মঙ্গল্বার ২১ অগাস্ট ২০১৮


উজ্জীবিত আ’লীগ মেয়াদোত্তীর্ণ বিএনপি নেতৃত্বের গা ছাড়া ভাব


আমাদের কুমিল্লা .কম :
26.02.2018

মাহফুজ নান্ট:
কুমিল্লা আদর্শ সদর উপজেলা। সিটি কর্পোরেশন ও ছয়টি ইউনিয়ন বেষ্টিত আদর্শ সদর উপজেলার বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের কার্যক্রমের প্রভাব বিস্তার হয় পুরো কুমিল্লা জেলার সতেরটি উপজেলা। এ কারণে পুরো জেলার রাজনীতি কেন্দ্রবিন্দু হিসেবে বিবেচিত হয় আর্দশ সদর উপজেলা। বর্তমান এখানে আ’লীগ বেশ সুসংগঠিত। মামলা-হামলা আর ধরপাকড়ে বিপর্যস্ত বিএনপি চলছে মেয়াদোত্তীর্ণ কমিটি দিয়ে। প্রকাশ্য রাজনীতি করতে পারে না বলে জামায়াত চলছে গোপনে ও কৌশলে । আর জাতীয় পার্টি ভুগছে অস্তিত্ব সংকটে ।

আওয়ামী লীগ: কুমিল্লার মর্যাদাবান উপজেলা হলো আদর্শ সদর উপজেলা। এই উপজেলার মধ্যেই পড়েছে কুমিল্লা জেলা সদর। দীর্ঘদিন ধরে এই উপজেলার কমিটি ছিল কুমিল্লা দক্ষিণ জেলা আওয়ামী লীগের সাবেক যুগ্ম আহ্বায়ক অধ্যক্ষ আফজল খানের অনুসারীদের দখলে। কিন্তু ২০১৭ সালে এসে আদর্শ সদর উপজেলা আওয়ামী লীগ আফজল খানের হাতছাড়া হয়ে চলে যায় তার চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী এমপি আ ক ম বাহাউদ্দিন বাহারের দখলে। তিনি উপজেলার আমড়াতলী,পাঁচথুবী,জগন্নাথপুর,কালিবাজার, উত্তর দূর্গাপুর-দক্ষিণ দূর্গাপুর এই ছয়টি ইউনিয়নের একেবারে ওয়ার্ড কমিটি পর্যন্ত নিজের প্রত্যক্ষ তত্ত্বাবধানে সম্মেলনের মাধ্যমে গঠন করেন। বিশেষ করে ইউনিয়নের সম্মেলনগুলো হয়েছে বেশ উৎসবমুখর। পরে একই বছর ২২ নভেম্বর নগরীর টাউনহলে উপজেলা আওয়ামী লীগের ত্রি-বার্ষিক সম্মেলনের মাধ্যমে কেন্দ্রীয় নেতাদের উপস্থিতিতে উপজেলা কমিটি গঠন করেন। এ কমিটিতে আবুল বাশারকে সভাপতি ও উপজেলার ভাইস চেয়ারম্যান তারিকুর রহমান জুয়েলকে সাধারণ সম্পাদক করে ৭১সদস্য বিশিষ্ট উপজেলা কমিটি নির্বাচিত করা হয়।
তবে আদর্শ সদর উপজেলার আওয়ামী লীগের একাধিক নেতৃবৃন্দের সাথে আলাপ করে জানা যায়, এবার এমপি বাহার যে ভাবে আদর্শ সদর উপজেলার কমিটি করেছেন তা নি:সন্দেহে অন্য দলগুলোর জন্যও দৃষ্টান্ত হয়ে থাকবে। অতীতের যেকোনো সময়ের তুলানায় সদর উপজেলায় আওয়ামী লীগ সরকার ছাড়াও দলীয়ভাবেও অনেক শক্তিশালী এবং সংগঠিত। কিন্ত এই উপজেলায় যারা অধ্যক্ষ আফজল খানের অনুসারী তাদেরকে কমিটিতে বঞ্চিত করা হয়েছে বলে কেউ কেউ মন্তব্য করেছেন।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি কাজী আবুল বাশার বলেন, আমাদের সদর ও মহানগর আওয়ামী লীগের অভিভাবক বীরমুক্তিযোদ্ধা এমপি আ ক ম বাহাউদ্দিন বাহার ভাই যেভাবে উপজেলার তৃণমূল থেকে মহানগর পর্যায়ে আওয়ামী লীগ ও অঙ্গ সংগঠনের কমিটি করে দিয়ে যেভাবে দলীয় কার্যক্রমকে তদারকি করছেন স্বাধীনতার পরে এভাবে কখনো আদর্শ সদর উপজেলা বলেন বা সদর আসনের মহানগর বলেন এভাবে আওয়ামী লীগের ব্যানারে আর কখনো দলীয় কার্যক্রম সংগঠিত হয়নি। তিনি আরো বলেন, কুমিল্লা গণমানুষের নেতা হাজী আ ক ম বাহাউদ্দিন বাহার দলীয় কার্যক্রমের পাশাপাশি বঙ্গবন্ধুর আদর্শে বলিয়ান থেকে স্বাধীনতার শত্রু সাধারণ মানুষের শত্রু জামাত-শিবিরকে মহানগর থেকে বিতাড়িত করে সদর আসনটি আমাদের নেত্রী মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে উপহার দিয়েছেন। এ থেকে সহজেই অনুমেয় বর্তমান কুমিল্লা সদর আসনে মহানগর ও উপজেলা আওয়ামী লীগের প্রতিটি ইউনিট কত বেশি সুসংগঠিত। আর গ্রুপিং কোন্দল যা বলেন, তা আমাদের সদর উপজেলা আওয়ামী লীগে নেই। আমরা সবাই এমপি বাহার ভাইয়ের নেতৃত্বে ঐক্যবদ্ধ আছি।

বিএনপি :
মেয়াদোত্তীর্ণ কমিটি দিয়ে চলছে কুমিল্লার আদর্শ সদর উপজেলা বিএনপি। নগরীতে হাজী ইয়াছিন ও মেয়র সাক্কু গ্রুপ দৃশ্যমান থাকলেও উপজেলার ৬টি ইউনিয়ন একচ্ছত্রভাবে কুমিল্লা দক্ষিণ জেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক হাজী আমিন উর রশীদ ইয়াছিনের দখলে। আদর্শ সদর উপজেলাটি জেলা সদরের সাথে সংযুক্ত হওয়ায় উপজেলার অধিকাংশ নেতাই আন্দোলন সংগ্রামে জেলা সদরে ভূমিকা রাখেন। কিন্তু দীর্ঘ দিন ধরে তাদের আওয়াতাধীন উপজেলার ৬টি ইউনিয়নে নতুন কমিটি না হওয়ায় দলের ত্যাগী ও পরিক্ষিত নেতাকর্মীদের মাঝে হতাশা দেখা দিয়েছে। এই হতাশা বিরাজ করছে উপজেলার প্রতিটি ওয়ার্ড, ইউনিয়ন এবং উপজেলা পর্যায়ের নেতাকর্মীদের মাঝেও বিরাজমান বলে ৬টি ইউনিয়নের একাধিক নেতাকর্মীদের সাথে কথা বলে জানা গেছে। বিশেষ করে ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারি নির্বাচনকেন্দ্রিক আন্দোলন সংগ্রামে ভূমিকা রাখা নেতাকর্মীরা প্রত্যাশা করেছিল যে, শিগগিরই দল পুনর্গঠন করলে তারা যথাযথ জায়গায় অবস্থান করবে। কিন্তু ২০০৯ সালের কমিটি মেয়াদোত্তীর্ন হয়ে যাওয়ার পরেও যখন বহাল রয়েছে তখন নেতৃত্বে আসা ত্যাগী নেতাকর্মীরা কিছুটা হতাশ হয়ে পড়ছে বলে জানা গেছে। খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, আদর্শ সদর উপজেলার প্রতিটি ইউনিয়নের প্রতিটি ওয়ার্ড কমিটি এখন আর খুব একটা কার্যকর নেই। যদিও তারা সবাই তাদের রাজনৈতিক নেতা কেন্দ্রীয় বিএনপির ত্রাণ ও পুনর্বাসন বিষয়ক সম্পাদক ও জেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক হাজী ইয়াছিনের নেতৃত্বে সুদৃঢ়ভাবে ঐক্যবদ্ধ রয়েছে এবং হাজী ইয়াছিনের আদেশ নির্দেশ পালনে তারা পিছপা হন না বলে দলীয় সাধারণ কর্মীরা জানান। তাদের দাবি , আগামী একশ বছর পরে কমিটি করলেও বিতর্ক, মান অভিমান থাকবে। এটাই রাজনীতির সৌন্দর্য। কিন্তু তাই বলে ২ বছরের কমিটি দিয়ে ৯ বছর চালিয়ে দেওয়া হবে এটা তারা মেনে নিতে পারছে না বলে জানান সাধারণ নেতাকর্মীরা। নাম প্রকাশ না করার শর্তে এ সকল কর্মী সমর্থক বলেন, নির্বাচনের আর মাত্র বেশিদিন সময় নেই। এই মুহূর্তে নতুন কমিটি গঠন করতে না পারলেও আমাদের নেতার উচিত হবে, ৬টি ইউনিয়নের প্রতিটি ওয়ার্ড কমিটিতে যারা আছে তাদের সাথে আলাদা আলাদাভাবে বসে সময় নিয়ে কথা বলে তাদের সক্রিয় করা। তাদের ডেকে এনে নিজেরা কথা কম বলে তাদের কথা বেশি করে শুনে দলকে সক্রিয় করে আগামী নির্বাচনের জন্য দলকে প্রস্তুত করা।
এ প্রসঙ্গে আদর্শ সদর উপজেলা বিএনপির সভাপতি ও কুমিল্লা দক্ষিণ জেলা বিএনপির উপদেষ্টা এড. আলী আক্কাছ বলেন, বর্তমানে উপজেলা বিএনপি অতীতের তুলনায় বেশ সুসংহত এবং রাজনৈতিকভাবে উপজেলার প্রতিটি নেতাকর্মী বেশ উজ্জীবিত । তিনি আরো বলেন, আমরা আদর্শ সদর উপজেলায় বেশ কয়েকটি সভা-সেমিনার করার মাধ্যমে দলে নতুন সদস্য অর্šÍভুক্তিসহ কেন্দ্রীয় কর্মসূচি পালন করছি। মাস দেড়েক আগে জগন্নাথপুর ও কালিবাজার ইউনিয়নে সভা করেছি। নতুন সদস্য অর্ন্তভুক্ত করার কার্যক্রম চালিয়েছি। উপজেলা বিএনপির দলীয় কার্যক্রমের ইতিবাচক একটি দিক হল অতীতের তুলনায় নতুন কর্মী তৈরি হচ্ছে বহুগুণে। পাশাপাশি পুলিশের সাথে সরকারি দলের নানামুখী হামলা-মামলায় নেতাকর্মীরা আরো বেশি উজ্জীবিত হচ্ছে। আপনারা জানেন কুমিল্লা (দ:) জেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক হাজী আমিন উর রশীদ ইয়াছিন সব সময় দলের তৃণমূলের সকল কর্মীদের খবরাখবর রাখছেন। যে সব নেতাকর্মী জেলে আছেন তাদের জন্য জেলে খাবারসহ মামলা থেকে জামিন পাওয়া পর্যন্ত সকল খরচ বহন করছেন। কোন কর্মী যেন পকেট থেকে এসব খরচ বহন করতে না হয় তিনি সব সময় এ বিষয়টি খেয়াল রাখছেন।
আদর্শ সদর উপজেলা বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম সম্পাদক ও জেলা বিএনপির সহ প্রচার সম্পাদক হাজী সফিউল আলম রায়হান বলেন, ২০০৮ সাল থেকে এ পর্যন্ত বর্তমান সরকারের এই দুই মেয়াদে আদর্শ সদর উপজেলার এমন কোন ইউনিয়ন এবং ওয়ার্ডের নেতাকর্মী নেই যাদের নামে মিথ্যা মামলা দিয়ে হয়রানি করা হচ্ছে না। একদিকে, পুলিশি নির্যাতন, পুলিশের মামলা অপর দিকে, আওয়ামী লীগের হামলা মামলা সব কিছু মিলে বলা যায়, আমাদের নেতাকর্মীরা বিপর্যস্ত অবস্থায় রয়েছে। তারপরেও, দলের প্রতিটি কেন্দ্রীয় এবং স্থানীয় কর্মসূচি আমাদের নেতা ও আগামী দিনের সদর আসনের ভবিষ্যত হাজী আমিন উর রশীদ ইয়াছিনের নির্দেশে আমরা উপজেলা সভাপতি আক্কাছ ভাই ও সেক্রেটারি রেজাউল ভাইয়ের নেতৃত্বে সফলভাবে পালন করে আসছি। আমি এবং আমাদের উপজেলা সেক্রেটারিও জেলা খেটেছি। হামলা মামলা মাথায় নিয়েও চলমান আন্দোলন চালিয়ে যাচ্ছি। সুতরাং আদর্শ সদর উপজেলা বিএনপিকে নিষ্ক্রিয় বলা যাবে না।
জামায়াত ইসলামী :

বাংলাদেশ জামায়াত ইসলামী কুমিল্লার আদর্শ সদর উপজেলায় বর্তমানে তাদের কোন কার্যক্রম দৃশ্যমান নেই। উপজেলা জামায়াতের নাম প্রকাশ না করার শর্তে একাধিক নেতৃবৃন্দ বলেন, আওয়ামী লীগ এবং পুলিশের যৌথ হামলা-মামলায় আমাদের অবস্থা বলতে পারেন খুবই নাজুক। তারপরেও আমাদের দলীয় কর্মকা- আল্লাহর রহমতে থেমে নেই। আমরা আমাদের মত করে প্রচারণা চালাচ্ছি। জামায়াত নেতৃবৃন্দ আরো বলেন, কুমিল্লা আদর্শ সদর উপজেলা জামায়েতের শীর্ষ কোন নেতৃবৃন্দকে মোবাইল ফোনে পাওয়া যাবে না। সবাই নতুন মুঠোফোনে একটি নির্দিষ্ট সময়ে দলীয় কার্যক্রমের বিষয়ে কথাবার্তা শেষ করে আবার মুঠোফোনটি বন্ধ করে দেন। তিনি দাবি করেন তাদের দল যদি ইতিবাচক পরিস্থিতি না পায় তাহলে তারা আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচনে দলের প্রার্থীকে স্বতন্ত্রপ্রার্থী হিসেবে নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করাবেন।
কুমিল্লা মহানগর জামায়েতের প্রচার সম্পাদক কামরুজ্জামান সোহেল জানান, নির্বাচনকে সামনে রেখে জামায়াতের সাংগঠনিক কার্যক্রম সঠিকভাবেই পরিচালিত হচ্ছে। তিনি জানান, কেন্দ্রীয় কর্মপরিষদের সদস্য ও কুমিল্লা মহানগর জামায়াতের আমির কাজী দ্বীন মোহাম্মদ কুমিল্লা সদরে জামায়াতের প্রার্থী হিসেবে আগামী নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করবেন। তবে অতীতে জামায়াতের যারা শরিক দল ছিলো তাদের আচরণ এবং দেশের ভবিষ্যৎ পরিস্থিতির উপর নির্ভর করে অন্যান্য সিদ্ধান্ত নেয়া হবে।

জাতীয়পার্টি:
বর্তমান সংসদের প্রধান বিরোধী দল জাতীয়পাটির্র (জাপা) কুমিল্লা আদর্শ সদর উপজেলায় কার্যক্রম নেই বললেই চলে। এ কারণে আদর্শ সদর উপজেলায় সাংগঠনিকভাবে দলটি এখন বিপন্নপ্রায় দলে পরিণত হয়েছে। ২০১৫ সালের অক্টোবরে দক্ষিণ জেলার ১১১ সদস্য বিশিষ্ট কমিটি গঠনের পরে তৃণমূল পর্যায়ে আর কোন কমিটি গঠন হয়নি। ওই কমিটি গঠন হওয়ার পরে দলের ভেতরে কোন্দলে জড়িয়ে পরে নেতাকর্মীরা। তারপর থেকে নেতাকর্মীরা এক হতে পারে নি। অন্তর্দ্বন্দ্বে দূরত্ব বাড়তে বাড়তে অবস্থা এমন হয়েছে জাতীয় দিবস কিংবা কেন্দ্রীয় কর্মসূচি কোন অনুষ্ঠানে দৃশ্যত জাতীয় পার্টিকে আর দেখা যায়নি। বর্তমান সময়েও রাজনৈতিক অঙ্গনে দৃশ্যত জাতীয়পার্টির কার্যক্রম আর চোখে পড়েনি।
অস্তিত্ব সংকটে থাকা সদর আসনের নেতাকর্মীদের বহুবার এক করার চেষ্টা করেও ব্যর্থ হয়েছেন বলেন জানান, কুমিল্লা দক্ষিণ জেলা জাতীয় পার্টির প্রথম যুগ্ম সম্পাদক ওবায়দুল কবির মোহন। তিনি জানান, দক্ষিণ জেলা জাতীয়পার্টির সাংগঠনিক কার্যক্রম চলছে। তবে সদরে জাতীয়পার্টির কোন কার্যক্রম নেই।
আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচনে সদর আসনে জাতীয়পার্টি থেকে কে প্রার্থী হতে পারে জানতে চাইলে দক্ষিণ জেলা জাতীয় পার্টির প্রথম যুগ্ম সম্পাদক ওবায়দুল কবির মোহন জানান, দক্ষিণ জেলা জাতীয়পার্টির সহ-সভাপতি সালামত আলী খান বাচ্চু ও আমি নিজেই প্রার্থী হতে ইচ্ছুক। তবে দল কাকে মনোনয়ন দেন সেটাই হচ্ছে প্রধান বিষয়। আসলে সবকিছুই নির্ভর করছে ভবিষ্যতের ওপর।