সোমবার ২২ জুলাই ২০১৯


এখনো থমথমে রাধানগর


আমাদের কুমিল্লা .কম :
12.07.2019

# থানায় ২ মামলা
# আহতদের চিকিৎসার দায়িত্ব নিলেন
পুলিশ সুপার
# কে এই অপরিচিত পাঁচ ব্যক্তি ?

শাহীন আলম,দেবিদ্বার।।
চোখের সামনেই মা ও ছোট ভাইকে কুপিয়ে মারল। প্রথমে আমার ছোট ভাই হানিফকে কুপিয়ে মারে। খানিক পরে দৌড়ে গিয়ে পাশের বাড়ির বৃদ্ধা মাজেদা বেগমকে কোপায়। আমার দিকে ইশারা দিয়ে বলছে ‘ আয় আয় সামনে আয়’ আমি দূরে দাঁড়িয়ে দেখছিলাম, ভয়ে আগাচ্ছি না, আমি যদি আগাতাম ওই ঘাতক আমাকেও মেরে ফেলতো। আমার মা আমার ভাইয়ের লাশ আনতে গেলে পিচ্ছিল রাস্তায় পড়ে যায়, পড়ে যাওয়ার পর পিছন থেকে আমার মাকে কোপায়। মা যদি পিছলে না পড়ত তাহলে আমার মাকে আর মারতে পারত না। এই কথা গুলো বলে গগণবিদারী এমনই আর্তনাদে বারবার মুর্ছা যাচ্ছিলেন নিহত আনোয়ারা বেগম আনুর দশম শ্রেণীতে পুড়–য়া মেয়ে নিপা আক্তার (১৫)। নিপার এমন বুকফাঁটা আর্তনাদ-আহাজারিতে আকাশ বাতাস ভারী হয়ে উঠে। তাকে কিছুতেই থামাতে পারছে না স্বজনরা। বারবার জ্ঞান হারান, পুনরায় জ্ঞান ফিরলেই অন্যমনস্ক হয়ে পড়ছেন। ঘরের মা ও ভাইয়ের পরণের কাপড়ের দিকে অপলক দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকেন। একটু পরপর চিৎকার করে বলছেন, আপনারা আমার মা ও ভাইকে ফিরিয়ে দেন, আমাদের তো দেখার আরও কেউ রইলো না।
আনোয়ারা বেগম ছাড়াও নিপার ছোট ভাই হানিফকেও কুপিয়ে হত্যা করে ঘাতক মোখলেছ। হানিফ তালতলা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ৪র্থ শ্রেণীতে পড়ত। বর্তমানে হানিফ ছাড়া নিহত আনোয়ারা বেগমের চার মেয়ে ও এক ছেলে রয়েছে। শিউলি, আকলিমা, কুলসুম তিনজনই বিবাহিতা থাকেন স্বামীর বাড়িতে। আর নিপা আক্তার (১৫) তার মা ও ছোট দুই হানিফ মুন্সি এবং আলম মুন্সিকে নিয়ে থাকেন নিজের বাড়িতে। মাস খানেক আগে আনোয়ারা বেগমের স্বামী শাহ আলম ক্যানসার আক্রান্ত হয়ে মারা যান। স্বামীর মাছ ধরার বেল বেয়ে আনোয়ারা এতোদিন সংসার চালিয়ে আসছিলেন। ঘটনার দিন ভোরে আনোয়ারা বেলে মাছ ধরার জন্য গিয়েছিলেন। বেল থেকে মাছ ধরে বাড়িতে এসে রান্না করার কথা ছিলো আনোয়ারার। এর আগেই ঘাতক মোখলেছ কেড়ে নিলো আনোয়ারা ও তার শিশু পুত্রের প্রাণ।
সরেজমিনে আনোয়ারার বাড়িতে গিয়ে দেখা যায়, দু-চালা একটি টিনের ঘর, ঘরে মাটির চুলার উপরে রান্নার খালি হাড়ি-পাতিল। ঘরের চৌকিতে আনোয়ারার চার মেয়ে ও এক ছেলে বুকফাঁটা আর্তনাদ-আহাজারি করছে। পাশে স্বজনরা সান্তনা দিয়ে থামানোর চেষ্টা করছে।
নিহত আনোয়ারার স্বজনরা জানান, তিন মেয়ে বিয়ে দিলেও ছোট একটি মেয়ে এখনও বিয়ে দেওয়ার বাকি। আনোয়ারার বাড়ির ভিটে-মাটি ছাড়া আর কোন সম্পদ নেই। কয়েক মাস আগে স্বামীর চিকিৎসার জন্য ব্যাংক থেকে ঋণও নিয়েছিলেন। চিকিৎসা করেও ক্যানসারে আক্রান্ত স্বামীকে বাঁচাতে পারেনি আনোয়ারা। অবশেষে স্বামীর পথযাত্রী হলেন আনোয়ারা ও তার শিশু সন্তান হানিফ মুন্সী।
আনোয়ারার বোনের ছেলে খলিলুর রহমান জানান, ঘটনার আগের রাত মোখলেছের বাড়িতে অচেনা ৫/৬ জন যুবককে দেখতে পায় বাড়ির লোকজন, তারা কারা? কি তাদের পরিচয় ? এ প্রশ্নের উত্তর কি আড়াল থেকে যাবে ?
থানায় ২ মামলা :

কুমিল্লার দেবিদ্বারে মা-ছেলেসহ প্রকাশ্যে ৩জনকে নৃশংসভাবে কুপিয়ে হত্যা করার ঘটনায় দেবিদ্বার থানায় পৃথক দুইটি মামলা দায়ের হয়েছে।বৃহস্পতিবার সকালে মামলা দুটি নথিভুক্ত করা হয়।
থানা ও মামলা সূত্রে জানা যায়, নিহত নাজমা বেগম’ র ছোট ভাই মো. রুবেল হোসেন বৃহস্পতিবার সকালে বাদী হয়ে জনতার হাতে গণপিটুনিতে নিহত মো. মোখলেছুর রহমানসহ অজ্ঞাতদের আসামি করে একটি হত্যা মামলা দায়ের করেন। ঘাতক মোখলেছুর রহমান রাধানগর গ্রামের মো. মুর্তজ আলী ওরফে মুতু মিয়ার ছেলে।
পরে একই দিনে নিহত মোখলেছের স্ত্রী মো. রাবেয়া বেগম স্বামী মোখলেছুর রহমানকে পিটিয়ে হত্যা করার অভিযোগে রাধানগর গ্রামের অজ্ঞাতনামা ১০০০/১৫০০ জনের বিরুদ্ধে একটি হত্যা মামলা দায়ের করেন। এ নিয়ে এলাকায় চাঞ্চল্য ও ভীতিকর পরিস্থিতি দেখা দিয়েছে।

এ ব্যাপারে দেবিদ্বার থানার ওসি মো. জহিরুল আনোয়ার জানান, হত্যাকা-ের ঘটনায় দেবিদ্বার থানায় পৃথক দুটি মামলা হয়েছে। তবে মামলা দুটি অধিকতর তদন্ত ও হত্যাকা-ের মূল রহস্য উদঘাটনের জন্য পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই) কুমিল্লাকে হস্তান্তর করার কথা রয়েছে।

উল্লেখ্য, গত বুধবার সকাল ১০ টায় দেবিদ্বার উপজেলার রাধানগর এলাকায় মোখলেছুর রহমান উম্মুক্ত ধারালো দা’ দিয়ে এলোপাতারি কুপিয়ে নারী ও শিশুসহ তিনজনকে নির্মমভাবে হত্যা করে। এ ঘটনায় আরও সাতজনকে মারাত্মক জখম করে সে। পরে মসজিদের মাইকে ঘোষণা পেয়ে স্থানীয় বিক্ষুব্ধ জনতা মোখলেছকে পিটিয়ে হত্যা করেন। সে পেশায় রিক্সাচালক ছিলো।

অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়ন
কুমিল্লায় মা-ছেলেসহ প্রকাশ্যে ৩জনকে নির্মমভাবে কুপিয়ে হত্যা করার ঘটনায় নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার করা হয়েছে। ঘটনাস্থলের বিভিন্ন পয়েন্টে অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়ন করা হয়েছে। কুমিল্লা পুলিশ লাইন থেকে ১৬ জন নারী ও পুরুষ পুলিশ সদস্য ঘটনাস্থলে মোতায়ন করা হয়েছে।
এ ব্যাপারে দেবিদ্বার থানার ওসি মো. জহিরুল আনোয়ার জানান, পরবর্তী সময়ে আর কোন প্রকার অপ্রীতিকর ঘটনা যেন না ঘটে সেজন্য পুলিশ সুপার মহোদয়ের নির্দেশে ঘটনাস্থলে অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়ন করা হয়েছে। পরবর্তী নির্দেশ না দেওয়া পর্যন্ত ঘটনাস্থলে পুলিশ থাকবে।
আহতদের চিকিৎসার দায়িত্ব নিলেন
পুলিশ সুপার
কুমিল্লার দেবিদ্বারে প্রকাশ্যে মা-ছেলেসহ ৩ জনকে কুপিয়ে হত্যা করার ঘটনায় ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে নিহতদের পরিবারকে শান্তনা ও শোক সন্তপ্ত পরিবারের প্রতি সমবেদনা জ্ঞাপন করেন এবং নিহতদের পরিবারবর্গকে আর্থিক সহযোগিতাসহ তাদের খাদ্য সামগ্রীর ব্যবস্থা এবং আহতদের চিকিৎসার দায়িত্ব গ্রহন করেন কুমিল্লার পুলিশ সুপার সৈয়দ নুরুল ইসলাম বিপিএম(বার) পিপিএম। এ সময় আরো উপস্থিত ছিলেন অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (পদোন্নতি পাওয়া পুলিশ সুপার) মো. সাখাওয়াত হোসেন, ডিবি ও পিবিআই কর্মকর্তা, দেবিদ্বার-ব্রাহ্মণপাড়া সার্কেল এএসপি আমিরুল্লাহ, দেবিদ্বার থানার অফিসার ইনচার্জ মোঃ জহিরুল আনোয়ার সহ পুলিশের উর্ধতন কর্মকর্তা ছাড়াও দেবিদ্বার উপজেলা পরিষদ চেয়ারম্যান আলহাজ্ব মো. জয়নুল আবেদীন, জেলা পরিষদ সদস্য মো. শাহজাহান সরকার, সুলতানপুর ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান মো. সফিকুল ইসলামসহ গন্যমান্য ব্যক্তিবর্গ।
বুধবার বিকালে দেবিদ্বার থানার ওসি মো. জহিরুল আনোয়ার নিহত তিন পরিবারের মাঝে চাল, ডাল, তেলসহ নিত্য প্রয়োজনীয় খাদ্য সামগ্রী ও নগদ অর্থ বিতরণ করেন।
এ ব্যাপারে দেবিদ্বার থানার ওসি মো. জহিরুল আনোয়ার জানান, নিহত তিন পরিবারের মাঝে চাল, ডাল, তেলসহ নিত্য প্রয়োজনীয় খাদ্য সামগ্রী বিতরণ করা হয়েছে এবং আহতদের চিকিৎসার ব্যবস্থা করা হয়েছে।

কে এই অপরিচিত পাঁচ ব্যক্তি ?

কুমিল্লার দেবিদ্বারে মা-ছেলেসহ তিন জনকে কুপিয়ে হত্যা করার ঘটনায় এখনো কোন রহস্য উদঘাটন করতে পারেনি পুলিশ। তবে ঘটনার পূর্বের রাতে ঘাতক মোখলেছুর রহমানের বাড়িতে অপরিচিত পাঁচ ব্যক্তিকে এবং ঘটনার দিন সকালে বোরকা পরিহিত এক মহিলাকে বাড়ির লোকজন দেখতে পায়। ওই ব্যক্তিরা কে, কি তাদের পরিচয়, কেন ঘাতক মোখলেছের বাড়িতে তারা আসলো? এ নিয়ে এলাকায় চলছে নানা গুঞ্জন।
অপরিচিত পাঁচ ব্যক্তি সম্পর্কে জানতে চাইলে নিহত মোখলেছের স্ত্রী রাবেয়া আক্তার জানান, ঘটনার দিন সকালে আমি ঢাকা থেকে এসেছি। রাতে বা সকালে বাড়িতে কে আসছে আমার জানা নেই।
নিহত আনোয়ারার বড় মেয়ে আকলিমা ও ছোট মেয়ে নিপা আক্তার জানান, ঘাতক মোখলেছের বাড়িতে ঘটনার আগের দিন অপরিচিত কিছু লোককে দেখতে পায় তার বাড়ির লোকজন। ওই লোকজনের পরিচয় পাওয়া গেলে ঘটনার রহস্য জানা যেতে পারে।

সুলতানপুর ইউনিয়নের চেয়ারম্যান মো. শফিকুল ইসলাম জানান, ঘাতক মোখলেছ একজন সাধারন রিক্সা চালক হওয়ার পরও তার বাড়িতে পাকা বিল্ডিং! এর পিছনে রহস্য আছে। রিক্সা চালানোর পিছনে মাদক ব্যবসায় জড়িত কিনা তাও খতিয়ে দেখা প্রয়োজন। এছাড়া ঘটনার আগের রাতে তার ঘরে নারী-পুরুষসহ কয়েকজন অপরিচিত লোকও এসেছিল। ওরা কারা ? কি জন্যে এসেছিলেন? তা খতিয়ে দেখা প্রয়োজন। বিশেষ করে তার স্ত্রী ও বড় ভাইয়ের স্ত্রীকে জিজ্ঞাসাবাদ করলেই এ ঘটনার রহস্য বেড়িয়ে আসবে। সম্প্রতি গুজব খ্যাত পদ্মাসেতুকে কেন্দ্র করে শিশুদের মাথা কাটার বিষয় অর্থাৎ আতঙ্ক ছড়ানোর পেছনে কোন রহস্য আছে কিনা তাও খোঁজ নিতে হবে। গণপিটুনিতে ঘাতক নিহত হওয়ার কারনে গ্রামবাসীও পালিয়ে যায়। ঘাতক মোখলেছের বাড়িতেও কাউকে পাওয়া যায়নি।
প্রসঙ্গত, গত বুধবার সকাল ১০টার দিকে উপজেলার সুলতানপুর ইউনিয়নের রাধানগর গ্রামে ঘাতক রিক্সাচালক মোখলেছ এলোপাতারি কুপিয়ে ১০/১২ জনকে কুপিয়ে আহত করে। এসময় ঘটনাস্থলেই এক শিশু ও দুই নারী মারা যান। পরে বিক্ষুব্ধ জনতা ঘাতক মোখলেছকে পিটিয়ে হত্যা করে।

এ ব্যাপারে দেবিদ্বার থানার ওসি মো. জহিরুল আনোয়ার জানান, পুলিশ হত্যাকা-ের রহস্য উদঘাটনের চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। এ হত্যার পিছনে যদি কোন রহস্য থেকেও থাকে তা খতিয়ে বের করা হবে।