শুক্রবার ২৩ অগাস্ট ২০১৯


কুমিল্লার আদালতে হত্যাকাণ্ড নিয়ে মিশ্র প্রতিক্রিয়া


আমাদের কুমিল্লা .কম :
16.07.2019

গতকাল জনাকীর্ণ কুমিল্লা আদালতে হত্যা মামলার আসামি আরেক আসামিকে হত্যার ঘটনায় সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমসহ বিভিন্নস্থানে তুমুল আলোচনা-সমালোচনার সৃষ্টি হয়েছে। দেশের অন্যতম নিরাপদ স্থান হওয়া সত্ত্বেও আদালতের মতো জায়গায় এমন হত্যাকা-ের ঘটনায় বিস্ময় প্রকাশ করেছে সারাদেশের মানুষ। কুমিল্লার সচেতন মহলেও এ নিয়ে চলছে ব্যাপক সমালোচনা। সুশাসনের অভাব, আদালতের নিরাপত্তা ব্যবস্থা, সামাজিক মূলবোধের অবক্ষয়, মাদকের আগ্রাসন, সচেতনতার অভাব ও বিচারের দীর্ঘসূত্রিতার প্রভাবে এ ধরনের হত্যাকা-ের ঘটনা ঘটছে বলে মনে করেন কুমিল্লার বিশিষ্টজনরা। দৈনিক আমাদের কুমিল্লার পাঠকদের জন্য বিশিষ্টজনদের মতামত গ্রহণ করেছেন দৈনিক আমাদের কুমিল্লার স্টাফ রিপোর্টার তৈয়বুর রহমান সোহেল।

আইন ব্যবসায়ীদের সচেতন হতে হবে

 

                 

                                                 প্রফেসর আমীর আলী চৌধুরী

কুমিল্লা ভিক্টোরিয়া সরকারি কলেজের সাবেক অধ্যক্ষ প্রফেসর আমীর আলী চৌধুরী মনে করেন, খুনিদের পক্ষে কিছু কিছু আইনজীবীর অবস্থান নেওয়ার কারণে এ ধরনের হত্যাকা-ের ঘটনা ঘটনা বৃদ্ধি পাচ্ছে, খুনিরা সাহস পাচ্ছে। দেখা গেলো, যে ধরনের হত্যাকা-ের বিচার খুব দ্রুত হওয়া উচিত- আইন ব্যবসায়ীরা বিভিন্ন কৌশল অবলম্বন করে তা দীর্ঘতর করছে। হত্যাকা-ের ঘটনায় যারা কাস্টোডিতে আছে তাদের পক্ষে আইনজীবীদের অবস্থান নেওয়া অত্যন্ত দু:খজনক। গতকালের খুন যে করেছে, শুনেছি সে পুরনো হত্যা মামলার আসামি। দ্রুত বিচার আইনে যদি তার সাজা হতো, তাহলে সে এ ঘটনা ঘটাতে পারতো না। অপরাধীদের যথাযথ পানিশমেন্ট না দেওয়া, জামিনে বের করে দেওয়া এবং সুশাসনের অভাবে এ ধরনের অপরাধ প্রবণতা বৃদ্ধি পাচ্ছে। আমি সরকার ও বিচারকদের অনুরোধ করব বিষয়টির দিকে যেন নজর দেন। সে সাথে আমাদের প্রত্যেককে সচেতন হতে হবে। প্রত্যেকে নিজ নিজ জায়গা থেকে এগিয়ে এসে প্রতিরোধ গড়ে তুললে সমাজে অপরাধ কমে আসবে।

বিচারের দীর্ঘসূত্রিতায় আরেকটি দুর্ঘটনা

                             ডা. মোসলেহ উদ্দিন আহমেদ

কুমিল্লা মেডিকেল কলেজের সাবেক অধ্যক্ষ ডা. মোসলেহ উদ্দিন আহমেদ বলেন, সামাজিক মূল্যবোধের অবক্ষয়ের কারণে অপরাধ প্রবণতা বৃদ্ধি পাচ্ছে। সমাজের কোথাও আইনের শাসন প্রতিষ্ঠিত নয়। মানুষ মনে করে, ধর্ষণ থেকে শুরু করে হত্যাকা- পর্যন্ত কোনো ধরনের অপরাধের বিচার তারা পাবে না। বিচারের দীর্ঘসূত্রিতা, তদন্তে বাধা ও সঠিক তদন্ত প্রকাশে অনীহার কারণে গুরুতর অপরাধ সংগঠিত হচ্ছে। গতকালের ঘটনা তারই বহি:প্রকাশ। না হয় আদালতের মতো নিরাপদ জায়গায় কেউ অপরাধ কর্মকা- করতে সাহস পেতো না।

এ ঘটনার জন্য মানসিকভাবে প্রস্তুত ছিলাম না

                            অ্যাড. জহিরুল ইসলাম সেলিম

কুমিল্লা আদালতের পিপি অ্যাডভোকেট জহিরুল ইসলাম সেলিম বলেন, এটা খুবই ন্যাক্কারজনক ঘটনা। এ ঘটনার জন্য আমরা মানসিকভাবে প্রস্তুত ছিলাম না। হামলাকারী ও হামলায় নিহত ব্যক্তি সম্পর্কে মামাতো-ফুফাতো ভাই। তারা আরেকটি হত্যা মামলার আসামি। আদালতে হাজিরা দিতে এসেছিল। হত্যাকারী প্রথমে বাইরে অপর আসামির ওপর হামলা করে। পরে দৌড়ে বিচারকের কক্ষে ঢুকলে আবারোও তার ওপর হামলা চালানো হয়। এ ঘটনার পরপর আদালতের নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার করা হয়েছে। আমাদের আরো সচেতন হতে হবে, যাতে ভবিষ্যতে এমন হত্যাকা- না ঘটে।

এটা খুবই পেইনফুল

                                   বদরুল হুদা জেনু

সচেতন নাগরিক কমিটি (সনাক) কুমিল্লার সভাপতি বদরুল হুদা জেনু বলেন, আদালত হলো মানুষের শেষ আশ্রয়স্থল। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ যদি নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার করতো তাহলে এ ঘটনা হয়তো ঘটতো না। তারা ব্যর্থতার দায় এড়াতে পারে না। এটা খুবই পেইনফুল একটা ব্যাপার। যদিও আদালত প্রাঙ্গণে এমন ঘটনা সচরাচর চোখে পড়ে না। এ ধরনের ঘটনা আমরা কামনা করতে পারি না।

জাস্টিস ডিলেইড, জাস্টিস ডিনাইড

                                      দিলনাশি মহসিন

মা ও শিশু কল্যাণ ফাউন্ডেশন কুমিল্লার নির্বাহী পরিচালক, দিলনাশি মহসিন মনে করেন, দেশে আইনের শাসন সুপ্রতিষ্ঠিত হলে এসব ঘটনা ঘটাতে কেউ সাহস পেতো না। রিফাতকে হত্যা করা হলো, কেউ এগিয়ে আসলো না। সবাই দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে ভিডিও করলো। এখন দোষ দেওয়া হচ্ছে মিন্নির ওপর। মিন্নি অপরাধী কিনা তা প্রমাণ সাপেক্ষে হয়তো বলা যাবে। কিন্তু প্রকাশ্যে যে হত্যাকা- তাতো ধামাচাপা দেওয়ার কোনো সুযোগ নেই। আমাদের সমাজ অস্থির সময় পার করছে। আমরা সবাই গা বাঁচিয়ে চলতে চাই। আমরা যখন ছোট ছিলাম, তখন দেখতাম কেউ ভয়ে কোনো শিশু-কিশোরীকে টিজিং করতো না। এখন এসব ঘটনায় কেউ এগিয়ে আসে না। প্রকাশ্যে হত্যাকা- হলেও কেউ এগিয়ে আসে না। এদিকে বিচারে রয়েছে দীর্ঘসূত্রিতা। একটা কথা রয়েছে, ‘জাস্টিস ডিলেইড, জাস্টিস ডিনাইড।’ কুমিল্লা আদালতের ঘটনা তারই ফসল।

ইদানিং খুব নিরাপত্তাহীনতা বোধ করি

                                        ফাহমিদা জেবিন

নারী নেত্রী অ্যাডভোকেট ফাহমিদা জেবিন বলেন, গতকালের ঘটনা যে দু’জনকে কেন্দ্র করে হয়েছে, আমার ধারণা তারা মাদকাসক্ত। অনেকে অপরাধ করে পার পেয়ে যাওয়ার পেছনে কিছু কিছু পুলিশ দায়ী রয়েছে। নারী-শিশু নিয়ে কাজ করি বিধায় অনেকে গভীর রাতে ফোন করে আমাকে উত্ত্যক্ত করছে। ইদানীং খুব ইনসিকিউরড ফিল করছি। একটি কথা, আগের তুলনায় বিচার খুব তাড়াতাড়ি হচ্ছে। তবে আরেকটি সমস্যা দেখা দিয়েছে। বিচার তাড়াতাড়ি শেষ করার জন্য অনেক বিচারক দ্রুত সাক্ষী হাজির করানোর জন্য চাপ দিচ্ছে। আবার দেখা গেলো সাক্ষী হাজির করা হলেও বিচারক নানা অজুহাতে সাক্ষ্য নিচ্ছেন না। সাক্ষী হাজির করানো ব্যয় সাপেক্ষ। আবার নির্দিষ্ট সময়ে অনেকে সাক্ষী হাজির করতে না পারায় মামলা খারিজ হয়ে যাচ্ছে।