শনিবার ২০ অক্টোবর ২০১৮
  • প্রচ্ছদ » sub lead 1 » লক্ষ লক্ষ টাকা নিয়ে কুমিল্লা থেকে আউট ফরেক্স আউটসোর্সিং


লক্ষ লক্ষ টাকা নিয়ে কুমিল্লা থেকে আউট ফরেক্স আউটসোর্সিং


আমাদের কুমিল্লা .কম :
15.07.2018

আবু সুফিয়ান রাসেল।।


আনলিমিটেড ডলার, ইউরো আর পাউন্ডসহ বিশে^র প্রধান প্রধান কারেন্সি লাভের লোভে চটকদার বিজ্ঞাপন দেখে আউটসোর্সিং করে অল্পদিনে কোটিপতি হওয়ার আশায় প্রতারিত হচ্ছে কুমিল্লার তরুণ-তরুণীরা। রাজধানীর বারিধারা এলাকার ৩৫ নং রোডের ৭৬নং বাড়িতে আউটসোর্সিং ব্যবসার নামে গ্রাহকের টাকা নিয়ে উধাও হয়ে যায় ওয়ার্ল্ড ওয়ে লিমিটেড। ঢাকার পর নারায়ণগঞ্জ জেলার সাইনবোর্ড এলাকার ভুইঘরের রুপায়ণ টাউন মার্কেটের ২য় তলায় লিমিটেড শব্দ বাদ দিয়ে শুধু ওয়ার্ল্ড ওয়ে নাম ধারণ করে আবার র্কাযক্রম শুরু করে কোম্পানিটি। সাধারণ মানুষের লক্ষ লক্ষ টাকা নিয়ে ২০১৭ সালের শেষ দিকে বন্ধ করে দেয় নারায়ণগঞ্জের সে অফিস।
২৮ জানুয়ারি রাত ২:১৪ মিনিটে সাগর (আবু কালাম আজাদের সাংকেতিক নাম) ০১৭০৩৯৮৮৯৯৯ নম্বর দিয়ে বিক্রয় ডট কম এ তার নারায়ণগঞ্জে ব্যবহৃত মালামালের বিজ্ঞাপন দেয়। এ বিজ্ঞাপনে ৭টি কম্পিউটার ও কম্পিউটার আসবাব, কম্পিউটার চেয়ার ২০টি, হাতল চেয়ার ২০টি, হোয়াইট বোর্ড ২টি, সোফাসহ নানা আসবাবের বিক্রির বিজ্ঞাপন দেয়।
২০১৭ সালের নভেম্বর মাসে কুমিল্লা পদুয়ার বাজার বিশ^রোডের হাকিম প্লাজার ৬ষ্ঠ তলায় ভাড়া অফিসে আবার ওয়ার্ল্ড ওয়ে আউটসোর্সিং ইন্সটিটিউট নাম ধারণ করে কার্যক্রম শুরু করে। কুমিল্লায় কোম্পানি চালু করার সাথে সাথে নগরীর অলিগলিতে নিয়োগ পোস্টারের পসরা দেখা যায়। এ পোস্টারে দেখা যায়, জরুরি নিয়োগ : ওয়ার্ল্ড ওয়ে আউটসোর্সিং ইন্সটিটিউট কোম্পানিতে বেশ কিছু পুরুষ/ মহিলা নিয়োগ দেওয়া হবে, আগ্রহী প্রার্থীগণ দুই কপি ছবি ও সিভিসহ সরাসরি যোগাযোগ করুন। শিক্ষাগত যোগ্যতা এসএসসি, অভিজ্ঞতার প্রয়োজন নেই। ঘরে বসে কাজ করা যাবে। মাসিক বেতন ১০ হাজার টাকা। এ বিজ্ঞাপন দেখে তরুণ-তরুণীরা চাকুরির জন্য গিয়েছে তখন ১০০টাকায় ফরম ফি, ৪ হাজার টাকা একাউন্ট ফি আদায় করা হয়েছে। তারপর গ্রাফিক্স আর আউটসোর্সিং শিখার জন্য দিতে হবে ১০ হাজার টাকা। আর এ ১০ হাজার টাকার দেওয়ার জন্য কোম্পানির একটি লিপলেটে যুক্তি দাঁড় করিয়েছে এমন। ধরুন আপনি মাছ চাষ করবেন, তা সম্পর্কে ভালোমত না জানেন, তাহলে কি কখনো লাভ করতে পারবেন? তাই ফরেক্সে টাকা ইনকাম করতে হলে আপনাকে ট্রেনিং করতে হবে, আর ট্রেনিং ফি হলো ১০ হাজার টাকা। ট্রেনিংয়ের পর কাজ হলো প্রতিমাসে কমপক্ষে ১০টি ৪ হাজার টাকার একাউন্ট চালু করা। আর প্রতি একাউন্ট থেকে পাবে ১ হাজার করে ১০ হাজার টাকা। এটাই তার বেতন। আর এ পদ্ধতি হলো যুবক-যুবতীদের জন্য।
আর বয়স্ক আর ব্যস্ত মানুষের জন্য হলো ফরেক্স আর্থ ডট নেট। এখানে একাউন্ট ভর্তির জন্য জমা দিতে হবে ৫০ ডলার। ইন্টান্ডার্ড একাউন্টের জন্য দিতে হবে ১৫০০ ডলার, মিনি একাউন্ট ইনভেস্ট ৬২৫ ডলার, মাইক্রো একাউন্ট ইনভেস্ট ১২৫ ডলার । যখন কেউ একটি একাউন্ট চালু করেছে তখন অধিক লাভের প্রলোভনে ৩টি, ৫টি, ৭টি একাউন্ট চালু করার জন্য বুঝানো হয়েছে । কোটবাড়ি বিশ^রোড এলাকার রনি নামের একলোক জানান, তার ভাগিনা ৩ লক্ষ টাকা জমা দিয়েছে, ৭ মাসে ৫লক্ষ টাকা পাওয়ার জন্য, কিন্তু এখন অফিস বন্ধ, ডিরেক্টরের মোবাইল নম্বর ও বন্ধ। নাম প্রকাশ না করো দুইজন জাানান তারা একজন তিন লাখ, আর এজজন এক লাখ ত্রিশ হাজার টাকা জমা দিয়েছিল। একজন সদস্য হওয়ার পর অন্যজনকে সদস্য করতে হবে। তাহলে পাবে তার থেকে বিশেষ কমিশন।এ কমিশন দেওয়া হবে এমএলএম নিয়মানুসারে। সরেজমিনে দেখা যায়, কোম্পানির ৩টি কক্ষের দুইটিতে তালা দেওয়া অন্য একটিতে তালা ভেঙে স্থানীয় প্রভাবশালী গ্রহকরা চেয়ার, টেবিল, কম্পিউটারসহ আসবাব ভাগাভাগি করে নিচ্ছে।
মাজলুম গ্রাহকরা কেন প্রশাসনের নিকট অভিযোগ করে না? এমন প্রশ্নে একাধিক গ্রহকের অভিমত হলো আট-দশ হাজার টাকা হারিয়ে গেছে। এখন যদি থানা পুলিশ ডাকি তাহলে আরো কয়েকগুণ টাকা খরচ হবে। আর যারা কয়েক লক্ষ টাকা ইনস্টেষ্ট করেছেন, তাদেরও অভিযোগ করতে অনীহা। কারণ তারাই কমিশনের লোভে একজন অন্যজনকে কয়েকগুণ টাকার আশা দিয়ে এখানে টাকা জমা দেওয়ার জন্য বলেছিল। মো. আবু তাহের নামে এক ব্যক্তি বলেন, চোরকে ধরতে গেলে দৌড়াতে হবে। দৌড়াতে যেমন কষ্ট, ধরতেও তেমন কষ্ট।
এ কোম্পানি যেখানেই কাজ শুরু করেছে কোম্পানির নামের আগে পরে নতুন শব্দ যোগ করেছে। ঢাকায় ওয়াল্ডর্ ওয়ে লিমিটেড, নারায়ণগঞ্জে ওয়ার্ল্ডওয়ে , কুমিল্লায় ওয়াল্ড ওয়ে আউটসোসিং ইন্সটিটিউট নামে কার্যক্রম করে কোম্পানিটি।
উপরোক্ত সকল কিছুর মূলহোতা আবুল কালাম আজাদ। এ বিষয়ে গত দশদিনে তার সাথে মোবাইলে যোগাযোগ করা যায়নি, তার নম্বর বন্ধ। ঢাকায় তার মোবাইল নম্বর ছিল ০১৬৮১৩০১৪৩১, নারায়ণগঞ্জে ০১৭০৩৯৮৮৯৯৯, কুমিল্লায় ০১৯৭৩৯৮৮৯৯৯ এই নম্বরগুলি সে ভিজিটিং কার্ড ও পোস্টারে ব্যাবহার করেছে। যখন সে অফিস পরিবর্তন করেছে সাথে সাথে পরিবর্তন করেছে কোম্পানির নাম ও মোবাইল নম্বর। টিন সার্টিফিকেট, পাসপোর্ট ও জাতীয় পরিচয় পত্র অনুযায়ী তার নাম আবুল কালাম আজাদ পিতা, ইসরাফিল গাজী, মাতা, আলেয়া বেগম, গ্রাম চাঁনপুর, ডাকঘর মদনপুর, থানা বন্দর, জেলা নারায়ণগঞ্জ। আর বর্তমান ঠিকানায় দেওয়া হয়েছে, হাউজ ১৫, রুপায়ণ টাউন, ফতুল্লা নারায়ণগঞ্জ। তার জাতীয় পরিচয় পত্র ১৯৫০৭৫২৫৫৮ ও পাসপোর্টে ৪২৫৪৪৮০/১৯৮২৬৭১৫৮৭৯৩৫৭৫০৭ নামের অংশ বিশেষ অমিল রয়েছে। তবে উভয়ে জন্ম তারিখ ১ মে ১৯৮২ ।
তিয়ানশি (বাংলাদেশ) কো. লি. এর সাবেক ৮ স্টার কাজী মোতালেব, যিনি ২০১৫ সালে নতুন মার্কেটিং প্লান আসলে আপলাইন থেকে ধোকা খেয়ে এবং কোম্পানির ভুয়া আশা পদত্যাগ করেন। ২০১৭ সালে তার সাথে ফেসবুকে পরিচয়ের মাধ্যমে কুমিল্লায় আসে ওয়ার্ল্ডওয়ের মালিক আবু কালাম আজাদ ওরূপে সাগর। একই বছর নভেম্বর মাসে দুজন ব্যবসা শুরু করে, ২০১৮ সালের মার্চে এসে টাকার ভাগ নিয়ে উভয়ের মধ্যে ফাটল তৈরি হয়। তখন কাজী মোতালেব এ কোম্পানি থেকে চলে যায়।

এ বিষয়ে কাজী মোতালেব মোবাইলে জানান, আমার কপাল মন্দ, তিয়ানশি করেছি লস খাইছি, নিজেরা ফরেক্স করলাম লস খাইলাম। এ কোম্পানির এ টু জেড সাগর ভাই (আবু কালাম আজাদ) নিয়ন্ত্রণ করতো। গতবছর নভেম্বর মাসে কুমিল্লায় শুরু করেছি ভালো উদ্দ্যেশ নিয়ে, সে যে বাটপারি করবে তা কে জানে? আপনারা এ বিষয়টা নিয়ে তার সাথে কথা বলতে পারেন।
ভিক্টোরিয়া কলেজ বাংলা বিভাগের ছাত্রী জান্নাতুল ফেরদাউস জানান, তার এক বান্ধবীর কথা শুনে সে চাকরির জন্য আবেদন করে। কিন্তু ধারাবাহিকভাবে টাকা চাওয়ায়, সে টাকা দিতে রাজি হয়নি। নতুন চৌধুরীপাড়ার বাসিন্দা সালাম উদ্দিন জানান, আমার মেয়ে কার কথা শুনে সেখানে চাকরির জন্য আবেদন করে। বাসায় এসে বলে কিছু টাকা জামানত দিতে হবে। তখন আমি নিষেধ করে দেই, যে চাকরি টাকা দিয়ে নিতে হবে, এ চাকরির পক্ষে আমি নাই।
খেতাসার এলাকার বাসিন্ধা চট্টগ্রাম কলেজের ছাত্র সোহারব দাস জানায়, তারা বিভিন্ন অফার দিয়ে থাকে । বিজয় মাস, ভাষার মাস, বৈশাখী, ঈদসহ নানা অফার। আমি ফেব্রুয়ারি মাসে ভর্তি হয়ে ছিলাম, ৪০% অফারে। তারা বলেছিল ক্লাস শুরু হলে আমাকে কল দিবে, কিন্তু ৫ মাস হয়ে গেল একনো কল দেয়নি। এখন জানতে পারলাম কোম্পানি চলে গেছে।
কাজীপাড়া গ্রামের মো. রাকিবুল ইসলাম জানান, পদুয়ার বাজার, শ্রী ভল্ববপুর, কচুয়া চৌমুনী থেকে কান্দিরপাড়, ভিক্টোরিয়া কলেজ, সরকারি কলেজ, মহিলা কলেজসহ সবখানে তাদের পোস্টার আর পোস্টার। স্কুল-কলেজের সামনে এ বিজ্ঞাপন বেশি যেন স্কুল-কলেজের ছেলে-মেয়েরা সহজে ভর্তি হয়।
বিকেএমইএ এর কর্মকর্তা মোস্তাফিজুর রহমান জানান, আমার অফিসের ওপরের তলায় তাদের অফিস। একদিন গিয়ে কথা বলে ছিলাম, তারা আমাকে বললো এক লক্ষ টাকা ইনভেস্ট করার জন্য, পরে নাকি কয়েকগুণ পাবো। আমি প্রশ্ন করলাম আপনারা কীভাবে কাজ করেন? তারা বললো নিজেদের ওয়েবসাইট আছে। তখনি আমার সন্দেহ হয়, আমি আর টাকা জমা দেইনি।
হাকিম প্লাজার মালিক মো. জাহাঙ্গীর আলম জানান, ২০১৮ সালের জানুয়ারি মাস থেকে মে মাস পর্যন্ত তারা আমার ভবনের ৬ষ্ঠ তলাটি ভাড়া হিসাবে ব্যবহার করে। তারা ভাড়া নেওয়ার সময় আমাকে বলেছিল , এখানে নাকি তারা কম্পিউটার শিখাবে। কোম্পানির ট্রেড লাইন্সের কোন কপি আপনার নিকট আছে কিনা এমন প্রশ্নে তিনি বলেন, এটা তো আমার কাজ না। আমার টাকা দরকার ভাড়া দিছি, আমার ৫ মাসে কোন টাকা বাকি নাই। শেষ মাসে ভাড়া দেওয়ার সময় বলেছে, এখানে নাকি ছাত্র-ছাত্রী ভর্তি হয় না। তাই তারা বন্ধ করে দিয়েছে। মালিক জানুয়ারি মাস বললেও সে কোম্পানির অফিসিয়াল ফেসবুক পাতায় পদুয়ার বাজার বিশ^রোড অফিসের জন্য ২০১৭ সালের ১১ডিসেম্বর রাত ১১:১৪ মিনিটে নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করা হয়।
কুমিল্লা সিটি কর্পোরেশন (কুসিক) এলাকায় ব্যাবসা করার জন্য ওয়ার্ল্ডওয়ে আউটসোর্সিং ইন্সটিটিউট নামে কোন কোম্পানির অনুমোদন ছিল কিনা? এ বিষয়ে কুসিক ট্রেড লাইসেন্স বিষয়ক র্কমর্কতা মো. রবিউল হাসান রাসেল জানান, এই নামের কোন প্রতিষ্ঠান আমাদের নিকট ট্রেড লাইন্সের জন্য আবেদন করেনি। আমার জানা মতে কুসিক এ নামের কোন দোকানকে অনুমোদন করেনি।
এ বিষয়ে দক্ষিণ থানার ওসি আদিল মাহমুদ জানান, ওয়ার্ল্ডওয়ে নামের কোন প্রতিষ্ঠানের কার্যক্রম বিষয়ে আমার জানা নেই। প্রতারিত কোন গ্রহক আমাদের নিকট লিখিত বা মৌখিক অভিযোগ করেনি।
কুমিল্লা জেলা প্রশাসক মো. আবুল ফজল মীর বলেন, এ বিষয়গুলোতে জনগণ প্রশাসনকে আবগত করা উচিত। এমএলএম কোম্পানিগুলো কাজ করে গোপনে, তাই সাধারণ মানুষ যদি পুলিশকে অবগত করে, প্রমাণের ভিত্তিতে আমরা যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণ করবো।