মঙ্গল্বার ১৯ নভেম্বর ২০১৯
  • প্রচ্ছদ » sub lead 1 » অন্ত:সত্ত্বা নারীকে ধর্ষণের সহায়তা করায় রাজাকারকে গুলি করে হত্যা করি-জাহিদ হাসান


অন্ত:সত্ত্বা নারীকে ধর্ষণের সহায়তা করায় রাজাকারকে গুলি করে হত্যা করি-জাহিদ হাসান


আমাদের কুমিল্লা .কম :
10.03.2019

সম্মুখ সমরের মুক্তিযোদ্ধা-১০

শাহাজাদা এমরান।।
বীরমুক্তিযোদ্ধা জাহিদ হাসান বলেছেন, শিবের বাজার-আমড়াতলী-ছাওয়ালপুর যুদ্ধে আমরা পেরে না উঠে পিছু হঠার পর রাজাকারদের সহায়তায় হানাদার বাহিনী এই তিন গ্রাম ও আশেপাশের এলাকায় মুক্তিযুদ্ধাদের খোঁজে না পেয়ে ব্যাপক ধ্বংসলিলা চালায়। এই যুদ্ধে হানাদার বাহিনী প্রায় শতাধিকের উপর নিরিহ গ্রামবাসীকে হত্যা করে। পরে আমরা খবর পেয়ে এসে দেখি ১৫/১৬ বছরের এক অন্ত:সত্ত্বা যুবতী মেয়েকে পাকিস্তানী হানাদার বাহিনী ধর্ষণ করে একটি ঘরে ফেলে গেছে। আর এই ধর্ষণ কাজে যে সহযোগিতা করেছে সে ঘরের সামনে ঘুরাঘরি করছে। ধর্ষিতা মেয়েটির সাথে কথা বলে জানতে পারলাম, এই সেই রাজাকার যে তাকে তুলে আনার সময় পাঞ্জাবীদের সহযোগিতা করছে। তখন মেয়েটিকে তার বাবা-মার কাছে ফিরিয়ে দিয়ে ঐ রাজাকারকে গুলি করে হত্যা করি।

জাহিদ হাসান। পিতা মুকবুল হোসেন এবং মাতা জমিলা খাতুন। পিতা মাতার ৪ ছেলে আর ২ মেয়ের মধ্যে তিনি ছিলেন সবার ছোট। পৈত্রিক নিবাস ব্রাহ্মণবাড়িয়া হলেও বেড়ে উঠেছেন শহর কুমিল্লায়। বর্তমানে এখানেই তিনি স্থায়ী নিবাস করেছেন।
ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলার কসবা উপজেলার চানপুর তমিজ উদ্দিন হাই স্কুলে ৮ম শ্রেণীতে পড়া অবস্থায় ছাত্রলীগের মাধ্যমে ছাত্র রাজনীতিতে প্রবেশ করেন। পরে ১৯৭০ সালে কুমিল্লা ভিক্টোরিয়া সরকারি কলেজ ছাত্রছাত্রী সংসদের নির্বাচনে ছাত্রলীগের শাহ আলম-কবীর-সেলিম প্যানেলে সহ সমাজ সেবা সম্পাদক পদে নির্বাচিত হই। সেই সময়ে জেলা ছাত্রলীগের সভাপতি ছিলেন এড.সৈয়দ আবদুল্লাহ পিন্টু।
কিভাবে যুদ্ধে গেলেন জানতে চাইলে জাহিদ হাসান বলেন, বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের ভাষণের পরই আমরা মুক্তিযুদ্ধে অংশ নেয়ার জন্য মানসিক প্রস্তুতি নিতে শুরু করি। ২৫ মার্চ রাতে যখন হানাদার বাহিনী কুমিল্লা শহরে আক্রমণ করার পর আমরা মূল নেতৃত্ব থেকে কিছুটা বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ি। সারা শহরে পাকিস্তান আর্মির টহল বেড়ে যায়। এই অবস্থায় ২৯ মার্চ গ্রামের বাড়ি কসবার রায়তলা গ্রামে চলে যাই। গ্রামে গিয়ে যোগাযোগ করার চেষ্টা করি আমাদের ভিক্টোরিয়া কলেজের ছাত্র নেতাদের সাথে। তারা তখন কে কোথায় আছেন কিছুই জানি না। এপ্রিলের সম্ভবত দ্বিতীয় সপ্তাহের দিকে হঠাৎ এক সকালে দেখি আমাদের গ্রামের ঈদগায়ে বঙ্গবন্ধু ছেলে শেখ জামাল। আমাদের এলাকার প্রভাবশালী আওয়ামী লীগ নেতা ময়নাল হোসেন মনা ভাই তাকে দেখভাল করে ভারতে যাওয়ার ব্যবস্থা করে দেন। শেখ জামালকে আমাদের গ্রামে দেখে আমার যুদ্ধে যাওয়ার উদ্দীপনা আরো বেড়ে গেল। কিন্তু যাব কিভাবে ? কারণ,আমি হলাম বাবা-মার সবচেয়ে ছোট ছেলে। তার উপর বাবা নেই। বলতে পারেন মায়ের অন্ধের যষ্টি আমি । কুমিল্লা শহর থেকে গ্রামে আসার পর মা আমাকে সারাক্ষণ চোখে চোখে রাখছেন। যাতে আমি কোন ভাবেই যুদ্ধে না যাই। এপ্রিলের শেষ দিকে বা মে মাসের প্রথম দিকে চাচাতো ভাই খসরুসহ মাকে না বলে নৌকা দিয়ে যাই কসবা সীমান্তে । পড়ে এখান থেকে ভারতের আগড়তলা হাফানিয়া ইয়ুথ ক্যাম্পে। এই ক্যাম্পে এসে পাই আমাদের বি বাড়িয়ার প্রভাবশালী ছাত্র নেতা কুতুব ভাই, হুমায়ুনসহ আরো অনেকের সাথে। এখানে কয়েকদিন থাকার পর যখন দেখি প্রশিক্ষণের কোন ব্যবস্থা হচেছ না তখন যাই কংগ্রেস ভবনে। সেখানে গিয়ে অধ্যাপক খোরশেদ আলম স্যার বললেন, আচ্ছা দেখতেছি কি করা যায়। কিছু দিন পর আমাদের ইয়ুথ ক্যাম্পে আসেন খোরশেদ স্যার, ছাত্রনেতা ও পরবর্তী পর্যায়ে মন্ত্রী এমপি শাহজাহান সিরাজ, ভিপি শাহআলম ভাই ও কুতুব ভাই এসে আমাকেসহ প্রায় ৪০/৫০জনকে প্রশিক্ষণের জন্য নিয়ে যায়। আমাদের হাফানিয়া ইয়ুথ ক্যাম্প থেকে প্রথমে নিয়ে যায় লোহারভর প্রশিক্ষণ শিবিরে।এখানে প্রশিক্ষণের সুযোগ না পেয়ে আমাদের ওম্পিনগর প্রশিক্ষণ কেন্দ্রে নিয়ে যায়।এই ওম্পিনগর কেন্দ্রের মূল দায়িত্বে ছিলেন ভারতীয় মেজর আব্রাহাম। আমাদের চার্লি ক্যাম্পের দায়িত্বে ছিলেন ফোর ব্যাংলের সুবেদার মেজর আম্বর আলী আর প্রশিক্ষক ছিলেন,ভারতীয় সেনাবাহিনীর প্রশিক্ষকরা। এক মাস প্রশিক্ষণ শেষ করে আমাদের অস্ত্রের জন্য পাঠানো হয় মেলাঘর ক্যাম্পে। মেলাঘর ক্যাম্পের দায়িত্ব প্রাপ্ত মেজর হায়দার আমাদের অস্ত্র না দিয়ে অস্ত্র দিচ্ছেন ঢাকা থেকে আসা মুক্তিযোদ্ধাদের। এভাবে চলে যায় কয়েকদিন। এরপর একদিন সকালে মেলাঘরে দেখা হয় আমার বন্ধু সফিউল আহমেদ বাবুল ও ভিপি শাহআলম ভাইয়ের সাথে। আমি কমান্ডার বাবুলকে ঘটনাটি জানালে তিনি সাথে সাথে মেজর হায়দারের কাছে গিয়ে আমার নামে একটি এস এল আর ইস্যূ করান। অস্ত্র দেয়ার পর আমাদের দেওয়া হয় এফ এফ বাহিনীর যুদ্ধকালীন সময়ে কোতয়ালী থানার কমান্ডার আবদুল মতিন ভাইয়ের সাথে। কোতয়ালী ক্যাম্পটি ছিল তখন এনসি নগরে। এই এনসি নগরে এসেই আমি বুঝতে পারলাম না যে আমি কোথায় আছি কুমিল্লা না ভারতে। এখনে আমার বন্ধুদের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন আবু, আসাদ, বুলবুল,নাঈম,কমল,রফিক।
প্রথম যুদ্ধ সম্পর্কে জানতে চাইলে জাহিদ হাসান বলেন, আগস্টের শেষ দিকে হবে,আমাদের কমান্ডার আবদুল মতিন ভাই বললেন, আমরা পাঁচথুবির ইটাল্লা আক্রমন করব। তোমরা দ্রুত প্রস্তুত হয়। কমান্ডার মতিন ভাইয়ের নেতৃত্বে বেলা ১২টার দিকে আমরা ২৫/৩০জন মুক্তিযোদ্ধা ইটাল্লা আসি। আমরা ইটাল্লা গিয়ে সবেমাত্র এ্যামবুশ করলাম এরই মধ্যে হানাদার বাহিনী আমাদের উপর ফায়ার শুরু করে। আমি ছিলাম কবারিংয়ে। তখন আমাদের প্রথম দল নাজিম উদ্দিনসহ অন্যান্যরা পাল্টা আক্রমন শুরু করে। একপর্যায়ে যখন দেখা গেল হানাদার বাহিনী আর্টিলারী নিক্ষেপ করছে তখন আমি,নঈম,কমলসহ আমরা যারা কভারিংয়ে ছিলাম তারা সামনে এসে ফায়ার শুরু করি। এ সময় আমার হাতে ছিল একটি এসএলআর। আমাদের যৌথ আক্রমনে পাক সেনারা সেদিনের মতো পিছু হটতে বাধ্য হয়।
এরপর কুমিল্লার বিভিন্ন স্থানে সুবর্নপুর, আমড়াতলী,শিবের বাজারসহ বিভিন্ন স্থানে একাধিক সম্মুখ যুদ্ধে অংশ গ্রহণ করি। স্মরণীয় যুদ্ধের স্মৃতি জানতে চাইলে মুক্তিযোদ্ধা জাহিদ হাসান বলেন, ঐ সময় প্রতিটি যুদ্ধই ছিল স্মরণীয় যুদ্ধ। তবে সেপ্টম্বর মাসের শেষ দিকে পাকিস্তানী বাহিনীর সাথে শিবেরবাজার-আমড়াতলী-ছাওয়ালপুর যুদ্ধটি ছিল ভয়ানক যুদ্ধ। আমাদের কাছে খবর ছিল যে ,হানাদার বাহিনী শিবেরবাজার-আমড়াতলী-ছাওয়ালপুর এর দিকে অগ্রসর হচ্ছ্ েআমরা তাদের প্রতিরোধ করার জন্য আমরাও শিবের বাজারের দিকে আসছ্ ি। এর আগেই আমরা পাক বাহিনীর সম্ভাব্য আক্রমন প্রতিহত করতে এখানে এসে কয়েক দিন অবস্থান নেই।
পাকিস্তান বাহিনী হঠাৎ করে শিবেরবাজার-আমড়াতলী-ছাওয়ালপুর এক সাথে তিন দিক দিয়ে ত্রিমুখী আক্রমন করছে ,আর্টিলারী নিক্ষেপ করছে। অবস্থা বেগতিক দেখে আমাদের কমান্ডার ক্যাপ্টেন দিদারুল আলমের সাহায্য চাইলেন। তিনি সাথে সাথে আমাদের তিন প্লাটুন সেনাবাহিনীর সদস্য দিলেন।কিন্তু তারপরেও আমরা তাদের আক্রমনের মুখে দাঁড়াতেই পারছি না। যখন দেখছি তারা শক্তিশালী থেকে আরো শক্তিশালী হয়ে বীরদর্পে সামনে এগিয়ে আসছে। এই অবস্থায় আমাদের পুরো বাহিনী পেছনের দিকে ছুটে যায়। পরে হানাদার বাহিনী পুরো তিনটি এলাকা দখল করে ব্যাপক হত্যাযজ্ঞা,লুটপাট ও ধর্ষনসহ এমন হেন কাজ নেই যা তারা করে নাই। প্রায় শতাধিকের উপর নিরীহ গ্রামবাসীকে তারা হত্যা করে। এমনকি ১০/১৫জন নারীকে ধর্ষনের পর হত্যা করে একটি এক দেড় বছরের জীবন্ত শিশুসহ একটি রুমে আটকে রেখে বাহির দিয়ে বন্ধ করে দেয়। হানাদার বাহিনীর স্মরণ কালের এই নির্মম হত্যা ধর্ষনযজ্ঞের খবর পেয়ে দুই দিন পর আমরা আবার পূর্ন শক্তি নিয়ে নিয়ে আবার শিবেরবাজার-আমড়াতলী-ছাওয়ালপুর আসি।এসে দেখি, একটি বদ্ধ ঘরে ১০/১৫টি মহিলার বিবস্ত্র মৃত দেহ।প্রচন্ড গরমে তীব্র দুর্গন্ধ বের হচ্ছে। এরই মধ্যে পাওয়া গেল একটি এক দেড় বছরের অর্ধমৃত একটি শিশুও।সবাইকে আমরা জানাযা,কাফন,গোসল ছাড়া এক সাথে মাটি চাপা দেই। পরে শুনলাম, হানাদার বাহিনীর একটি পরিত্যক্ত ব্যাংকারে ১৫/১৬ বছরের এক অন্ত:সত্তা যুবতী মেয়েকে পাক বাহিনী ধর্ষন করে আটকে রেখে এক রাজাকারকে পাহারাদার হিসেবে রেখে যায়। যাতে ঐ ধর্ষিত মেয়েটি বের হতে না পারে। আমরা ঐ মেয়েটিকে উদ্ধার করে তার বাবা-মার হাতে হস্তান্তর করি। পরে ঐ রাজাকার (এখন আর নাম মনে নেই)কে ধরে এনে আমার এসএলআর দিকে তাকে হত্যা করি। এসময় আমার বন্ধু নাজিম উদ্দিন,আবু,আসাদসহ অন্যান্য মুক্তিযোদ্ধারাও সাথে ছিল।
আরেকটি যুদ্ধের বর্ননা দিতে গিয়ে জাহিদ হাসান বলেন, নভেম্বর মাসে প্রথম দিকে, আমাকে আর শাহাদাত হোসেন রতনকে ভিপি শাহআলম ও নাজিমসহ অন্যান্যরা বলল, শান্তি কমিটির চেয়ারম্যান নগরীর ঝাউতলাস্থ এড.মজিবুর রহমানের বাসায় আক্রমন করার জন্য। কিন্ত আমি আর রতন সেখানে গিয়ে ফিরে আসি তার বাসায় ব্যাপক নিরাপত্তা থাকার কারনে।
যুদ্ধ শেষে কখন দেশে এলেন জানতে চাইলে বীরমুক্তিযোদ্ধা জাহিদ হাসান বলেন, আমাদের বন্ধু নাজিমসহ তাদের একটি গ্রুপ আগে থেকেই কুমিল্লায় ছিলেন বিভিন্ন অপারেশনের জন্য। ৬ ডিসেম্বর নাজিম উদ্দিন খবর পাঠাল যে, তোরা কুমিল্লা চলে আয়। আগামী কয়েক দিনের মধ্যে কুমিল্লা হানাদার মুক্ত হয়ে যাবে।তারা ইতিমধ্যে তাদের ক্যাম্প-ডিফেন্স উঠিয়ে নিয়ে যাচ্ছে। তারপর নাজিম কুমিল্লা পৌরসভার তৎকালীন চেয়ারম্যান বগা মিয়ার গাড়ি ছিনতাই করে সীমান্ত যায় আমাদের নিয়ে আসতে। এরই মধ্যে আরো দুটি গাড়িও চলে আসে সীমান্তে। তখন আমরা একটি গ্রুপ সীমান্ত থেকে সরাসরি বাগিচাগাঁওস্থ স্টেশন রোডের মুন্সি বাড়ির জাহাঙ্গীরের বাসায় আশ্রয় নেই। কিন্তু সবাই থাকার সুযোগ না থাকায় রেইসকোর্স এসে দলিলুর রহমান দালালের বাড়ি দখল করে ক্যাম্প স্থাপন করি । এ সময় আমাদের সাথে ছিলেন মতিন কমান্ডার ,ভিপি শাহআলম,নাজিম, আবাদ,আবু,রতন, মুন্সি বাড়ির এনাম,কমল,অমল,কোহিনুর,জাহাঙ্গীরসহ অন্যান্যরা ।
যুদ্ধের পর পরবর্তী জীবন সম্পর্কে জানতে চাইলে জাহিদ হাসান বলেন, মোটামোটি ভাল ছিল ।
যে স্বপ্ন নিয়ে যুদ্ধ করেছেন সেই স্বপ্ন পূরন হয়েছে কিনা জানতে চাইলে তিনি বলেন, স্বপ্ন পূরন হয়নি একথা যেমন সত্য ঠিক এ কথাও সত্য যে, বর্তমান সরকার মুক্তিযোদ্ধাদের জন্য যা করেছে তা আর কোন সরকার করেনি। সেজন্য বর্তমান সরকারের প্রতি আমরা কৃতজ্ঞ।
আগামীর বাংলাদেশকে কেমন দেখতে চান জানতে চাইলে মুক্তিযুদ্ধের বীর সেনানী জাহিদ হাসান বলেন, অনেক উন্নত দেখতে চাই। যাতে বিশ্বের দরবারে বাংলাদেশ মাথা উচুঁ করে দাঁড়াতে পারে।