সোমবার ১০ অগাস্ট ২০২০


৪৮ বছরেও নির্মিত হয়নি আজগরা বাজার গণহত্যার স্মৃতিস্তম্ভ


আমাদের কুমিল্লা .কম :
12.12.2019

মহিউদ্দিন মোল্লা : ১৯৭১ সালের ৬এপ্রিল মঙ্গলবার বিকাল বেলা। কুমিল্লার লাকসাম উপজেলার আজগরা বাজার। আজগরা ধান বিক্রির জন্য বাজারটি প্রসিদ্ধ ছিলো। তখন আজরা,উত্তরদা ইউনিয়ন এবং নাঙ্গলকোট উপজেলার কিছু গ্রামের মানুষ এখানে বাজার করতো। সেদিন ছিলো হাটবার। বাজারে উপচে পড়া ভিড়। হঠাৎ মাথার উপর দিয়ে উড়ে গেলো পকিস্তানী দুইটি যুদ্ধ বিমান। মিনিট খানেক সময় পরেই আবার ফিরো এলো বিমান দুইটি। বাজাওে বোমা ফেলা হলো। ধবংসলীলা নেমে এলো আজগরা বাজারে। যে যার মতো ছুটতে লাগলো চার দিকে। মুহূর্তে খালি হয়ে গেলো বাজার। মানুষের মাথার মগজ আর পেটের ভূড়ি গিয়ে আটকে থাকলো পাশের বরই গাছের ডালে। বীভৎস লাশ হয়ে মাটিতে পড়ে রইলো অর্ধ শতাধিক মানুষ। আহত হলো দুই শতাধিক। হাত-পা বিহীন অনেকেই এখনো বেঁচে আছেন। এ দৃশ্য গুলো বর্ণনা করেন আজগরা বাজারের বর্ষিয়ান ব্যবসায়ী রমজান আলী। ৭৬ বছর বয়সের রমজান আলী তখন তরুণ। তার দোকানের এক‘শ গজ সামনেই আজগরা তরকারি বাজারে এ বর্বর হত্যাকাÐ ঘটে। স্বাধীনতার ৪৮ বছরেও সেখানে কোনো স্মৃতিস্তম্ভ হয়নি। নিহত ও আহতদের পরিবারের খোঁজ কেউ নেয়নি। এত গুলো মানুষের মৃত্যুদিনে কেউ স্মরণ সভারও আয়োজন করেনি। দক্ষিণ-পূর্ব লাকসামে আজগরা বাজারের বোমা ফেলার ঘটনা মানুষ আজো ভুলেনি।
নিহতদের মধ্যে ৩০জনের পরিচয় পাওয়া গেছে। অনুসন্ধানে এবং লাকসামে প্রবীণ সাংবাদিক আবদুল জলিলের ‘মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় লাকসাম’ বইয়ের সূত্রে জানা যায়, নিহতরা হচ্ছেন- লাকসামের নাওটি গ্রামের ওহেদ আলী,কোমড্ডার রুস্তম আলী,বাতাবাড়িয়ার এর সূর্য মোহন দাশ,চরবাড়িয়ার কোরবান আলী,উত্তরদার আবদুল মান্নান, কৃষ্ণপুরের আবদুল গফুর, শাহপুর গ্রামের আবদুল হামিদ,আমদুয়ার গ্রামের কাজী ছেরাজুল হক,সিলুইন গ্রামের সুলতান আহমেদ,বড়বাম গ্রামের বাছা মিয়া ও আবদুল কাদির,নোয়াগাঁও গ্রামের আবদুর রশিদ ও আফজল হোসেন,পাওতলী গ্রামের সাদেক হোসেন,কালা মিয়া,নুরুল ইসলাম ও আবদুল মান্নান,লোলাই গ্রামের রহমত আলী,ঘাটারের আবদুস সামাদ ও সৈয়দ আলী। ভোজপাড়ার আবদুর রশিদ,খিলপাড়ার ইউনুস মিয়া, কালিয়াচৌঁ‘র আলী আশ্রাফ। দক্ষিণ নরপাটির আলী আজম,পশ্চিম সাহেবপাড়ার খলিলুর রহমান। নাঙ্গলকোটের হেসাখাল গ্রামের হরিপদ দাস হোরামনি,বালিয়াপুরের ইব্রাহিম খলিল,আলী হোসেন,জয়নাল আবেদীন, তুলাগাঁওয়ের মো.ইব্রাহিম।
আজগরা বাজার কমিটির সভাপতি নুরুল আমীন জানান, সে সময় তিনি ১৬বছরের কিশোর। ওই সময় তারা স্থানীয় আওয়ামীলীগ নেতা মুক্তিযুদ্ধের সংগঠক আলতাফ আলীর নেতৃত্বে শারিরীক কসরত করছিলাম। হঠাৎ বোমার শব্দ পাই। প্রথম বোমাটি পড়ে পাশের নিচু জমিতে। পরেরটি পড়ে বাজারের পশ্চিম পাশে তরকারি ও খুচরা চাউল বাজারে। মুহূর্তে বাজার খালি হয়ে যায়। চারিদিকে শুধু মানুষের লাশ। এ সংখ্যা ৫০এরও বেশি হবে।
মুড়ি বিক্রেতা হোরামনির ভুড়ি বরই গাছে আটকে থাকার দৃশ্য এখনও মনে পড়ে। প্রথমে এখানে কয়েক বছর নিহতদের স্মরণে মিলাদ পড়ানো হয়েছিলো। এঘটনার পর আওয়ামীলীগ নেতা জালাল আহমেদ,আবদুল আউয়াল,খোরশেদ আলম সুরুজ ও হাজী আলতাফ আলী ঘটনাস্থলে এসেছিলেন। তারা আহতদের বিভিন্ন হাসপাতালে পাঠান। তিনি চান এখানে একটি স্মৃতিস্তম্ভ গড়ে উঠুক। বেঁচে থাক পাক হায়েনাদের নৃংশসতার চিহ্ন।
নিহতদের একজন পাওতলী গ্রামের সাদেক হোসেন। তিনি ওই গ্রামের রমজান আলীর ৪ছেলে ৩মেয়ের সবার ছোট ছিলেন। তার ভাই মোবারক হোসেন (৭০)জানান, তার মৃত্যুর পর স্ত্রী চলে যায়। তার ভাইয়ের স্মৃতি চিহ্ন বলে কিছু নেই।
নিহতদের আরেকজন কালিয়া চৌঁ‘র আলী আশ্রাফের স্ত্রী আয়েশা খাতুন জানান,২ছেলে ৫মেয়ে রেখে তিনি মারা যান। খেয়ে না খেয়ে তাদের বড় করেছি। কেউ কোনো দিন আমাদের খবর নেয়নি।
একজন আহত কালিয়া চৌ‘র গ্রামের রমজান আলী। তিনি এখন মানসিক বিকারগ্রস্ত।
লাকসাম উপজেলা মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডার আবদুল বারী মজুমদার জানান,আজগরায় পাক-হায়েনাদের বোমা হামলায় অনেক মানুষ হতাহত হয়েছে। সেখানে একটি স্মৃতিস্তম্ভ গড়ে তোলা উচিত।