সোমবার ২৩ †m‡Þ¤^i ২০১৯


২৩ মার্চ থেকে আমরা যুদ্ধ শুরু করি-আমির হোসেন


আমাদের কুমিল্লা .কম :
12.03.2019

সম্মুখ সমরের মুক্তিযোদ্ধা-১২

                                                         বীরমুক্তিযোদ্ধা আমির হোসেন
শাহাজাদা এমরান।।
বীরমুক্তিযোদ্ধা আমির হোসেন বলেছেন, বঙ্গবন্ধু শেখ মজিবুর রহমানের ৭ মার্চের ভাষণের পরই আমরা চট্টগ্রামে যারা বিভিন্ন মিল ফ্যাক্টরিতে চাকুরী করতাম তারা এক প্রকার নিশ্চিত ছিলাম যে কোন দিন যুদ্ধ শুরু হতে পারে। তাই আমাদের প্রস্তুতিও ছিল তেমনি। আমি তখন চাকুরী করতাম চট্টগ্রামের কর্ণফুলির পাকিস্তানীদের মালিকানাধীন রেয়ন মিলে। তখন চট্টগ্রামে অলরেডি যুদ্ধ যুদ্ধ ভাব শুরু হয়ে গেছে। ২৩মার্চ সকালে আমাদের নিরাপত্তা কর্মকর্তা অবসরপ্রাপ্ত ক্যাপ্টেন নুরুল হুদার নেতৃত্বে আমরা ১৩১ সদস্য বিশিষ্ট একটি কমিটি গঠন করে বিকালেই মিলে কর্মরত বিহারী,পাঠান ও পাঞ্জাবীদের ৪০ থেকে ৫০জন শ্রমিককে ধরে মেটানিজ স্টোরে আটকে রাখি। ২৪ মার্চ সকালে আমাদের দায়িত্বপ্রাপ্ত গার্ড তাদের নাস্তা দিতে গেলে আটককৃতরা এই সুযোগে গার্ডদের থেকে জোরপূর্বক অস্ত্র ছিনিয়ে নিয়ে ফায়ার শুরু করে। এরই মধ্যে গার্ডদের আত্মচিৎকারে আমরা মুহুর্তের মধ্যেই পজিশন নিয়ে ফেলি। তখন আমাদের কোন অস্ত্রও ছিল না,প্রশিক্ষণও ছিল না। আমরা গজারি লাঠি দিয়ে আর আমাদের বাঙ্গালি সিকিউরিটি গার্ডরা বন্ধুক দিয়ে তাদের উপর আক্রমন করি। এতে তাদের ৩জন নিহত হয়। মো.আমির হোসেন মজুমদার। পিতা টুকু মিয়া মজুমদার এবং মাতা সরবত বানু। পিতা-মাতার তিন ছেলে ও তিন মেয়ের মধ্যে তিনি সবার বড়। তিনি ১৯৪৯ সালের ২৮ মার্চ কুমিল্লার চৌদ্দগ্রাম উপজেলার বাতিসা ইউনিয়নের দেবীপুর গ্রামে জন্ম গ্রহন করেন।
কিভাবে মুক্তিযুদ্ধে অংশ গ্রহন করলেন জানতে চাইলে আমির হোসেন বলেন, মুলত ৭ মার্চের পরই চট্রগ্রামের অবস্থা অন্য রকম হতে থাকে। ১০/১২ তারিখের পর থেকেই বন্দর দিয়ে অতিরিক্ত সৈন্য এবং গোলাবারুধ যে আসছে তা আমরা খবর পেতাম। এভাবেই আমরা বিভিন্ন ফ্যাক্টরিতে যারা বাঙ্গালী শ্রমিক ছিলাম তখন এ বিষয়ে আমরা আলোচনা করতাম। এতে আমাদের উৎসাহ দিতেন আমাদের নিরাপত্তা কর্মকর্তা অবসরপ্রাপ্ত ক্যাপ্টেন নুরুল হুদা। তিনি ২২ মার্চ আমাদের সাথে এ বিষয়ে কথা বললেন আর ২৩ মার্চ সকালে তিনি প্রধান হয়ে ১৩১ সদস্য বিশিষ্ট কয়েন মিল বাঙ্গালী ফোর্স গঠন করলেন । একই দিন বিকালেই বললেন, মিলে বর্তমানে যারা অবাঙ্গালী আছে তাদের ধরে ধরে একটি রুমে আটকে রাখ। এভাবেই বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধ আনুষ্ঠানিক ভাবে শুরু হওয়ার আগেই আমরা যুদ্ধ শুরু করি। ২৩ মার্চ তাদের আটক পরদিন ২৪ মার্চ উভয়ের মধ্যে সংঘর্ষে তিন অবাঙ্গালী নিহত হওয়ার পর আমরা প্রশিক্ষনের জন্য একই দিন রাঙ্গামাটি যাই। পরে রাঙামাটি দিয়ে ১নং সেক্টরের ক্যাম্প সাবরুম যাই।আমাদের চৌদ্দগ্রাম উপজেলার বাতিসা এলাকার আলী হোসেন, আবদুল কাদের,আনোয়ার হোসেনসহ আমাদের পুরো ১৩১জন আমরা অবসরপ্রাপ্ত ক্যাপ্টেন নুরুল হুদার নেতৃত্বে রাত ২টার দিকে যাই। আমরা ছিলাম ১নং সেক্টরের সাবরুম কেন্দ্রের প্রথম ব্যাচের যোদ্ধা। সাবরুম ক্যাম্পে আমরা প্রথম ৭ দিন প্রশিক্ষন নেই। আমাদের প্রশিক্ষক ছিলেন, ভারতীয় সেনাবাহিনীর মেজর তেওয়ারী। আমাদের ১৩১ জনের মধ্যে বাছাই করে আমি সহ ২৫জনকে বগাপা প্রশিক্ষন কেন্দ্রে পাঠায় উচ্চতর প্রশিক্ষনের জন্য। বগাপা কেন্দ্রে যাওয়ার পর প্রথম দিনই মেজর জিয়াউর রহমান (পরবর্তীতে বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি হন) আমাদের ২৫জনকে এ্যাসম্বলীতে দাঁড় করিয়ে এক আবেগঘন ভাষন দিয়ে জানতে চান তোমরা কে কে দেশের জন্য বুকের তাজা রক্ত আজ বিলিয়ে দিতে চাও। যারা চাও তারা এক কদম করে সামনের দিকে এগিয়ে আস। পরে আমাদের এই ২৫ জনের মধ্যে আমাদের এলাকার আলী হোসেন,আমিসহ আমরা ৭ জন সামনের দিকে এগিয়ে আসলাম। আমাদের এই ৭জনকেই তিনি প্রাথমিক ভাবে ৭টি যুদ্ধের কমান্ডার হিসেবে নিয়োগ দিলেন।
প্রথম যুদ্ধের অভিজ্ঞতা সম্পর্কে জানতে চাইলে এই সম্মুখ সমরের যোদ্ধা আমির হোসেন বলেন, এপ্রিলের প্রথম সপ্তাহেই আমার গ্রুপকে নির্দেশ দেওয়া হলো, ফেনী জেলার শ্রী নগর সীমান্তে দিয়ে দেশে প্রবেশ করে তৎসংলগ্ন শুভপুর ব্রিজ উড়িয়ে দিতে হবে। কারণ, হানাদার বাহিনী এই ব্রিজ ব্যবহার করে ভারী অস্ত্র আনা নেওয়া করে। ঐদিনই ছিল আনুষ্ঠানিক যোদ্ধা হিসেবেও আমার প্রথম আবার গ্রুপের কমান্ডার হিসেবেও আমার প্রথম এ্যাসাইনমেন্ট। এই অভিযানে আমরা ৯ জন অংশ গ্রহন করি। হানাদার বাহিনীর কয়েকজন সদস্য সর্বদা এই ব্রিজ পাহারা দিত। এখানে এসে দেখলাম এই ব্রিজটি উড়িয়ে না দিয়ে দখল করতে পারলে আমাদের জন্যই সুবিধা হবে। মেসেজটি সাবরুম ক্যাম্পে পাঠিয়ে অনুমতি ইে। পরে এখানে আমরা খন্ড খন্ড ৭দিন যুদ্ধ করার পর ব্রিজটি হানাদার বাহিনীর কাছ থেকে দখল মুক্ত করি। শুভপুর ব্রিজ মুক্ত করার এই যুদ্ধে আমরা বিজয়ী হলেও আমাদের হারাতে হয়েছে ঢাকার সন্তান শাহজালাল নামে এক সাহসী শহিদ মুক্তিযোদ্ধাকে। যুদ্ধের ৭ম দিনে সে হানাদার বাহিনীর গুলিতে শহিদ হয়। আমরা তাকে জানাযা,দাফন ও কাফন ছাড়াই মাটি চাপা দিয়ে রাখতে বাধ্য হই। জীবনের প্রথম যুদ্ধে বিজয়ী হয়ে সাবরুম ক্যাম্পে যাওয়ার পর সেক্টর কমান্ডার মেজর জিয়া খুশিতে আমাদের ৭দিন ছুটি দেন। আমরা যেন এই ৭দিন ছুটি কাটিয়ে পরবর্তী আরেকটি যুদ্ধের জন্য প্রস্তুতি গ্রহন করতে পারি। তখন আমরা ফেনী গিয়ে বিশ্রাম সময় কাটাই। এ কয়েকদিন আমাদের খাবার কষ্ট ছিল অবর্ণনীয়। যদিও আমাদের নেতৃত্বের নির্দেশ ছিল যখন যে এলাকায় যুদ্ধ করবা তখন সে এলাকার জনগনের কাছ থেকে সার্বিক সহযোগিতা নিবা। প্রয়োজনের একটু কঠোর হলেও যুদ্ধের ময়দানের কোন সমস্যা হবে না। বিশ্রামের পর আমার অধীনে থাকা প্রতিটি যোদ্ধাই বলল, আমরা আর এই ক্যাম্পে থাকবনা। আমরা এখান থেকে বিদায় নিয়ে নিজ নিজ এলাকায় গিয়ে যুদ্ধ করব। এরপর আমিসহ সবাই ফেনীর চোত্তাগোলা ক্যাম্পের ইনচার্য খাজা আহমেদের নিকট হাতিয়ার জমা দিয়ে সবাই যার যার এলাকায় চলে আসি এপ্রিলের শেষ সপ্তাহের দিকে। বাড়ি এসে এক রাত থাকি। পরে ২নং সেক্টরের সাব সেক্টর নির্ভয়পুর ক্যাম্পে যোগ দেই। এই ক্যাম্প থেকে আবার আমাদের কালাকৃঞ্চ নগর ক্যাম্পেড পাঠান। তখন এই কালাকৃঞ্চ ক্যাম্পের ক্যাম্প কমান্ডার ছিলেন ক্যাপ্টেন মাহবুবুর রহমান,প্লাটুন কমান্ডার ছিলেন, সুবেদার মাহবুবুর । এই নির্ভয়পুর ক্যাম্প থেকে দেশ স্বাধীন হওয়ার আগ পর্যন্ত অসংখ্য ছোট বড় যুদ্ধে অংশ গ্রহন করি।
একটি স্মরণীয় যুদ্ধের কথা বলতে গিয়ে তিনি বলেন, অক্টোবর মাসের শেষ দিকে হবে। একদিন আমাদের কমান্ডার মাহবুবুর রহমান বললেন, কুমিল্লার বর্তমানের সদর দক্ষিণ উপজেলার গলিয়ারা ইউনিয়নের কনেশতলা হানাদার বাহিনীর বাংকারে আক্রমন করতে হবে। আমাদের অগ্রবর্তী দল রেকি করে জানায় কনেশতলা স্কুলে আমাদের রাত্রি যাপন করতে হবে। এই যুদ্ধে আমরা কালাকৃঞ্চপুর ক্যাম্পের পুরো কোম্পানী চলে আসি। আমাদের একটি গ্রুপ যখন স্কুলের মাঠে এসে পৌঁছায় তখন বাজে রাত প্রায় ২টা। সবার চোখেই ঘুম । সকালে অভিযানে নামতে হবে। আমাদের আরেকটি গ্রুপ রাস্তায় ডিউটি করছে। গিয়ে দেখি স্কুলের সব কটি রুমই খালি। যে যেভাবে পারছে কোন মতে গা এলিয়ে চুপচাপ শুয়ে পড়ছে।এর মধ্যে আমি যে রুমে ছিলাম এই রুমের একপাশে আবার হানাদার বাহিনীর কয়েকজনও ঘুমিয়ে আছে। তারা ডিউটি করে পরবর্তীদের হাতে ডিউটি হস্তান্তর করে এখানে রেস্ট নিচ্ছে। আমরা মনে করছি, এরা তো আমাদেরই লোক। হয়তো হানাদাররাও ঘুমের মধ্যে মনে করছে তারা তো আমাদেরই লোক। নিজের লোক মনে করে কেউ কাউকে ডাক দিচ্ছি না। এর মধ্যে ভোর রাতের দিকে রাস্তার পাশের খাল পাড়ে আমাদের পেট্রোল ডিউটির সাথে হঠাৎ করে কয়েকজন রাজাকারের মুখোমুখি সাক্ষাত হয়ে যায়। রাজাকার দেখে আমাদের সৈনিকদের মাথা গরম হয়ে যায়। তারা শুরু করে দিল ফায়ার। এই ফায়ারের শদ্ধে আমরা আর হানাদাররা সবাই উঠে ড়িয়ে ফায়ার শুরু করে। যে যেভাবে পারছে ফায়ার করছে। চর্তুদিকে তখনো অন্ধকার। আমাদের রুমের হানাদার বাহিনীর সদস্যরাও রুমের বাহির হয়ে এলোপাতারী গুলাগুলি শুরু করল। তখন আমরা অধিকাংশই কিছুটা নিরাপদ দূরুতে চলে গেলাম। কারণ, কে মুক্তিবাহিনী আর কে হানাদার ঠিক ঐ সময়ে বুঝার উপায় ছিল না। এক পর্যায়ে আমরা পূর্বদিকে আর হানাদার বাহিনী পশ্চিম দিকে অবস্থান নেয়।এ যুদ্ধে অনেক হতাহত হয়। তবে ঐ রাতে বেশীর ভাগ নিহত হয় পাঞ্জাবীরা। যার কারণে পরদিন সকালে তারা চৌয়ারা বাজার এলাকার কয়েকটি গ্রামে ব্যাপক ধ্বংসযজ্ঞ চালায় এবং ৭/৮ জন গ্রামের নিরিহ মানুষকে হত্যা করে।
কুমিল্লা মুক্ত দিবসের কথা বলতে গিয়ে এই বীর যোদ্ধা বলেন, ৮ ডিসেম্বর আমরা ছিলাম ১৪জাট রেজিমেন্ট(ভারতীয়) এর সাথে। কোটবাড়ি,ভুচ্ছি এলাকায় আমাদের ডিফেন্স ছিল। কোটবাড়ি বিডিআর ক্যাম্পের পশ্চিম পাশের গ্রামে ছিলাম আমরা । বিকাল ৪টায় পাকিস্তান বাহিনী সাদা পতাকা নিয়ে লালমাই পাহারের নিচে এসে তারা মিত্র বাহিনীর সাথে কথা বলতে চায়। তখন জাট রেজিমেন্টের ৪জন অফিসার এবং আমিসহ আমরা ৪জন এফ এফ সদস্য এই মোট ৮জন তাদের দেওয়া আরেকটি সাদা পতাকা নিয়ে এগিয়ে আসি। তখন পাকিস্তানী বাহিনীর এক অফিসার আমাদের ভারতীয় এক অফিসারেরর সাথে হাত মিলিয়ে বলে আজ থেকে তোমরা স্বাধীন। আমরা মেনে নিলাম। তোমাদের সাথে আমাদের আর কোন যুদ্ধ নেই। আমরা এখন থেকে আর কেউ কারো উপর আক্রমন করবো না। পরে ১৬ ডিসেম্বর পর্যন্ত সেনানিবাস এলাকা সংলগ্ন গ্রামটিতে আমাদের ডিফেন্স ছিল। ১৮ডিসেম্বর দিনের কোন এক সময় প্রায় ১৫০ বা ২০০ হবে পাকিস্তানী সেনা নিয়ে আমরা ভারতে আমাদের ক্যাম্পে গিয়ে তাদের হস্তান্তর করি।
যুদ্ধের পরবর্তী অবস্থা কেমন ছিল জানতে চাইলে তিনি বলেন, আমরা একই পরিবারের ৮জন মুক্তিযুদ্ধে অংশ নিয়েছি। ইনশাল্লাহ আমাদের সার্বিক অবস্থা ভালই ছিল।
যে স্বপ্ন নিয়ে দেশ স্বাধীন করেছেন তা পূরণ হয়েছে কিনা জানতে চাইলে তিনি বলেন, যুদ্ধ করেছি দেশ স্বাধীনের জন্য। দেশ স্বাধীন হয়েছে। এটাই তো ছিল আমাদের স্বপ্ন।
আগামীর বাংলাদেশকে কেমন দেখতে চান জানতে চাইলে তিনি বলেন, খুব ভাল দেখতে চাই। যাতে সারা বিশ্বের মানুষ একটি উন্নত রাষ্ট্র হিসেবে আমাদেরকে চিনে।