শনিবার ২১ জুলাই ২০১৮
  • প্রচ্ছদ » sub lead 2 » ভোটারদের কেন্দ্রে যেতে দেয়নি বহিরাগত ক্যাডাররা, প্রকাশ্যে নৌকায় সিল!


ভোটারদের কেন্দ্রে যেতে দেয়নি বহিরাগত ক্যাডাররা, প্রকাশ্যে নৌকায় সিল!


আমাদের কুমিল্লা .কম :
30.03.2018


আবদুর রহমান/ মাসুদ আলম।। প্রায় ২০ বছর ৪ মাস পর আজকে (গতকাল) আমাদের ইউনিয়নে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হচ্ছে। দীর্ঘ দুই দশকের বেশি সময় ধরে মামলা সংক্রান্ত জটিলতার কারণে আমাদের এই ইউনিয়নে কোন নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়নি। যার কারণে আমরা সব সময় অবহেলিত ছিলাম। ভেবেছিলাম আজকে অন্তত নিজের ভোটটা প্রয়োগের মাধ্যমে দুই দশকের এই কষ্টকে দূর করবো। এজন্য সকাল সকাল ঘর থেকে বের হয়েছিলাম। ভোট শুরুর ঠিক ১০ মিনিট আগে কেন্দ্রের সামনেও পৌঁছেছি। কিন্তু নিজের ভোট দেওয়া-তো দূরের কথা সেখানে থেকে কোন রকমে নিজের প্রাণটা বাঁচিয়ে ফিরে এসেছি। কারণ ভোট দিতে যাওয়ার কারণে কয়েক শ’ বহিরাগত সন্ত্রাসী দেশীয় অস্ত্র (রামদা) ও লাঠি নিয়ে আমার মতো সকল ভোটারদের ধাওয়া করেছে। যার কারণে বাধ্য হয়ে প্রাণ বাঁচাতে সকল ভোটাররাই পালিয়ে এসেছে। গতকাল বৃহস্পতিবার সকাল ৮টা ১০ মিনিটের সময় এভাবেই কথাগুলো বলছিলেন কুমিল্লা বরুড়া উপজেলার দক্ষিণ শিলমুড়ি ইউনিয়নের লগ্নসার গ্রামের গৃহবধূ লিপি আক্তার।
দীর্ঘ ২০ বছর পর গতকাল বৃহস্পতিবার দক্ষিণ শিলমুড়ি ইউনিয়ন পরিষদের নির্বাচনে অনুষ্ঠিত হয়েছে। এ নির্বাচনে নৌকা প্রতীকে হাজী ফারুক হোসেন ভূঁইয়া, ধানের শীষ প্রতীকে মো.শাহ আলম, নাঙ্গল প্রতীকে খোরশেদ আলম ও স্বতন্ত্র প্রার্থী সেলিম মিয়া আনারাস প্রতীক নিয়ে চেয়ারম্যান পদে লড়ছেন। ওই ইউনিয়নের ৯ নম্বর ওয়ার্ডের ভোট কেন্দ্র ছিলো লগ্নসার সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে। তবে ওইদিন সকালে কেন্দ্রে গিয়ে ভোট দিতে না পেরে লিপি আক্তারের মতো কয়েক শ’ নারী-পুরুষ অবস্থান নেয় ভোট কেন্দ্রে থেকে প্রায় ২’শ মিটার দূরে লগ্নসার গ্রামের মধ্যপাড়া মালি বাড়ির সামনে।
সরেজমিনে ওইদিন সকাল ৮টার দিকে লগ্নসার সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় ভোট কেন্দ্রে গিয়ে দেখা যায়, ভোটারদের লাইনগুলো পুরোপুরি ফাঁকা। তবে কেন্দ্রের সামনে ও প্রবেশপথগুলোতে প্রায় আড়াই শতাধিক কিশোর ও যুবক অবস্থান নিয়ে দাঁড়িয়ে রয়েছে। তারা কোন ভোটারকে কেন্দ্রে প্রবেশ করতে দিচ্ছে না। বিভিন্নভাবে ভয়ভীতি প্রদর্শন করে ভোটারদের কেন্দ্র থেকে চলে যেতে বাধ্য করা হচ্ছে। এই বিষয়ে জানতে চাইলে ওই কেন্দ্রের প্রিজাইডিং অফিসার মো.আবদুল মান্নান বলেন, ‘তাঁরা (ভোটাররা) এখনো আসেনি। মাত্র ভোট গ্রহণ শুরু হচ্ছে, একটু পরেই দেখবেন সবাই আসা শুরু করেছে’।
তবে সকাল ৮টা ১০ মিনিটের সময় ভোট কেন্দ্রে থেকে প্রায় ২’শ মিটার দূরে লগ্নসার গ্রামের মধ্যপাড়া মালি বাড়ির সামনে সাফু মিয়ার চায়ের দোকানের সামনে গিয়ে দেখা গেছে ভিন্ন চিত্র। সেখানে ধানের শীষ প্রতীকের চেয়ারম্যান প্রার্থী মো.শাহ আলম, ৯ নম্বর ওয়ার্ডে ফুটবল প্রতীকের মেম্বার প্রার্থী মো.শাহ আলম লিটনসহ কয়েক শ’ নারী-পুরুষের জটলা। এদের মধ্যে নৌকা ছাড়া অন্য চেয়ারম্যান প্রার্থীদের এজেন্টরাও রয়েছে। তবে নৌকা ছাড়া অন্য কোন চেয়ারম্যান প্রার্থী ও তাঁদের এজেন্টদেরকে কেন্দ্রে প্রবেশ করতে দেওয়া হয়নি বলে অভিযোগ করেছেন উপস্থিত ওই দু’জন প্রার্থী।
এ সময় লগ্নসার গ্রামের সাধারণ ভোটার জাকির হোসেন, আলী হোসেন, ফরিদ মিয়া, মাওলানা দেলোয়ার হোসেন, ফজিলতুর নেছা, লিপি আক্তারসহ অন্তত ২০ জন অভিযোগ করেন, নৌকা প্রতীকের প্রার্থী বহিরাগত শত শত সন্ত্রাসী এনে কেন্দ্রের চার পাশে মজুদ করে রেখেছেন। কোন ভোটারকে কেন্দ্রে যেতে দেওয়া হচ্ছে না। কেন্দ্রের বাইরে একদল সন্ত্রাসী দাঁড়িয়ে আছে, আর ভিতরে আরেকদল প্রকাশ্যে নৌকা প্রতীকে সিল মারছে। ২০ বছর ধরে ইউপি নির্বাচনে ভোট দিতে পারিনি। এবারো পারলাম না।
ওইদিন সকাল ৯টার দিকে ইউনিয়নের শিলমুড়ি আর আর উচ্চ বিদ্যালয় কেন্দ্রে গিয়েও দেখা গেছে প্রায় একই অবস্থা। লাইনে হাতেগোনা কয়েকজন নারী ও পুরুষ দাঁড়িয়ে রয়েছে আর কেন্দ্রের সামনে শত শত বহিরাগত ক্যাডার। ওই কেন্দ্রের ৬ নম্বর বুথে গিয়ে দেখা যায় ওই ইউপির সদ্য বিদায়ী চেয়ারম্যান বিল্লাল হোসেন নিজেই তার লোকদের বলছেন প্রকাশ্যে নৌকায় সিল মারতে। এ সময় কুমিল্লার কয়েকজন গণমাধ্যমকর্মীও সেখানে উপস্থিত ছিলো। তবে ওই কেন্দ্রের প্রিজাইডিং অফিসার রবিউল রানার দাবি নির্বাচন পুরোপুরি সুষ্ঠু হচ্ছে।
সকাল ১০টার দিকে ওই ইউনিয়নের জয়াগ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় কেন্দ্রে গিয়ে দেখা গেছে, নৌকা প্রতীকের চেয়ারম্যান প্রার্থী হাজী ফারুক হোসেন ভূঁইয়া তার নেতাকর্মীদের নিয়ে কেন্দ্রের সামনে অবস্থান নিয়েছেন। ওই কেন্দ্রের ৪ নম্বর বুথে গিয়ে দেখা যায় পোলিং অফিসার ফজলু মিয়া নিজেই প্রকাশ্যে নৌকায় সিল মারছেন। আর অন্য বুথগুলোতেও ভোটারদের চেয়ারম্যান পদের ব্যালট দেয়া হচ্ছে না। আর সব বুথেই নৌকায় চলছে প্রকাশ্যে সিল। তবে ওই কেন্দ্রের প্রিজাইডিং অফিসার মাসুদ ইবনে হোসাইন এসব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন।
সকাল ১১টার দিকে ওই ইউপির মাটিয়ারা মাদ্রাসা কেন্দ্রে গিয়ে দেখা যায়, বেশ কিছু মহিলা লাইনে দাঁড়িয়ে থাকলেও পুরষের লাইনগুলো একেবারেই শূন্য। সেখানেও চলছে একই অবস্থায় সিল মারা। এখানেও হঠাৎ এসে অবস্থান নেন নৌকা প্রতীকের প্রার্থী।
বেলা সাড়ে ১১টার দিকে আমড়াতলী উচ্চ বিদ্যালয় কেন্দ্রে গিয়ে দেখা গেছে আরো ভয়াবহ দৃশ্য। সবগুলো বুথেই যেন প্রকাশ্যে নৌকায় সিল মারার উৎসব চলছে। এ সময় একটি বুথের প্রকাশ্যে সিল মারার ছবি তুলতে গেলে বহিরাগত কয়েকজন সন্ত্রাসী সাংবাদিকদের উপর হামলার চেষ্টা চালান। এ সময় তাঁদের ক্যামেরাও ছিনিয়ে নেওয়ার চেষ্টা চালায় ওই সন্ত্রাসীরা। পরে দ্রুত সাংবাদিকরা ঘটনাস্থল ছেড়ে চলে আসেন।
এছাড়া ওইদিন দুপুর ২টা পর্যন্ত সরেজমিনে ওই ইউনিয়নের সুন্দরদুল কেন্দ্র, মাটিয়ারা কেন্দ্র, বাঁশপুর কেন্দ্র, চেংহাটা কেন্দ্রসহ প্রায় সব ক’টি কেন্দ্রেই সরেজমিনে গিয়ে একই ধরনের দৃশ্য দেখা গেছে।
ধানের শীষ প্রতীকের চেয়ারম্যান প্রার্থী মো.শাহ আলম অভিযোগ করেন, সবগুলো কেন্দ্রই বহিরাগত সন্ত্রাসীদের দিয়ে দখল করে প্রকাশ্যে নৌকায় সিল মারা হয়েছে। একটি কেন্দ্রেও আমার এজেন্টদের যেতে দেওয়া হয়নি। সাধারণ ভোটাররা দীর্ঘ ২০ বছর পর ভোট দিতে গিয়েও তাদের ভোটাধিকার প্রয়োগ করতে পারেনি। আমি সকাল থেকে বিষয়গুলো বার বার প্রশাসনকে জানিয়েছি। কিন্তু তাতে কোন লাভ হয়নি। উল্টো পুলিশসহ প্রশাসনের লোকেরাই নৌকায় সিল মারতে সাহায্য করেছে। যার কারণে নির্বাচন বর্জন করেছি সকাল ১১টার দিকে।
তবে মাটিয়ারা মাদ্রাসা কেন্দ্রে এসব অভিযোগ অস্বীকার করে নৌকা প্রতীকের চেয়ারম্যান প্রার্থী হাজী ফারুক হোসেন ভূঁইয়া সাংবাদিকদের বলেন, আমি সকাল থেকে প্রশাসনকে বার বার বলেছি শান্তিপূর্ণ পরিবেশে ভোট গ্রহণের জন্য। জনগণ যাকে রায় দেয় আমি তা মাথা পেতে নিবো। আর আমাদের কোন বহিরাগত সন্ত্রাসী বা ক্যাডার আনার অভিযোগ সম্পূর্ণ মিথ্যা। প্রতিটি কেন্দ্রেই আমাদের নেতাকর্মীরা দলীয় প্রার্থীর পক্ষে কাজ করেছে। এর বেশি কিছু নয়।
এই বিষয়ে জানতে চাইলে ওই নির্বাচনে রিটার্নিং আফিসারের দায়িত্বে থাকা উপজেলা নির্বাচন কর্মকর্তা মোহাম্মদ আজহারুল ইসলাম বলেন, আমি যখনই কোন অভিযোগ পেয়েছি। সাথে সাথেই এর ব্যবস্থা নিয়েছি। নির্বাচন সুষ্ঠু হচ্ছে।
জেলা নির্বাচন কর্মকর্তা মো.খোরশেদ আলম মুঠোফোনে জানান, কেন্দ্রে ভোটারদের উপস্থিতি কিছুটা কম থাকলেও কোথাও বড় ধরণের কোন সমস্যা হয়নি। শান্তিপূর্ণভাবেই ভোটগ্রহণ চলেছে।
তিন বিএনপির প্রার্থীর ভোট বর্জন : এদিকে দক্ষিণ শিলমুড়ি ইউনিয়নের সঙ্গে গতকাল বরুড়ার শিলমুড়ি উত্তর ও খোশবাস দক্ষিণ ইউপিতে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছে। বহিরাগত ক্যাডার দিয়ে কেন্দ্র দখল, প্রকাশ্যে নৌকায় সিল, ভোটার ও এজেন্টদের কেন্দ্রে আসতে না দেওয়াসহ বিভিন্ন অভিযোগ ওই তিন ইউনিয়নের ধানের শীষ প্রতীকের প্রার্থীরা সকাল ১১টার দিকে উপজেলা রিটার্নিং কর্মকর্তার কার্যালয়ে এসে আনুষ্ঠানিকভাবে নির্বাচন বর্জন করেন। এরা হলেন; দক্ষিণ শিলমুড়িতে মো.শাহ আলম, শিলমুড়ি উত্তরে হাজী নুরুল হক ও খোশবাস দক্ষিণে আবদুর রব। ওই তিন প্রার্থী এ ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করেছেন।