শুক্রবার ২৩ অগাস্ট ২০১৯


কান্না থামছে না রাধানগরে


আমাদের কুমিল্লা .কম :
13.07.2019

দেবিদ্বার ট্রাজেডী :

# আমাদের সব সময় খোঁজ নেওয়া ব্যক্তিটি  মাকে কুপিয়ে মারলো

শাহীন আলম , দেবিদ্বার।।
এক দিকে আষাঢ়ের বৃষ্টি পড়ছে রাধানগর গ্রামে অপর দিকে বৃষ্টির চেয়েও ভারী পানি ঝর ঝর করে পড়ছে নিহত নাজমা আক্তারের পরিবারের মধ্যে। অসহায় নিহতের চার সন্তানের কান্নার শদ্ধ আর টিনের চালে পড়া বৃষ্টির পানির শদ্ধ যেন একাকার হয়ে আছে রাধানগর গ্রামে। মোসলেম নামক এক ঘাতকের হাতে কুপিয়ে ৩জন নিহত হওয়ার ঘটনা ৩ দিন অতিবাহিত হলেও এখনো কান্না থামছে না রাধানগর গ্রামে।
নিহত ৩ জনের মধ্যে একজন হলো নাজমা আক্তার। ঘাতক মোসলেমের দায়ের কুপে নিহতের স্বামী ও শ্বাশুরীও মারাত্মক আহত হয়ে মৃত্যুর সাথে পাঞ্জা লড়ছে কুমিল্লা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে।

শুক্রবার দুপুরে সরেজমিনে নিহত নাজমা আক্তারের বাড়ি গেলে দেখা যায় তার অসহায় অবুঝ চার শিশু সন্তানের ভয়ার্ত চেহারা। নিহত নাজমা আক্তারের দশম শ্রেনীতে পড়–য়া বড় মেয়ে জান্নাত আক্তার বলেন, এক দিকে মা নেই অপর দিকে একই ঘটনায় বাবা ও দাদীও আহত হয়ে হাসপাতালে। যিনি আমাদের পরিবারের সবসময়ই খোঁজ- খবর নিতো, তার হাতেই আমার মায়ের প্রাণ গেলো । আমরা ভাত খেয়েছি কিনা যে মোখলেছ কাকা দুই ঘন্টা আগেও খোঁজ-খবর নিলো ! সেই মোখলেছ কাকা কিভাবে আমার মাকে খুন করলো ! আমার মাকেই সবচেয়ে বেশি কুপিয়েছে সে। তার পরিবারে সাথে আমাদেরই সবচেয়ে ভালো সম্পর্ক ছিলো। এত ভালো সম্পর্ক থাকার পরও সে আমার মাকে কিভাবে এত নির্মম-পাশবিক ভাবে কুপিয়ে হত্যা করলো এবং বাবা ও দাদীকেও কুপালো। আপনারা আমার বাবা ও দাদীকে বাচাঁন, না হয় আমরা একবারে এতিম হয়ে যাবো, আমাদের দেখার কেউ থাকবেনা।
ঘাতকের দায়ের কোপে গুরুত্বর আহত হয়ে কুমিল্লা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে কাতরাচ্ছেন রিক্সা চালক বাবা নুরুল ইসলাম(৫০) ও দাদী মাজেদা বেগম(৬৫)। ওই দিন ঘটনাস্থলেই মৃত্যু হয়েছিলো মা নাজমা আক্তারের। জান্নাতরা দুই ভাই ও দুই বোন, জান্নাত সকলের বড়, সে রাধানগর উচ্চ বিদ্যালয়ের দশম শ্রেনীর ছাত্রী, ছোট ভাই নাজমুল হাসান সপ্তম শ্রেনীর ছাত্র, চতুর্থ শ্রেনীতে পড়ে আবু নাঈম, সকলের ছোট বোন সানজিদা আক্তার পড়ে দ্বিতীয় শ্রেনীতে।
নিহত নাজমা আক্তারের মেয়ে জান্নাত আক্তার জানান, ঘাতক মোখলেছ ও তাদের পরিবারের মধ্যে খুবই সু-সম্পর্ক ছিলো। তার মেয়েও জান্নাতের সাথে পড়ে। সেই সুবাধে মোখলেছের ঘরে আসা যাওয়া ছিলো জান্নাতের। ঘটনার দিন (১০ জুলাই বুধবার) সকাল ৮টার দিকে আমি মোখলেছের ঘরে যাই। তখন তিনি আমাকে জিজ্ঞাসা করে আমি ভাত খেয়েছি কিনা, না খেয়ে থাকলে তাদের ঘরে ভাত খেতে। আমি বলি না মোখলেছ কাকা, আমি আম মুড়ি খেয়ে এসেছি, এখন ভাত খাবনা। কিছুক্ষন অপেক্ষা করে তাদের ঘর থেকে এসে স্কুলে চলে যাই আমি। এর প্রায় দুই ঘন্টা পর ছোট ভাই আবু নাঈম স্কুলে গিয়ে আমাকে জানায় মোখলেছ আমার মাকে খুন করেছে এবং বাবা ও দাদীকেও দা দিয়ে কুপিছে। দৌড়ে এসে দেখতে পাই বাড়ির সামনে রাস্তায় মায়ের রক্তমাখা নিথর দেহটা পড়ে আছে। আমি কিছুতেই বিশ্বাস করতে পারছিলাম না মোখলেছ কাকা কিভাবে আমার মাকে এত নির্মমভাবে কুপিয়ে হত্যা করলো।
নিহত নাজমা আক্তারের মেয়ে জান্নাত আক্তার আরো জানান,আমার ছোট ভাই বোন গুলো কিছুই মুখে দিতে চায় না। শুধু মা মা করে। মা কে দেখতে চায়। বাবা কে দেখতে চায়। আমারই বা বয়স কত। মাত্র ১০ম শ্রেনীতে পড়ি। কি উত্তর দিব ভাই বোনদের। এ কথা বলেই কান্নায় ভেঙ্গে পড়ে জান্নাত। তার বুক ফাটা কান্নার আওয়াজ প্রকম্পিত হয়ে উঠে আকাশ বাতাস। যেই সান্তনা দিতে আসে সেই কাপড় দিয়ে চোখ মুছে। স্থানীয় আবদুল হাকিম বলেন, তাদের কি সান্তনা দিব। এই মা হারা এতিম শিশুদের দেখলে নিজেই তো সান্তনা খুঁজে পাই না।

উল্লেখ্য-গত ১০ জুলাই বুধবার সকাল সাড়ে দশটার দিকে দেবিদ্বার উপজেলার রাধানগর গ্রামের মুর্তজ আলীর ছেলে রিক্সা চালক মোখলেছুর রহমান একটি ধারালো দা দিয়ে আকস্মিক লোকজনকে এলোপাতারি কোপাতে থাকে। এ সময় প্রতিবেশী নুরুল ইসলামের স্ত্রী নাজমা আক্তার(৪০), মৃত শাহ আলমের ছেলে আবু হানিফ(১০) এবং স্ত্রী আনোয়ারা বেগম (৪৫)কে কুপিয়ে হত্যা করে। ঘাতক মোখলেছের দায়ের কুপে আব্দুল লতিফ(৪৫), মাজেদা বেগম(৬৫), নুরুল ইসলাম(৫০), রাবেয়া বেগম(৪০), ফাহিমা(১০), জাহানারা বেগম(৫০) ও লোকমান হোসেন(১৭)সহ ৭জন আহত হয়। আহতদের মধ্যে মাজেদা বেগমের অবস্থা আশংকা জনক বলে চিকিৎসকরা জানিয়েছে। ওই সময় গণপিটুনীতে ঘাতক মোখলেছ ঘটনাস্থলেই নিহত হয়।