শুক্রবার ২২ নভেম্বর ২০১৯


দেবিদ্বারের পাগলের মেলায় জুয়া ও মাদকের আসর


আমাদের কুমিল্লা .কম :
24.10.2019

দেবিদ্বার প্রতিনিধি। আসল নাম সুজন। বয়স ৫০ এর কাছাকাছি। কিন্তু তার এলাকায় তার পরিচিতি ‘সুজন পাগল’ বা সুজন ভাÐারী নামে। নামের সঙ্গে ‘পাগল’ জুড়ে ডাকলেও খারাপ লাগে না তাঁর। এই সুজন পাগলের পুরো শরীরেই রয়েছে শিকলে বাধা ও তালা লাগানো। শরীরে কাপড় না থাকলেও লজ্জাস্থানে রয়েছে ছোট্ট লাল কাপড়ের একটি নেংটি। দুই হাতে লম্বা লম্বা কাটা দাগ দেখে মনে হবে কেউ তাকে দুই হাতে কুপিয়েছে। দীর্ঘ ৩৬বছর নাকি তিনি এ অবস্থাতেই থাকেন।
তার একজন সেবক এ প্রতিবেদককে জানান, গত ২০ বছর ধরে তিনি কাচা মাংস ও মাছ ছাড়া কিছু খান না। তাকে তালা বাবা বলেও ডাকা হয়। তার কোন সংসার নেই। ব্রাহ্মণবাড়িয়ার খড়মপুর মাজারেই কাটে তার বেশির ভাগ সময়। পুরো মেলায় এভাবে ছোট ছোট তাবুতে আগর বাতি আর বড় বড় মোমবাতি জ¦ালিয়ে গভীর ধ্যানে মগ্ন শত শত পাগল।
গত মঙ্গলবার থেকে শুরু হয়ে ৭দিন ব্যাপী এই ‘বিশ^ পাগলের মেলা’ চলছে দেবিদ্বার উপজেলার মোহনপুর ইউনিয়নের ভৈষরকোট গ্রামে। এতে ‘পাগল’ ছাড়াও বিভিন্ন উপজেলার কৌতুহলী মানুষের উপস্থিতি ছিল চোখে পড়ার মত।
পুরো মেলা ঘুরে দেখা যায়, বিশাল গেটের ভিতরে টিন ও কাঠ দিয়ে বানানো সামিয়ানার মত প্যান্ডেলের ভিতরে চলছে ওয়াজ নসিহত। প্যাÐেলের পশ্চিমাংশে রয়েছে ছোট ছোট তাবু। তাবুর বেশির ভাগই বানানো লাল-সালু কাপড় দিয়ে। বড় বড় মোমবাতি ও আগর বাতি জ¦ালিয়ে তাবুর ভিতরে নারী-পুরুষ ভক্তবৃন্দদের চলছে গানের জলসা। ঢোলের তালে তালে গান বাজনা আর মাদকের ঘ্রাণে পুরো এলাকাই যেন পরিণত হয়েছে মাদকের ওপেন হাট-বাজারে। প্যাÐেলের পূর্বপাশে দুইশ গজ দূরে একটি বাঁশঝাড়ের ভিতরের অবস্থা আরও ভয়াবহ। এখানে রাত যত গভীর হয় ততই মাদকের হাট জমে ওঠে। নারী পুরুষ একত্রে মিলে এক সাথে চলে মাদক সেবন আর গান-বাজনা। এ যেন সত্যিই পাগলের হাট।
মাদক সেবন ও জুয়ায় যোগ দিচ্ছেন দেশের বিভিন্নস্থান থেকে আসা যুবকরাও। তারা মনে করেন মেলায় এসেছেন আর গাঁজা খাবেন না তা কি করে হয় ? সব মিলিয়ে এ যেনো মাদকসেবী ও জুয়াড়িদেরও মিলন মেলা।
এখানে বাইর থেকে আসা সন্দেহভাজন কাউকে দেখা মাত্রই নিরাপত্তায় থাকা স্বেচ্ছাসেবীর বাঁশির ফুঁয়ে সবাই সর্তক হয়ে যান। সাংবাদিকদের উপস্থিতি দেখে চারদিক থেকে আসা বাঁশির শব্দে স্পষ্টই বুঝা যাচ্ছিলো এটি মাদক সেবন ও জুয়াড়িদের জন্য একটি সতর্কমূলক বার্তা। এসময় সাংবাদিকদের দেখে মাদক সেবনকারীরা তাদের ব্যবহৃত সরঞ্জাম ও লুকাতে চেষ্টা করেন। মাদকের ঘ্রাণে স্পষ্ট বুঝা যাচ্ছে এখানে নারী-পুরুষ প্রায় সকলেই মাদক সেবনরত অবস্থায় ছিলেন্।
মেলার উদ্যোক্তা নুরুল ইসলাম দয়াল সুজন জানান, নবীর আশেকানদেরকে এ বিশ^ পাগলের মেলায় একত্র করা হয়। এ মেলায় দেশের বিভিন্ন প্রান্তে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা নবীর আশেক ও পাগল ভক্তরা জড়ো হয় নবীর সহবত পাওয়ার জন্য। তিনি আরও জানান, তিনিও নিজেও নবীর পাগল ভাবেন অন্য ‘পাগলদের’ নিয়েও। তাই গত ৪বছর ধরে তাঁর গ্রামে ‘পাগলের মেলা’র আয়োজন করছেন তিনি।
ইসলামী শরিয়তে এ ব্যাপারে কি নির্দেশনা রয়েছে এমন প্রশ্নে দেবিদ্বার ইসলামীয়া ফাযিল মাদরাসার আরবী বিভাগের অধ্যাপক আবুল বাশার মিরাজী জানান, কোরআন হাদিসের কোথাও এমন পাগলের অস্তিত্ব খুঁজে পাওয়া যাবে না। রাসুলের প্রেমে পাগল বলতে এসব ছন্নছাড়া মাদকসেবী, যাদের পরনে কাপড় নেই, ফরজ গোসল নেই, পাক-পবিত্রতা নেই এমন পাগলদের বুঝানো হয়নি। তারা বিশ^ ব্যাপী ইসলামকে বিকৃত করছেন। ইসলামে এসবের ন্যূনতম স্থানও নেই।
দেবিদ্বার থানার ওসি মো. জহিরুল আনোয়ার জানান, যেকোন সময় পাগলের মেলায় অভিযান চালানো হবে। মাদকের সাথে যাদেরকে পাওয়া যাবে তাদের সবকটিকে আইনের আওতায় নিয়ে আসা হবে।
এ ব্যাপারে দেবিদ্বার উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা রাকিব হাসান জানান, বিশ^ পাগলের মেলার খবর আপনার মাধ্যমেই প্রথম জানলাম। ওনারা কার কাছ থেকে এ মেলার অনুমতি নিয়েছেন আমার জানা নেই। আমি আপনার মাধ্যমে স্পষ্টই বলে দিতে চাই, মাদকের সাথে ন্যুনতম কেউ জড়িত থাকলে কাউকে ছাড় দেওয়া হবে না। অচিরেই এ বিশ^ পাগলের মেলার বিরুদ্ধে প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেওয়া হবে।