বৃহস্পতিবার ১৭ অক্টোবর ২০১৯


মাটি-বালুর পর বিক্রি হচ্ছে গোমতীর চর!


আমাদের কুমিল্লা .কম :
03.10.2019

মাসুদ আলম।। কুমিল্লার বুক চিরে বয়ে যাওয়া গোমতী নদীর সেই অপরূপ সৌন্দর্য এখন আর নেই। অবৈধভাবে চর কেটে মাটি-বালু উত্তোলন, নদী রক্ষা বাঁধে দোকান-পাট নির্মাণ এবং ভিতরের চর দখল করে ঘর-বাড়ি নির্মাণে নষ্ট হচ্ছে গোমতীর সৌন্দর্য। হুমকির মুখে পড়েছে নদী রক্ষা বাঁধ এবং তার পরিবেশ। প্রভাবশালী অবৈধ দখলদারা চরের সরকারি সম্পত্তি দখল করে প্রতি শতক জায়গা এক লক্ষ টাকা দরে বিক্রি করছেন। মাটি-বালুর পর এবার চর বিক্রি উৎসবে পরিণত হয়েছে। দখলকৃত সম্পত্তি ভূমিহীন এবং দরিদ্র শ্রেণীর বাসিন্দাদের কাছে স্ট্যাম্পের মাধ্যমে বিক্রি করে যাচ্ছেন। এইসব সম্পত্তি বিক্রি করে প্রভাবশালীরা লাভবান হলেও ক্রয় করে বসতি শুরু করা মানুষগুলো রয়েছে অনিশ্চিত ভবিষ্যতে। তাদের বসতির কারণে নদীর চর এখন গ্রামে পরিণত হয়েছে।
সরেজমিনে দেখা যায়, কুমিল্লার আলেখারচর আমতলী ব্রিজ থেকে টিক্কারচর ব্রিজ পর্যন্ত নদীর দুই পাশে ছোট-বড় কাঁচা-পাকা ঘর, বাড়ি এবং বাঁধের উপর দোকানপাট নির্মাণের হিড়িক পড়েছে। গোমতী নদীর বাঁধে উঠলেই দেখা যায় ভিতরে চর দখল করে গড়ে উঠা ঘর-বাড়ির দৃশ্য। কেউ টিন সিটের ঘর নির্মাণ করে বসতি শুরু করেছেন। কেউ আবার কাঁচা-পাকা এবং এবং পাকা ঘরও নির্মাণ করেছেন। আবার কেউ বাড়ি নির্মাণের সাথে বাঁধের সাথে চর ভরাট করে দোকান পাট নির্মাণ করেছেন ব্যবসা করার জন্য।
কুমিল্লা জেলা প্রশাসক কার্যালয় ও পানি উন্নয়ন বোর্ডের দুই কর্মকর্তা জানান, গোমতীর বাঁধের ভিতরে সরকারি সম্পত্তি দখল করে ঘর,বাড়ি এবং দোকানপাট নির্মাণ করা হচ্ছে। এসব দখলদারদের উচ্ছেদ করতে পানি উন্নয়ন বোর্ড একটি তালিকা করেছে। ২২ সেপ্টেম্বর কুমিল্লা জেলা প্রশাসক কার্যালয়ে গোমতী নদী রক্ষার বিষয়ে একটি বৈঠক হয়। ওই বৈঠকে উচ্ছেদ অভিযানে যেতে ৩শত ১৭টি অবৈধ দখলদারের নাম উল্লেখ করে জেলা প্রশাসক বরাবর জমা দেয় পানি উন্নয়ন বোর্ড।
খোঁজ নিয়ে জানা যায়, নদী রক্ষা বাঁধ নির্মাণ করার সময় সরকার যাদের কাছ থেকে সম্পত্তি ক্রয় করেছেন, তারা সরকারের কাছে সম্পত্তি বিক্রি করলেও দখলে ছিলেন। বর্তমানে ওই দখলদাররা সরকারের এই সম্পত্তি শতক হারে লাখ টাকায় বিক্রি করছেন। আর যারা এই সরকারি সম্পত্তি কিনে বসতি শুরু করেছেন তা স্ট্যাম্পের মাধ্যমে। স্ট্যাম্পে লিপিবদ্ধ থাকে এই সম্পত্তি অন্য কোন ব্যক্তি দখলে আসতে পারবে না। তবে সরকার যখন চাইবে তখন সম্পত্তি ছেড়ে চলে যেতে হবে।
রফিকুল ইসলাম নামে এক ব্যক্তি জানান, এক বছর পূর্বে শহরতলী চাঁনপুর এলাকার রাজা মিয়া নামে এক ব্যক্তি থেকে প্রতি শতকে এক লক্ষ টাকা দরে আড়াই শতক সম্পত্তি ক্রয় করেছেন। রফিকুল ইসলামসহ আরও ৬ পরিবারের কাছে রাজা মিয়া স্ট্যাম্পের মাধ্যমে সরকারি সম্পত্তি বিক্রি করেছে একই দরে। তারা ছয় পরিবার একই জায়গায় থাকেন। বর্তমানে ওই জায়গা একটি বিশাল বাড়িতে পরিণত হয়েছে।
তিনি জানান, টাকা নেওয়ার সময় তাদেরকে স্ট্যাম্প দিয়েছে রাজা মিয়া। উল্লেখ আছে এই সম্পত্তি কেউ দাবি করতে আসবে না। তবে সরকার যখন চাইবে তখন এই ক্রয় করা সম্পত্তি রেখে চলে যেতে হবে।
পাঁচথুবী ইউনিয়নের এক বাসিন্দা থেকে মিজানুর রহমান দোকান করার জন্য স্ট্যাম্পের মাধ্যমে সম্পত্তি ক্রয় করেছেন। তিনি জানান, বাঁধের সাথে হওয়ায় প্রতি শতক দেড় লক্ষ টাকা নিয়েছে। তবে তারা বাঁধের পাশে চর ভরাট করে দিয়ে দোকানের জন্য।
কুমিল্লা জেলা পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. আবদুল লতিফ বলেন, গোমতী নদীর বাঁধের ভিতরে দখল হওয়া সম্পত্তি উচ্ছেদের জন্য আমরা সরেজমিনে গিয়ে তালিকা করেছি। ৩শ১৭টি স্থাপনা এবং বসতি রয়েছে সেখানে অবৈধভাবে। এইসব স্থাপনা এবং বসতির কারণে নদীর সৌন্দর্য দিন দিন ম্লান হচ্ছে। এখনই উচ্ছেদ না করলে কয়েক বছর পর হুকির মুখে পড়বে নদী রক্ষা বাঁধ। আমরা তালিকাটি জেলা প্রশাসকের বরাবর দিয়েছি। খুব শিঘ্রই আমরা উচ্ছদ অভিযানে নামবো।

কুমিল্লা জেলা প্রশাসক আবুল ফজল মীর জানান, গোমতী নদীর বাঁধ ও চরের সরকারি সম্পত্তির উপর দখলকৃতদের উচ্ছেদ করতে পানি উন্নয়ন বোর্ড একটি তালিকা দিয়েছে আমাদেরকে। আমাদের ম্যাজিস্ট্রেট এবং থানায় পুলিশ আছে। পানি উন্নয়ন বোর্ড যখনই চায় উচ্ছেদে যেতে পাওে, আমরা সর্বাত্মক সহযোগিতা করবো।