মঙ্গল্বার ২৫ †m‡Þ¤^i ২০১৮


কুমিল্লার দুই শতাধিক অবৈধ লেভেলক্রসিং এখন ‘মরণ ফাঁদ’


আমাদের কুমিল্লা .কম :
04.03.2018

আবদুর রহমান।। পূর্বাঞ্চলীয় রেলওয়ের প্রবেশদ্বার হিসেবে পরিচিত কুমিল্লার লাকসাম রেলওয়ে জংশনের আওতাধীন এলাকার পরিমাণ ১৮৪ কিলোমিটার। ঢাকা-লাকসাম-চট্টগ্রাম, লাকসাম-নোয়াখালী ও লাকসাম-চাঁদপুর রেলপথে মোট ১৮৪ কিলোমিটার এলাকা নিয়ন্ত্রণ করে লাকসাম রেলওয়ে থানা পুলিশও। এই বিশাল রেলপথ এলাকায় রয়েছে দুই শতাধিক লেভেলক্রসিং। যদিও স্থানীয় সূত্রের দাবি এই সংখ্যা দ্বিগুণেরও বেশি হবে। তবে লেভেলক্রসিংয়ের সঠিক কোন হিসেব নেই স্বয়ং রেলওয়ে কর্তৃপক্ষের কাছেও।
এদিকে, সবচেয়ে আশ্চর্যের বিষয় হলো হাতেগোনা কয়েকটি ছাড়া এসব লেভেলক্রসিংগুলোর প্রায় ৯০ শতাংশই অনুমোদনহীন এবং অবৈধ। সাধারণ মানুষের কাছে এসব অবৈধ লেভেলক্রসিংগুলো এখন এক একটি ‘মরণ ফাঁদ’ হিসেবেই পরিচিত হয়ে উঠেছে। বর্তমানে এই মরণ ফাঁদে কাটা পড়ে অকালে প্রাণ দিতে হচ্ছে বহু সাধারণ মানুষেকে। গত দুই বছরে এই প্রাণ হারানোর সংখ্যা অন্তত একশ হবে বলে জানা গেছে। সর্বশেষ গত সোমবার লাকসাম পৌর শহরের ফতেপুর এলাকায় গেটম্যানবিহীন একটি লেভেলক্রসিংয়ে ডেমু ট্রেনের ধাক্কায় এই মৃত্যুর মিছিলে যোগ দিতে হয়েছে অটোরিকশা চালক মো.হৃদয় মিয়াকে (৩০)। এদিকে অবৈধ এসব লেভেলক্রসিংয়ে গেট নির্মাণ ও গেট ম্যান নিয়োগের দাবি দীর্ঘদিনের হলেও এই সমস্যা সমাধানে রেলওয়ে কর্তৃপক্ষের তেমন কোন সাড়া নেই বলে অভিযোগ করেছেন সাধারণ মানুষ।
লাকসাম রেলওয়ে থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো.ওসমান গণি পাঠান জানিয়েছেন, ঢাকা-চট্টগ্রাম রেলপথে লাকসাম থেকে কুমিল্লার সীমান্ত এলাকা শালদা নদী ও লাকসাম থেকে ফেনী এবং লাকসাম-নোয়াখালী রেলপথে নেয়াখালী আর লাকসাম-চাঁদপুর রেলপথে চাঁদপুরের আউটার সিগন্যাল পর্যন্ত সর্বমোট ১৮৪ কিলোমিটার রেলপথ এলাকা আমাদের আওতাধীন। তবে এর মধ্যে ঠিক কতগুলো লেভেলক্রসিং রয়েছে এর সঠিক কোন হিসেবে আমাদের কাছে নেই।
তবে লাকসাম রেলওয়ে জংশন ও রেলওয়ে থানা একাধিক সূত্র জানায়, লাকসাম রেলওয়ে জংশনের আওতাধীন ঢাকা-লাকসাম-চট্টগ্রাম রেলপথে ৬৮টি, লাকসাম-চাঁদপুর রেলপথের আউটার সিগন্যাল পর্যন্ত একটি এবং লাকসাম-নোয়াখালী রেলপথে ৪৮টিসহ সর্বমোট ১১৭টি লেভেলক্রসিংয়ের হিসেবে রয়েছে রেলওয়ে কর্তৃপক্ষের কাছে। এর মধ্যে মাত্র ৩৪টি লেভেলক্রসিং বৈধ। তবে বৈধ এই ৩৪টি লেভেলক্রসিংয়ের বেশ কয়েকটিতেও নেই গেট ও গেটম্যান। রেলওয়ে কর্তৃপক্ষ এসব স্থানে নিজ দায়িত্বে পারাপারের জন্য সতর্কবার্তা লিখে সাইনবোর্ড ঝুলিয়ে দিয়েছেন। তবে অরক্ষিত কয়েকটি রেলক্রসিংয়ে সতর্কবার্তা সাইন বোর্ড দিলেও থামছে না দুর্ঘটনা। এক শ্রেণির অসাধু ব্যক্তি রেললাইনের লেভেলক্রসিং সংলগ্ন ভূমি অবৈধভাবে দখল করে বাড়িঘর, দোকানপাট নির্মাণ করায় পথচারী বা যানবাহন চালকদের ট্রেন চলাচল চোখে পড়ছে না। এ কারণে রেলক্রসিং দিয়ে চলাচল করতে গিয়ে পথচারী বা যানবাহন চালকরা প্রতিনিয়ত প্রাণ হারাচ্ছেন। এছাড়া অনেক ক্ষেত্রে নিজেদের অসাবধানতার জন্যও অবৈধ এসব লেভেলক্রসিংগুলোতে প্রাণহানীসহ বিভিন্ন যানবাহন দুর্ঘটনার কবলে পড়ছে।
এদিকে, সূত্রে জানা গেছে, ২০১৫ সালের ১৮ এপ্রিল থেকে ঢাকা-চট্টগ্রাম রেলপথের লাকসাম থেকে চিনকি আস্তানা পর্যন্ত ডাবল রেললাইনে ট্রেন চলাচল শুরু করেছে। বর্তমানে ওই রেলপথে আগের চেয়ে অনেক দ্রুত সময়ে ও গতিতে ট্রেন চলাচল করছে। ৬১ কিলোমিটার দীর্ঘ ডাবল এই রেলপথে হাতেগোনা কয়েকটি ছাড়া বেশিরভাগ লেভেলক্রসিংগুলোতে কোন গেট নেই। এতে এলাকার পথচারীরা বড় ধরনের দুর্ঘটনার আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন। কারন ওই রুটে ট্রেনের গতি আগের চেয়ে বর্তমানে অনেক বেশি।
লাকসাম-চিনকি আস্তানা ডাবল রেলপথে নাঙ্গলকোট পৌর বাজারে অবস্থিত অবৈধ লেভেলক্রসিং দিয়ে নিয়মিত চলাচলকারী বিল্লাল হোসেন রিয়াজ ও মো.দুলাল মিয়াসহ এলাকার বেশ কয়েকজন ব্যবসায়ী ও পথচারী জানান, এই লেভেলক্রসিং দিয়ে প্রতিদিন কয়েক হাজার যানবাহন চলাচল করে। এছাড়া কোমলমতি শিশু, স্কুল-কলেজ ও মাদ্রাসার শিক্ষার্থীরা আসা-যাওয়া করে। কিন্তু দীর্ঘদিনের দাবি থাকা সত্ত্বেও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এই লেভেলক্রসিংয়ে এখনো কোন গেট নির্মাণ বা গেটম্যান নিয়োগ করা হয়নি। অথচ কিছু দিন পর পরই এখানে ট্রেনে কাটা পড়ে মানুষ মরছে।
লাকসামের আজগরা এলাকার বাসিন্দা মো.সাইফুল ইসলাম বলেন, আমাদের এলাকায় দু’টি লেভেলক্রসিং রয়েছে। তবে এগুলোর একটিরও গেট ও গেটম্যান নেই। তাই এ স্থানে প্রতিনিয়ত দুর্ঘটনা ঘটছে।
নাম প্রকাশ না শর্তে লাকসাম রেলওয়ে জংশন এলাকার বেশ কয়েকজন বাসিন্দা জানান, লাকসাম রেলওয়ের পক্ষ থেকে বিভিন্ন সময় দেড়শ বা দুইশ লেভেলক্রসিংয়ের কথা বলা হলেও বাস্তবে এর সংখ্যা দ্বিগুণেরও বেশি। সব মিলিয়ে পাঁচশ এর কম হবে না। আবার অনেকক্ষেত্রে দেখা গেছে মানুষ নিজেদের সুবিধার্থেই রেললাইনের ওপর দিয়ে রাস্তা বানিয়ে চলাচল শুরু করেছেন। যার কারণে এই সংখ্যা আরো বাড়ছে।
অনুসন্ধানে দেখা গেছে, গত বছরের ১ এপ্রিল ঢাকা-চট্টগ্রাম রেলপথে নাঙ্গলকোটের হাসানপুর স্টেশন এলাকার অবৈধ লেভেলক্রসিংয়ে ট্রেনে কাটা পড়ে মাওলানা হাছান আহমেদ (৩৭) নামে এক মাদ্রাসা শিক্ষক নিহত হয়েছেন। একই বছরের ১৭ মার্চ নাঙ্গলকোট পৌর বাজারে অবৈধ লেভেলক্রসিং পারাপারের সময় ট্রেনের ইঞ্জিনের নিচে কাটা পড়ে আবদুল আলীম (৪৫) এবং আবুল কাসেম (৫০) নামে দুই পথচারীর মর্মান্তিক মৃত্যু হয়েছে। ওই বছরের ১৪ মার্চ চৌদ্দগ্রামের গুণবতী এলাকার অবৈধ লেভেলক্রসিং পারাপারের সময় চলন্ত ট্রেনের নিচে কাটা পড়ে অজ্ঞাত (২৮) এক যুবকের নিহত হয়। ওই বছরের ৩ এপ্রিল নাঙ্গলকোটে অবৈধ লেভেলক্রসিং পার হতে গিয়ে ট্রেনের নিচে কাটা পড়ে মিনি বেগম (৪০) নামে এক মহিলার মৃত্যু হয়। ১৭ আগস্ট নাঙ্গলকোটে অবৈধ লেভেলক্রসিংয়ে ট্রেনের ধাক্কায় আমির হোসেন অনু (২৫) নামে এক অটোরিকশা চালকের মৃত্যু হয়েছে। ওই বছরের ২ নভেম্বর লাকসাম রেলওয়ে জংশনের পাশে ট্রেনে কাটা পড়ে মো.শওকত (২৫) নামে এক যুবকের মৃত্যু হয়। সর্বশেষ গত সোমবার ২৬ ফেব্রুয়ারি লাকসাম পৌর শহরের ফতেপুর এলাকায় গেটম্যানবিহীন লেভেলক্রসিংয়ে ডেমু ট্রেনের ধাক্কায় অটোরিকশা চালক মো.হৃদয় মিয়ার (৩০) মর্মান্তিক মৃত্যু হয়েছে।
অনুসন্ধানে আরো জানা গেছে, এগুলো গত বছর ঘটে যাওয়া দুর্ঘটনার সিকিভাগ মাত্র। আর গত দুই বছরে শুধুমাত্র লাকসাম রেলওয়ের আওতাধীন এলাকাতেই এই সংখ্যা কমপক্ষে একশ হবে। কারণ অনেক সময় দেখা দুর্ঘটনা বা হতাহতের খবরও রেলওয়ে পুলিশের কাছে এসে পৌঁছায় না। স্থানীয়রা নিজেরাই লাশ উদ্ধার করে দাফন করে ফেলেন।
গত বুধবার এ প্রসঙ্গে জানতে লাকসাম রেলওয়ে জংশনের পরিবহন পরিদর্শক মো.আবু তাহেরের মুঠোফোনে একাধিকবার ফোন করা হলে তিনি রিসিভ করেন। এরপর এই প্রতিবেদকের পরিচয় পেয়ে ব্যস্ত রয়েছেন বলে ফোনের লাইনটি কেটে দেন তিনি।
তবে লাকসাম রেলওয়ে থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মো.ওসমান গণি পাঠান বলেন, আমরা প্রতিটি মিটিংয়ে বিষয়টি তুলে ধরছি। রেলওয়ে কর্তৃপক্ষ আমাদের আশ্বাস দিয়েছেন শীঘ্রই এ সমস্যার সমাধান হবে। তিনি জানান, যদি প্রতিটি বা গুরুত্বপূর্ণ লেভেলক্রসিংগুলোতে গেট নির্মাণ করে গেটম্যান নিয়োগ দেওয়া হয় তাহলে এসব দুর্ঘটনা ও প্রাণহানী শূন্যের কোঠায় নিয়ে আসা অসম্ভবের কিছু নয়।