বৃহস্পতিবার ১৭ অক্টোবর ২০১৯


ঘিঞ্জি পরিবেশে স্বাস্থ্যঝুঁকিতে কুমিল্লার বিহারীরা


আমাদের কুমিল্লা .কম :
04.10.2019

মাসুদ আলম।। কুমিল্লায় বিহারী নামে পরিচিত দেড় শতাধিক পরিবারের সদস্যরা স্বাস্থ্যঝুঁকিতে রয়েছে। নগরীর রাণীর বাজার এলাকার নুনাবাদ কলোনি, জেলা প্রশাসক কার্যালয় সংলগ্নœ মফিজাবাদ কলোনি এবং হাউজিং এলাকাসহ তিনটি ক্যাম্পে প্রায় দেশ শতাধিক বিহারী পরিবার রয়েছে। জলাবদ্ধতা, পানি নিষ্কাশন ও ড্রেনেজ ব্যবস্থা না থাকা, প্রয়োজনের তুলনায় কম নি¤œমানের শৌচাগার এবং সীমাহীন মশার উপদ্রবে স্বাস্থ্যঝুঁকিতে পড়েছে ক্যাম্পগুলোর বিহারীরা।

বিহারী ক্যাম্পে সরেজমিন দেখা যায়, একটি কামরার ভিতরে রান্না, খাওয়া, ঘুম। সেখানেই ঠাসাঠাসি করে রাখা প্রয়োজনীয় আসবাবপত্র। প্রায় সব ঘরেই একই চিত্র। এ ছাড়াও একই গোসলখানায় একাধিক নারী কিংবা একাধিক পুরুষকে গোসল করতে দেখা গেছে।

নুনাবাদ কলোনির ক্যাম্পে ৪৫ থেকে ৫০ টি বিহারী পরিবার রয়েছে। এই ক্যাম্পটি সড়ক থেকে নিচু স্থানে হওয়ায় বৃষ্টির পানি জমে সরু গলিগুলোর ভিতর ময়লা ও দুর্গন্ধময় পরিবেশ সৃষ্টি হয়। তাছাড়াও ড্রেনেজ ব্যবস্থা না থাকায় নুনাবাদ কলোনি পুকুরের ময়লা পানি এবং বৃষ্টির পানি জমে ক্যাম্পে এক ধরনের জলাবদ্ধতায় রূপ নেয়। অতিরিক্ত বৃষ্টি হলে বসত ঘরসহ ক্যাম্পটি হাটু পানিতে তলিয়ে যায়। নষ্ট হয়ে পড়ে শৌচাগার, গোসলখানা এবং খাওয়ার পানির ব্যবস্থা। সীমাহীন দুর্ভোগে পড়েন এক-একটি ঘরে একসঙ্গে অনেকজন বাস করা মানুষগুলো। এদিকে ময়লা ও দুর্গন্ধময় পরিবেশ সৃষ্টি হওয়ায় ক্যাম্পটিতে বেড়েছে মশার উপদ্রব। মশার উৎপাতে জ¦র, এলার্জি এবং চর্মরোগসহ নানা রোগে আক্রান্ত হয়ে স্বাস্থ্যঝুঁকিতে রয়েছে ক্যাম্পের বিহারীরা।

তাদের অভিযোগ, স্থানীয় প্রশাসন এবং সিটি কর্পোরেশন কোন খোঁজ খবর রাখেন না। জলাবদ্ধতা সৃষ্টি এবং ময়লা ময়লা ও দুর্গন্ধময় পরিবেশ থেকে বাঁচতে তারা একাধিকবার সিটি কর্পোরেশনের দ্বারে দ্বারে ঘুরেও সমাধান পায়নি। ক্যাম্পে মশার উপদ্রবের কথা স্থানীয় কাউন্সিলরকে জানানো হলেও মশা নিধনে তিনি কোন ব্যবস্থা নেয়নি।

মুন্নি বেগম নামে এক বিহারী মহিলা জানান, তার শ্বশুর মো. ইসলাম কুমিল্লা সেনানিবাসে চাকরি করতেন। ভারত পাকিস্তান ভাগের সময় শ্বশুর ইসলাম মারা যান। পরবর্তীতে বাংলাদেশ সরকার তাদেরকে এখানে থাকতে জায়গাটুকু দেয়। ৬০/৬৫ বছর অতিক্রম করলেও তাদের জীবনের কোন পরিবর্তন ঘটেনি। ক্যাম্পটিতে আগে পানি জমে থাকতো না। গত ২বছর পূর্বে নুনাবাদ পুকুরের পশ্চিম পাশ এবং বিসিকের সড়কগুলো উঁচু করায় ক্যাম্পটি নিচে পড়ে যায়। যার কারণে বর্তমানে সারাবছরই বসত ঘরের চারপাশ এবং প্রবেশ পথগুলো কাদা-পানিতে মাখামাখি হয়ে থাকে। বেড়েছে অতিরিক্ত মশা।

সোহেলা আফরুজ এবং তার স্বামী নূর আলম জানান, সামান্য বৃষ্টি হলেই তাদের বসত ঘরসহ পুরো ক্যাম্প পানিতে ডুবে যায়। ছেলে,মেয়ে এবং পরিবারের লোকজন নিয়ে দুর্ভোগে পড়তে হয়। এছাড়াও বন্ধ হয়ে পড়ে শৌচাগার, গোসলখানা এবং চলাচল ব্যবস্থাও।

আবিদ হোসেন নামে আরও এক বিহারী জানান, আমাদের এই দুর্ভোগ কারও চোখে পড়ে না। ক্যাম্প থেকে পানি নিষ্কাশনের জন্য নেই কোন ড্রেনেজ ব্যবস্থা। এখন স্থানীয়রা ড্রেনের উপর ঘর বাড়ি নির্মাণ করায় ক্যাম্পে পানি জমে থাকে সারা বছর।

এদিকে মফিজাবাদ কলোনি এবং হাউজিংয়ের বিহারি ক্যাম্পগুলোর একই দশা। মফিজাবাদ কলোনির এক বিহারী বাসিন্দা বলেন- স্বামী, ছেলে, ছেলে-বউ, মেয়ে, নাতি নিয়ে একই ঘরে থাকি। লজ্জাজনক হলেও তবু এভাবেই থাকতে বাধ্য হচ্ছেন তারা। এখানে যে পরিমাণ মানুষ বাস করে তার বিপরীতে শৌচাগার অনেক কম। বেশি সমস্যায় রয়েছে মহিলারা। সকালে কিংবা রাতে যখন লোকজনের তাড়াহুড়ো থাকে তখন শৌচাগারের সামনে লম্বা লাইন পড়ে যায়। এই ক্যাম্পেও ৬৫/৭০ বিহারী বসতি রয়েছে। ক্যাম্পের বাসিন্দাদের চিকিৎসা, পয়:নিষ্কাশন ও গ্যাসের মতো নাগরিক সেবার অবস্থা অত্যন্ত নাজুক।

বিহারী ক্যাম্পগুলোতে মশার উৎপাত এবং নানা সমস্যা সমাধানের বিষয়ে জানাতে চাইলে কুমিল্লার সিটি কর্পোরেশনের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা অনুপম বড়–য়া বলেন, ডেঙ্গু রোগ নিয়ন্ত্রণে রাখতে এডিস মশার প্রজনন স্থান ধ্বংস করতে গিয়ে কুমিল্লার নগর-মহানগরের প্রত্যেকটি স্থানে মশক নিধন অভিযান পরিচালনা করা হয়েছে। এই কার্যক্রম থেকে বাদ যায়নি কুমিল্লার বিহারী কলোনিগুলোও। আমরা এখনও সর্বাত্মক চেষ্টা করে যাচ্ছি এই কার্যক্রম অব্যাহত রাখতে। বিহারী ক্যাম্পগুলো গণবসতি পূর্ণ। এখানে নানা সমস্যা থাকতে পারে, তারপরও আমার তাদের প্রাথমিক সমস্যাগুলো সমাধানে চেষ্টা করবো।

অন্যদিকে দুই পাশেরর সড়ক উঁচু করায় নুনাবাদ বিহারী ক্যাম্পটি নিচু হয়ে গেছে। এখানে পানি জমে। ড্রেনের ব্যবস্থা করে পানি নিষ্কাশনের বিষয়টি আমাদের মাথায় আছে।