সোমবার ২৩ †m‡Þ¤^i ২০১৯


কুমিল্লায় ফুটেছে রুপকথার নার্সিসাস ফুল


আমাদের কুমিল্লা .কম :
06.03.2019


ডা. আবু নাঈম
গ্রীক মিথোলজি ছোটবেলা থেকেই খুব টানে আমাকে। দেবতাদের মাটিতে নেমে আসা, মানুষের মত প্রেম ভালোবাসা, ক্রোধ, প্রতিশোধ, মানুষের মতো মিশে যাওয়া কেবল গ্রীক পুরাণেই সম্ভব। আর মেডিকেল সাইন্সে পড়বার সময় পারসোনালিটির বিশদ পড়া হয় বিহেভিয়ার‌্যাল সাইন্সে। তখন পরিচিত হই নার্সিসিস্ট ( ঘধৎপরংংরংঃ) শব্দটির সাথে, যার মানে দাঁড়ায় আতœপ্রেমী, আতœকেন্দ্রিক, সেল্ফ অবসেসড একজন মানুষকে বুঝাতে।
ফিরে যাই গ্রীক পুরাণে,
জলপরী লিরিউপি ও নদীদেবতা সিফিসাস এর পুত্র ছিলেন নার্সিসাস।
ছোটবেলা থেকেই তার সৌন্দর্যে সবাই মুগ্ধ হতো। নর নারী যেই হোক না কেন তাকে এক দেখাতেই ভালোবেসে ফেলতো এতটাই সুন্দর ছিলো সে।
যুবক বয়সে নার্সিসাস কে অনেক অপ্সরী ভালোবেসেছে আর বারবার প্রত্যাখ্যাত হয়েছে। হয় নার্সিসাস তাদের প্রত্যাখ্যান করত অথবা মেরে ফেলতো!
নার্সিসাসকে কেবল নারীরাই ভালোবেসেছে এমন নয়, এমনিসিয়াস নামের এক যুবকও ভালোবেসে ফেলে তাকে। এমনিসিয়াসকে অন্য বহু পুরুষ ও ভালোবাসতো, কিন্তু সে কেবল নার্সিসাসের জন্যই প্রত্যাখান করেছে সবাইকে।
ভাগ্যের কি নির্মম পরিহাস, নার্সিসাস যেখানে অপ্সরা বা নারীকেই ফিরিয়ে দেয়, সেখানে এমনিসিয়াস তো ছিলো পুরুষ। নার্সিসাস তাকে ফিরিয়ে দিলো এবং উপহার দিলো একটা ছুরি।
এমনিসিয়াস নার্সিসাস এর ঘরের সামনে এসে সেই ছুরি দিয়ে আত্মহত্যা করে ফেলে!
নার্সিসাস নিজেকে এত বেশি ভালবাসতো, সে ভাবতো তার মত সুন্দর ও তার জন্য উপযুক্ত সুন্দরী আর কেউ নেই বা হতে পারেনা।
এভাবে প্রত্যাখ্যাত হওয়া কোন এক অপ্সরা অভিশাপ দেয় দেবী নেমেসিস এর কাছে , “যেদিন নার্সিসাস কাউকে মনে প্রাণে ভালোবাসবে সেও যেন এমনি করেই প্রত্যাখ্যাত হয়, ভালোবাসা না পায়”

নার্সিসাস এর কাছ থেকে সবচে মর্মান্তিকভাবে প্রত্যাখ্যাত হয়েছিল সম্ভবত অপ্সরা ইকো ( ঊপযড়)
ইকো কথা বলতে পারতো না, কেবল অন্যের কথার প্রতিধ্বনি করতে জানতো।
নার্সিসাস যেখানে যেতো তার ভালোবাসায় অন্ধ ইকো তার পিছনে পিছনে যেতো। একদিন নার্সিসাস শিকারে গেলো, তার পিছু নিলো ইকো।
নার্সিসাস তার সহচরদের খুঁজতে ডাক দিলো,
এখানে কেউ আছো?
ইকো তো কথা বলতে পারেনা, তাই সে শেষ শব্দটির প্রতিধ্বনি করে বলল,
“আছে, আছে।”
গাছের আড়ালে লুকিয়ে থাকা ইকোকে নার্সিসাস বললো, “এসো, সামনে এসো”।
তাই, গাছের আড়াল থেকে বেরিয়ে এলো ইকো।
নার্সিসাস ইকোকে দেখে মোটেও খুশি হলেন না, কারণ সে বাকপ্রতিবন্ধী।
উদ্ধত, বিরক্ত নার্সিসাস বললো, “আমি বরং মারা যাবো তবু তোমার মত কাউকে আমার কাছে আসতে দেবোনা।”
হতাশ প্রত্যাখ্যাত ইকো মনের দুঃখে গুহায় আশ্রয় নিলো। আর কোন শান্তনাবাণীই কাজে আসলোনা। মনের দুঃখে লীন হয়ে গেলো ইকো, রয়ে গেলো কেবল তার কন্ঠস্বর, যা অন্যের শব্দকে অনুকরণ করে।
ইকোর নাম অনুসরণ করেই আমাদের শব্দের প্রতিধ্বনি কে ইকো বলে নাম দেয়া হয়। পাহাড়ে বা দূরের খালি জায়গার দিকে শব্দ করলে হয়ত খেয়াল করবেন যে সেই শব্দটি আবার ফিরে আসে প্রতিধ্বনি হয়ে।
একদিন হরিণ শিকার শেষে ক্লান্ত নার্সিসাস ডনাকন নদীর তীরে পানি পান করতে আসে।
মতান্তরে অন্য কোন হ্রদ, যার পানি এত স্বচ্ছ যে তলদেশ স্পষ্ট দেখা যায়, যে হ্রদের পানি কেউ পান করেনি এমন কোন হ্রদ।
পানি পান করতে যেয়ে প্রথম বারের মতো নিজেকে দেখতে পায় পানিতে নার্সিসাস।
দেখে, নিজেই নিজের প্রেমে পড়ে যায়।
এত সুন্দর, অদ্ভুত, অপূর্ব সে!
সব কিছু বাদ দিয়ে তার কাজ হয়ে দাঁড়ায় কেবল পানিতে নিজের প্রতিবিম্ব দেখা ও হাত দিয়ে ছুঁয়ে দেখা। যতবার চেষ্টা করে ততবার ব্যর্থ হয়।
নিজের প্রতি আজন্ম প্রেমিক নার্সিসাস এর নিজের দিকে তাকিয়েই থাকা হয়ে যায় একমাত্র কাজ।
এভাবে চেষ্টারত ক্ষুতপিপাসায় কাতর নার্সিসাস সেই হ্রদের তীরেই মারা যায়।
ফলে যায় নেমেসিস দেবীর কাছে দেয়া অপ্সরীর দৈব অভিশাপ।
নার্সিসাসের মৃতদেহ বা কবর থেকে যে ফুল জেগে উঠে তারই নাম নার্সিসাস ফুল ( ঘধৎপরংংঁং ভষড়বিৎ) আর অতিমাত্রায় আতœপ্রেমীদের বলা হয়, ঘধৎপরংংরংঃ.
বাগান করা আমার প্রিয় শখ, চিকিৎসা পেশার পাশাপাশি এই কাজটা করেও অত্যন্ত আনন্দ পাই আমি। অবশেষে নিজ চোখে নিজ বাগানের নার্সিসাস ফুল দেখবার সৌভাগ্য হলো।
দেশের বাইরে যাওয়া তো সম্ভব না, দেশেই দেখে নিলাম নার্সিসাস। কুমিল্লায় ফুটেছে নার্সিসাস ফুল।
নার্সিসাস ফুলের অন্য প্রচলিত নাম ড্যাফোডিল।
জন্মায় শীতপ্রধান দেশে, যেখানে তাপমাত্রা শূণ্য বা তার কাছাকাছি থাকে। আমাদের মতো নাতিশীতোষ্ণ দেশের ফুল নয় সে। তাই এই ফুল ফুটানোও ছিলো কষ্টকর একটা কাজ।