৃত্বের অভাবে এক প্রকার বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে বুড়িচং উপজেলায় বিএনপি। একেরপর এক নেতা বদলের পর সর্বশেষ কেন্দ্রীয় বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান, জাতীয় প্রেস ক্লাবের সাবেক সভাপতি, সাংবাদিক নেতা শওকত মাহমুদকে কুমিল্লা-৫ বুড়িচং ব্রাহ্মণপাড়া উপজেলা বিএনপির সমন্বয়কের দায়িত্ব নিয়ে আসেন। কিন্তু বিষয়টি মেনে নিতে পারেনি স্থানীয় নেতৃবৃন্দ। ফলে বিএনপির মধ্যে গ্রুপিংয়ের সৃষ্টি হয়। গত উপজেলা পরিষদ নির্বাচনের পূর্বে শওকত মাহমুদ সকল গ্রুপিং নিরসন করে উপজেলা বিএনপির সভাপতি মোঃ মিজানুর রহমানকে বিএনপির প্রার্থী হিসেবে ঘোষণা করেন। দলীয় নেতা কর্মীদের একনিষ্ঠ পরিশ্রম ও আ’লীগের দুই প্রার্থীতার সুযোগ নিয়ে উপজেলা পরিষদ নির্বাচনে বিএনপির প্রার্থী বিজয়ী হয়। বর্তমানে বুড়িচং উপজেলা বিএনপির গ্রুপিং নিরসন হয়ে আসেছে বলে মনে করেন নেতারা। উপজেলা বিএনপির সভাপতি মোঃ মিজানুর রহমানসহ অধিকাংশ বিএনপি, যুবদল, স্বেচ্ছাসেবকদল, ছাত্রদল নেতাকর্মীদের নামে একাধিক মামলা থাকায় বর্তমানে আত্মগোপনে আছে নেতাকর্মীরা। বিএনপির চেয়ারপার্সন বেগম খালেদা জিয়ার গ্রেফতারের পর কেন্দ্র ঘোষিত কোন কর্মসূচি পালন করেনি বুড়িচং উপজেলা বিএনপি। এর মধ্যেই নতুন মামলা দায়ের হয় নেতৃবৃন্দের নামে গ্রেফতার হন উপজেলা বিএপনির সহ-সভাপতি ও যুবদলের সাধারণ সম্পাদকসহ শতাধিক নেতাকর্মী। বর্তমানে বুড়িচং উপজেলায় গ্রেফতার আতঙ্কে আছে বিএনপির নেতাকর্মীরা। তাই নির্বাচনী ভাবনার চেয়ে গ্রেফতার এড়িয়ে চলাই মূল লক্ষ্য হয়ে পড়েছে বুড়িচংয়ের বিএনপির।
এ প্রসঙ্গে বুড়িচং উপজেলা বিএনপি’র সভাপতি ও উপজেলা চেয়ারম্যান মো মিজানুর রহমান জানান বুড়িচং উপজেলার বিএনপি সাংগঠনিক ভাবে অত্যান্ত শক্তিশালী । উপজেলা থেকে ওয়ার্ড পর্যন্ত প্রতিটি ইউনিটে আমাদের কমিটি রয়েছে।নেতাকর্মীদের মাঝে কোন দ্বন্ধ নেই। দলের প্রতিটি ইউনিটের নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে অসংখ্য মামলা দিয়ে হয়রানী করা হচ্ছে। তারা এখন বাড়ি ঘরে ঘুমাতে পারছে না। আওয়ামীলীগের হামলা মামলার কারণে আমাদের নেতাকর্মীরা বর্তমানে কৌশলী ভুমিকা নিয়ে থাকলেও ইনশাল্লাহ নির্বাচনের সময় দেখবেন বুড়িচং উপজেলা বিএনপি এবং আমাদের নেতা শওকত মাহমুদের ঘাঁটি।

জাতীয়পার্টিঃ
সরকারের জোটে থাকলেও বুড়িচং উপজেলা জাতীয়পার্টির নেতৃবৃন্দ উপজেলা আ’লীগের কার্যক্রমে অংশগ্রণ করছে না। নিজেরাই নিজেদের মতো করে কার্যক্রম পরিচালনা করে আসেছে। এ উপজেলা থেকে গত সংসদ নির্বাচনে বুড়িচং উপজেলা জাতীয়পার্টির উপদেষ্টা প্রফেসর অধ্যক্ষ মোঃ সফিকুল ইসলাম নির্বাচন করেন। বর্তমানে বীরমুক্তিযোদ্ধা মোঃ তাজুল ইসলাম এ উপজেলার সমন্বয়ক হিসেবে দায়িত্ব নেয়ার পর সফিকুল ইসলামকে আর মাঠে দেখা যায়নি। উপজেলা জাতীয়পার্টির সভাপতি আলহাজ মোঃ নূরুল হক মাস্টার বলেন, উপজেলা জাতীয়পার্টিসহ সবকটি সহযোগী সংগঠনের কমিটি আছে। ইউনিয়ন ও ওয়ার্ড পর্যায়ে নতুন কমিটি করে কার্যক্রম আরো গতিশীল করা হবে।

জামায়াতঃ
উপজেলা জামায়াতের কার্যক্রম পরিচালতি হয় গোপনে। প্রকাশ্যে কোন কর্মসূচিতে আসছে না জামায়াত নেতারা, তাছাড়া বিএনপির সাথে জোটে থাকলেও দলীয় কর্মসূচিতে বিএনপির সাথে পাওয়া যাচ্ছে না জামায়াতকে। এদিকে উপজেলা জামায়াতের সেক্রেটারিসহ বেশ কয়েকজন নেতা বর্তমানে জেলে আছে। অন্যান্য নেতাকর্মীরা গ্রেফতার আতঙ্কে আত্মগোপনে আছে।