বুধবার ৫ অগাস্ট ২০২০
  • প্রচ্ছদ » sub lead 3 » পেঁয়াজের পর চাল-তেল-আলুতে অস্থিরতা একেক বাজারে একেক দর


পেঁয়াজের পর চাল-তেল-আলুতে অস্থিরতা একেক বাজারে একেক দর


আমাদের কুমিল্লা .কম :
30.11.2019

আবু সুফিয়ান রাসেল।। গত কয়েক মাস লাগামহীন পেঁয়াজের বাজার। এদিকে বাড়ছে আলু ও তেলের দাম। শীতের শুরুতে দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আসতে শুরু করেছে সবজি। তবে দাম কমছে না। বেগুন আর পেঁপে ছাড়া কোন সবজি বিক্রি হয় না ৫০ টাকার নিচে। কুমিল্লা নগরীর বাজারের সাথে শহরতলী ও উপজেলার অন্যান্য বাজারের দামে পার্থক্য রয়েছে অনেক। আবার নগরীর একবাজার থেকে অন্য বাজারে রয়েছে দামের তফাৎ। নগরীর রাজগঞ্জ বাজারে দুই প্রান্তে দুই রকম দাম দেখা যায়। নিত্য প্রায়োজনীয় এসকল পণ্যের ঊর্ধ্বমুখী দামে নিরুপায় অল্প আয়ের মানুষ। নি¤œ আয়ের মানুষ পরিবার পরিচালনা যেন অসাধ্য হয়ে যাচ্ছে দিনদিন।

কুমিল্লার সব ছেয়ে বড় কাঁচা তরকারির পাইকারি বাজার বুড়িচং উপজেলার নিমসার বাজার। বাজারটি মাহাসড়ক সংলগ্ন হওয়ায় দেশের বিভিন্ন জেলা থেকে কাঁচা তরকারি সংগ্রহ করে এ বাজারে নিয়ে আসেন ব্যবসায়ীরা। পাইকারি দরে এসব তরকারি ক্রয় করে, কুমিল্লার বিভিন্ন উপজেলা ও কাছাকাছি জেলা শহরে নিয়ে যান ব্যবসায়ীরা। তবে পাইকারি বাজার দরের সাথে প্রায় দ্বিগুণ বেশি দামে এসব কাঁচা তরকারি বিক্রি করেন খুচরা বিক্রেতারা।

গত মঙ্গলবার সরেজমিনে গিয়ে নিমাসার বাজার , নগরীর রাজগঞ্জ, নিউ মার্কেট, বাদশা মিয়া বাজার, পদুয়ার বাজার ঘুরে দেখা গেছে পাইকারি দাম থেকে খুচরা দাম তুলনামূলক অনেক বেশি। সদর দক্ষিণের রতনপুর বাজার, চৌয়ারা বাজারেও অতিরিক্ত মূল্য রাখার বিষয়টি পরিলক্ষিত হয়েছে। তবে শুলনামূলক সুয়াগাজী বাজারে কাঁচাতরকারি দাম কিছুটা কম।

নিমাসার বাজারে পাইকারি হিসাবে দেখা গেছে করলা ৪৫-৫২ টাকা যা খুচরা বাজারে ৮০-৯০ টাকা। বাঁধা কপি প্রতিটি ১৩-২২ টাকা যা খুচরা বাজারে ৪০-৫০ টাকা। পাঁকা টমেটো ২২-৩৫ টাকা, খুচরা ৬০-৮০ টাকা। কাঁচা টমেটো ১৬-২০ টাকা, খুচরা ৪০ টাকা। মুলা ২০-২২ টাকা খুচরা ৪৫-৬০ টাকা। বেগুন ১৬-২০ টাকা খুচরা ৩০-৪০ টাকা। পেঁপে ১৫-১৮ টাকা, খুচরা ২৫-৩৫ টাকা। খিরা ৩৮-৪০ টাকা, খুচরা ৬৫-৭০ টাকা। শসা বড় সাইজ ৭০ খুচরা ১০০। ছোট শসা ৩৫-৪০ টাকা, খুচরা ৬০-৭০ টাকা। মরিচ ২৬-২৮ টাকা, খুচরা ৪০-৫০ টাকা। ধনিয়া পাতা ৪৫-৫০ টাকা, খুচরা ৮০-১২০ টাকা, কোন কোন বাজারে ১৫০ টাকা। শালগম পাইকারি ২৫-২৮ টাকা। নতুন আলু পাইকারি ৫৫-৬০ টাকা খুচরা ৮০ টাকা। শিম ৩৫ টাকা, খুচরা ৫০-৭০ টাকা। পটল ৩৫-৪০ খুচরা ৫০ টাকা বিক্রি হতে দেখা গেছে। পাইকারি দামের তথ্য নিমসার বাজার থেকে নেওয়া হয়েছে।
নিমসার বাজারের পাইকার ব্যবসায়ী আ. জলিল জানান, দেশের বিভিন্ন জেলা থেকে এখানে তরকারির ট্রাক আসে। বেশি আসে উত্তরবঙ্গের জেলাগুলো থেকে। যশোর, রাজশাহী, চুয়াডাঙ্গা, পাবনা, বগুড়া, লালমনির হাঁটসহ আরো অনেক জেলা থেকে কাঁচামাল আসে। এ ব্যবসায়ী আরো জানান, তিনি গত ৭ বছর এ পেশার সাথে জড়িত। পাইকার বাজারেও দামের পার্থক্য রয়েছে। রাত ১১ থেকে দিনের ১২টা পর্যন্ত এখানে লেনদেন হয়। তবে বেশি ক্রয়-বিক্রয় হয় রাত ১২টা থেকে সকাল ৬টার মধ্যে। ফলে দিনের দামের সাথে রাতের দাম পার্থক্য হয়ে যায়।

কুমিল্লার কোন বাজারে কাঁচা তরকারির দাম কম, কোথায় বেশি জানতে চেয়ে সোমবার একটি ফেসবুক গ্রুপে প্রশ্ন করা হয়। এ পোস্টে প্রায় অর্ধশত ফেসবুক ব্যবহারকারী মত প্রকাশ করেছেন। তারা মনে করেন, দাম কম চকবাজার, বাদশা মিয়া বাজারে। ছোটরা, টমছমব্রিজ, পদুয়ার বাজারে কিছুটা দাম বেশি।

পাঠক জরিপ মতে, সুপার শপ,রানীর বাজার, রাজগঞ্জ, ভ্যানে ভ্রাম্যমাণ বিক্রেতা, নিউ মার্কেট, থিরাপুকুর পাড়ে দাম বেশি।

মাহফুজ নান্টু লিখেছেন, মগবাড়ী বাজারে দাম কম, নিউমার্কেটে দাম বেশি।

তরকারির ঊর্ধ্বমুখী দামের কারণে ফেসবুকে মানুষের ক্ষেভ দেখা গেছে।
মাসুদ সরকার রানা লিখেছেন, মাছ আর পেঁয়াজ ক্রয় করলে ৫শ টাকা চলে যায়। ক্রেতারা অসহায়, কিছুই করার নেই।
আরিফুল ইসলাম সোহাগ লিখেছেন, আয় করে পরিবার যারা চালায় তারাই জানে মাস কতদিনে যায়।

পেঁয়াজ আলোচনা হয়েছে জুমার আলোচনায়ও। ২২ নভেম্বর জুমার আলোচনায় পুলিশ লাইন জামে মসজিদের খতিব মাওলানা সৈয়দ শরফুদ্দীন বলেন, পেঁয়াজের দাম ২০০ টাকা। এ টাকা কারো নিকট ২০ টাকার মতো কারো নিকট ২ হাজার টাকার মতো।

বেসরকারি প্রতিষ্ঠান ব্র্যাক কর্মকর্তা মাছুম বিল্লাহ জানান, মাসের ১৫ তারিখের পর থেকে শুরু হয় দোকান বাকি। বেতনটা পেলে বকেয়ার টাকা পরিশোধ করতেই টাকা শেষ হয়ে যায়। প্রতি মাসেই কর্জ করে চলতে হয়। নিজের অজানতেই বড় দেনাদার হয়ে যাচ্ছি।শহরতলী দিশাবন্দ এলাকার বাসিন্দা মাদরাসা শিক্ষক আবু তাহের বলেন, সাপ্তাহ ব্যবধানে খোলা সোয়াবিন তেলের দাম বেড়েছে ৫ টাকা। আলুর দাম বেড়েছে কেজি প্রতি ৮ টাকা। চালের দাম কেজি প্রাতি ২/৩ টাকা বেড়েছে।

সুয়াগাজী বাজারের ব্যবসায়ী জাহাঙ্গীর আলম জানান, যখন পাইকারি বাজারে দাম বেশি থাকে তখন খুচরা বাজারেও দাম বেশি থাকে। যদি কোন সিন্ডিকেট থেকে থাকে, সেটা পাইকারি বাজার বা তাদেরও উপরে রয়েছে।

নগরীর ঝাউতলা জেলিস ডিপার্টমেন্ট শপের মালিক মাঈন উদ্দিন জানান, পেঁয়াজ বিক্রি একটা ঝুঁকিতে পরিণত হয়েছে। এই দাম বাড়ে আবার কমে যায়, আবার বাড়ে। মানুষের সাথে অতিরিক্ত কথা বলতে হয়। তাই পেঁয়াজ বিক্রি বন্ধ করে দিয়েছি। নিজের বাসায় ও পেঁয়াজের বিকল্প বাঁধা কপিকে ব্যবহার করি।

কমিশন ভিত্তিক কাঁচা মালের আড়ৎ নিমসার বাজার সুরমা বাণিজ্যালয়ের পরিচালক আবদুল হান্নান জানান, নতুন সবজির চাহিদা কিছুটা বেশি। কৃষকরা ভালো দাম না পেলে বিক্রি করতে চায় না। শীত বাড়লে সবজি উৎপাদনও বাড়বে তখন দাম কিছুটা কমবে।

সদর দক্ষিণের পিপুলিয়া এলাকার নলছোয়া গ্রামের কৃষক মোতালেব মিয়া জানান, একটা কাজের লোকের দৈনিক মুজরি ৫শ টাকা। সার-বীজের খরচ আছে। সব কিছুর দাম বেশি, তারকারির দাম তো বাড়বেই। উৎপাদন কম হয়েছে কিনা এমন প্রশ্নে এ কৃষক বলেন, উৎপাদন বিগত বছরের মতোই হয়েছে। তবে জমি নির্বাচন আর কৃষকের উপর বিষয়টি নির্ভর করে কেমন ফল হবে।

সচেতন নাগরিক কমিটি সনাক কুমিল্লা জেলা সভাপতি বদরুল হুদা জেনু মনে করেন, নিত্য প্রয়োজনীয় দ্রব্যের বিষয়ে সরকারের পরিকল্পনা থাকা দরকার। চাহিদা অনুপাতে যেন যোগান হয়। হঠাৎ করে একটা পণ্যের দাম বেড়ে গেলে নির্দিষ্ট আয়ের মানুষগুলা বেকায়দায় পড়ে যায়। কারণ মাসে মাসে তো তার বেতন বৃদ্ধি পায় না।

জাতীয় ভোক্তা অধিদপ্তর কুমিল্লা জেলা সহকারী পরিচালক আছাদুল ইসলাম বলেন, কাঁচা তরকারি বা পচঁনশীল যে কোন দ্রব্যের বিষয়ে পাইকারি বিক্রেতা ও ক্রেতা উভয়ে ভাউচার সংগ্রহ করবে। এসব পণ্য থেকে ৫-৭ টাকার বেশি কেজি প্রতি লাভ করতে পারবে না খুচরা বিক্রেতারা। যদি ভোক্তা থেকে সুনির্দিষ্ট অভিযোগ পাওয়া যাওয়া যায়, তারা অভিযান পরিচালনা করবো। এক্ষেত্রে বিক্রেতা অবশ্যই পাইকারি ক্রয়ের ভাউচার দেখাতে হবে।

এ বিষয়ে জেলা প্রশাসক আবুল ফজল মীর জানান, লবণ নিয়ে গুজব উঠার পর আমরা কয়েক ঘণ্টার মধ্যে অসাধু ব্যবসায়ীদের আইনের আওতায় আনতে সক্ষম হয়েছি। আর এটি একটি নিয়মিত কার্যক্রম। মোবাইল কোর্ট টিম যে কোন সময় জেলার যে কোন বাজারে অভিযান পরিচালনা করেতে পারে। জেলা প্রশাসক ক্রেতাদের যে কোন অভিযোগ লিখিতভাবে, ভোক্তা অফিসে জানানোর জন্য জানানোর কথা বলেন।