সোমবার ২০ অগাস্ট ২০১৮


দেখার কেউ নেই… কুমিল্লায় চরম দুর্দশায় পোল্ট্রি শিল্প


আমাদের কুমিল্লা .কম :
05.08.2018

# সরকারের সুনির্দিষ্ট কোন নীতিমালা নেই
# ব্যাংকগুলো ঋণ দিতে চায় না
# বীমার ব্যবস্থা নেই
# বিক্রয়-বিপণনে অব্যবস্থাপনা
# হ্যাচারিগুলোতে মনিটরিং নেই
# অভিজ্ঞ চিকিৎসকের অভাব
শাহাজাদা এমরান ।।
নানা সমস্যায় জর্জরিত দেশের পোল্ট্রি শিল্প। দেশের পোল্ট্রির চাহিদা ব্যাপক থেকে ব্যাপকতর থাকা সত্ত্বেও এ শিল্পের সাথে জড়িতরা রয়েছে চরম দুর্দশায়। সরাসরি সরকারি ইতিবাচক সাড়া না পেলে এবং এ শিল্পকে শিল্পের মর্যাদা না দিলে ভবিষ্যতে এ শিল্পটি মুখ থুবড়ে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে বলে জানা গেছে।
বিভিন্ন স্তরের পোল্ট্রি শিল্প মালিকদের সাথে কথা বলে জানা গেছে, যেখানে প্রতি বছর এ শিল্প গাণিতিক হারে বৃদ্ধি পাবার কথা সেখানে ক্রমান্বয়ে কমছে জ্যামিতিক হারে। শুধু কুমিল্লা জেলাতেই গত দুই বছরে প্রায় পাঁচশর অধিক ফার্ম বন্ধ হয়ে গেছে। বন্ধ হওয়ার উপক্রম রয়েছে ততোধিক ফার্মের। মালিকরা টিকে থাকতে বর্তমানে পোল্ট্রির সাথে যুক্ত করেছে ডেইরি ও মৎস্য খামার।
জানা যায়, দেশের সম্ভাবনাময়ী ফুড শিল্পের মধ্যে পোল্ট্রি অন্যতম। নানাবিধ কারণে দেশীয় মুরগির তীব্র অপ্রতুলতা এবং অধিক জনসংখ্যার কারণে আমাদের দেশে পোল্ট্রির চাহিদা আকাশচুম্বি। সরকারের অদূরদর্শিতার কারণে সৃষ্টি হয়েছে মধ্যসত্বভোগী । এই মধ্যস্বত্বভোগীদের পকেটেই চলে যায় মুনাফার বিশাল একটি অংশ। এর পরের মুনাফাটা পায় খুচরা বিক্রেতারা। কিন্তু যারা গ্রামীণ মহাজন থেকে চড়া সুদে অর্থ লগ্নি করে ফার্ম দাঁড় করিয়েছে, লাভের অংশটা তাদের পকেটে যায় কালে ভাদ্রে।
কুমিল্লা, ব্রাহ্মণবাড়িয়া ও চাঁদপুর এই তিন জেলার একাধিক পোল্ট্রি ফার্মের মালিকের সাথে কথা বলে জানা গেছে, যে সকল কারলে বর্তমানে পোল্ট্রি শিল্প মুখ থুবড়ে আছে সেগুলোর মধ্যে অন্যতম হলো, ১. এ শিল্পের প্রসারে সরকারের সুনির্দিষ্ট কোন নীতিমালা নেই ২। পোল্ট্রির জন্য সুনির্দিষ্টভাবে কোন ব্যাংক ঋণ দেওয়া হয় না৩। এ শিল্পের কোন বীমা নেই ৪। সরকারি মনিটরিংয়ের অভাব ৫। শ্রমিক সংকট ৬। ড্রেনেজ ব্যবস্থার সমস্যা ৭। সরকারি নজরদারী না থাকায় ব্যাঙের ছাতায় ন্যায় অনেক ঔষধ কোম্পানি সৃষ্টি হয়েছে তারা নি¤œমানের ঔষধ দিয়ে অল্প শিক্ষিত বা স্বশিক্ষিত পোল্ট্রি মালিকদের প্রতারিত করছে। যার নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে মুরগির স্বাস্থ্যের উপর। ৮। খাদ্যের দাম বেশি ৯। বিক্রয় ব্যবস্থাপনায় রয়েছে চরম অব্যবস্থাপনা ১০। পরিবহন সংকট ১১। পর্যাপ্ত চিকিৎসক না পাওয়া ১২। এবং পুলিশি চাঁদাবাজ ।
কিভাবে পোল্ট্রি শিল্পকে আরো এগিয়ে যায় জানতে চাইলে বেশ কিছু প্রস্তাবনা তুলে ধরেন এর সাথে জড়িত সংশ্লিষ্টরা। এ প্রতিবেদককে তারা জানান, প্রথমেই সরকারকে পোল্ট্রি শিল্পের সাথে জড়িত লোকদের সমন্বয় করে একটি সুনির্দিষ্ট নীতিমালা করতে হবে । যেই নীতিমালার উপর এর বিকাশ এবং প্রসার হবে। ২। বর্তমানে আমাদের দেশের ব্যাংকগুলো অলিখিতভাবে পোল্ট্রির উপর থেকে ঋণ দেওয়া বন্ধ করে রেখেছে যা দ্রুত প্রত্যাহার করে সহজ শর্তে কিংবা বিনা সুদে এ শিল্পের সাথে জড়িতদের ব্যাংক ঋণ দিতে হবে। ৩। নির্দিষ্ট এলাকার বাইরে খামার করতে হবে ৪। পোল্ট্রি বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক উপজেলাতেও দিতে হবে ৫। বীমার ব্যবস্থা করতে হবে। ৬। বিক্রয় ও বিতরণ ব্যবস্থার উন্নতি করতে হবে । যাতে পোল্ট্রি ভর্তি পরিবহনগুলো যখন মার্কেটে মার্কেটে যাবে এ সময় পুলিশের চাঁদাবাজি বন্ধ করতে হবে একই সাথে নির্দিষ্ট সময়ে বাইরে শহরে গাড়ি প্রবেশের নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার করতে হবে। ৭। হ্যাচারিগুলো যাতে নিম্মমানের বাচ্চা উৎপাদন করতে না পারে সে ব্যাপারে সরকারি মনিটরিং থাকতে হবে প্রভৃতি।
এ বিষয়ে কথা বললে কুমিল্লার সদর দক্ষিণ উপজেলার গলিয়ারা ইউনিয়নের কনেশতলা গ্রামে প্রতিষ্ঠিত রূপালী প্রোটিন প্রোডাক্টের স্বত্বাধিকারী হাসান আহমেদ দু:খ করে বলেন, ২০১১ সালে ব্লার্ড ফ্লু আক্রান্ত আমার ডিম পাড়া ২৪ সপ্তাহ বয়সের ১২ হাজার মুরগি সরকার মেরে ফেলে। আমার এই মুরগির তখন বাজার মূল্য ছিল ৭২ লক্ষ টাকা। তিন বছর ঘুরিয়ে সরকার আমাকে দিল ১৭ লক্ষ টাকা। যদি বীমা থাকত তাহলে আমি যথাযথ ক্ষতিপূরণ পেতাম। এখন বাধ্য হয়ে আমি প্লোট্রির সাথে ডেইরি এবং মৎস্য চাষও করছি। বৃহত্তর কুমিল্লার হাজার হাজার পোল্ট্রি ফার্ম গত কয়েক বছরে এভাবে বন্ধ হয়ে মালিকরা এখন পথে বসেছে। তিনি বলেন, এ শিল্পকে রক্ষা করতে হলে অবশ্যই সরকারি নীতিমালা করতে হবে, ব্যাংক ঋণ দিতে হবে, বীমা করাতে এবং হ্যাচারিগুলো যাতে নি¤œমানের বাচ্চা উৎপাদন করতে না পারে সে ব্যাপারে প্রয়োজনীয় সিদ্ধান্ত না নিতে পারলে পোল্ট্রি শিল্পের সুদিন আসবে না।
পোল্ট্রি শিল্পকে কেন ঋণ দিতে ব্যাংক গুলো চায় না জানতে চাইলে এ বিষয়ে বাংলাদেশ কমার্স ব্যাংক কুমিল্লা জিলা স্কুল রোড শাখার ব্যবস্থাপক কাজী ফখরুল আলম বলেন, ব্যাংকগুলো ঋণ দিতে চায় না আসলে বিষয়টি এমন না। সব ব্যাংকই চায় তার ঋণের টাকাটা ফিরে আসার নিশ্চয়তাটা দেখে আগে। অনেক সময় দেখা যায়, অনেক অনভিজ্ঞ লোক কিছু না বুঝেই ঋণ নিয়ে একটি পোল্ট্রি ফার্ম দিল। কিন্তু দেখা গেল তার অনভিজ্ঞতার কারণে স্বল্প সময়ের মধ্যেই মুরগিগুলো মারা গেল। তখন সে নিজেও ক্ষতিগ্রস্থ হলো এবং ব্যাংকের টাকাটাও অনিশ্চয়তার মধ্যে পড়ে গেল।
কুমিল্লা জেলা প্রাণিসম্পদ অফিসার ডা. আবদুল মান্নান বলেন, পোল্ট্রি ফার্মের মালিকগণ যে বলছেন অভিজ্ঞ চিকিৎসক নেই, তা নয়। অভিজ্ঞ চিকিৎসক আছেন। তারা ডাকলেই আমাদের পাবেন। আর এ শিল্পের অন্যান্য সমস্যাগুলো নিয়ে তিনি মন্তব্য করতে রাজি হননি।