বুধবার ১৩ নভেম্বর ২০১৯


ব্যাট-বলের ‘নতুন প্রজাপতি’ সাকিবের ডানায় উড়বে বাংলাদেশ?


আমাদের কুমিল্লা .কম :
02.07.2019

এটাকে কি বলবেন, কাকতালীয়! বিস্ময়কর নাকি অবাক করা কোনো বিষয়?

বাংলাদেশের পাঁচ-পাঁচজন ক্রিকেটার ভারতের সাথে প্রথমবার খেলতে নেমেই ব্যাট ও বল হাতে জ্বলে উঠেছিলেন। এর মধ্যে আজকের অধিনায়ক মাশরাফি আর বাঁহাতি পেসার মোস্তাফিজ ভারতের বিপক্ষে প্রথম খেলতে নেমেই হয়েছেন ম্যাচ সেরা। শুধু তাই নয় ইতিহাস ও পরিসংখ্যান পরিষ্কার জানান দিচ্ছে, বাংলাদেশ যে পাঁচবার ভারতকে ওয়ানডেতে হারিয়েছে, তার প্রথম দুই বারের ম্যাচ সেরা মাশরাফি (২০০৪ সালের ২৬ মার্চ ঢাকায় এবং ২০০৭ সালের ১৭ মার্চ পোর্ট অব স্পেনে)।মাঝখানের ম্যাচ সেরা সাকিব (২০১২ সালের ১৬ মার্চ এশিয়া কাপে)। আর সবশেষ দুইবার মোস্তাফিজুর রহমান (২০১৫ সালের ১৮ ও ২১ জুন ঢাকার শেরে বাংলা স্টেডিয়ামে)। দুবারই ৫ বা তার বেশি উইকেট দখলকারী ছিলেন তিনি। প্রথম ম্যাচে ৫/৫০ আর পরের খেলায় নিজেকে ছাড়িয়ে ৪৬ রানে ৬ উইকেট।এবং ইতিহাস জানাচ্ছে সেটাই বাংলাদেশের কাছে ভারতের শেষবার পরাজয়। এরপর যত

বারই দেখা হয়েছে দু’দলের, লড়াই করেছে বাংলাদেশ। প্রতিদ্বন্দ্বীতা হয়েছে; কিন্তু শেষ পর্যন্ত আর পারেনি বাংলাদেশ। জিতেছে ভারত। মাশরাফি আর মোস্তাফিজের কথাতো বলা হলো। বাকি তিনজন তামিম, সাকিব আর মুশফিকও ভারতের সাথে প্রথম খেলতে নেমে নজর কেড়েছিলেন। কারো হাতে ম্যাচ সেরার পুরষ্কার না উঠলেও, তিনজনই ভারতের বিপক্ষে প্রথম খেলতে নেমে ব্যাট হাতে হাফ সেঞ্চুরি করে বেশ সাড়া জাগিয়েছিলেন। কাকতালীয়ভাবে তিনজনই একই ম্যাচে এবং সেটা বিশ্বকাপেই।

২০০৭ সালের ১৭ মার্চ ত্রিনিদাদের পোর্ট অফ স্পেনে। ভারতের বিপক্ষে হাফ সেঞ্চুরি করেছিলেন আজকের ‘পঞ্চ পান্ডবের’ তিনজন তামিম (৫৩ বলে ৫১), সাকিব (৮৬ বলে ৫৩) আর মুশফিক (১০৭ বলে ৫৬*)। বলা বাহুল্য, সেই ম্যাচটা এই তিনজনেরই ছিল বিশ্বকাপে অভিষেক ম্যাচ।

এরপর তামিম-মুশফিক ব্যাট হাতে রান পেলেও কখনো ভারতের বিপক্ষে ম্যাচ জেতানো পারফরমেন্স দেখিয়ে সেরা হতে পারেননি। তবে সাকিব ২০১২ সালের ১৬ মার্চ দেশের মাটিতে এশিয়া কাপে ভারতের বিপক্ষে ৩১ বলে ৪৯ রানের এক ঝড়ো ইনিংস খেলে ম্যাচ সেরা হয়েছিলেন।

মুশফিক-তামিম ভারতের সাথে প্রায় নিয়মিতই ভাল খেলেছেন। ভারতের বিপক্ষে ৭টি হাফ সেঞ্চুরি আছে তামিমের; কিন্তু সেঞ্চুরি নেই। আর মুশফিক ২১ ম্যাচে ২০ বার ব্যাট করে তিনবার পঞ্চাশে পা রাখার পাশাপাশি একবার সেঞ্চুরিও পূর্ণ করেন (২০১৪ সালের ২৬ ফেব্রুয়ারি ফতুল্লার খান সাহেব ওসমান আলী স্টেডিয়ামে, ১১৩ বলে ১১৭)।

ওদিকে সাকিবেরও ভারতের বিপক্ষে সেঞ্চুরি নেই। ১৭ ম্যাচে ১৬ বার ব্যাট করে ৭ বার পঞ্চাশের ঘর ছুঁলেও তিন অংকে পা রাখা সম্ভব হয়নি সাকিবের। সর্বোচ্চ ৮৫ (২০১০ সালের ১১ জানুয়ারি, শেরে বাংলায় ৯৭ বলে) রান।

আরও একটি তথ্য আছে। তাহলো, ভারতের বিপক্ষে হাফ সেঞ্চুরি দিয়ে (২০০৭ সালের ১৭ মার্চ ত্রিনিদাদের পোর্ট অব স্পেনে) বিশ্বকাপ যাত্রা শুরু করা সাকিব ৪ বছর পর, ২০১১ সালে দেশের মাটিতে দ্বিতীয়বার বিশ্বকাপ খেলতে নেমে ভারতের বিপক্ষে আবার পঞ্চাশে পা রাখেন (৫০ বলে ৫৫); কিন্তু ২০১৫ সালের বিশ্বকাপে ভারতের বিপক্ষে আর অর্ধশতকের দেখা পাননি তিনি।

২০১৫ সালের ১৯ মার্চ অস্ট্রেলিয়ার মেলবোর্নে ভারতের বিপক্ষে কোয়ার্টার ফাইনালে সাকিব ফিরে গিয়েছিলেন মাত্র ১০ রানে। তারপর ঘরের মাঠে মোস্তাফিজময় সিরিজে ভারতের বিপক্ষে বাংলাদেশ যে দুই ম্যাচ জিতেছিল, তাতেও সাকিব জোড়া হাফ সেঞ্চুরি হাঁকিয়ে কার্যকর অবদান রেখেছিলেন।

 

তবে দুই বছর আগে (২০১৭ সালের ১৫ জুন) বাংলাদেশ যখন এই বার্মিংহ্যামের এজবাস্টনে আইসিসি চ্যাম্পিয়ন্স ট্রফির সেমিফাইনালে ভারতের মুখোমুখি হয়েছিল, সেই ম্যাচে তামিম (৭০) আর মুশফিক (৬১) অর্ধশতক হাঁকালেও সাকিব কিছুই করতে পারেননি। ফিরে গিয়েছিলেন ২৩ বলে ১৫ রান করে।

এরপর গত বছর দুবাইতে এশিয়া কাপেও ভারতের বিপক্ষে সাকিবকে খুঁজে পাওয়া যায়নি। ১৭ রান করে আউট হয়ে গিয়েছিলেন; কিন্তু এবার সেই সাকিব অনেক বেশি উজ্জ্বল। স্বপ্রতিভ, স্বচ্ছন্দ, সাবলীল।

 

প্রতিটি ম্যাচেই তার ব্যাট আলো ছড়াচ্ছে। সবাই প্রাণভরে উপভোগ করছেন। উইকেটে যাচ্ছেন, অনায়াসে-অবলীলায় প্রতিপক্ষ বোলারদের শাসন করে চার-ছক্কার ফুলঝুরি ছুটিয়ে রানের নহর বইয়ে দিচ্ছেন। ৬ বার ব্যাট করে পাঁচবারই পঞ্চাশের ঘরে পৌঁছান তিনি। এর মধ্যে দু’বার আবার ১০০’তে পৌঁছান। একমাত্র অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে মিডিয়াম পেসার স্টোইনিজের স্লোয়ারে মিড অফে ক্যাচ দেয়া ছাড়া সাকিব বাকি ৫ ম্যাচে পঞ্চাশের (৭৫, ৬৪, ১২১, ১২৪ আর ৫১) ওপরে রান করেছেন।

সেই দক্ষিণ আফ্রিকার বিপক্ষে ৩৩০ রানের পাহাড় সমান স্কোর গড়ে দারুণ জয়ে শুরু করা বাংলাদেশ ওয়েস্ট ইন্ডিজের ৩২১ রানের চ্যালেঞ্জ অতিক্রম করে সবাইকে চমকে দিয়েছেন। এরপরের ম্যাচগুলো জিততে না পারলেও নিউজিল্যান্ড আর অস্ট্রেলিয়ার সাথেও টাইগারদের বুক চিতানো লড়াই দেখে মুগ্ধ ক্রিকেট বিশ্ব। ইংল্যান্ড আর ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপক্ষে সাকিবের পরপর দুই সেঞ্চুরির প্রশংসা সবার মুখে মুখে। ব্যাট করতে নামার পর বিশ্বসেরা বোলাররা তাকে টলাতে পারেননি।

সাকিব একদম অসীম সাহস, অবিচল আস্থা আর নিজের সামর্থ্যের ওপর বিশ্বাস রেখে খেলে চলেছেন। এতটুকু ভয়-ডর, দ্বিধা-সংকোচ নেই। মনে হচ্ছে, যেন রাজ্যের আস্থা আর আত্মবিশ্বাস তার ধমনিতে বইছে। যাকে যেভাবে খুশি সেভাবেই খেলতে পারছেন। ভাল বলগুলোকে সমীহ দেখাচ্ছেন।

তবে একদম মাথা নিচু করে ‘ডেড ব্যাটে’ খেলছেন কম। চেষ্টা থাকছে যত সম্ভব বেশি বল থেকে রান করা। রানের চাকা সচল রাখা । গুডলেন্থ ডেলিভারিগুলোর বিপক্ষে আক্রমণাত্মক শটস না খেলে হয়ত আলতো করে খালি জায়গায় ঠেলে সিঙ্গেলস নিচ্ছেন। আর আলগা বল পেলেই ব্যাস- ব্যাট যেন বিদ্যুতের মত চমকে উঠছে। খাট লেন্থের বল, ওভার পিচ আর হাফ ভলি দিয়ে রক্ষা পাচ্ছেন না কেউ।

সাকিব হয় পুল, হুক, স্কোয়ার কাট, ফ্লিক না হয় উইকেটের সামনে ড্রাইভ খেলে সীমানার ওপারে পাঠাচ্ছেন অবলীলায়। শেষ ম্যাচে আফগানিস্তানের সাথে একটু স্লো ট্র্যাক পেয়ে আবার বল হাতেও দেখিয়েছেন ঝলক।

 

বিশ্বকাপের ৪৪ বছরের ইতিহাসে যুবরাজ সিংয়ের পর দ্বিতীয় ক্রিকেটার হিসেবে একই ম্যাচে হাফ সেঞ্চুরি আর ৫ উইকেট শিকারের দুর্লভ কৃতিত্বটিও নিজের করে ফেলেছেন। বিশ্বকাপে ৩০ উইকেট আর ১ হাজার রান- সে বিশাল অর্জনটিও তার দখলে।

মোটকথা পারফরমার সাকিব এ মুহূর্তে বিশ্বকাপের আলোচিত, আলোড়িত এক নাম। তার ম্যাচ উইনিং পারফরমেন্স সবাইকে করেছে মুগ্ধ। বাংলাদেশ যে তিন ম্যাচ জিতেছে, সেই দক্ষিণ আফ্রিকা, ওয়েস্ট ইন্ডিজ আর আফগানিস্তান- তিন ম্যাচেরই ম্যান অফ দ্য ম্যাচ সাকিব। তাই ভারতে বিপক্ষে এবারের বিশ্বকাপের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ম্যাচে সাকিবই বাংলাদেশের আশা ভরসার কেন্দ্রবিন্দু। তার দিকেই তাকিয়ে পুরো দেশ।

সন্দেহ নেই ভারতের বোলিং অনেক সাজানো গোছানো। সমৃদ্ধ। ধারালো। যেমন পেস বোলিং ডিপার্টমেন্ট, তেমনি সমৃদ্ধ স্পিন আক্রমণ। দুই বিভাগেই আছেন বেশ ক’জন বিশ্বমানের ইনফর্ম বোলার। আহত ভুবনেশ্বরের বদলে মাঠে নেমে মোহাম্মদ শামি বিষাক্ত সুইংয়ে প্রতিপক্ষ ব্যাটসম্যানদের বেসামাল করে তিন ম্যাচে (৪+৪+৫) তুলে নিয়েছেন ১৩ উইকেট। অপর প্রান্তে জসপ্রিত বুমরা রীতিমত মাথা ব্যাথার কারণ। লাইন-লেন্থ চমৎকার। আলগা বল নেই। ব্যাটসম্যানের রান করাই দায়। এর সাথে চাহাল, কেদার ও কুলদিপ জাদব- স্পিন ডিপার্টমেন্ট বৈচিত্র্যে ভরা।

এমন শক্তিশালী বোলিংয়ের বিপক্ষে বাংলাদেশের আশার প্রদীপ সাকিব। তার বল ও ব্যাট হাতে ভাল খেলা, জ্বলে ওঠা এবং কার্যকর পারফরমেন্সের ওপর বাংলাদেশের সাফল্য ও ব্যর্থতা নির্ভর করছে অনেকটাই।

এবারের বিশ্বকাপে প্রমাণ হয়েছে সাকিব যে কোন দলের সাথে ভাল খেলার, ব্যবধান গড়ার ও ম্যাচ জেতানোর সামর্থ্য রাখেন এবং সে কারণেই ভারতের বিপক্ষে এই ম্যাচে সাকিবের ওপর ‘ফোকাসটা’ একটু বেশিই। দু’দলের ক্রিকেটারদের পারফরমেন্স চুলচেরা বিচার করলে ভারত ফেবারিট। একমাত্র ‘সাকিব ম্যাজিকেই’ সম্ভব ভারত বধ।

সেই ভারতের মাটিতে আইপিএলে টিম সানরাইজার্স হায়দ্রাবাদের অনুশীলনের ফাঁকে গুরু ও মেন্টর সালাউদ্দীনকে দেশ থেকে নিজ গরজ ও খরচে উড়িয়ে নিয়ে বাড়তি প্র্যাকটিস করে শক্তি-ঘাম ঝরিয়ে, ওজন কমিয়ে নিজেকে অনেক বেশি ফিট করে তুলেছেন সাকিব।

সেটা এমনি এমনি নয়। কোন এক বড় লক্ষ্য , অর্জন ও প্রাপ্তির আশায় অনেক কষ্ট করে নিজেকে নতুন ভাবে তৈরী করেছেন সাকিব। ইতিমধ্যেই শতভাগ আস্থা , আত্ববিশ্বাস আর ব্যাট ও বলের নজরকাড়া পারফরমেন্সে সেই বড় মঞ্চটার খুব সামনে বিশ্ব সেরা অলরাউন্ডার। এখন সাকিব মাঠে প্রজাপতির মত উড়ছেন। তার সৌন্দর্য্য মন কেড়ে নিয়েছে। প্রতিপক্ষ হন্যে হয়ে ছুটছেন পিছনে। কিন্তু নাগাল পাচ্ছেন না। অবাক সৌন্দয়্যে সবার ধরা ছোয়ার বাইরে ‘চ্যাম্পিয়ন সাকিব।’

২ জুলাই মঙ্গলবার কি সেই সাকিবের হাত ধরেই আকাশে উড়বে বাংলাদেশ?