মঙ্গল্বার ২৬ gvP© ২০১৯


হাতে গুলি নিয়ে রক্তমাখা কাপড় পরে ৪৫ দিন হাসপাতালে কেঁদেছি


আমাদের কুমিল্লা .কম :
09.03.2019

সম্মুখ সমরের মুক্তিযোদ্ধা-৯

শাহাজাদা এমরান,কুমিল্লা।।
ইপিআর সৈনিক যুদ্ধাহত বীর মুক্তিযোদ্ধা মো. রবিউল হক বলেছেন, ১৯৭১ সালের ২৮ জুলাই ভারতের ত্রিপুরা রাজ্যের পং বাড়ি নামক ক্যাম্পে নাইট ডিউটি করার সময় ফেনীর শ্রীপুর সীমান্ত দিয়ে পাকিস্তানের দুইজন গেরিলা যোদ্ধা গেরিলা কায়দায় আমাকে এসে আক্রমন করে আমার অস্ত্র জোড় করে নিয়ে যেতে চায়। এতে উভয়ের সাথে ধস্তাধস্তির এক পর্যায়ে তাদের একজন আমার মাথায় গুলি করলে ভাগ্য ক্রমে গুলিটি ডান হাতে লাগে। এতে আমি মাটিতে লুটিয়ে পড়ি। এই অবস্থায় আওয়াজ শুনে ক্যাম্প কমান্ডারসহ অন্যান্যরা এগিয়ে এলে তারা পালিয়ে যায়। রাতেই আমাকে ক্যাম্প থেকে ভারতের ত্রিপুরা রাজ্যের মুন হাসপাতালে নিয়ে যায়। এখানে প্রাথমিক চিকিৎসা দিয়ে পরদিন বিকাল ৪টায় আগড়তলা জিবি হাসপাতালে ভর্তি করানো হয়। এই হাসপাতালে রক্তমাখা শার্ট,লুঙ্গি পড়ে একটানা ৪৫ দিন ছিলাম। অনেক কেঁদেছি।এক কাপড়ে আর থাকতে পারছিলাম না। দূর্গন্ধ বের হচেছ। কিন্তু কেউ কথা শুনেনি। ৪৫ দিন পর হাসপাতালে আমার জন্য বিকল্প কাপড় আসে ড্রেস পরিবর্তন করার জন্য। তিনি বলেন, আনুষ্ঠানিক যুদ্ধ শুরুর আগেই ইপিআর চট্রগ্রাম গোপনে যুদ্ধের প্রস্তুতি গ্রহন করতে থাকে।
মো.রবিউল হক। পিতা লাল মিয়া ও মাতা রজ্জবেন নেছা। ১৯৪৫ সালের ১ এপ্রিল নাঙ্গলকোট উপজেলার বাঙ্গগড্ডা বাজার ইউনিয়নের শ্যামপুর গ্রামে জন্মগ্রহন করেন। পিতা মাতার চার ছেলে ও চার মেয়ের মধ্যে তার অবস্থান চতুর্থ। দেশে যুদ্ধ শুরু হওয়ার অনেক আগেই তিনি ইপিআরে যোগ দেন। ১৯৭১ সালে ইপিআরের ১১নং উইয়িংয়ের হালিশহরে কর্মরত ছিলেন। এই হালিশহরটি ছিল আবার বিহারী অধ্যষিত এলাকা।
মুক্তিযুদ্ধ সম্পর্কে জানতে চাইলে এই যুদ্ধাহত বীরমুক্তিযোদ্ধা বলেন,৭০’এর নির্বাচনের পর থেকেই আমরা যারা ডিফেন্সে চাকুরী করতাম তাদের কাছে দেশের পরিস্থিতিটা সব সময় অন্যরকম মনে হতো। আমাদের প্রতি পাকিস্থানী অফিসারদের আচরণও খুব একটা বেমানান লাগত। ৭১ সালের শুরুর দিকে তা বেড়ে যায়। ফেব্রুয়ারির শেষ কিংবা মার্চের শুরু থেকেই চট্রগ্রাম বন্দর দিয়ে পশ্চিম পাকিস্তান থেকে সৈন্য এবং অস্ত্র ও গোলাবারুদ আসতে থাকে নদী পথে। চট্রগ্রামে ইপিআরের যে প্লাটুন গুলো ছিল একমাত্র আমাদের হালিশহরের প্লাটুনে যারা ছিল তারা সবাই বাঙ্গালী ছিল। আমাদের কমান্ডার ছিলেন, বরিশালের সুবেদার আয়েজুদ্দিন আর আমাদের প্লাটুন কমান্ডার ছিলেন হাবিলদার গিয়াসউদ্দিন। আর আমাদের এডজুটেন্ট অফিসার ছিলেন সাবেক স্বরাষ্ট্র মন্ত্রী মেজর রফিকুল ইসলাম বীর উত্তম। আমাদের তখন দায়িত্ব ছিল পাঁচলাইশ থানা,টেলিফোন এক্্রচেঞ্জ এবং টিভি হাসপাতাল সংলগ্ন এলাকা।এই সব এলাকায় পুলিশের সহায়ক শক্তি হিসেবে কাজ করা।
মার্চের ১৫ বা ১৬ তারিখে হবে। রাত ১টার দিকে আমাদের কাছে একটা ফোন আসে। আমরা যেন দ্রুত লালদিঘি ময়দানের যাই। এত রাতে কেন লালদিঘী যাব সবাইকে নিয়ে, বুঝতে পারছিলাম না। তারপর ফোন করলাম আমাদের উইয়িং কমান্ডার পাকিস্তানী মেজর ইকবালের কাছে। তিনি বললেন এ বিষয়ে আমি জানি না। তার পর ফোন করলাম আমাদের সেক্টর কমান্ডার লে.কর্নেল পাকিস্থানী আজিজুর রহমানের কাছে। তিনিও মেজর ইকবালের মত একই উত্তর দিলেন।পরে সেক্টর এডজুটেন্ট আমাদের একমাত্র বাঙ্গালী অফিসার বর্তমান এমপি ও সাবেক মন্ত্রী মেজর রফিকুল ইসলামের বীর উত্তমের কাছে।তিনি ফোন করতেই ধমক দিয়ে বললেন, তোমরা এখনো যাওনি। দ্রুত যাও।রাত ১টায় পুরো প্লাটুন নিয়ে আমরা লালদিঘিতে যাই। গিয়ে দেখি প্রায় শতাধিক লোক আমাদের অপেক্ষায় আছে। যাওয়ার পর একজন অফিসার আমাদের নির্দেশ দিলেন, তোমাদের এই প্লাটুনকে চার ভাগে ভাগ কর। পরে লালদিঘী সংলগ্ন যে মার্কেটে আক্রমন করা হবে (এই মুহুর্তে মার্কেটের নাম মনে নেই) সেই মার্কেটে প্রবেশ করার রাস্তার তিন দিকে আমাদের তিনটি গ্রুপ শক্ত অবস্থান নিল। আর আমি সহ আমাদের আরেকটি গ্রুপ তাদের কথামত মার্কেটে প্রবেশ করে বন্ধুক ও গোলাবালুদ ভরা তিনটি দোকান ভেঙ্গে সব অস্ত্রও সংশ্লিষ্ট মালামাল আমরা ট্রাকে ভরে দামপাড়া পুলিশ লাইনে চলে যাই। সেখানে গিয়ে দেখি,ক্যাপ্টেন রফিকুল ইসলাম বীর উত্তম স্যার বসে আছেন আমাদের জন্য। তিনি তখন পুলিশ লাইনের বাঙ্গালী পুলিশ ও মুজাহিদদের নির্দেশ দিলেন
চট্রগ্রাম বিশ্¦বিদ্যায়সহ চট্রগ্রামের বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও অন্যান্য প্রতিষ্ঠানে রাতের মধ্যেই এগুলো রেখে আসার জন্য। এগুলো গ্রহন করার জন্য ঐ সকল স্থানে আমাদের লোকজন অপেক্ষা করছে বলে তিনি জানান। যেহেতু আমরা সিপাহী ছিলাম তাই অফিসারদের কোন প্রশ্ন করার সুযোগ না থাকলেও প্লাটুনের সবাই আমরা বুঝতে পারছিলাম যে, যে কোন সময় যুদ্ধ শুরু হয়ে যেতে পারে। এ দিকে, চট্রগ্রাম বন্দর দিয়ে যাতে পাক আর্মি ,অস্ত্র আর গোলাবারুধ খালাস না হতে পারে সেজন্য চট্রগ্রামের স্থানীয় জনগন কঠোর প্রতিরোধ গড়ে তুলল। পরে অপারেশন শেষ করে আমরা ব্যারাকে ফিরে এসে দেখি, মেজর ইকবাল সহপরিবারে ব্যারাক থেকে পালিয়ে গেছে। আমাদের এই ব্যারাকটি ছিল মেজর ইকবালের বাড়ি। তিনি চলে যাওয়ার পর ২০ মার্চ আমরা হালিশহরের ইপিআর সেক্টর হেড কোয়ার্টারে চলে আসি। ২৫ মার্চ রাতে আমরা শুয়ে পড়ছি এমন সময় রাত ৮কি ৯টা হবে আমাদের সেক্টর এ্যাডজুটেন্ট রফিক স্যার বললেন,আমরা সবাই যেন অস্ত্রাগারের সামনে থাকি। রাত ১০টায় তিনি বললেন অস্ত্র এবং গোলাবারুধগুলি গাড়িতে উঠে তোমরা সবাই আমার গাড়ি অনুসরন করে চলে এসো। রাত হলেও অবাক বিস্ময়ে লক্ষ করলাম প্রতিটি রাস্তায় মানুষ আর মানুষ। হানাদার বাহিনী যেন এই রাস্তা দিয়ে যেতে না পারে সেজন্য এই প্রতিরোধ। আমাদের গাড়িও পথে পথে তারা আটকে দিচিছল। কিন্তু আমরা যখনি বলছি আমরা বাঙ্গালী সৈনিক তখন তারা আমাদের ছেড়ে দিচেছ। রাত সাড়ে ১১টায় আমরা চট্রগ্রামের জিআরবি হলে উঠি। রাত ১১টায় সারা চট্রগ্রামে হানাদার বাহিনীর হত্যাযজ্ঞ শুরু হয়ে গেছে। হানাদার বাহিনী ঝাঁপিয়ে পড়ল চট্রগ্রামের নিরীহ জনগনের উপর। আমরা দ্রুত অস্ত্রাগারের সব অস্ত্র লুট করি। আমাদের জিআরবি হলের সাথে ছিল টাইগারস পাল । এখানে ছিলেন পাক হানাদার বাহিনী। রাত ১২টার দিকে আমরা কোন কিছু বুঝে উঠার আগেই আমাদের জিআরবি অফিসে পাকিস্তানীরা তিন দিক দিয়ে অতর্কিত ফায়ার করা শুরু করে। পরে আমরাও জবাব দেওয়া শুরু করি। কিন্ত এক পর্যায়ে যখন দেখা গেল তাদের সাথে আমরা পারব না।তখন রাত ২টায় রফিক স্যার বলল, আমি চলে গেলাম। তোমরা যেভাবে পার তোমাদের জান বাঁচাও। বাঁচলে দেখা হবে…। একথা শুনে আমরাও রফিক স্যারের পেছনে পেছনে যার পড়নে যা ছিল তা নিয়েই বের হয়ে আসি। একটা সময় দেখলাম রফিক স্যারের গাড়ি আর দেখছি না। তখন আমি , হাবিলদার গিয়াসউদ্দিন, সুবেদার আয়েজ উদ্দিন,হাবিলদার সেকান্দার আলীসহ ১০/১৫জন ইপিআর সদস্য একটা হাই স্কুলে গিয়ে আশ্রয় নেই এবং এখানেই নির্ঘুম রাত কাটাই। ২৭ মার্চ সকালে জানতে পারলাম যে, মেজর জিয়া(পরবর্তী পর্যায়ে দেশের প্রেসিডেন্ট হন),ক্যাপ্টেন রফিকসহ বিভিন্ন বাঙ্গালী আর্মি অফিসাররা কালুরঘাট বেতার কেন্দ্রে একত্রিত হয়েছেন। এবং এটি আমাদের দখলে আছে।এখানে গিয়ে আমরা স্যারদের সাথে দেখা করি।
২৮মার্চ দিনের ১১টা সময় সুবেদার আয়েজ উদ্দিনের নেতৃত্বে আমাদের ইপিআর প্লাটুনকে মেজর জিয়া নির্দেশ দেন ওসমানী গ্যাস ফ্যাক্টরীর ম্যানাজার অবসরপ্রাপ্ত পাকিস্তানী মেজর আবদুল জলিলকে তার বাসা থেকে ধরে আনার জন্য। আমরা পুরো প্লাটুন যাই। তার বাড়িতে গিয়ে দেখি বাড়ির সিকিউরিটি গার্ডগুলো গলায় কোরআন শরীফ ঝুলিয়ে রেখেছে। তারা ভয়ে কাঁপছে। প্রথমে সিকিউরিটি গার্ডরা আমাদের উপরে উঠতে দিতে রাজি হয়নি। পরে আমরা জোড় করে উঠি। মেজর জলিলকে ডাক দেই। কিন্তু তিনি আমাদের সাথে যেতে চাচ্ছেন না। মেজর জলিল বলেন তোমরা আমার লাশ নিতে পার কিন্ত আমাকে নিতে পারব না। এরপর আমরা মেজর জিয়াকে একথাটি জানালে তিনি বলেন প্রয়োজনে তার লাশ নিয়ে এসো। তখন আমরা সবাই তাকে অনেক বুঝিয়ে তার স্ত্রী, দুটি মেয়ে এর মধ্যে বড় মেয়েটি ছিল পাগল ,একমাত্র ছেলে আর তাকে নিয়ে গাড়িতে উঠাই। গাড়িতে উঠার পর মেয়ে দুটির দিকে দেখে আমার মায়া লেগে গেল। যদিও যুদ্ধ ক্ষেত্রে আবেগের কোন স্থান নেই। আমি কমান্ডার সুবেদার আয়েজউদ্দিনকে অনুরোধ করি, যাতে মেজর জলিলের স্ত্রী ও দুই মেয়েকে যেন না নেই। তিনি প্রথমে রাজি না হলেও পরে কিছুদূর গিয়ে বললেন, যান আপনারা তিনজন চলে যান। তখন মেজর জলিল আমাদের ধন্যবাদ দিল। আমরা কালুরঘাট এসে দেখি মেজর জিয়া ও ক্যাপ্টেন রফিক এক সাথে বসে আছেন। সাথে অস্ত্রসহ কয়েকজন প্রস্তুত। গাড়ি থামিয়ে আমরা মেজর জলিল ও তার ১৫ বছর বয়সী ছেলেকে গাড়ি থেকে টেনে হেঁচরে মেজর জিয়ার সামনে হাজির করি। মেজর জিয়ার সামনে এসেই মেজর জলিল উর্দুতে বললেন, জিয়া,আমি জানি এখন তোমরা আমাকে মেরে ফেলবা। তবে আমার শেষ অনুরোধ, আমাকে আর আমার ছেলেকে এক সাথে ফায়ার করে মার। এই বলে মেজর জলিল তার ছেলের সাথে হ্যান্ডসেক করা অবস্থায় বলল, এবার মার।সাথে সাথে আমার সামনেই মেজর জলিলকে সামনে থেকে এবং তার ছেলেকে পেছন থেকে গুলি করলে বাপা-ছেলে একে অপরের উপর ঢলে পড়ে। এরপর মেজর জিয়া বলল, ম্যাগাজিনটা দাও। ম্যাগাজিনে তিনি এক এক করে ২৮টা গুলি ভরলেন। পরে সব কয়টি গুলি মেজর জলিলের গায়ের উপর বর্ষন করলেন। একেবারে ঝাঁঝরা হয়ে গেল পাকিস্তানী মেজর জলিলের সমস্ত দেহ।
আনুষ্ঠানিক যুদ্ধ কখন শুরু করেন জানতে চাইলে মুক্তিযোদ্ধা রবিউল হক বলেন, আমি ১নং সেক্টরে সেক্টর কমান্ডার মেজর জিয়াউর রহমানের অধীনে যুদ্ধ করি। এপ্রিলের দ্বিতীয় সপ্তাহ পর্যন্ত আমরা কালুরঘাট,কালারপুল,কর্ণফুলি সেতু সংলগ্ন স্থানে অবস্থান নিয়ে কাজ করি। পরে আমাদের ব্যাটালিয়নটি ছত্রভঙ্গ হয়ে যায়। নেতাদেরও খুঁজে পাচ্ছি না। এমন সময় খবর পেলাম মেজর জিয়া ও ক্যাপ্টেন রফিক খাগড়াছড়ির মাটি রাঙ্গা স্কুলে আছেন। আমরা চট্রগ্রাম থেকে চলে এসেছি এই খবর শুনে প্রথমে জিয়াউর রহমান রাগ করে বললেন,কালুরঘাট আমাদের নিয়ন্ত্রনে আছে কেন তোমরা চলে এসেছ। ফিরে যাও। পরে এক অফিসারের মাধ্যমে জিয়াউর রহমানকে বুঝিয়ে আমরা তার সাথে দেখা করি।এরপর মেজর জিয়াউর রহমান আমাকে আর ফেনীর মুজিবুল হককে তার যুদ্ধকালীন বডিগার্ড নিয়োগ দেয়। আমরা রামঘরসহ খাগড়াছড়ির বিভিন্ন স্থানে অভিযান চালাই। এখানে জিয়াউর রহমান আমাদের সবাইকে মাসিক ৭৫ টাকা করে দুই মাসের ১৫০ টাকা সম্মানি দেন।
কিভাবে আহত হলেন জানতে চাইলে মো. রবিউল হক জানান, আমাদের ক্যাম্প ছিল বাংলাদেশ সীমান্ত সংলগ্ন ভারতের পং বাড়িতে। আমি তখন নাইট ডিউটিতে ছিলাম। ফেনী সীমান্ত দিয়ে পাকিস্তানী দুই গেরিলা যুদ্ধা রাত প্রায় দেড়টা হবে গেরিলা কৌশলে ঠিক আমার অবস্থানের সামনের একটি গাছের ঢাল নাড়ল। তখন আমার দৃষ্টিটি যায় গাছের দিকে। আমি গাছ বরাবর টর্চ লাইট দিয়ে যেই না ফোকাস করছি তখন এই সুযোগে তাদের একজন পেছন দিক দিয়ে এসে আমাকে জাপটে ধরে ফেলে। উদ্দেশ্যে ছিল,আমাকে হাত মুখ পা বেধে পরে ক্যাম্পে কোন মাইন বা কিছু রেখে যাবে। যাতে একসাথে সবাই মারা যায়। তখন আমি বন্ধুকটি সজোরে ধরে তাকে প্রতিহত করার চেষ্টা করতে করতে তাদের আরেকজন সামনে চলে এল। তখন আমি জোরে চিৎকার দিলে ক্যাম্প থেকে কমান্ডারসহ যখন সবাই বেড়িয়ে আসছে এমন সময় তারা আমার মাথায় গুলি করে দৌঁড়ে পালিয়ে যায়। কিন্ত আল্লাহর রহমতে তাদের টার্গেটটি মিস হয়ে আমার হাতে গিয়ে গুলিটি পড়ে। মুহুর্তেই রক্তে রঞ্জিত হয়ে গেল আমার শরীর। তখন সাথে সাথে আমাকে পাঠানো হয় ভারতের মনু হাসপাতালে। এখানে প্রাথমিক িিচকিৎসা দিয়ে পাঠিয়ে দেওয়া হয় আগড়তলা জিবি হাসপাতালে। এই জিবি হাসপাতালে আমি রক্তমাখা শার্ট গেঞ্জি ও লুঙ্গি পড়ে একটানা ৪৫দিন ছিলাম। হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ চিকিৎসা দিলেও আমাকে কোন কাপড় দিতে পারছিল না। আমাকে দেখতে সময়ে সময়ে যারাই আসতো বলে যেত আচ্ছা পাঠাচ্ছি কিন্তু পরে আর তাদের কোন খবর পেতাম না। এজন্য কত যে কেঁদেছি তার কোন হিসেব নেই। এই ভাবে ঠিক ৪৫ দিন পর রক্তমাখা কাপড়চোপড় পাল্টানোর সুযোগ পাই। কিছুটা সুস্থ্য হওয়ার পর ডিসেম্বর মাসের প্রথম সপ্তাহে আমি হরিনা ক্যাম্পে যোগ দেই। এই সময় ১নং সেক্টর কমান্ডার ছিলেন ক্যাপ্টেন রফিক। দেশ স্বাধীন হয়েছে এ কথা ১৬ তারিখই আমরা জেনে যাই। তখন পুরো ক্যাম্পে এক বিশাল আনন্দঘন পরিবেশের সৃষ্টি হয়। ১৭ ডিসেম্বর আমরা চট্রগ্রাম যাই। ২৫ ডিসেম্বর দীর্ঘ ৯ মাস পর বাড়ি ফিরি। তখন আমাদের এলাকার সবাই মনে করছে হানাদার বাহিনী আমাকে মেরে ফেলছে। আমি যেদিন বাড়ি আসি সেদিন আমাকে দেখার জন্য সারা গ্রামের মানুষ ছুটে আসে আমাকে দেখার জন্য।
যুদ্ধের পরবর্তী জীবন সম্পর্কে জানতে চাইলে তিনি বলেন, মুক্তিযুদ্ধ করতে গিয়ে হাতে গুলি খেয়েছি। কিন্তু আমার স্বাধীন দেশে অবসর যাওয়ার আগ পর্যন্ত আমার কোন প্রমোশন হয়নি। কারণ, আমার একটি হাত ছিল পঙ্গুর মত। যে দেশের জন্য যুদ্ধ করে পঙ্গু হয়েছি সেই দেশ আমাকে মূল্যায়ন করেনি। খুব অভাব অনটনের মধ্যে দিয়ে জীবন চলছে। যে স্বপ্ন নিয়ে যুদ্ধ করেছেন সেই স্বপ্ন পূরন হয়েছে কিনা জানতে চাইলে তিনি বলেন, সব কথা বলতে পারব না। শুধু এতটুকু বলব, যুদ্ধ করেছি, ১৬ ডিসেম্বর আমরা স্বাধীন হয়েছি। এই পর্যন্তই ।তিনি বলেন, বাবারে সব কথা বলতে পারব না। অনেক দু:খ কষ্ট আছে মনের ভিতর। আমরা পঙ্গু মুক্তিযোদ্ধারা স্বাধীন দেশের সরকার গুলো থেকে বার বার বঞ্চিত হয়েছি। এখন ঐসব বলতে গেলে আবার কোন সমস্যায় পড়ি তা তো বলা যায় না। তাই মনের কষ্ট মনেই থাকুক। তারপরেও শুকরিয়া যে এখন ভাতা পাচ্ছি।
একজন যুদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে আগামীর বাংলাদেশকে কেমন দেখতে চান জানতে চাইলে মো. রবিউল হক বলেন, এমন বাংলাদেশ দেখতে চাই যেই বাংলাদেশে থাকবে না কোন দূর্নীতি,স্বজনপ্রীতি,আত্মীয়করণ ও দলীয়করণ।