শুক্রবার ২৪ জানুয়ারী ২০২০


৩৫ বছর পর ভূমির মালিকানা বুঝে পেল বীরাাঙ্গনা আফিয়া খাতুনের পরিবার


আমাদের কুমিল্লা .কম :
01.12.2019

চৌদ্দগ্রাম(সদর) প্রতিনিধি ।। অবশেষে কুমিল্লার চৌদ্দগ্রাম থানা প্রশাসনের সহযোগিতায় দীর্ঘ ৩৫ বছর পর ওয়ারিশি দলিলমূলে মালিকীয় ভূমির দখল বুঝে পেয়েছে বীরাাঙ্গনা আফিয়া খাতুনের পরিবার। উপজেলার জগন্নাথদিঘী ইউনিয়নের কিং সোনাপুর মৌজায় পিতা-মাতার বসতভিটা এবং দাদির দলিলসূত্রে প্রাপ্ত ছয় শতক ভূমির দখল এবং মালিকানার ন্যায্য হিস্যা বুঝে পেয়ে খুশির জোয়ারে ভাসছেন বীরাাঙ্গনা আফিয়া খাতুনের মেয়ে রোকসানা। রোকসানার ভাষ্য, প্রশাসনের সার্বিক সহযোগিতা না পেলে জমি উদ্ধার একেবারেই অসম্ভব ছিল।
জানা গেছে, দীর্ঘ ৩০-৩৫ বছরের দখল, দখলীয় ভূমিতে স্থাপনা নির্মাণ, ভূমির প্রকৃত মালিকদের খোঁজ-খবর না থাকার সুযোগে ভূমির দখল কিংবা মালিকানা ছাড়ার কথা চিন্তায়ও আসেনাই দখলবাজদের। কিন্তু সেই কঠিন কাজকেই দীর্ঘ প্রচেষ্টার মাধ্যমে সমাধান করেছেন চৌদ্দগ্রাম থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা আব্দুল্লাহ আল মাহফুজ ও এসআই আরিফ হোসেন। মাত্র কয়েক মাসের ব্যবধানেই সোনাপুর গ্রামের আনা মিয়া, আজিজ মিয়া ও মানু মিয়ার নিকট থেকে বীরাঙ্গনা এবং তাঁর একমাত্র মেয়ে রোকসানাকে গ্রাম্য সালিশের মাধ্যমে তাদের মালিকানার ছয় শতক ভূমির দখল ও ন্যায্য হিস্যা বুঝিয়ে দিয়েছে থানা প্রশাসন। বীরাঙ্গনার পরিবারকে মালিকানা জমির দখল বুঝিয়ে দেওয়ায় রাজনৈতিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠনের নেতৃবৃন্দসহ বিভিন্নস্তরের মানুষ প্রশংসা করছে থানা প্রশাসনের।
পাশ^বর্তী নোয়াগ্রামের সাংবাদিক ফাহাদ পাটোয়ারী জানান, বীরাঙ্গনার পরিবারের দীর্ঘ ২-৩ বছরের কষ্টের ফল পেয়েছে প্রশাসনের মাধ্যমে। দীর্ঘ বছর দখলে থাকা জমি উদ্ধার হওয়ায় প্রশাসনের প্রতি জনগণের আস্থা এবং বিশ^াস আরও প্রখর হচ্ছে। এছাড়াও অনেকেই সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকে প্রশাসনকে ধন্যবাদ জানিয়ে পোস্ট দিচ্ছেন।
মুক্তিযোদ্ধাদের সূত্রে জানা গেছে, পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী দ্বারা নির্মম জেনোসাইডাল রেপড এর শিকার হওয়া হতভাগ্য এক নারী বীরাঙ্গনা আফিয়া খাতুন খঞ্জনী। তাঁর গ্রামের বাড়ি চৌদ্দগ্রাম উপজেলার জগন্নাথদিঘী ইউনিয়নের সোনাপুর গ্রামে। সম্ভ্রান্ত ঘরের মেয়ে আফিয়া খাতুন খঞ্জনী ১৯৩৯ সালে ফেনী জেলার ঐতিহ্যবাহী বরইয়া চৌধুরী বাড়িতে জন্মগ্রহণ করেন। তার পিতার নাম হাসমত আলী চৌধুরী ও মাতা মাসুদা খাতুন। নানা ঘাত-প্রতিঘাত আর চড়াই উৎরাই পেড়িয়ে ২০১৮ সালের ১৭ জুলাই বীরাঙ্গনা স্বীকৃতি পান আফিয়া খাতুন খঞ্জনী। তাঁর শাশুড়ি বোচন বিবির প্রয়াত ছেয়ে রুহুল আমিনের একমাত্র সন্তান রোকসানা। বিগত ৩০-৩৫ বছর পূর্বে বোচন বিবি রুহুল আমিন ও খঞ্জনী দম্পত্তির একমাত্র কন্যা রোকসানার নামে একটি দানপত্র দলিলের মাধ্যমে ছয় শতক ভূমি প্রদান করেন। বীরাঙ্গনা আফিয়া খাতুন যখন ফেনীর পিত্রালয় ও স্বামীর বাড়িতে থাকার সুযোগ পাননি তখন খঞ্জনী বেগমের সাথে একমাত্র কন্যা ছোট্ট রোকসানাও বাড়ি থেকে বের হয়ে পড়েন। তারা আশ্রয় নেন কুমিল্লা শহরের একটি বস্তিতে। এক সময় রোকসানার বিয়ে হয় ফুল মিয়া নামের একজনের সাথে। স্বামী-সংসার এবং ছেলেমেয়ে ও মাকে নিয়ে কুমিল্লা বাগিচাগাঁওয়ের ওই বস্তিতেই কাটতে থাকে তাদের দিন। এভাবে একটা পর্যায়ে রোকসানা ভুলে যান দাদির দলিলের বিষয়টি এবং নিজ গ্রাম সোনাপুরের পিতার সম্পত্তির কথা।
বীরাাঙ্গনা খঞ্জনীকে প্রথমে সংবাদপত্রের মাধ্যমে জাতির সামনে তুলে ধরেন মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক গবেষক সাংবাদিক শাহাজাদা এমরান। তার অক্লান্ত পরিশ্রম ও গবেষণার ফলেই প্রশাসনের নজরে আসেন খঞ্জনী বেগম।
২০১৪ সালের ডিসেম্বরে কুমিল্লা জেলা প্রশাসক খঞ্জনীর নামে চৌদ্দগ্রামের কালকোট মৌজার ৩১ দাগের হালে ৬৪০ দাগে ৫ শতক খাস জায়গা বরাদ্দ দেয়। বর্তমানে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের প্রকল্পের অধীনে উক্ত ৫ শতক ভূমিতে বীরাঙ্গনার পরিবারকে একটি দৃষ্টিনন্দন ঘর করে দিয়েছে সরকার। এরপর আর পেছনে ফিরে তাকাতে হয়নি পরিবারটিকে। স্বাধীনতা যুদ্ধ থেকেই ত্যাগ এবং কষ্ট স্বীকার করে আসা পরিবারটি বীরাঙ্গনা স্বীকৃতির মাধ্যমে পেয়েছে সুন্দরভাবে বেঁচে থাকার একটি অবলম্বন। বিগত ১ বছর পূর্বে দাদির দেওয়া দলিলটি খুঁজে পায় রোকসানা। দলিল অনুযায়ী মালিকানার দাবীতে পিতৃভূমি সোনাপুর যায় সে। কিন্তু দখলদারদের অনেকেই কোনভাবেই দখল ছেড়ে দেওয়ার জন্য রাজি হয়নি। রোকসানা সামাজিক ব্যক্তিবর্গ এবং স্থানীয় ইউপি চেয়ারম্যান ও মেম্বারকে জানায়। এক পর্যায়ে রোকসানাকে নিয়ে নিউজ দেখে চৌদ্দগ্রাম থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা আব্দুল্লাহ আল মাহফুজ বীরাঙ্গনার জমি উদ্ধারে এসআই আরিফ হোসেনকে দায়িত্ব প্রদান করেন। এসআই আরিফ হোসেন দায়িত্ব পেয়ে স্থানীয় চেয়ারম্যান ও মেম্বারকে জমি উদ্ধারে সহযোগিতা প্রদানের অনুরোধ করে। এ নিয়ে বেশ কয়েকটি বিচার-সালিশও বসে। সামাজিক সালিশ বিচারে প্রথমে দখলদাররা কোনভাবেই দখলীয় জমি ছাড়তে রাজি হয়নি কিন্তু একটা পর্যায়ে সামাজিক চাপ এবং সত্যের কাছে নতি স্বীকার করে দখল ছেড়ে দিতে বাধ্য হয় দখলদাররা। সামাজিক বিচার শালিষের মাধ্যমে রোকসানার মালিকানার ছয় শতক জমিনের দখল বুঝে নেয় সে। পরবর্তীতে স্থাপনাসহ চাচা আনা মিয়ার দখলে থাকা ২.২৫ শতক ভূমি মানবিক দৃষ্টিকোণ থেকে কবলা দলিলের মাধ্যমে গত ২৭ নভেম্বর আনা মিয়ার ওয়ারিশগণের মাধ্যমে মালিকানা হস্তান্তর করেন রোকসানা। পরদিন ২৮ নভেম্বর বিক্রিত ২.২৫ শতক ভূমির কবলা মূল্যের সমুদয় টাকা রোকসানার হাতে তুলে দেন চৌদ্দগ্রাম থানার এসআই আরিফ হোসেন।
বীরাঙ্গনা আফিয়া খাতুনের মেয়ে অত্যন্ত আনন্দের সাথে ধন্যবাদ জ্ঞাপন করেন প্রশাসন এবং সাংবাদিকদের। তিনি জানান, চৌদ্দগ্রাম থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা আব্দুল্লাহ আল মাহফুজ এবং এসআই আরিফ হোসেনের কারনেই জমিনের মালিকানা বুঝে পেয়েছে সে। তিনি বলেন সাংবাদিক শাহাজাদা এমরান স্যারের আগে কেউ তার মাকে নিয়ে লিখে নিই। শাহাজাদা এমরান স্যার প্রথমে পত্রিকায় ও পরে বই বের করার পরেই অন্যান্য সাংবাদিকরা তার মাকে নিয়ে লেখতে শুরু করে। সাংবাদিকদের লেখনীর কারণেই আজকে জমি উদ্ধার, বীরাঙ্গনা স্বীকৃতি, সরকারি জমি বরাদ্দ পাওয়া এবং ঘর বরাদ্দ পাওয়া সম্ভব হয়েছে।
এ ব্যাপারে চৌদ্দগ্রাম থানার এসআই আরিফ হোসেন জানান, চৌদ্দগ্রাম থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা আব্দুল্লাহ আল মাহফুজের নির্দেশনার আলোকে বীরাঙ্গনা আফিয়া খাতুনের জমি উদ্ধারে ভূমিকা পালন করি। জমি উদ্ধারে বিগত ৫-৬ মাস থেকে দফায় দফায় বিচার-শালিস, সামাজিক লোকজনের সাথে বারবার যোগাযোগ করতে হয়েছে। মূলত প্রশাসনের পর্যাপ্ত চাপের কাছে নতি স্বীকার করেই দখলদাররা জমির দখল ছেড়ে দিয়েছে।
চৌদ্দগ্রাম থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা আব্দুল্লাহ আল মাহফুজ জানান, ‘মুক্তিযোদ্ধা ও বীরাঙ্গনা আফিয়া খাতুন সমগ্র দেশের গর্ব। তাদের কল্যাণেই আমরা পেয়েছি একটি স্বাধীন দেশ, পেয়েছি একটি স্বাধীন পতাকা। আফিয়া খাতুনের মালিকানার ভূমি দখলদারদের দখলে থাকার বিষয়টি সাংবাদিকদের মাধ্যমে জানতে পারি। পরবর্তীতে এসআই আরিফ হোসেনকে বীরাঙ্গনার জমি উদ্ধারে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের নির্দেশনা প্রদান করি। বীরাঙ্গনা আফিয়া খাতুনের পরিবার নির্দেশনার আলোকেই দীর্ঘ বছর দখলে থাকা জমির মালিকানা ফিরে পাওয়ায় আমরা আনন্দিত।