শনিবার ১৫ ডিসেম্বর ২০১৮


প্রবাসে নয় পরপারে ইলিয়াসের পরিবার


আমাদের কুমিল্লা .কম :
28.02.2018


মাসুদ আলম।। মফিজ ও ইলিয়াস দুই ভাই। মফিজ ছিলেন মাছ ব্যবসায়ী। বাড়ি বাড়ি গিয়ে তিনি মাছ বিক্রয় করতেন। আর ইলিয়াস ছিলেন কাতার প্রবাসী। চার মাসের জন্য দেশে ইলিয়াস বাড়িতে এসেছিলেন। সোমবার কাতার ফেরার ফ্লাইট ছিল তাঁর। কিন্তু শারীরিক অসুস্থতার কারণে কাতারের নিজ কর্মস্থলে ফেরা হয়নি ইলিয়াসের। তাকে বিমান বন্দর থেকে ফেরত দেয়া হয়। কাতার ফিরতে না পারায় বিমানের ফ্লাইটের সময় বাড়িয়ে নিজের গ্রামের বাড়িতে ফিরতে চেয়েছিলেন তিনি। কিন্তু বাড়িতে ফেরার পথে ইলিয়াসের সঙ্গে থাকা বড় ভাই মো. মফিজ, ছোট বোন মিনুয়ারা ও ছেলে ইনানসহ চারজনই সড়ক দুর্ঘটনায় প্রাণ হারিয়েছেন। অনিশ্চয়তা ও আতঙ্কে এখন তাদের পরিবারে।
ঘটনাটি ঘটে সোমবার ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের নারায়ণগঞ্জের সোনারগাঁও উপজেলার টিপুরদীতে। সড়কে দাঁড়িয়ে থাকা লরির পেছনে একটি যাত্রীবাহী বাসের ধাক্কায় প্রাণ হারান তারা।
ওই দুর্ঘটনায় ১০জন নিহতের মধ্যে একই পরিবারের ছিলেন চারজন। তাদের বাড়ি কুমিল্লা জেলার চান্দিনা উপজেলার জোয়াগ ইউনিয়নের ভারেরা গ্রামে। তাঁরা হলেন কাতার প্রবাসী মো. ইলিয়াস (৩৮), তাঁর বড় ভাই মফিজ (৪৭), বোন মিনুয়ারা (৫০) ও ইলিয়াসের ছেলে ইনান (৮)। এতে আহত হয়েছিলেন ইলিয়াসের ছোট ভাই জাহাংগীর (২৮) ও ছেলে রাজু (২০)। তাকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছিল। জাহাংগীরের নিহত তিন ভাই বোন ও ভাতিজার সাথে তাকেও বাড়িতে নিয়ে আনা হয়। আজ তাকে কুমিল্লা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসার জন্য ভর্তি করা হয়েছে। তবে ডাক্তাররা বলছে আশঙ্কাজনক জাহাংগীর বেঁচে থাকার কোন লক্ষণ নেই।
এদিকে স্বামী ও সন্তান হারিয়ে জেসমিন আক্তার পাগল হয়ে গেছেন। জেসমিন কাতার প্রবাসী নিহত ইলিয়াসের স্ত্রী। তিনি এক বুক শোক নিয়ে বলেন, আমি অসহায়, আমার কেউ নেই। সব হারিয়ে ফেলেছি। আমার বাকী দুই সন্তান নিয়ে আমি কিভাবে চলবো?
চান্দিনা জোয়াগ ইউনিয়নের চেয়ারম্যান মেহেদী হাসান তালুকদার বলেন, খেটে খাওয়ার পরিবারের সন্তান মফিজ ও ইলিয়াস। ভারের গ্রামের মৃত লতিফ মিয়ার ছেলে তারা। বেশ কয়েক বছর পূর্বে তাদের মা ও বাবা মারা গেছেন। তারা পাঁচ ভাই ও তিন বোন। তার মধ্যে গেল কয়েক বছর পূর্বে পাঁচ ভাইয়ের মধ্যে সবার বড় ফুল মিয়া ক্যান্সারে আক্রান্ত হয়ে মারা যান। ফুল মিয়ার পরের জন হচ্ছে মো. মফিজ। মা-বাবা ও বড় ভাই হারা ভাইবোনদের দেখা শুনা করতেন মফিজ। তিনি গ্রামের বাড়ি বাড়ি গিয়ে মাছ ব্যবসা করে পরিবার চালাতেন। এর পরের জন হচ্ছেন ইলিয়াস। তিনি কাতারে থাকতেন। চার মাসের ছুটি নিয়ে ইলিয়াস বাড়িতে আসেন। ছুটি শেষে ইলিয়াস তার ভাইবোন, ছেলে ও স্বজনদের নিয়ে ঢাকায় গিয়েছিলেন ইলিয়াস। শরীরিক অসুস্থতার কারণে কাতার যেতে না পেরে বড় ভাই মফিজ, দুই ছেলে ইনান ও রাজু, ছোট বোন মিনুয়ারা ও ভাই জাহাংগীরকে নিয়ে বাড়ি ফেরার পথে ইলিয়াসসহ তিন ভাইবোন ছেলে প্রাণ হারান। মফিজ ও ইলিয়াসকে হারিয়ে তাদের পরিবার আজ নিঃস্ব। নেমে এসেছে অনিশ্চয়তা ও আতঙ্ক।
তিনি বলেন, মঙ্গলবার ১১টায় নিজস্ব কবরস্থানে ইলিয়াসের সন্তান ও তিন ভাইবোনকে একই সাথে দাফন করা হয়েছে। নিহত পরিবারের মধ্যে শোকের ছায়া নেমে এসেছে। কেউ বাবা হারিয়ে, কেউ ছেলে হারিয়ে, কেউ বোন হারিয়ে। তাদের পরিবারের মধ্যে একমাত্র আশার আলো হচ্ছেন মফিজ ও ইলিয়াসের ছোট ভাই রিকশা চালক ইউনুস।
উল্লেখ্য, সোমবার দাঁড়িয়ে থাকা লরির পেছনে একটি যাত্রীবাহী বাসের ধাক্কায় নারায়ণগঞ্জের সোনারগাঁও উপজেলার টিপুরদী এলাকায় এ দুর্ঘটনা ঘটে। ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের এ দুর্ঘটনায় ঘটনাস্থলেই তিনজন ও হাসপাতালে আনার পর সাতজন নিহত হয়েছেন। তাদের মধ্যে ইলিয়াসরা চারজন।