শনিবার ২৪ অগাস্ট ২০১৯


বন্ধ হওয়ার পথে ফরেনসিক বিভাগ !


আমাদের কুমিল্লা .কম :
07.08.2018


স্টাফ রিপোর্টার।।
নানা সমস্যায় বন্ধ হওয়ার পথে রয়েছে কুমিল্লা মেডিকেল কলেজের ফরেনসিক বিভাগ। মাত্র ৬ জন চিকিৎসকের মধ্যে বিভাগীয় প্রধানসহ প্রথম ৩ জনের পদই শূন্য। কর্মরত ৩ জনের মধ্যে ১ জন আবার সংশ্লিষ্ট বিভাগের চিকিৎসক না। ফলে এক দিকে যেমন শিক্ষার্থীদের পাঠদান ব্যাহত, হচ্ছে অপর দিকে পোস্টমর্টেম এবং ভিকটিম পরীক্ষার কাজ চালাতে গিয়েও হিমশিম খেতে হচ্ছে সংশ্লিষ্টদের। স্বয়ং কলেজের অধ্যক্ষ ডা. মহসিন উজ্ জামান চৌধুরী বললেন, এভাবে চললে বিভাগটি ধরে রাখা কঠিন হবে।
কুমিল্লা মেডিকেল কলেজ সূত্র জানায়, কলেজের গুরুত্বপূর্ণ ফরেনসিক বিভাগের দুটি কাজ। একটি স্বরাষ্ট্রমন্ত্রণালয়ের অধীন আরেকটি স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের অধীন। স্বাস্থ্যমন্ত্রণালয়ের অধীনের কাজটি হলো, কলেজে ছাত্র-ছাত্রীদের পড়ানো। আর স্বরাষ্ট্রমন্ত্রণালয়ের কাজ হলো,পোস্টমর্টেম, ভিকটিম পরীক্ষাসহ এ সংক্রান্ত কাজগুলো করা। এখানে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রণালয়ের কোন বরাদ্দ নেই। পোস্টমর্টেম, ভিকটিম পরীক্ষা করার জন্য প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি কে দিবে? মর্গকে প্রস্তুত করার খরচ কে দিবে? আর যে লাশ কাটে সেই ডোমের বেতনই বা কে দিবে ?এ সব কাজ বর্তমানে করতে হচ্ছে মেডিকেল কলেজের অধ্যক্ষ যে যখন থাকেন তিনি বিভিন্নভাবে ম্যানেজ করে নেন। কিন্তু অফিসিয়াল এ ক্ষেত্রে সরকারের কোন বাজেট নেই।
অপর দিকে স্বাস্থ্যমন্ত্রণালয়ের অধীনের কাজটি হলো কলেজে ছাত্রছাত্রীদের পড়ানো । কিন্তু পড়ানোর মত প্রয়োজনীয় শিক্ষক নেই কলেজে। নেই ফরেনসিক বিভাগের অধ্যাপক, সহযোগী অধ্যাপকও সহকারী অধ্যাপকের পদও। মাত্র তিন জন প্রভাষক দিয়ে গুরুত্বপূর্ণ এই বিভাগটি চালানো হচেছ এখন। এই তিন জনের মধ্যে এক জন আবার এই বিভাগের চিকিৎসক নন। ফলে তিনি পোস্টমর্টেম কিংবা ভিকটিম পরীক্ষা করেন না। বাধ্য হয়ে কলেজে ক্লাস করানোর পাশাপাশি এই দুটি কাজও করতে মাত্র দুই জন প্রভাষক দিয়ে। বর্তমানে এই বিভাগের ভারপ্রাপ্ত প্রধান করা হয়েছে গাইনি বিভাগের সহকারী অধ্যাপক ডা. পি কে বালাকে। অথচ, ইচ্ছে করলে এই বিভাগের বিশেষজ্ঞ ডা. শারমিন সুলতানাকে প্রমোশন দিয়ে অথবা চলতি দায়িত্ব দিয়েও যদি সহকারী অধ্যাপক করা হতো তাহলে তিনি ভারপ্রাপ্ত বিভাগীয় প্রধান হতেন। ফলে স্বাভাবিক কারণেই প্রভাষকের একটি পদ শূন্য হতো। ওই শূন্যের জায়গায় আরেকজন নিয়োগ পেতে পারতেন। তাহলে বিভাগে কিছুটা হলেও গতি পেত।
কুমিল্লা মেডিকেল কলেজের ফরেনসিক বিভাগের প্রভাষক ডা. শারমিন সুলতানা বলেন, আমাদের ফরেনসিক বিভাগটি বর্তমানে মানবেতর জীবন যাপন করছে। ৬জন শিক্ষকের মধ্যে তিন পদ শূন্য। তাও আবার অধ্যাপক, সহকারী ও সহযোগী অধ্যাপকের মত পদ শূন্য। ৩ জন প্রভাষকের মধ্যে একজন এই বিভাগে পড়াশুনা করেননি। যার কারণে বছরে প্রায় এক হাজারের কাছাকাছি পোস্টমর্টেম ও অর্ধ হাজার ভিকটিম পরীক্ষা আমাদের দুই চিকিৎসককে করতে হয়। এ বিভাগে আমাদের সরকারি ছুটি নামে থাকলেও কাজে নেই। এমনকি ঈদের দিনেও আমাদের কাজ করতে হয়। এ জন্য আমাদের কোন ওভার টাইম তো নেই-ই, উপরন্ত আমাদেরকে বিভিন্ন সময় আদালতে যেতে হয়। এ জন্য নেই কোন প্রণোদনাও। ডা. শারমিন আরো বলেন, আমরা সাক্ষী দিতে গিয়ে সব সময়ই নিরাপত্তাহীনতায়ও ভুগী। এ জন্য আমাদের পরিবারও উদ্বেগে থাকে। ন্যূনতম কোন সাপোর্টও আমরা পাই না। এ জন্যই এ বিভাগে শিক্ষক কম। সরকারকে এ বিভাগে শিক্ষার্থীদের পড়াশুনা করার বিষয়ে উৎসাহিত করতে হবে। একই সাথে কুমিল্লা মেডিকেল কলেজের ফরেনসিক বিভাগে দ্রুত প্রয়োজনীয় শিক্ষক নিয়োগের দাবি জানান তিনি।
এ প্রসঙ্গে কুমিল্লা মেডিকেল কলেজের অধ্যক্ষ ডা. মহসিন উজ্ জামান চৌধুরী বলেন, ফরেনসিক বিভাগের অবস্থা কেমন একটি উদাহরণ দিলেই আপনি বুঝবেন। গাইনি বিশেষজ্ঞ ডা. পি কে বালাকে আমি ফরেনসিক বিভাগের চিফ করেছি। গাইনি বিশেষজ্ঞ ফরেনসিক বিভাগের কিছু বুঝবে না, তারপরেও করেছি, কারণ একজন প্রভাষককে তো আর আমি বিভাগের প্রধান করতে পারি না। এই বিভাগে অধ্যাপক, সহযোগী এবং সহকারী অধ্যাপক পদে কেউই নেই। সুতরাং কী দিয়ে আমি বিভাগটি সচল রাখব বলেন। ফরেনসিক বিভাগের নানা সমস্যা এবং কিছুটা অনিয়ম পরোক্ষভাবে স্বীকার করে এই চিকিৎসক বিশেষজ্ঞ বলেন, লেখে দিতে পারেন, যে কোন সময় বন্ধ হয়ে যেতে পারে কুমেকের ফরেনসিক বিভাগ! কারণ হিসেবে তিনি জানান, ফরেনসিক বিভাগের শুধু মাত্র ছাত্রছাত্রীদের পড়ানোর কাজটি হলো আমাদের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের। আর সব কাজ হলো স্বরাষ্ট্রমন্ত্রণালয়ের। কিন্তু এ জন্য তাদের কোন বরাদ্দও নেই। অনেক কষ্ট করে আমাকে এ খরচগুলো বহন করতে হয়। এ বিভাগে বছরে কমপক্ষে ১০ লক্ষ টাকা প্রয়োজন হয়। এখানে ভিকটিম পরীক্ষা করতে হয় এবং ময়নাতদন্ত করতে হয়। যা স্বরাষ্ট্রমন্ত্রণালয়ের কাজ। এখানে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রণালয়ের কাজ আছে কিন্তু টাকা দেওয়ার কেউ নেই।
ফরেনসিক বিভাগের মত একটি গুরুত্বপূর্ণ বিভাগ শুধু মাত্র প্রভাষক দিয়ে কিভাবে চলে জানতে চাইলে অধ্যক্ষ ডা. মহসিন উজ্ জামান চৌধুরী বলেন,জোড়াতালি দিয়ে চলে। বার বার উপরে এ বিষয় গুলো লিখছি। এখনো কোন কাজ হয়নি। দেখা যাক ভবিষ্যতে কী হয়।