মঙ্গল্বার ১৯ নভেম্বর ২০১৯


সেশনজটে শিক্ষকদের বিরুদ্ধে অভিযোগ


আমাদের কুমিল্লা .কম :
20.09.2019

জাহিদুল ইসলাম, কুবি ঃ কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের সেশনজটের জটলা যেন কমছেই না। কিছু কিছু বিভাগে এ মাত্রা কিছুটা কমলেও বাকি বিভাগগুলোতে এর মাত্রা অসহনীয় পর্যায়ে রয়েছে। বিভিন্ন বিভাগের বিভিন্ন ব্যাচে সর্বনি¤œ ৬ মাস থেকে সর্বোচ্চ দুই বছর পর্যন্ত সেশন জট রয়েছে। তাই চার বছরের ¯œাতক শেষ করতে সময় লেগে যায় প্রায় ছয় বছর। যার মূলেই রয়েছে সেমিস্টার ফাইনাল পরীক্ষার ফলাফল প্রকাশে বিলম্ব। যেখানে সেমিস্টারের ছয় মাসের মধ্যে ক্লাস পরীক্ষাসহ ফলাফল প্রকাশের বিধান রয়েছে সেখানে ফাইনাল পরীক্ষাই সম্পন্ন হচ্ছে না অধিকাংশ বিভাগে। ছয় মাসের মধ্যে সেমিস্টার শেষ করতে ব্যর্থ প্রায় সবকটি বিভাগই। এজন্য কিছু শিক্ষকের দায়িত্ব অবহেলাকে দায়ী করা হয়েছে।
বিশ^বিদ্যালয়ের ¯œাতক ডিগ্রির জন্য পরীক্ষার বিধি অনুসারে, ১৩ সপ্তাহ ক্লাস, ২ সপ্তাহ সেমিস্টার পরীক্ষার প্রস্তুতি ও ৩ সপ্তাহ সেমিস্টার পরীক্ষার সময়সহ মোট ১৮ সপ্তাহ সময় বরাদ্ধ সেমিস্টার শেষের জন্য। সেমিস্টার পরীক্ষার পরবর্তী ৮ সপ্তাহ সময় বরাদ্ধ ফলাফল তৈরীর জন্য। সেক্ষেত্রে ৬ মাসের মধ্যেই যেকোন সেমিস্টার ফলাফল প্রকাশসহ শেষ হওয়ার কথা। প্রতি বর্ষের ২য় সেমিস্টারে অতিরিক্ত ২ সপ্তাহ লাগার কথা। কিন্তু কোন বিভাগেই কোন ব্যাচের এই সময়ের মধ্যে সেমিস্টার শেষ করে ফলাফল প্রকাশ করতে পারেনি। এমনকি ৬ মাসের সেমিস্টারের রেজাল্ট ১৪ মাস পরেও প্রকাশ হয়েছে কিছু কিছু বিভাগে। পূর্ববর্তী সেমিস্টারের ফলাফল প্রকাশের পরে নতুন সেমিস্টারের ফাইনাল পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হওয়ার বিধান থাকলেও সেই বিধান না মেনে নতুন সেমিস্টারের ফাইনাল পরীক্ষা নেওয়ারও নজির রয়েছে বেশ কয়েকটি বিভাগে। শুধু তাই নয় কোন কোন কোর্সে ৪-৫ টি ক্লাস নিয়েও কোর্স সমাপ্ত করার অভিযোগ রয়েছে বেশ কয়েকজন শিক্ষকের বিরুদ্ধে।
বিশ্ববিদ্যালয় সূত্রে জানা যায়, বিশ^বিদ্যালয়টির ২০১৩-১৪ ও ২০১৪-১৫ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থীদের ¯œাতক শেষ হওয়ার কথা থাকলেও অধিকাংশ বিভাগের ¯œাতক ফাইনালের ফলাফল প্রকাশ হয়নি। ২০১৩-১৪ সেশনের (৮ম ব্যাচ) রসায়ন ও আইসিটি বিভাগের ¯œাতকের চূড়ান্ত ফলাফল এখনও প্রকাশ হয়নি। যেখানে সর্বোচ্চ সেশন জটে থাকা রসায়ন বিভাগের সর্বশেষ ২০১৮ সালের ৫ নভেম্বর ষষ্ঠ সেমিষ্টারের ফলাফল প্রকাশিত হয়। প্রতœতত্ত্ব ও পদার্থ বিজ্ঞান বিভাগের ¯œাতকের চূড়ান্ত ফলাফল প্রকাশিত হয়েছে গত ১৫ সেপ্টেম্বর। এ সেশনের বিভাগগুলোর মধ্যে বাংলা বিভাগ সবার আগে ¯œাতক শেষ করে যাদের চূড়ান্ত ফলাফল প্রকাশিত হয় ২০১৮ সালের ৩ অক্টোবর। তারাও প্রায় ৬ মাসের সেশনজটের কবলে। অপরদিকে ২০১৪-১৫ সেশনের ¯œাতকের চূড়ান্ত ফলাফল প্রকাশিত হয়েছে শুধুমাত্র গণিত ও অর্থনীতি বিভাগের। বিশ্ববিদ্যালয়টির এমন অবস্থা যে, একই শিক্ষাবর্ষে ভর্তি হওয়া কিছু বিভাগের শিক্ষার্থী পড়াশোনা শেষ করে কর্মজীবনে প্রবেশ করেছে আবার অনেকে সেশনজটের কবলে পড়ে পড়াশোনা শেষ করতে পারছে না।
বিশ^বিদ্যালয়ের অন্যান্য শিক্ষাবর্ষেও অধিকাংশ বিভাগেই রয়েছে সেশনজট। রসায়ন, পদার্থ বিজ্ঞান, প্রতœতত্ত্ব, নৃ-বিজ্ঞান, সিএসই ও আইসিটি বিভাগগুলোতে মারাত্মক আকার ধারণ করেছে। ফার্মেসি, পরিসংখ্যান, গণিত, ইংরেজি, অর্থনীতি, লোকপ্রশাসন, গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা এবং আইন বিভাগে রয়েছে সহনীয় পর্যায়ে। বাকি বিভাগগুলোর অনেক ব্যাচেরই সেশনজট কাটিয়ে উঠতে সক্ষম হয়েছে।
খোঁজ নিয়ে জানা যায়, প্রথম বর্ষে ভর্তি হওয়ার পরে বিগত দুই বছর যাবৎ ১ লা জানুয়ারি ক্লাস শুরু করলেও অধিকাংশ বিভাগ প্রথমদিকে ক্লাস নিতে নিয়মিত হয় না হওয়া, বিলম্বে পরীক্ষার ফলাফল প্রকাশ, রুটিন অনুযায়ী ক্লাস-পরীক্ষা নিতে শিক্ষকদের অনীহা, শিক্ষকদের বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে ক্লাস নেওয়া, সান্ধ্যকালীন কোর্সে বেশি সময় দেওয়া, শিক্ষক ও ক্লাসরুম সংকট, পরীক্ষা চলাকালীন সময়ে অন্য ব্যাচের ক্লাস না নেওয়া, এক ব্যাচের পরীক্ষা শেষ হওয়ার পর অন্য ব্যাচের পরীক্ষা নেওয়া, বিভাগে শিক্ষক সংকট থাকা সত্বেও শিক্ষা ছুটি অনুমতি প্রভৃতি কারণে ছাড়ছে না সেশনজট। বেশ কয়েকজন শিক্ষক রয়েছেন, যাঁরা স্বেচ্ছাচারীতা করেই নিয়মিত ক্লাস নেয় না এমনকি বিভাগেও আসে না। এছাড়া বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে ক্লাস নেওয়ার জন্য বিশ^বিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের অনুমতি নেয়ার বিধান থাকলেও অনেক শিক্ষকই তা মানছে না। এমনকি বিশ^বিদ্যালয়ের ক্লাসের সময়েও বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে ক্লাস নেয়।
প্রায় সব বিভাগের শিক্ষার্থীদের সাথে কথা বললে তারা জানান, যেসব বিভাগের শিক্ষকরা একটু আন্তরিক সেসব বিভাগের সেশনজট অনেকাংশেই কমে এসেছে। কিছু কিছু বিভাগের গুটি কয়েক শিক্ষকদের কারণে ফলাফল প্রকাশে বিলম্ব হলে পরবর্তী পরীক্ষাও বিলম্বে অনুষ্ঠিত হয়। ফাইনাল পরীক্ষা শেষ হওয়ার দুই মাসের মধ্যে ফলাফল দেওয়ার বিধান থাকলেও পরবর্তী পরীক্ষার আগ মুহূর্তে এমনকি পরবর্তী সেমিস্টারেরও পরে ফলাফল প্রকাশ করে। যা সেশনজটের অন্যতম প্রধান কারন।
রসায়ন, পদার্থ বিজ্ঞান, প্রতœতত্ত্ব, নৃ-বিজ্ঞান, সিএসই, আইসিটি ও ইংরেজি বিভাগের বেশ কয়েকজন শিক্ষার্থী বলেন, ‘শিক্ষকদের দায়িত্বে অবহেলা, নিয়ম ও সময় অনুযায়ী ক্লাস না নেওয়া, শিক্ষকদের নিজেদের মধ্যে দ্বন্দ্ব প্রভৃতি কারণে আমাদের বিভাগগুলো অবস্থা দিন দিন বাজে হচ্ছে।’
বিশ^বিদ্যালয়ের সেশনজটের দায়ভার অনেকটাই শিক্ষকদের এমনটাই স্বীকার করে তারা। এরপরেও বেশ কয়েকটি বিভাগের শিক্ষকদের সাথে কথা বললে তারা জানান, ফলাফল বিলম্বে প্রকাশ হওয়া নিঃসন্দেহে সেশনজটের জন্য দায়ী। এছাড়া প্রায় বিভাগেই রয়েছে শিক্ষক সংকট। তাছাড়া ক্লাসরুম সংকটে রয়েছে অধিকাংশ বিভাগ। এরপরেও শিক্ষকরা একটু আন্তরিক হলে সেশনজট কমিয়ে আনা সম্ভব।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে ইংরেজি বিভাগের কয়েকজন শিক্ষক জানান,‘আমাদের বিভাগের ২/৩ জন শিক্ষকের কারণে আমরা সেশনজট কাটিয়ে উঠতে পারছি না। এরা বিভাগে নিয়মিত নয়। এমনকি তাদের কোর্সও কম থাকে এরপরেও তাদের কোর্স শেষ করতে এবং ফলাফল প্রকাশে বিলম্ব হয়।’
শুধু ইংরেজি বিভাগই নয় নৃ-বিজ্ঞান, রসায়ন, আইসিটি, সিএসই, গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা, প্রতœতত্ত্ব, বাংলা, পদার্থ বিজ্ঞান বিভাগের বেশ কয়েকজন শিক্ষকের বিরুদ্ধেও এ ধরনের অভিযোগ রয়েছে।
রসায়ন বিভাগের বিভাগীয় প্রধান অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ সৈয়দুর রহমান বলেন,‘আমি গত ২৫ জুন বিভাগীয় প্রধানের দায়িত্ব নেওয়ার পরে সেশনজটের বিরুদ্ধে সবাইকে সচেতন করেছি এবং একাডেমিক ক্যালেন্ডার করে দিয়েছি। এ আলোকেই বিভাগ এগোচ্ছে এবং এ ধারা অব্যহত থাকলে অচিরেই আমরা সেশনজট মুক্ত বিভাগে পরিণত হতে পারবো। নতুন ব্যাচগুলো একদিনের জটেও রাখবো না।’
প্রতœতত্ত্ব বিভাগের বিভাগীয় প্রধান মোঃ সাদেকুজ্জামান বলেন,‘আমাদের বিভাগ শুরু হওয়ার পরে চারটি ব্যাচ পর্যন্ত মাত্র চার জন শিক্ষক ছিলাম। যেখানে একজন শিক্ষা ছুটিতে থাকায় তিন জনের জন্য বিভাগ চালানো প্রায় অসম্ভব হয়ে গিয়েছিল। তাছাড়া ছিল ক্লাসরুম সংকট। বর্তমানে বিভাগে নয় জন শিক্ষক রয়েছে এবং অনেক সংকটই কাটিয়ে উঠতে সক্ষম হয়েছি। আশা করি সেশনজটও কাটিয়ে উঠবো এক বছরের মধ্যে।’
আইসিটি বিভাগের বিভাগীয় প্রধান মোঃ তোফায়েল আহমেদ বলেন,‘আমাদের সাতটি ব্যাচের জন্য ক্লাসরুম মাত্র একটি। এছাড়া ল্যাব সংকট তো রয়েছেই। এগুলোর সমাধান হলে বিভাগে সেশনজট থাকবে না।’
বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. এমরান কবির চৌধুরী বলেন, ‘আমরা সেশনজট অনেকাংশেই কমিয়ে আনতে সক্ষম হয়েছি। আশা করি আগামী ছয় মাসের মধ্যেই সেশনজট শূন্যতে নামিয়ে আনতে সক্ষম হবো। যেসব শিক্ষকদের বিরুদ্ধে বিভিন্ন ধরনের অভিযোগ রয়েছে তাদেরকে ডেকে সতর্ক করে দিয়েছি এবং সংশোধন না হলে পরবর্তীতে তাদের বিরুদ্ধে পদক্ষেপ নিব।’