শনিবার ১৯ অক্টোবর ২০১৯


দোয় দুরুদ পড়তে পড়তে জমিতে নেমে পড়ি – নজরুল ইসলাম


আমাদের কুমিল্লা .কম :
08.04.2019

সম্মুখ সমরের মুক্তিযোদ্ধা -২৮

শাহাজাদা এমরান।।
পকেটে গ্রেনেড নিয়ে রসুলপুর দিয়ে যাচ্ছি। এমন সময় লক্ষ করলাম,সামনে দিয়ে কয়েকজন পাঞ্জাবী সেনা আসতেছে। মনে মনে দোয়া দুরুধ পড়ে ভাবছি আজই আমার জীবন শেষ। তারা আমাকে সামনে পেলেই পকেটে হাত দিলে দেখবে গ্রেনেড। তখন আর রক্ষা নেই। হঠাৎ করে মহান আল¬াহর মেহেরবানীতে মাথায় বুদ্ধি এলো। উপস্থিত বুদ্ধি খাটিয়ে নেমে পড়লাম এক ধানী জমিতে। কৃষকদের সাথে আমিও ধান কাটা শুরু করলাম। এর ২ মিনিট পরই লক্ষ করলাম আমার পেছনে পাঞ্জাবীরা এসে উপস্থিত। পেছন দিক থেকে আমার জামার কলারে ধরে টান দিল। আমি দাঁড়ালাম। জানতে চাইল কেন আমি রাস্থা থেকে জমিতে নেমে এলাম। আমি উত্তার দেয়ার আগেই জমির মালিক বুদ্ধি খাঁটিয়ে উর্দুতে বলল,সে আমার জমির কাজের লোক। ধান কাটার জন্যই এসেছে। তখন আর কিছু না বলে তারা চলে যায়।
মো. নজরুল ইসলাম।পিতা কালা মিয়া ও মাতা রমিজা খাতুন। ১৯৫৩ সালের ১ ফেব্রুয়ারি তিনি কুমিল্ল¬ার আদর্শ সদর উপজেলার ৪নং আমড়াতলী ইউনিয়নের রসুলপুর গ্রামে জন্ম গ্রহণ করেন। পিতা মাতার ৬ ছেলে ও ২ মেয়ের মধ্যে তার অবস্থান ৬ষ্ট।
কিভাবে যুদ্ধে গেলেন জানতে চাইলে মো. নজরুল ইসলাম বলেন,১৯৭১ সালে আমি রসুলপুর হাই স্কুলে দশম শ্রেনীতে পড়তাম। মার্চের শেষ দিকে যুদ্ধ শুরু হয়। চাচাতো ভাই শাহ আলমের মাধ্যমে এপ্রিলের শেষ দিকে ভারতের সোনামুড়া যাই। সোনামুড়া ক্যাম্পে সকালে আমাদের সবাইকে লাইনে দাঁড়াতে বলে। তখন আমাদের ১৫জনকে লাইন থেকে থেকে বাছাই করে একটি গ্রুপ করেন। পরে ঐ দিনই আমাদের ১৫জনকে মতিনগরে পাঠিয়ে দেওয়া হয় । মতিনগরে এসে আবদুর রাজ্জাক নামে এক সেনা সদস্যকে পাই যাকে আমি পূর্ব থেকে চিনতাম।এখানে আমাদের গ্রেনেডের উপর ১৭দিন প্রশিক্ষন করানো হয়। পরে আমাদের ১৫জনকে দিয়ে একটি বৃত্তিবাহিনী গঠন করেন।এর কমান্ডার ছিলেন মুন্সিগঞ্জের হারুন অর রশীদ। আমাদের গ্র“পের মুলকাজ ছিল যেখানে হানাদার বাহিনী একত্রিত থাকবে বা তাদের বাংকারে সেখানে গিয়ে গ্রেনেড নিক্ষেপ করে চলে আসা।
আগষ্টের প্রথম দিকে গ্রেনেড নিয়ে প্রথম বারের মত দেশে প্রবেশ করি। একাধিকবার চেষ্টা করেও রসুলপুর ক্যাম্পে কিংবা তার আশেপাশে আমরা গ্রেনেড নিক্ষেপ করতে পারতেছিলাম না। কারণ,এখানে হানাদার বাহিনীর শক্তিশালী টিম ছিল আর রাজাকারও ছিল সক্রিয়।
এক পর্যায়ে আমাদের টিমটিকে ভারতে নিয়ে যাওয়া হয়। যাওয়ার আগে গ্রেনেডগুলো আমরা স্থানীয় মুক্তিযোদ্ধাদের ক্যাম্পে দিয়ে যাই। এবার আমাদের হাতিমারা ইয়ুথ ক্যাম্পে নেওয়া হয়। এখানে কয়েক দিন পর জানালো,তোমরা যারা যারা রাইফেল চালাতে পার তারা আলাদা দাঁড়াও। এখানে আমরা মাত্র কয়েকজন রাইফেল চালাতে পারতাম। আরো কয়েক জায়গায় থেকে লোক এনে ১৫জন এর একটি গ্র“প করে আবার ১৫ দিনের প্রশিক্ষন দেওয়া হয়। প্রশিক্ষন শেষ হলে অস্ত্র সস্ত্র দিয়ে আমাদের বুড়িচং সদর ক্যাম্পে পাঠানো হয় ।এখানে আমরা একাধিক যুদ্ধে সক্রিয় অংশ গ্রহন করি।
একদিন পকেটে গ্রেনেড নিয়ে রাস্থা রেকি করার জন্য রসুলপুর দিয়ে যাচ্ছি। এমন সময় লক্ষ করলাম,সামনে দিয়ে কয়েকজন পাঞ্জাবী সেনা আসতেছে। মনে মনে দোয়া দরুধ পড়ে ভারছি আজই আমার জীবন শেষ। তারা আমাকে সামনে পেলেই পকেটে হাত দিলে দেখবে গ্রেনেড। তখন আর রক্ষা নেই হঠাৎ করে মহান আল¬াহর মেহেরবানীতে মাথায় বুদ্ধি এলো। নেমে পড়লাম এক ধানী জমিতে। জমির কৃষকদের সাথে আমিও ধান কাটা শুরু করলাম। এর ২ মিনিট পরই লক্ষ করলাম আমার পেছনে পাঞ্জাবীরা এসে উপস্থিত। পেছন দিক থেকে আমার কলারে ধরে টান দিল। আমি দাঁড়ালাম। জানতে চাইল কেন আমি রাস্থা থেকে জমিতে নেমে এলাম। আমি উত্তার দেয়ার আগেই জমির মালিক বুদ্ধি খাঁটিয়ে উর্দুতে বলল,সে আমার জমির কাজের লোক। ধান কাটার জন্যই এসেছে। তখন আর কিছু না বলে তারা চলে যায়।
এরপর থেকে দেশ স্বাধীন হওয়ার আগ পর্যন্ত আমরা বুড়িচং সদর ক্যাম্পে থেকে যুদ্ধ করি। ১৬ ডিসেম্বর আমড়াতলীর ইউনিয়নে এসে কৗাম্প করি। এখানে জয়নাল আবেদীন,আবদুল ওহাব মাস্টার,আবদুল হান্নান ওসফিকুল ইসলাম প্রমুখরা ছিলেন।
যুদ্ধের পরবর্তী জীবন কেমন ছিল জানতে চাইলে তিনি বলেন, ভাল ছিল। যে স্বপ্ন নিয়ে যুদ্ধ করেছেন তা পুরন হয়েছে কিনা জানতে চাইলে তিনি বলেন, হ্যা পূরন হয়েছে। আগামীর বাংলাদেশকে কেমন দেখতে চান জানতে চাইলে তিনি বলেন ভাল। খুব ভাল দেখতে চাই।